Read Shadow Ledger by Sohagi Baski in Bengali Crime stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ছায়ার হিসাব

#পর্ব ১*****
রাত নামলেই শহরটা বদলে যেত। দিনে যে রাস্তা ব্যস্ত আর নিরীহ, রাতে সেখানেই হাঁটত রায়হান খান—নীরব, হিসেবি, চোখে এমন এক দৃষ্টি যা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলত। রায়হানের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, উচ্চতা মাঝারি, শরীর চওড়া নয় কিন্তু শক্ত। মুখে হালকা দাড়ি, চোখের নিচে সবসময় ক্লান্তির ছায়া। সে এমন একজন, যাকে একবার দেখলে ভুলে যাওয়া যায় না, কিন্তু মনে রাখার কারণও ঠিক বোঝা যায় না।
রায়হান ছিল একজন হিসাবরক্ষক—কিন্তু ব্যাংকের নয়, অপরাধের। সে খুন করত না, চুরি করত না, কিন্তু বড় বড় অপরাধের অঙ্ক কষত। কোন কাজ করলে কত ঝুঁকি, কত লাভ, কার বিশ্বাস ভাঙবে—সবকিছুর হিসাব তার মাথায় পরিষ্কার থাকত। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে সবাই চিনত “মাস্টার” নামে।
তার এই জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ। একসময় সে ছিল পুলিশের এক জুনিয়র অফিসারের ছেলে। বাবার সততার জন্যই পরিবার ভেঙে গিয়েছিল। এক মামলায় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোয় বাবাকে মিথ্যে অভিযোগে চাকরি হারাতে হয়। অপমান, দারিদ্র্য আর অবহেলা—এই তিনে রায়হানকে ধীরে ধীরে অন্য মানুষ বানিয়ে দেয়। সে বুঝে যায়, এই শহরে ন্যায় নয়, হিসাবই শেষ কথা।
রায়হানের নিয়ম ছিল কঠিন। সে কখনো আবেগে সিদ্ধান্ত নিত না। কাজের আগে সে মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করত—কে লোভী, কে ভয় পেলে ভাঙবে, কে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল মানুষের দুর্বলতা বোঝার ক্ষমতা।
এক রাতে তার কাছে আসে শহরের বড় চোরাকারবারি সালমান মল্লিক। কাজটা বড়—এক রাজনৈতিক নেতার কালো টাকার হিসাব সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে প্রমাণ না থাকে। রায়হান কাগজপত্র দেখেই বুঝে যায়, এটা শুধু টাকা নয়, ক্ষমতার খেলা। সে কাজ নিতে রাজি হয়, কিন্তু শর্ত দেয়—সে একাই পুরো পরিকল্পনা করবে।
পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল। ভেতরের লোক, সময়, নিরাপত্তা—সব হিসাব মিলে যায়। কাজ সফল হয়। কিন্তু রায়হান তখনই টের পায়, কোথাও একটা হিসাব মিলছে না। সালমানের চোখে ছিল তাড়াহুড়া আর ভয়। রায়হান বুঝে যায়, পরের শিকার সে নিজেই হতে পারে।
সেই রাত থেকেই রায়হান সাবধান হয়ে যায়। সে নিজের সব যোগাযোগ বদলে ফেলে, রুটিন ভাঙে, এমনকি নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস ছিল তার অতীত—তার বাবার পুরনো মামলা আবার খোলা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে ইন্সপেক্টর আরিফ, যে একসময় রায়হানের বাবার অধীনে কাজ করত।
আরিফ ধীরে ধীরে রায়হানের কাছাকাছি পৌঁছায়। সরাসরি নয়—হিসাবের ভুল ধরে। একের পর এক অপরাধে সে এমন প্যাটার্ন পায়, যা কেবল একজন মানুষই বানাতে পারে। আরিফ জানত, রায়হান খারাপ মানুষ নয়—সে ভুল পথে হাঁটা এক বুদ্ধিমান মানুষ।
শেষ মুখোমুখি হয় শহরের এক পুরনো গুদামে। কোনো বন্দুক বের হয় না, কোনো চিৎকারও না। শুধু দুইজন মানুষ—একজন আইনের পক্ষে, একজন হিসাবের পক্ষে। আরিফ রায়হানকে বলে, “তোর বাবার মামলা আমি আবার খোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু তুই যদি এই পথে থাকিস, তাহলে সব শেষ।”
রায়হান চুপ করে থাকে। তার চোখে প্রথমবার দ্বিধা। সে বুঝে যায়, জীবনে সব হিসাব কষা যায় না। কিছু দেনা থাকে, যা টাকায় মেটে না।
পরদিন সকালে শহর জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে—রায়হান খান নিখোঁজ। কেউ বলে সে দেশ ছেড়েছে, কেউ বলে খুন হয়েছে। কিন্তু আরিফ জানত সত্যিটা আলাদা। রায়হান নিজেকে মুছে ফেলেছে—তার অপরাধের হিসাব চুকিয়ে, বাবার নামটা অন্তত পরিষ্কার করার আশায়।
শহর আবার আগের মতো চলতে থাকে। শুধু রাতে কোনো কোনো হিসাব মিললে, অজানা এক ছায়ার কথা মনে পড়ে—যে জানত, অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর জিনিস হলো নিখুঁত হিসাব।
ফোন রাখার পর রায়হান খান বেশ কিছুক্ষণ নড়েনি।
তার ঘরে আলো জ্বলছিল না। সে অন্ধকারেই বসে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে—কারণ অন্ধকারে মানুষ আসল চেহারা লুকাতে পারে না, শুধু প্রকাশ পায়।
টেবিলের ওপর রাখা পুরনো ঘড়িটা টিকটিক করে চলেছে। প্রতিটা শব্দ যেন সময়ের নয়, বরং অতীতের। রায়হান ধীরে ধীরে ফাইলটা খুলে দেখে—তার বাবার কেস। পাতাগুলো হলদেটে, কিন্তু ভেতরের অভিযোগগুলো এখনও তাজা। মিথ্যে সাক্ষ্য, চাপা দেওয়া প্রমাণ, ক্ষমতার জোর।
রায়হান ঠোঁট চেপে ধরে।
রাগ নয়—এই অনুভূতিটা তার কাছে অচেনা। এটা ছিল উপলব্ধি।
এই শহরে কেউ নির্দোষ নয়, কেউ নিরাপদও না।
হঠাৎ দরজায় হালকা নক।
তিনবার।
সমান ছন্দে।
রায়হান বুঝে যায়—এটা সাধারণ নক নয়। সে চেয়ার থেকে ওঠে না। শুধু বলে,
—“ঢুকো।”
দরজা খুলে ভেতরে আসে নাসির। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, চোখে সবসময় ভয় আর লোভের মিশ্রণ। সে রায়হানের পুরনো যোগাযোগ—খবর আনে, কিন্তু কখনো পুরো সত্য না।
—“মাস্টার, নামটা শুনলে চিনবেন,” নাসির ফিসফিস করে বলে।
—“শুনাই,” রায়হান শান্ত স্বরে জবাব দেয়।
—“সালমান মল্লিক।”
এই নামটা ঘরে ভারী হয়ে পড়ে।
সালমান মল্লিক মানে টাকা, অস্ত্র, রাজনীতি—সব একসাথে। আর তার সাথে কাজ মানে নিজের কবর নিজে খোঁড়া।
রায়হান ধীরে চোখ তুলে তাকায়।
—“সে ভয় পেয়েছে?”
