সূচিপত্র
১. স্বপ্ন দেখা কেন জরুরি
২. ছোট পদক্ষেপের বড় জয়
৩. ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়
৪. সময় ব্যবস্থাপনায় সাফল্য
৫. ধৈর্য – জীবনের গোপন চাবি
৬. আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় কিভাবে?
৭. নেতিবাচক মানুষদের দূরে রাখা
৮. নিজের গল্প তৈরি করো
৯. অভাবই অনেক সময় আশীর্বাদ
১০. শিখতে হবে না বলার ক্ষমতা
১১. জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া
১২. তোমার গল্প, তোমার শক্তি
চ্যাপ্টার ১ – স্বপ্ন দেখা কেন জরুরি
ছোটবেলা থেকে আমরা সবাই শুনে আসছি – স্বপ্ন দেখো। কিন্তু কেন? অনেকেই ভাবে, স্বপ্ন দেখা মানেই হয়তো আকাশ কুসুম ভাবনা। আবার অনেকে বলে, স্বপ্ন দেখলেই যদি সব হতো, তাহলে তো সবাই সফল হতো।
আসলে স্বপ্ন মানে শুধু কল্পনা নয়। স্বপ্ন হচ্ছে একটি শক্তি, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে। স্বপ্ন মানুষকে সেই কাজ করতে বাধ্য করে, যা সে হয়তো কখনও ভাবতে পারেনি। আসলেই, মানুষ যত বড় অর্জন করেছে, তার শুরু হয়েছিল একটা ছোট্ট স্বপ্ন থেকে।
আজ কিছু বাস্তব গল্প শোনাই, যেখানে স্বপ্নের জোরেই জীবন বদলে গেছে।
মাদার টেরেসার স্বপ্ন
১৯১০ সালে আলবেনিয়ার এক ছোট্ট শহরে জন্মেছিলেন । সবাই তাকে মাদার টেরেসা নামে চেনে। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। পরিবারে অভাব। তবুও মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন সবসময় জ্বলতে থাকল – গরীব, অসহায়, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ভারতে এসে প্রথমে তিনি শিক্ষকতা শুরু করলেন। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় কাঁদতে থাকা অসুস্থ মানুষদের দেখে তার মন ভেঙে যায়। তিনি ভাবলেন, “আমি যদি এদের জন্য কিছু না করি, তাহলে আমার জীবন বৃথা।”
শুরু করলেন একাই। তবুও সেই স্বপ্নের জন্য দিন-রাত লড়াই করলেন। আর আজ কোটি কোটি মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। তিনি প্রমাণ করে গেলেন – একটা স্বপ্ন, একা একজন মানুষও কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অমিতাভ বচ্চনের লড়াই
ভারতের আরেক স্বপ্নবাজ মানুষ অমিতাভ বচ্চন। আজ তিনি কিংবদন্তী। কিন্তু একসময় তার স্বপ্ন প্রায় ভেঙেই গিয়েছিল।
ছোটবেলায় অমিতাভ খুব লম্বা ছিলেন, দেখতেও সাধারণ। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে প্রথমে একের পর এক প্রত্যাখ্যান পেয়েছিলেন। অনেকে বলেছিল, “তোমার গলার স্বর সিনেমার চলবে না। দেখতে নায়কের মতো না।”
তবুও স্বপ্নের কাছে হার মানেননি। ছোট ছোট কাজ করতে করতে একদিন “জঞ্জির” ছবির নায়ক হলেন। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। অথচ একসময় তার পকেটে টাকাও ছিল না। চিকিৎসার জন্য বন্ধুর সাহায্য নিতে হয়েছিল।
তিনি নিজেই বলেন – “আমি স্বপ্ন দেখতাম, তাই এত লড়াই করতে পেরেছি। স্বপ্ন না থাকলে হয়তো আমি অনেক আগেই হেরে যেতাম।”
কালাম স্যারের স্বপ্ন
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম। ছোটবেলায় রামেশ্বরমের এক গরীব পরিবারে বড় হয়েছেন। পিতার নৌকা ছিল, যা দিয়ে পুজোর জিনিসপত্র বহন করতেন। ছোট্ট কালাম খবরের কাগজ বিলি করতেন, পরিবারকে পরিচালনা করার জন্য।
কিন্তু তাঁর চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। একদিন শিক্ষক তাকে জিজ্ঞেস করলেন – “তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?” কালাম বলেছিলেন – “আমি বিমান বানাতে চাই।”
