গাড়িটা অন্ধকার রাস্তা কেটে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। চারদিকে গভীর রাতের নীরবতা। মাঝে মাঝে রাস্তার লাইটগুলো গাড়ির কাঁচে পড়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির ভেতরে নরম আলো জ্বলছে।
আহাদ ধীরে ধীরে মাথাটা আযলানের কাঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তার শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। এত বছর ধরে আযলানের পাশে থেকে কত ঝড়, কত বিপদ সামলেছে সে।আযলান এক পলক পাশ ফিরে তাকাল।চোখে পড়ল—আহাদ ঠিক ছোটবেলার মতোই ঘুমাচ্ছে। মাথাটা হেলান দিয়ে আছে তার কাঁধে।
আযলানের চোখে মুহূর্তের জন্য নরম একটা দৃষ্টি ভেসে উঠল।
আহাদের আব্বু অনেক আগেই মারা গিয়েছিল। এক ভয়ংকর অ্যাকসিডেন্টে।সেই সময় আহাদ খুব ছোট ছিল।তারপর থেকেই আরশ খান তাকে নিজের ছেলের মতো করে বড় করেছে।
আযলানের আব্বু মানেই ছিল আহাদেরও আব্বু।আরশ কখনো তাদের আলাদা করে দেখেনি। সব সময় দুজনকে একই চোখে দেখেছে, একই ভালোবাসা দিয়েছে।ছোটবেলায় আযলান আর আহাদ প্রায় সব সময় একসাথে থাকত।একসাথে পড়া, একসাথে খেলাধুলা, একসাথে দুষ্টুমি।কেউ দেখলে বুঝতেই পারত না—তারা দুই ভাই নয়।আযলান আবার একবার আহাদের দিকে তাকাল।তারপর ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে নিল।
গাড়ি তখন শহরের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে বড় বড় আলো দেখা গেল।
এয়ারপোর্ট।
গাড়িটা ধীরে ধীরে গেট পার হয়ে ভেতরে ঢুকল।তারপর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে থেমে গেল।
ড্রাইভার পিছনে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“স্যার… পৌঁছে গেছি।”
কিন্তু আযলান কোনো উত্তর দিল না।সে ঠিক আগের মতোই বসে আছে।তার কাঁধে এখনো মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে আহাদ।আযলান একবার তাকিয়ে দেখল।কিন্তু তাকে জাগাল না।সে চুপচাপ বসে রইল।
গাড়ির কাঁচের বাইরে এয়ারপোর্টের আলো ঝলমল করছে।কিছু দূরে প্লেনের ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।ঘড়িতে তখন রাত প্রায় দুইটা ছুঁই ছুঁই।
নীরব রাত।গাড়ির ভেতর নিঃশব্দ।শুধু আহাদের শান্ত ঘুম আর আযলানের গভীর চিন্তা।
হঠাৎ আযলানের চোখ আকাশের দিকে গেল।মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের সেই রাত।রক্তে ভেজা মাটি।তার বাবার নিথর দেহ।আর একটা ছোট ছেলের কান্না।তার চোখ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল তাদের একজন লোক।
সে গাড়ির দরজার কাছে এসে ধীরে বলল—
“স্যার… সব প্রস্তুত। প্লেনও রেডি।”
আযলান ধীরে মাথা নাড়ল।কিন্তু সে এখনো বসে আছে।কারণ তার কাঁধে মাথা রেখে এখনো ঘুমাচ্ছে আহাদ।কয়েক সেকেন্ড পর আযলান খুব ধীরে নিজের হাতটা তুলে আহাদের মাথায় রাখল।মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল—
“আহাদ… ওঠো।”
আহাদ একটু নড়ে উঠল।ধীরে ধীরে চোখ খুলল।কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না সে কোথায়।
তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে পড়ল।
“ভাই… আমরা… পৌঁছে গেছি?”