নাসির একটু থামে। তারপর মাথা নেড়ে বলে,
—“খুব।”
রায়হান হালকা হাসে। ভয় পাওয়া মানুষই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ তারা বাঁচতে যেকোনো কিছু করতে পারে।
—“বল,” রায়হান বলে, “সে কী চায়?”
নাসির সামনে একটা পেনড্রাইভ রাখে।
—“ডেটা। পুরনো হিসাব। কিছু নাম মুছে ফেলতে চায়… কিছু নাম মরতে বসেছে।”
রায়হান পেনড্রাইভটা নেয় না।
—“মরার হিসাব আমি রাখি না,” সে বলে। “আমি শুধু ভুলের হিসাব ঠিক করি।”
নাসির গিলতে গিলতে বলে,
—“এই ভুলটা যদি ঠিক না হয়… শহরটা কাঁপবে।”
রায়হান জানালার কাছে যায়। বাইরে দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। সে জানে—এই শব্দ সবসময় দেরিতে আসে। আগে আসে অপরাধ, পরে আইন।
—“সালমানকে বল,” রায়হান ধীরে বলে,
“আমি কাজ নিলে… কেউ নিরাপদ থাকে না। সে নিজেও না।”
নাসির মাথা নোয়ায়।
—“কাল রাতে দেখা?”
—“না,” রায়হান উত্তর দেয়।
“আজ রাতেই।”
নাসির চলে যায়। দরজা বন্ধ হয়।
ঘরে আবার নীরবতা।
রায়হান টেবিলে বসে পেনড্রাইভটা হাতে নেয়। তার আঙুল কাঁপে না। কিন্তু মাথার ভেতরে একটা লাইন ঘুরতে থাকে—
এই কাজটা তার বাবার কেসের সাথে জড়িত।
সে নিজেকে ফিসফিস করে বলে,
“এইবার হিসাব ভুল করলে… বাঁচার সুযোগ থাকবে না।”
রাত আরও গভীর হয়।
শহরের আলো নিভে আসে।
আর রায়হান খান বুঝে যায়—এই পর্বটা শুধু শুরু। অন্ধকার এখনো পুরো নামেনি।


#পর্ব ২****
সালমান মল্লিককে প্রথম দেখেই বোঝা যায়—এই লোকটা কাউকে বিশ্বাস করে না, এমনকি নিজেকেও না।
রাত তিনটার পর শহরের পুরনো ডকইয়ার্ডে দেখা। জায়গাটা ইচ্ছে করেই বেছে নেওয়া—চারদিকে খোলা, কিন্তু পালানোর রাস্তা কম। সালমান মোটা গড়নের, দামি স্যুট পরা, কিন্তু চোখে স্থিরতা নেই। তার হাত বারবার ঘড়ির দিকে যায়, যেন সময় নয়—ভাগ্য মাপছে।
রায়হান খান দূর থেকেই সব লক্ষ করে।
ভয় পাওয়া মানুষ—চেয়ারের ভঙ্গি, চোখের পাতা, নিঃশ্বাস—সব কিছুতেই তাড়াহুড়া থাকে।
—“তুমি দেরি করো না,” সালমান বলে।
—“আমি দেরি করি না,” রায়হান শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
“আমি অপেক্ষা করাই।”
সালমান হালকা হাসে, কিন্তু সেটা হাসি নয়—চাপা আতঙ্ক।
টেবিলে ফাইল রাখা হয়। নাম, লেনদেন, তারিখ—সব। এই কাগজগুলো থাকলে অনেক ক্ষমতাবান মানুষ জেলে যাবে। না থাকলে—সবাই মুক্ত।
—“এগুলো মুছে ফেলতে হবে,” সালমান বলে।
—“মুছে ফেলা যায়,” রায়হান বলে,
“কিন্তু মুছে ফেলার শব্দ থাকে।”
সালমান থমকে যায়।
—“আমি টাকা দেবো,” সে তাড়াতাড়ি বলে। “যত লাগে।”
রায়হান এবার চোখ তুলে তাকায়।
—“টাকা সমস্যা না,” সে বলে,
“সমস্যা হলো—তুমি কাকে বাঁচাতে চাও, আর কাকে মরতে দিতে রাজি।”
এই প্রশ্নটার উত্তর সালমানের কাছে ছিল না।
কারণ সত্যিটা ভয়ংকর—সে সবাইকে বাঁচাতে চায়, কিন্তু সবার খরচ দিতে চায় না।
রায়হান তখনই বুঝে যায়—এই লোকটা শেষ পর্যন্ত কাউকে না কাউকে ফাঁসাবে।
প্রশ্ন শুধু—সে কি আগে করবে, না পরে।
কাজের শর্ত ঠিক হয়। সাত দিনের মধ্যে ডেটা “দুর্ঘটনায়” নষ্ট হবে।
কিন্তু রায়হান ভিতরে ভিতরে অন্য হিসাব কষছিল।
সেই রাতেই আরেকজন মানুষ রায়হানের নাম শুনে ফেলে—
ইন্সপেক্টর আরিফ।
আরিফ শান্ত মানুষ। বেশি প্রশ্ন করে না। কিন্তু যে প্রশ্ন করে, সেটা ছাড়ে না। সে অপরাধের জায়গায় রক্ত খোঁজে না—ভুল খোঁজে। আর এই কেসে ভুলের ছক খুব পরিচিত।
আরিফ ফাইলের এক কোণে একটা নাম দেখে থমকে যায়—
ইমরান খান।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ পড়ে।