তখন অনেকেই হেসেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নই তাকে বিজ্ঞানী বানাল। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে তিনি অমূল্য অবদান রাখলেন। রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত হলেন। যাকে পৃথিবীর সকলেই “মিসাইল ম্যান” বলে চিনে।
কালাম বলতেন – “স্বপ্ন সেটা নয় যেটা ঘুমিয়ে দেখো, স্বপ্ন সেটা যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।”
লতা মঙ্গেশকরের গান
লতা মঙ্গেশকরের গল্পও আমরা সকলে জানি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিল। সংসারে অভাব। তবুও মনে রেখেছিলেন বাবার কথা – “তুমি একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে।”
রেকর্ডিং স্টুডিওতে প্রথম প্রথম অনেকেই বলত, “তোমার গলায় কিছু নেই।” কিন্তু লতা নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখলেন। দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা পরিশ্রম করতেন গানের অভ্যাস করতেন। অবশেষে তাঁর গান হয়ে গেল কোটি মানুষের প্রাণের স্পর্শ।
তিনি প্রমাণ করলেন – স্বপ্ন বড় না হলে, মানুষও বড় হতে পারে না।
ছোট মানুষের বড় স্বপ্ন
সবাই তো বড় বড় তারকার গল্প নয়। আমাদের চারপাশেই আছে অনেক সাধারণ মানুষের অসাধারণ স্বপ্নের গল্প। যেমন
এক অটোচালক, দিনশেষে সামান্য আয় থেকে মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখছে। তার মেয়ে এখন সরকারি মেডিকেলে কলেজের একজন বড় ডাক্তার।
গ্রামের মেয়ে সুলেখা, বাবা দিনমজুর। তবুও রাত জেগে পড়ে, একদিন শিক্ষক হয়েছে।
আমাদের পাড়ার মুদি দোকানদার রতনদা, সংসারের চাপ সামলে রাতে কম্পিউটার শেখে। একদিন নিজের ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি খুলেছে।
এসব মানুষের গল্প প্রমাণ করে – স্বপ্ন কখনও পেশা, টাকা বা বড় শহরের ওপর নির্ভর করে না। স্বপ্ন জন্মায় মনের ভিতর।
স্বপ্নের বিজ্ঞান
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, স্বপ্ন দেখা শুধু আবেগ নয়, এটি ব্রেইনের জন্য দরকারি। যখন আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের মস্তিষ্ক “পজিটিভ কেমিক্যাল” তৈরি করে। সেই রাসায়নিক আমাদের দুঃখ, হতাশা, ক্লান্তি কমিয়ে নতুন শক্তি দেয়।
তাই স্বপ্ন দেখা শুধু গল্প নয়, বিজ্ঞানের একটি অংশ , শারীর সুস্থ থাকতে স্বপ্ন দেখাটা জরুরী। যে মানুষ স্বপ্ন দেখে, সে হতাশায় ভাঙে না। চেষ্টা চালিয়ে যায়।
কেন স্বপ্ন জরুরি?
১. স্বপ্ন আশা দেয়।
খারাপ সময়ে মনে হয়, “একদিন সব বদলাবে।”
২. স্বপ্ন দিকনির্দেশনা দেয়।
যেমন Google-এর দুই প্রতিষ্ঠাতা ছোটবেলায় ভাবত, “সারা পৃথিবীর তথ্য এক ক্লিকে আনব।”
৩. স্বপ্ন মানুষকে জিদী করে তোলে।
মেরি কম, ছোট গ্রাম থেকে ৬ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কারণ স্বপ্ন ছাড়া সম্ভব নয়।
৪. স্বপ্ন জীবনের মানে দেয়।
টাকা, নাম – সবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু স্বপ্ন মানুষকে বাঁচতে শেখায়। শেখায় কিভাবে বড় হওয়া যায় আরো শেখায় জীবনের মানে।
নিজের স্বপ্ন তৈরি করো
তুমি যেই হও – ছাত্র, চাকুরিজীবী, গৃহিণী, ব্যবসায়ী – স্বপ্ন না থাকলে জীবন থেমে যায়। হয়তো বলছো, “আমার স্বপ্ন কী হবে বুঝতে পারছি না।”
কোন জিনিস করতে তোমার ভালো লাগে? কোন মানুষকে দেখে ভাবো, “ওর মতো হতে চাই”? সেই ভাবনা থেকেই শুরু করো। ছোট ছোট স্বপ্ন লেখো। সেটাই একদিন বড় হবে।
মনে রেখো – তুমি যা ভাবতে পারো, সেটা একদিন করতে পারো।
আজ যাদেরকে বড় মানুষ ভাবি, তারাও একদিন ছোট্ট স্বপ্ন থেকে শুরু করেছিল। জীবন অনেক কঠিন। কিন্তু স্বপ্নের কাছে সবকিছু ছোট।
তাই বলি – স্বপ্ন দেখো। স্বপ্নকে ছোট করো না। কারণ, স্বপ্নই বদলাবে তোমার জীবন।