আযলান গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল—
“হ্যাঁ। এবার চল।”
আহাদ দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল এয়ারপোর্টের ভেতরের দিকে।দূরে রানওয়েতে একটা প্রাইভেট জেট দাঁড়িয়ে আছে।তার আলো অন্ধকার রাতকে কেটে সামনে পড়ছে।আযলান থামল।একবার প্লেনটার দিকে তাকাল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
“বাংলাদেশ…”
তার চোখে আবার সেই পুরোনো আগুন জ্বলে উঠল।কারণ সে জানে—এই যাত্রা শুধু দেশে ফেরা নয়।এটা শুরু—একটা পুরোনো হিসাব চুকানোর।
-------------------------
সকাল টা ছিল অপূর্ব শান্ত আর মিষ্টি।
রাতের ঠান্ডা হাওয়া এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে সোনালি রোদ ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। সেই আলো বিছানার উপর পড়ে ঘরটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও কারও রান্নার হাঁড়িতে কিছু ফুটছে—তার হালকা গন্ধও যেন বাতাসে মিশে আছে।
এমন সুন্দর সকাল হলেও ঘরের ভেতরে থাকা তিনটা মেয়ের মুখে কিন্তু কোনো আনন্দের ছাপ নেই।বিছানার উপর এলোমেলো ভাবে বসে আছে ঐশী, লাইবা আর রাইশা।
মেট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে । এতদিন পড়াশোনা, পরীক্ষা, টেনশন—সবকিছু নিয়ে তারা খুব ব্যস্ত ছিল। কিন্তু এখন হঠাৎ করে সব শেষ হয়ে যাওয়ায় যেন একটা অদ্ভুত ফাঁকা সময় এসে পড়েছে।
এখন তাদের সামনে শুধু লম্বা ছুটি।কিন্তু এই ছুটিটা যেন আনন্দের বদলে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। কারণ কেউ তাদের কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে না।
এই নিয়েই সকাল থেকে তিনজনের গুজগুজ ফুসফুস চলছে।
তাদের বসার ভঙ্গিটাও দেখার মতো অদ্ভুত।
ঐশী বিছানার উপর উল্টো হয়ে শুয়ে আছে। তার মাথাটা বিছানায় রাখা, আর দুই পা তুলে দেয়ালে ঠেকিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে সে পা নাড়াচ্ছে আর বিরক্ত মুখে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
রাইশা আবার ঐশীর পেটের উপর মাথা রেখে আরাম করে শুয়ে আছে। এক হাতে বালিশ চেপে ধরে আছে, আর অন্য হাতে নিজের চুল নিয়ে খেলছে। তার মুখে একেবারে অলস ভাব—মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই।
আর লাইবা বিছানার উপর উবু হয়ে শুয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ছোট্ট ঘোড়া বিশ্রাম নিচ্ছে। তার দুই হাত সামনে ছড়ানো, আর মাথাটা একটু কাত হয়ে আছে।
তিনজনই গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।
“দেখ, আমি কিন্তু বলেই দিচ্ছি—এই ছুটিটা যদি বাসায় বসে কাটাতে হয়, আমি কিন্তু পাগল হয়ে যাবো,” ঐশী বিরক্ত হয়ে বলল।
রাইশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
“আমারও তাই মনে হচ্ছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে ভাবছিলাম—কি মজা হবে, কত জায়গায় ঘুরতে যাবো! আর এখন দেখ, কেউ একটা কথাও বলছে না।”
লাইবা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
“আমাদের কপালটাই খারাপ। সবাই বন্ধুদের সাথে কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। আর আমরা?”
তিনজন আবার চুপ হয়ে গেল।ঠিক তখনই—দরজার বাইরে হালকা পায়ের শব্দ শোনা গেল।পরের মুহূর্তেই দরজাটা একটু খুলে গেল।ভেতরে ঢুকল রাশিক।রাশিক রুমে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল।তার সামনে যে দৃশ্যটা সে দেখল—তা একেবারে অপ্রত্যাশিত।
ঐশী দেয়ালে পা তুলে উল্টো হয়ে আছে।রাইশা তার পেটের উপর মাথা রেখে শুয়ে।আর লাইবা উবু হয়ে আছে।
এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে রাশিকের চোখ যেন একটু বড় হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে তাকিয়ে থাকল।তারপর হঠাৎ করেই সে হেসে ফেলল।
“হাহাহা! এ কী অবস্থা তোমাদের?”