“কাকতাল নয়,” সে ফিসফিস করে বলে।
এইদিকে, রায়হান প্রথমবারের মতো নিজের নিয়ম ভাঙে।
সে নাসিরকে বলে,
—“যদি আমি নিখোঁজ হই… এই ফাইলটা আরিফের হাতে পৌঁছাবে।”
নাসির ভয় পেয়ে যায়।
—“মাস্টার, আপনি নিজেই তো বলতেন—ভরসা করলে মরতে হয়।”
রায়হান হালকা হাসে।
—“এই শহরে বাঁচতেও কখনো কখনো মরার ঝুঁকি নিতে হয়।”
রাত শেষে যায়, কিন্তু অস্বস্তি যায় না।
সালমান কাউকে মারবে।
আরিফ কাউকে ধরবে।
আর রায়হান—সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, সে কাকে বাঁচাতে চাইছে।
অন্ধকার এবার শুধু বাইরে না—তার ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।ডকইয়ার্ড ছেড়ে বেরোনোর সময় রায়হান বুঝতে পারছিল—সালমান মল্লিক তাকে অনুসরণ করছে না, কিন্তু বিশ্বাসও করছে না। এই দুটো একসাথে হলে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল করে।
গাড়ির ভেতর বসে রায়হান আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়। সে নিজেকে প্রশ্ন করে না—কারণ উত্তরগুলো সে আগেই জানে। সে শুধু নিশ্চিত হতে চায়, সে এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে কি না।
ফিরে এসে সে সরাসরি অফিসে ঢোকে। দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপ অন করে। পেনড্রাইভ ঢোকানোর আগে সে থামে। এই ডেটা শুধু সংখ্যার তালিকা না—এটা ক্ষমতার মানচিত্র। কে কার কাছে মাথা নত করে, কে কার ঘাড়ে পা রেখে উঠে এসেছে—সব লেখা আছে এখানে।
রায়হান একটার পর একটা ফোল্ডার খোলে।
হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় একটা সাবফাইলে।
“কেস_৪১_রিওপেন”
তার বুকের ভেতর হালকা ধাক্কা লাগে।
এই নামটা কেউ জানার কথা না।
সে ফাইল খোলে না।
খুললেও লাভ নেই—কারণ সে বুঝে গেছে, কেউ তাকে আগেই দেখছে।
ঠিক তখনই নাসির আবার আসে। এবার তার মুখে রঙ নেই।
—“মাস্টার…”
—“বল,” রায়হান শান্ত।
—“একটা লোক মারা গেছে।”
রায়হান চেয়ার ছাড়ে না।
—“কে?”
—“সালমানের হিসাবরক্ষক। আজ দুপুরে। হার্ট অ্যাটাক বলা হচ্ছে।”
রায়হানের চোখ আধখোলা থাকে। হার্ট অ্যাটাক—ভালো শব্দ। এতে প্রশ্ন কম হয়।
—“সময়?”
—“আমাদের মিটিংয়ের তিন ঘণ্টা পর।”
রায়হান ধীরে শ্বাস নেয়।
এটা ছিল সতর্কবার্তা।
সালমান কাউকে সরিয়ে দিয়েছে—এটা প্রমাণ করার জন্য যে সে অপেক্ষা করবে না।
—“আর কেউ জানে?”
—“পুলিশ,” নাসির বলে, “আর… ইন্সপেক্টর আরিফ।”
এই নামটা ঘরে ঢুকতেই বাতাস ভারী হয়ে যায়।
রায়হান উঠে দাঁড়ায়।
—“আরিফ ভুল লোক না,” সে ধীরে বলে।
“সে বেশি গভীরে গেলে… সত্যটা বের করবেই।”
নাসির কাঁপা গলায় বলে,
—“তাহলে আমরা শেষ?”
রায়হান জানালার দিকে তাকায়। বাইরে সন্ধ্যা নামছে।
—“না,” সে বলে,
“খেলা এখনো শুরুই হয়নি।”
একই সময়, অন্য প্রান্তে—আরিফ মৃত লোকটার অফিসে দাঁড়িয়ে। কোনো ছিনতাইয়ের চিহ্ন নেই, কোনো লড়াইও না। শুধু ডেস্কে এলোমেলো কাগজ। কিন্তু একটা ড্রয়ার খোলা—অকারণে।
আরিফ ফাইলগুলো দেখেই বুঝে যায়—কেউ তথ্য খুঁজেছে, টাকা নয়।
সে মনে মনে একটা নাম লেখে, যেটা সে উচ্চারণ করে না।
রায়হান।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সালমান রায়হানকে আবার ফোন করে।
—“আমি বলেছিলাম, সময় নেই,” সালমান বলে।
—“আমি বলেছিলাম,” রায়হান জবাব দেয়,
“তাড়াহুড়া করলে হিসাব ভুল হয়।”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ।
—“তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?”
—“না,” রায়হান শান্তভাবে বলে,
“আমি তোমাকে তোমার নিজের ভয়টা দেখাচ্ছি।”
কল কেটে যায়।
রায়হান চেয়ারেই বসে থাকে।
তার মাথার ভেতর তিনটা লাইন স্পষ্ট—
১. সালমান কাউকে না কাউকে আরও মারবে।
২. আরিফ খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
৩. এই কাজ শেষ হলে রায়হান আর আগের মতো থাকবে না।
সে ল্যাপটপ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
“অন্ধকার যখন কথা বলতে শুরু করে… তখন আলো আর দেরি করতে পারে না।”
বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা যায়।
এবার সেটা আরও কাছাকাছি।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের অফিসটা যেন ছোট হয়ে আসছিল। দেয়ালগুলো কাছে সরে এসেছে এমন অনুভূতি হচ্ছিল তার। সে জানত—এই অনুভূতিটা ভয় নয়। এটা ছিল সতর্কতা। ভয় মানুষকে দুর্বল করে, আর সতর্কতা মানুষকে বাঁচায়।
রায়হান আবার ল্যাপটপ চালু করে।
এবার সে সেই ফাইলটাই খোলে—
“কেস_৪১_রিওপেন”
ভেতরে খুব বেশি কিছু নেই। শুধু কিছু তারিখ, দুইটা নাম, আর এক লাইন মন্তব্য—
“মূল সাক্ষ্য এখনো জীবিত।”
রায়হানের আঙুল থেমে যায়।
এই লাইনটা মানে—তার বাবার কেস পুরোপুরি শেষ হয়নি। কেউ একজন ইচ্ছে করেই সত্যটা লুকিয়ে রেখেছিল। আর এখন কেউ সেটা সামনে আনতে চাইছে।
প্রশ্ন একটাই—কে?
সে ফাইল বন্ধ করে দেয়।
কারণ কিছু সত্য আছে, যেগুলো খুব তাড়াতাড়ি জানা উচিত না।
ঠিক তখনই নাসিরের ফোন আসে।
—“মাস্টার… সালমান আজ রাতেই শহর ছাড়ছে।”
—“একাই?”
—“না। দুইজন দেহরক্ষী। আর… একটা গাড়ি আলাদা পথে যাচ্ছে।”
রায়হান হালকা চোখ সরু করে।
আলাদা গাড়ি মানে—ডিকয়।
সালমান কাউকে ফাঁসাতে চাইছে।
—“সে কাউকে দিচ্ছে,” রায়হান বলে।
“প্রশ্ন হলো—কাকে?”
নাসির চুপ।
কারণ উত্তরটা সে জানে।
—“আপনাকেই, মাস্টার।”
রায়হান ফোন নামিয়ে রাখে।
তার ভেতরে কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু নিশ্চিত ভাব—এই লোকটা এতদিনে ঠিক জায়গায় এসেছে।
অন্যদিকে, আরিফ নিজের অফিসে বসে কফি ঠান্ডা হতে দেয়। সে ফাইলগুলো একবারও ছোঁয় না। শুধু দেখে। কারণ সে জানে—অপরাধী তাড়াহুড়া করে, কিন্তু সত্য অপেক্ষা করে।
তার চোখ থামে একটা ছবিতে—
ইমরান খান, ইউনিফর্মে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে।
আরিফ ধীরে বলে,
“আপনি মিথ্যে ছিলেন না, স্যার।”
এই মুহূর্তে শহরের তিনটা জায়গায় তিনজন মানুষ তিনটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—
সালমান ভাবছে, কাকে বলি দিলে সে বাঁচবে।
আরিফ ভাবছে, কাকে ধরলে সত্যটা বেরোবে।
আর রায়হান ভাবছে—সে নিজে এবার হিসাবের কোন পাশে দাঁড়াবে।
রাত আরও ঘন হয়।
কিন্তু অন্ধকার আর আগের মতো নিরাপদ না।
কারণ অন্ধকারে জন্ম নেওয়া মানুষটা এবার আলো চিনতে শুরু করেছে।

#পর্ব ৩****



রায়হান খান জানত—ভোর হওয়ার আগেই কিছু একটা ভাঙবে।
এই শহরে বড় সিদ্ধান্তগুলো সবসময় আলো আসার ঠিক আগে নেওয়া হয়।
সে অফিস ছাড়েনি। জানালা দিয়ে ভোরের ফ্যাকাসে আলো ঢুকছে, কিন্তু ঘরের ভেতর অন্ধকারটা এখনো শক্ত। রায়হান টেবিলে রাখা তিনটা জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকে—ল্যাপটপ, বাবার ফাইল, আর একটা সিমকার্ড। এই তিনটার যেকোনো একটায় হাত বাড়ালেই তার জীবন অন্য দিকে ঘুরে যাবে।
সিমকার্ডটা ছিল সালমানের দেওয়া—“সরাসরি যোগাযোগের জন্য”।
রায়হান জানত, সরাসরি যোগাযোগ মানেই সরাসরি বিপদ।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।
—“তুমি কোথায়?” সালমানের গলা এবার শান্ত না।
—“যেখানে হিসাব ভাঙে না,” রায়হান উত্তর দেয়।
—“তুমি আমার সাথে খেলছো?”