তার হাসির শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল।তিনজন একসাথে দরজার দিকে তাকাল।রাশিক সদ্য গোসল করেছে।
তার চুলগুলো এখনো হালকা ভেজা। কপালের উপর কয়েকটা ভেজা চুল পড়ে আছে। সে একটা পরিষ্কার শার্ট আর জিন্স পরে একেবারে বাইরে যাওয়ার মতো করে তৈরি হয়েছে। হালকা একটা সুগন্ধিও ব্যবহার করেছে।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে আজ একটু আলাদাই লাগছে।রুমের ভেতরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল।কিন্তু সবচেয়ে বেশি থমকে গেল রাইশা।তার চোখ রাশিকের উপর স্থির হয়ে গেল।সে যেন কয়েক সেকেন্ড অন্য জগতে চলে গেল।
তারপর অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—
“আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে… রাশিক ভাই।”
কথাটা বের হওয়ার সাথে সাথেই পুরো ঘরটা একেবারে চুপ হয়ে গেল।ঐশী, লাইবা আর রাশিক—তিনজনই একসাথে রাইশার দিকে তাকাল।রাইশা প্রথমে বুঝতেই পারল না কি হয়েছে।কিন্তু যখন দেখল সবাই তার দিকে অদ্ভুত ভাবে
তাকিয়ে আছে—তখনই যেন তার হুঁশ ফিরল।সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—সে কি বলে ফেলেছে!মুহূর্তের মধ্যে তার মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল।চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
সে তাড়াতাড়ি উঠে বসে তোতলাতে লাগল—
“মানে… আমি… ওই… আমি আসলে… বলতে চাইনি…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই লাইবা হো হো করে হেসে উঠল।
“ওই ওই! কি বললি একটু আগে?”
ঐশীও উঠে বসে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল—
“রাশিক ভাইকে খুব সুন্দর লাগছে… তাই না?”
রাইশা লজ্জায় একেবারে গুটিয়ে গেল।সে বালিশ দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিক—সে এখনো মুচকি মুচকি হাসছে।সকালের শান্ত ঘরটা মুহূর্তের মধ্যেই হাসি, লজ্জা আর খুনসুটিতে ভরে উঠল।
রুমের ভেতর তখনো হাসির রেশ রয়ে গেছে।রাইশা এখনো বালিশটা মুখের সামনে ধরে বসে আছে, যেন পৃথিবীর সব লজ্জা একসাথে এসে তাকে ঘিরে ধরেছে। তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
ঐশী রাইশার এই অবস্থা দেখে হালকা হেসে মাথা নাড়ল। তারপর একটু গম্ভীর ভঙ্গি করে বলল—
ঐশী:
“আরে বস! এত ইমবারেস হওয়ার কী আছে? সুন্দর কিছু দেখলে তার প্রশংসা করা উচিত।”
এই কথা শুনে লাইবা সাথে সাথে মাথা নাড়ল।
লাইবা:
“ঠিক ঠিক! কিন্তু একটা কথা বলি—রাশিক ভাই, আপনাকে তো সুন্দর লাগছে না!”
লাইবার কথা শুনে রুমে আবার এক মুহূর্তের জন্য চুপচাপ নেমে এল।
ঐশী সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে লাইবার দিকে তাকাল, তারপর দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল—
ঐশী:
“হ্যাঁ ঠিকই তো! সে রাইশার তো সুন্দর লাগতেই পারে রাশিক ভাইকে!”
রাইশা এবার সত্যিই মাথা তুলল। তার চোখে এমন অবস্থা,মনে হচ্ছে সে এখনই মাটির নিচে ঢুকে যেতে চায়।দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিকও এবার ভ্রু তুলে তাদের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে একটু এগিয়ে এল।
তারপর মজা করে বলল—
রাশিক:
“কেন রে? আমাকে কি সুন্দর লাগে না?”
তার কথার ভঙ্গি এমন ছিল যে লাইবা আর ঐশী আবার হেসে ফেলল।
লাইবা হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“না না, তা তো বলিনি! আপনি তো খুবই… খুবই… সুন্দ—”
কথাটা শেষ করার আগেই ঐশী হেসে বলল—
“লাইবা, বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। এখন রাইশা অজ্ঞান হয়ে যাবে!”
রাইশা এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে বালিশটা লাইবার দিকে ছুঁড়ে মারল।
“তোরা চুপ করবি! আমি কিন্তু কিছুই বলিনি!”
ঐশী সাথে সাথে বলল—
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা তো শুনিইনি! রাশিক ভাইও শুনেনি… তাই না ভাই?”
রাশিক হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“না, আমি তো কিছুই শুনিনি।”
তারপর একটু থেমে মুচকি হেসে যোগ করল—
“শুধু একটা কথা শুনেছি—কেউ একজন খুব মিষ্টি স্বরে বলছিল আমাকে নাকি খুব সুন্দর লাগছে!”
এই কথা শুনে রুমের ভেতর আবার হাসির ঝড় বয়ে গেল।
আর মাঝখানে বসে থাকা রাইশা—সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণেও অজান্তে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
ঐশী—
"ভাইয়া আপনি কি কোথাও যাবেন"
রাশিক—
"হ্যাঁ,ওই আযলান,আহাদ আর সাদ্দিক"
বলার আগেই রাশিক এর ফোনটা বেজে উঠলো।
Happy Reading ☺
To Be Continue 😅