—“না,” রায়হান বলে,
“তুমি নিজের সাথে খেলছো। আমি শুধু স্কোর লিখছি।”
ওপাশে শ্বাসের শব্দ।
তারপর আসল কথাটা।
—“আজ রাতেই ডেটা উধাও চাই,” সালমান বলে।
“না হলে আমি তোমার নামটা ছেড়ে দেবো।”
এই হুমকিটা নতুন না।
কিন্তু এবার আলাদা ছিল।
রায়হান বুঝে যায়—সালমান ইতিমধ্যে কাউকে জানিয়েছে। পুরো নাম না হোক, ছায়াটা ছেড়ে দিয়েছে।
এটাই ছিল রায়হানের প্রথম ভুল।
সে ভেবেছিল, সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
ফোন কেটে দিয়ে সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়—সে আর অপেক্ষা করবে না।
সে ডেটা মুছবে, কিন্তু সালমানের জন্য নয়।
সে মুছবে, যাতে সত্যটা নতুন করে সাজানো যায়।
ল্যাপটপে কাজ শুরু হয়।
ফাইলগুলো একটার পর একটা খুলে, বদলায়, ভেঙে যায়।
কিন্তু একটা ফাইল সে ছোঁয় না—
ইমরান খান: কেস ৪১
এই ফাইলটা সে কপি করে রাখে আলাদা করে।
ঠিক একই সময়, শহরের অন্য প্রান্তে—ইন্সপেক্টর আরিফ রাতের ডিউটি নিজেই নেয়।
কারণ তার বুক বলছে, আজ কাউকে ধরা পড়তেই হবে।
একটা নাম বারবার উঠে আসছে—রায়হান খান।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তার বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু নেই। শুধু ফাঁক।
আরিফ জানে—যেখানে ফাঁক বেশি, সেখানে বুদ্ধিমান অপরাধী থাকে।
রাত নামতেই সালমান শহর ছাড়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু যে গাড়িটায় সে নেই, সেটাই ধরা পড়ে।
ভেতরে পাওয়া যায়—ডেটার কপি, আর একটা নাম লেখা কাগজে।
R. Khan
আরিফ কাগজটা হাতে নিয়ে থেমে যায়।
এই প্রথমবার সে নিশ্চিত হয়—রায়হান শুধু ছায়া না, কেন্দ্র।
এদিকে রায়হান কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।
সে জানে—এখন আর পেছনে ফেরার রাস্তা নেই।
ঠিক তখন দরজায় জোরে নক।
এই নকটা আগের মতো না।
এটা আইন-এর নক।
রায়হান দরজার দিকে তাকায়।
ভেতরে তার বুক শান্ত।
কারণ সে বুঝে গেছে—অপরাধের হিসাব শেষ হলেও, নিজের হিসাব এখনো বাকি।
দরজার ওপাশ থেকে আরিফের গলা ভেসে আসে—
“রায়হান খান, দরজা খুলুন।”
রায়হান একবার চোখ বন্ধ করে।
এই প্রথম সে ভাবছে—হয়তো বাবার সত্যটা বেরোতে যাচ্ছে।
সে দরজার দিকে এগোয়।
দরজার ওপাশে নীরবতা।
আইনের নীরবতা—যেটা চিৎকার করে না, কিন্তু পিছু ছাড়ে না।
রায়হান খান দরজা খোলে না। সে জানে, এখনই খুললে প্রশ্ন আসবে। আর প্রশ্ন মানেই সময়। সময় মানেই ভুল।
—“আপনি ভেতরে আছেন, জানি,” আরিফ আবার বলে।
গলায় কোনো রাগ নেই। এই গলাটা ভয়ংকর—কারণ এটা তাড়াহুড়া করে না।
রায়হান ধীরে টেবিলের দিকে ফিরে যায়। ল্যাপটপ বন্ধ, কিন্তু ফাইলগুলো খোলা ছিল তার মাথায়। সে বাবার ফাইলটা নেয়, হাতের তালুতে ওজনটা অনুভব করে। এই কাগজগুলোই একসময় তার বাবাকে মেরেছিল। আজ এগুলোই হয়তো কাউকে বাঁচাবে।
সে দরজা খুলে দেয়।
আরিফ ভেতরে ঢোকে একা। কোনো নাটক নেই, কোনো হুংকার নেই। শুধু চোখে সতর্কতা। দুজন মানুষ—একজন আইন, একজন হিসাব—মাঝখানে কয়েক ফুট দূরত্ব।
—“আপনি পালালেন না,” আরিফ বলে।
—“আমি পালালে হিসাব অসম্পূর্ণ থাকত,” রায়হান শান্তভাবে উত্তর দেয়।
আরিফ চারদিকে তাকায়। সাধারণ অফিস। সাধারণ মানুষ হলে এখানেই থেমে যেত। কিন্তু আরিফ সাধারণ না।
—“সালমান মল্লিক,” আরিফ বলে,
“এই নামটা আপনার কাছে কী?”
রায়হান এক সেকেন্ড দেরি করে।
এই এক সেকেন্ডটাই ছিল তার দ্বিতীয় ভুল।
—“একজন আতঙ্কিত মানুষ,” সে বলে।
—“আর আতঙ্কিত মানুষ কী করে?”
—“ভুল।”
আরিফ চেয়ার টেনে বসে পড়ে।
—“আজ রাতে একটা গাড়ি ধরা পড়েছে,” সে বলে।
“ভেতরে ডেটা, আর আপনার নাম।”
রায়হানের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।
—“নাম লেখা থাকলেই অপরাধ হয় না, ইন্সপেক্টর।”
—“না,” আরিফ বলে,
“কিন্তু গল্প শুরু হয়।”
দুজনের মাঝে নীরবতা নামে।
এই নীরবতায় অনেক কথা জমে।
হঠাৎ আরিফ বলে,
—“ইমরান খানকে আপনি কীভাবে চিনতেন?”
এই প্রশ্নটা প্রত্যাশিত ছিল না।
রায়হানের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে ওঠে। সে ধীরে চোখ তোলে।
—“তিনি আমার বাবা,” রায়হান বলে।
এই প্রথমবার আরিফের চোখে পরিবর্তন আসে।
দয়া না—বরং বোঝা।
—“আমি তার অধীনে কাজ করেছি,” আরিফ বলে।
“তিনি ঘুষ নিতেন না। তাই তাকে ভাঙা হয়েছিল।”
রায়হান কিছু বলে না।
কারণ কিছু সত্য আছে—যেগুলো শুনতে পারা আর সহ্য করা এক জিনিস না।
—“এই কেসটা আবার খুলেছে,” আরিফ বলে।
“আর কেউ চায় না, আপনি মাঝখানে থাকুন।”
রায়হান হালকা হাসে।
—“আমি মাঝখানে নেই, ইন্সপেক্টর,”
“আমি শুরুতে ছিলাম।”
ঠিক তখনই রায়হানের ফোন ভাইব্রেট করে।
স্ক্রিনে একটাই নাম—
নাসির
রায়হান কল ধরছে না।
কারণ সে জানে—এই কল মানেই খারাপ খবর।
আরিফ উঠে দাঁড়ায়।
—“আজ আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি না,” সে বলে।
“কিন্তু আমি চলে যাচ্ছি না।”
দরজার দিকে যেতে যেতে আরিফ থামে।
—“একটা কথা মনে রাখবেন, রায়হান,”
“যে মানুষ হিসাব কষে… সে একদিন নিজের হিসাবেও আটকে যায়।”
দরজা বন্ধ হয়।
রায়হান ধীরে চেয়ারে বসে পড়ে।
এবার ফোনটা ধরে।
নাসিরের গলা ভাঙা—
—“মাস্টার… সালমান ধরা পড়েনি।”
রায়হানের চোখ বন্ধ হয়।
সে জানত—এই গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটা এখনো আসেনি।
কারণ যে শত্রু ধরা পড়ে না,
সে আবার ফিরে আসে।
আরিফ চলে যাওয়ার পর অফিসটা হঠাৎ অচেনা লাগে রায়হানের।
এই ঘরটা সে নিজে বানিয়েছিল—নীরব, নিরাপদ, হিসাবের জায়গা।
আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, এই ঘরের দেয়ালেও কান আছে।
নাসিরের কথা মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে—
“সালমান ধরা পড়েনি।”
রায়হান জানত, এটাই সবচেয়ে খারাপ খবর।
ধরা না পড়া মানুষ প্রমাণ করে—সে এখনও খেলায় আছে।
সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজা লক করে। তারপর বাবার ফাইলটা আবার খোলে। এবার সে পড়তে শুরু করে—লাইন ধরে, শব্দ ধরে। হঠাৎ একটা নাম চোখে পড়ে, যেটা সে আগে খেয়াল করেনি।
আবেদ হোসেন।
পদবি—নাইট গার্ড।
অবস্থা—নিখোঁজ (কেস ক্লোজের আগে)।
রায়হানের বুকের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়।
নিখোঁজ মানে—মরা না, বাঁচাও না।
এই নামটাই সেই “মূল সাক্ষ্য”।
ঠিক তখনই অফিসের বিদ্যুৎ চলে যায়।
এক সেকেন্ডের জন্য অন্ধকার।
তারপর জেনারেটরের মৃদু শব্দ।
রায়হান নড়ে না।
কারণ অন্ধকার তার শত্রু না—মানুষই শত্রু।
তার ফোনে একটা অডিও মেসেজ আসে। অচেনা নম্বর।
সে প্লে করে।
সালমানের গলা—ক্লান্ত, কিন্তু ঠান্ডা।
—“তুমি খুব চালাক, রায়হান।
কিন্তু তুমি একটাই জিনিস ভুলে গেছো—
আমি মরার আগে কাউকে না কাউকে সাথে নিয়ে যাই।”
অডিও শেষ হয়।
মেসেজের সাথে একটা লোকেশন পিন।
রায়হান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এই লোকেশনটা সে চিনে—পুরনো পুলিশ ব্যারাক, যেটা বছরখানেক আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
সে বুঝে যায়—এটা ফাঁদ।
কিন্তু সে এটাও জানে—এই ফাঁদে না গেলে সত্যটা আর পাওয়া যাবে না।
এই সিদ্ধান্তটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ এবার সে হিসাব কষছে না—সে বেছে নিচ্ছে।
রায়হান অফিস ছাড়ে।
কাউকে জানায় না।
নাসিরকেও না।
একই সময়, আরিফ নিজের গাড়িতে বসে অস্বস্তি অনুভব করে।
কোনো প্রমাণ নেই, তবু মনে হচ্ছে—কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
সে রায়হানের নামটা আবার ডায়েরিতে লেখে।
এবার দাগ দিয়ে।
পুরনো ব্যারাকে ঢোকার সময় রায়হানের চারপাশ নিস্তব্ধ।
দেয়ালে ফাটা পোস্টার, মেঝেতে ধুলো, বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ—
—“হিসাব মিললো?”
রায়হান ঘুরে দাঁড়ায়।
সামনে সালমান মল্লিক।
একাই।
কিন্তু এই একা থাকাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
রায়হান বোঝে—
এই পর্বে কেউ মরতে পারে।
কিন্তু সত্যটা আর লুকিয়ে থাকবে না।
দূরে কোথাও পুলিশের সাইরেন শোনা যায়।
কাছাকাছি নয়—তবু আসছে।




#পর্ব ৪****

পুরনো পুলিশ ব্যারাকের ভেতর বাতাস থমকে আছে।
রায়হান খান আর সালমান মল্লিক—দুজনের মাঝখানে কয়েক কদম দূরত্ব, কিন্তু বছরের পর বছর জমে থাকা ভয় আর লোভ সেই দূরত্ব ভরে দিয়েছে।
সালমানের মুখে ক্লান্ত হাসি।
—“তুমি এসেছো,” সে বলে।
—“সত্যের ডাক এলে মানুষ আসে,” রায়হান উত্তর দেয়।
“ফাঁদের ডাক হলে… হিসাব কষে।”
সালমান ধীরে ধীরে হাত দুটো তুলে দেখায়—খালি।
—“আমি একা,” সে বলে।
—“তুমি কখনো একা থাকো না,” রায়হান শান্ত গলায় বলে।
“তোমার সাথে সবসময় ভয় থাকে।”
এই কথাটা সালমানের চোখে লাগে।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে, তারপর বলে,
—“তোমার বাবাকে আমি মারিনি।”
রায়হানের ভেতরে কিছু একটা শক্ত হয়ে যায়।
—“কিন্তু তুমি জানাতে পারতে,” সে বলে।
—“হ্যাঁ,” সালমান স্বীকার করে,
“কারণ আমি জানতাম, সত্য বেরোলে আমার নামও উঠবে।”
সালমান পকেট থেকে একটা ভাঙা পেনড্রাইভ বের করে মেঝেতে রাখে।
—“এটা সেই সাক্ষীর,” সে বলে।
“আবেদ হোসেন। সে মরেনি। লুকিয়ে আছে।”
রায়হান এগোয় না।
—“দাম?”
—“আমার মুক্তি,” সালমান বলে।
“এই শহর থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।”
রায়হান চোখ নামায়।
এইখানেই নৈতিকতার হিসাব ভাঙে।
একজন অপরাধীকে ছেড়ে দিলে, একজন নির্দোষের নাম পরিষ্কার হবে।
ঠিক তখন দূরে সাইরেনের শব্দ জোরালো হয়।
আরিফ আসছে।
সালমানের গলা দ্রুত হয়ে যায়।
—“সময় নেই, রায়হান। সিদ্ধান্ত নাও।”
রায়হান পেনড্রাইভটার দিকে তাকায়।
তার বাবার মুখ ভেসে ওঠে—ক্লান্ত, কিন্তু সোজা।
—“তুমি বেরোতে পারবে,” রায়হান বলে।
“কিন্তু আমি তোমার পাপের হিসাব মুছবো না।”
সে পেনড্রাইভটা তুলে নেয়, কিন্তু সালমানের দিকে আর এক পা এগোয় না।
—“আজ তুমি বাঁচলে,” রায়হান বলে,
“কারণ সত্যটা বড়।”
সালমান পিছিয়ে যায়।
তার চোখে প্রথমবার কৃতজ্ঞতা না—শূন্যতা।
ঠিক তখন আরিফ ঢুকে পড়ে।
কোনো নাটক নেই। শুধু প্রমাণ।
—“সব শেষ,” আরিফ বলে।
সালমান থেমে যায়।
সে বুঝে যায়—রায়হান তাকে ছাড়েনি।
শুধু সময়টা কিনে দিয়েছে, যাতে সত্যটা আগে বেরোয়।
রায়হান আরিফের দিকে তাকায়।
—“সাক্ষী বেঁচে আছে,” সে বলে।
“এটাই শেষ সূত্র।”
আরিফ মাথা নেড়ে নেয়।
সে বুঝে যায়—এই মানুষটা অপরাধী, কিন্তু এই মুহূর্তে সে মিথ্যে নয়।
ব্যারাকের বাইরে আলো ঢোকে।
অন্ধকার সরে যেতে শুরু করে।
রায়হান জানে—তার নিজের হিসাবটা এখনো বাকি।
কিন্তু বাবার সত্যটা আর চাপা থাকবে না।
আরিফের উপস্থিতিতে ব্যারাকটা হঠাৎ ছোট হয়ে আসে।
আইন ঢুকলে জায়গা কমে যায়—কারণ তখন আর লুকোনোর জায়গা থাকে না।
সালমান মল্লিক ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে হেলে পড়ে। তার চোখে এখন আর চালাকি নেই, আছে হিসাবের শেষ পাতা। সে বুঝে গেছে—আজ সে জিতবে না, কিন্তু হয়তো পুরোপুরি হারবেও না।
—“তুমি জানো,” সালমান আরিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই শহরে সত্য বেরোলে অনেক নাম পুড়বে।”
আরিফ উত্তর দেয় না।
কারণ সে জানে—সত্যের আগুন সবসময় আগে দুর্বলদের ছোঁয়।
রায়হান চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
এই প্রথমবার সে নিজেকে মাঝখানে মনে করছে—অপরাধ আর আইনের মাঝখানে নয়, অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝখানে।
আরিফ পেনড্রাইভটা নেয়।
—“এই সাক্ষী কোথায়?”
সালমান হেসে ওঠে—শব্দহীন হাসি।
—“আমি জানি না,” সে বলে।
“আমি শুধু জানতাম, সে মরেনি।”
এই মিথ্যেটা সূক্ষ্ম।
রায়হান বুঝে যায়—সালমান পুরো সত্য দিচ্ছে না, 
কিন্তু যা দিচ্ছে সেটাই এখন যথেষ্ট।
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।
একটা না—দুটো।
আরিফ জানালা দিয়ে তাকায়।
—“আমার লোক,” সে বলে।
কিন্তু তার গলায় নিশ্চিতভাব নেই।
রায়হ
ব্যারাকের ভেতরে আলো বাড়ে, কিন্তু কারও মুখ উজ্জ্বল হয় না।
সালমান মল্লিক দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে—হাত নামানো, চোখে হিসাব। সে বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে দৌড়ানোর মানে নেই। আরিফের লোকজন ধীরে ধীরে জায়গা নেয়—কোনো ধস্তাধস্তি নেই, কোনো নাটক নেই। শুধু নিশ্চিততা।
আরিফ রায়হানের দিকে তাকায়।
—“পেনড্রাইভটা দিন।”
রায়হান দেয়।
এই ছোট্ট জিনিসটার ভেতর এতদিনের নীরবতা বন্দি ছিল।
আরিফ সঙ্গে সঙ্গে দেখে না। সে জানে—প্রমাণের চেয়েও মানুষটা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
—“আপনি জানতেন, সে বাঁচতে চাইবে,” আরিফ বলে।
—“হ্যাঁ,” রায়হান উত্তর দেয়,
“ভয় মানুষকে সবকিছু করায়—কিন্তু সত্যটা শেষমেশ মুখ ফসকে বেরোয়।”
সালমান হঠাৎ হেসে ওঠে।
—“তুমি আমাকে ছেড়ে দিলে না, রায়হান,” সে বলে।
—“আমি ছাড় দিইনি,” রায়হান শান্ত।
“আমি শুধু সময়টা সঠিক করেছি।”
এই কথাটা সালমানের ভেতরে ঢুকে যায়।
সে প্রথমবার বুঝে—এই মানুষটা তাকে ব্যবহার করেনি, তাকে উল্টে ধরেছে।
আরিফ হাতের ইশারায় লোকজনকে সালমান নিয়ে যেতে বলে। যাওয়ার সময় সালমান থামে।
—“তোমার বাবার জন্য দুঃখিত,” সে বলে।
কথাটা ক্ষমা নয়—স্বীকারোক্তি।
রায়হান চোখ সরায় না।
—“দেরি হয়ে গেছে,” সে বলে।
সালমান চলে যায়।
ব্যারাকে নীরবতা নামে।
আরিফ পেনড্রাইভটা খুলে দেখে—ভিডিও, অডিও, আর একটা নথি।
আবেদ হোসেন। কণ্ঠ কাঁপা, কিন্তু স্পষ্ট।
—“ইমরান খান স্যার ঘুষ নেননি,” আবেদ বলে।
“আমাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। আমি পালিয়েছিলাম। আজও ভয় পাই।”
আরিফ চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড।
এটাই সেই লাইন—যেটার জন্য কেউ কেউ জীবন দেয়।
—“এটা আদালতে যাবে,” আরিফ বলে।
—“জানতাম,” রায়হান উত্তর দেয়।
আরিফ রায়হানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
—“আপনি জানেন, আপনার নামও উঠবে।”
রায়হান মাথা নেড়ে নেয়।
—“হিসাবের এটাই নিয়ম,” সে বলে।
“কিছু পেলে, কিছু দিতে হয়।”
বাইরে ভোরের আলো পুরোপুরি ঢুকে পড়ে।
শহর জেগে উঠছে—অজানা, উদাসীন।
আরিফ ধীরে বলে,
—“আপনি যদি আজ রাতে না আসতেন—”
—“সত্যটা আবার চাপা পড়ত,” রায়হান শেষ করে।
“আমি জানি।”
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
আইন আর অপরাধ—মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মানুষ, যে দুটোই দেখেছে।
—“আজ আমি আপনাকে আটক করছি না,” আরিফ বলে।
“কিন্তু এটা শেষ না।”
রায়হান জানে—এটা ছাড় নয়। এটা অপেক্ষা।
সে ব্যারাক থেকে বেরোয়।
আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু তার ভেতরে ঝড় থামে না।
কারণ সত্যটা বেরোলেও, নিজের হিসাব এখনো বাকি।
সে ফোন বের করে নাসিরকে একটা মেসেজ পাঠায়—
“সব গুটাও। সময় শেষ।”
রায়হান হাঁটে।
এই শহরে সে আর ছায়া হয়ে থাকতে পারবে না।


#শেষ পর্ব ৫****



আদালতের ঘরটা ঠান্ডা।
এখানে আবেগ জমে না—শুধু প্রমাণ জমে।
রায়হান খান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নেই।
সে দর্শকসারিতে বসে আছে।
কারণ আজ সে অপরাধী নয়—আজ সে সাক্ষী।
আবেদ হোসেন ধীরে ধীরে কথা বলে।
কণ্ঠ কাঁপে, কিন্তু ভাঙে না।
—“ইমরান খান স্যার ঘুষ নেননি।
আমাকে মিথ্যে বলতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আমি পালিয়েছিলাম… কারণ আমি মরতে চাইনি।”
ঘরে ফিসফাস ওঠে।
নামগুলো নড়ে।
ক্ষমতার মুখগুলো শক্ত হয়ে যায়।
বিচারক নোট নেন।
আইন নীরব থাকে—কারণ আইন জানে, এই নীরবতাই সবচেয়ে ভারী।
রায়হান চোখ বন্ধ করে।
তার বাবার মুখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ক্লান্ত, কিন্তু মাথা উঁচু।
বিরতির সময় আরিফ এসে পাশে বসে।
—“আপনার বাবার নাম পরিষ্কার হচ্ছে,” সে বলে।
—“আমি জানি,” রায়হান উত্তর দেয়।
“এটাই যথেষ্ট।”
—“আপনার ব্যাপারটা…”
আরিফ বাকিটা বলে না।
রায়হান হালকা হাসে।
—“হিসাব আমি আগেই কষে রেখেছি।”
কয়েকদিন পর রায়হান নিজেই হাজিরা দেয়।
কোনো নাটক নেই, কোনো পালানো নেই।
ফাইল খুলে যায়—ডেটা বদলানো, প্রভাব, পরিকল্পনা।
সব খুন নয়, কিন্তু সব নির্দোষও না।
রায়হান স্বীকার করে।
সব না—যতটা সত্যের জন্য দরকার।
রায়হানের সাজা হয়।
লম্বা না, ছোটও না।
আইনের ভাষায়—সহযোগিতার মূল্য বিবেচিত।
কারাগারের ঘরটা ছোট।
কিন্তু অন্ধকার নয়।
একদিন আরিফ দেখা করতে আসে।
—“আপনি চাইলে আরও কম হতে পারত,” সে বলে।
রায়হান মাথা নাড়ে।
—“হিসাব ঠিক থাকলেই চলে।”
আরিফ উঠে দাঁড়ানোর আগে থামে।
—“আপনি কী অনুতপ্ত?”
রায়হান জানালার দিকে তাকায়—এক টুকরো আকাশ।
—“আমি অপরাধ করেছি,” সে বলে।
“কিন্তু আজ আর মিথ্যে করি না।”
সময় কাটে।
একদিন খবর আসে—ইমরান খানকে মরণোত্তর সম্মান দেওয়া হবে।
রায়হান খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখে।
কারণ কিছু আনন্দ শব্দ করে না।
শেষ দিনে, মুক্তির কাগজে সই করে রায়হান বেরোয়।
শহরটা একই আছে।
কিন্তু সে নয়।
সে পুরনো অফিসে আর ফেরে না।
হিসাবের জায়গায় তার কাজ শেষ।
চলতে চলতে সে মনে মনে বলে—
“অপরাধের হিসাব মেলে,
কিন্তু সত্যের হিসাব… দেরিতে হলেও, ঠিকই মেলে।”
রায়হান খান ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
কোনো ছায়া নয়।
কোনো মাস্টার নয়।
শুধু একজন মানুষ—
যে শেষ পর্যন্ত নিজের হিসাবটা চুকিয়েছে।

সমাপ্তি... 🍁