Read Nihshobdo Artonad by Liman Manidas in Bengali Human Science | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

নিঃশব্দ আর্তনাদ

                   বড় মায়ের চপেটাঘাত 

এই অহঙ্কাররূপী শরীরে বাসা বাঁধিয়াছে ভয়, হিংসা, লোভ এবং ভোগবাদী উথাল-পাতাল সমস্ত বা অগণিত বৃত্তি, যাহা সেই অনন্তকাল হইতে শোষণ করিয়া চলিতেছে "বড় মা"-কে। আমি সম্পূর্ণ অন্ধ হইয়াছিলাম, যাহার ফলস্বরূপ বড় মায়ের প্রতি কৃত আমার প্রত্যেক কুকর্ম একপ্রকার ঢাকা দিয়া রাখিতাম এবং তৎপর বুক ফুলাইয়া হাঁটিতাম খুব। এই মনুষ্য শরীরের ভেতরে ভ্রমবশত বিরাজিত স্বয়ং কে অপূর্ণ মানিত অহঙ্কারের গড়া কাদো-জলের গর্তে ডুবিয়া নাচিতাম খুব অন্ধ হইয়া। সেই নাচনের ফলস্বরূপ বড় মায়ের নিকট হইতে খাইতাম বহু চপেটাঘাত, বার বার।
        
         অবশেষে নিজের জীবনের এই প্রকার চালচলন দেখিতে দেখিতে সমাজের গড়া লোকধর্মে প্রভাবিত হইলাম এবং "সগুণ" মার্গ অবলম্বন করিতে লাগিলাম। তবে এই মার্গের বাস্তবিক অর্থ বুঝিলাম না এবং কোনো প্রশ্ন না করিয়া গোলামের ন্যায় তাহা মানিয়া চলিলাম খুব। কিন্তু একপ্রকার অস্থিরতা অন্তরে সর্বদা বিদ্যমান ছিল; লোকধর্মের সেই নিয়ম, আচার, বিধি, কর্মকাণ্ড, পূজা-অর্চনা বা এই বিশ্বের সমস্ত মানবনির্মিত ধর্মের অগণিত ক্রিয়াকলাপ—যাহা "মুক্তি" নয় বরং বন্ধনের কারণ হইয়া থাকে—তাহার কোনোটিই আমার সেই আন্তরিক অস্থিরতা দূর করিতে সক্ষম হইল না।

        এক নির্বোধ যুবক, যাহার এই জীবন সম্পর্কে কোন ধারণা মাত্র নাই। বাল্যকাল হইতে বড় মা ও ছোট মায়ের নিকট অনেক চপেটাঘাত খাইতে খাইতে আজ প্রায় কুড়ি আয়ূতে আসিয়া দাড়িয়াছি । এমতবস্থায় ছোট মায়ের নিকট হইতে চপেটাঘাত খাওয়া বন্ধ হইলেও বড় মায়ের নিকট হইতে বারবার প্রহার খাইতেছি; কিন্তু তাঁহার চপেটাঘাত প্রদানের ধরণ আজ বদলাইয়া গিয়াছে, তাই বুঝিতেও পারি না কখন "ঠাস" করিয়া চপেটাঘাত খাইব! আপনাদের কি কোনোক্ষণে এমন সৌভাগ্য হইয়াছে?

      জীবনে এক শুভক্ষণ আসিল!
গুরু, তিনিই হইয়া থাকেন যিনি তাঁহার শিষ্যকে সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ করিতে জানেন; যিনি তাঁহার শিষ্যকে এক নতুন জন্ম প্রদান করিয়া থাকেন। এক নতুন দৃষ্টি প্রদানের নিমিত্তে গুরু ও শিষ্য উভয়েই নিজেদের বিরুদ্ধে একত্রে সংঘর্ষ করিতে থাকেন। গুরু তিনিই, যিনি শিষ্যের সম্মুখে সর্বদা দর্পণ হইয়া দণ্ডায়মান থাকেন; যিনি শিষ্যকে তাহার অন্তরের সমস্ত বেঈমানি সম্পর্কে অবগত করিয়া থাকেন—যাহা সে নিজের অভ্যন্তরে স্থান দিয়াছিল এবং নিজ হইতেই সবথেকে বড় বেঈমানি করিয়া বসিয়াছিল। গুরু শিষ্যকে সর্বদা নিজেরই বিরুদ্ধে সংঘর্ষ করিতে শিক্ষা প্রদান করিয়া থাকেন। এমনই এক গুরুর সন্ধান আমার সেই অস্থিরতা দীর্ঘকাল যাবৎ করিতেছিল। হঠাৎ জীবনে এমনই একজন গুরুর সন্ধান পাইলাম এবং তাঁহার সান্নিধ্যে আসিয়া সেই সমস্তই ভুলিয়া গেলাম যাহা পূর্বে এই অন্তরে বিদ্যমান ছিল অন্ধকার রূপে; জানিলাম যে তিনিই হইলেন বড় মা...... 

      গুরুর সান্নিধ্যে অবস্থান করিয়া “বড় মা”-কে ক্রমশঃ জানিতে আরম্ভ করিলাম এবং আজও জানিয়া চলিয়াছি। উপলব্ধি করিলাম, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যাহা কিছু বিদ্যমান, তাহার সমুদয়ই বড় মা। বড় মা-ই জন্ম, বড় মা-ই মৃত্যু, এবং বড় মা-ই প্রলয়। অবগত হইলাম—বড় মা-ই জ্ঞান, বড় মা-ই প্রেম, বড় মা-ই করুণা, এবং বড় মা-ই দ্বৈত ও অদ্বৈত। দেবী মাহাত্ম্যের “অপরাজিতা স্তোত্র”-এর সহিত পরিচয় লাভ করিলাম। জানিতে পারিলাম যে, আমি স্বয়ং বড় মায়েরই এক ক্ষুদ্র অংশমাত্র, আর কিছুই নহি। গুরুদেব তাঁহার কার্য সম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন এবং আজও করিয়া চলিয়াছেন; আর আজ আমার দ্বারা আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপিত হইল এই ক্ষুদ্র লেখনী।


             ওহে! কী করিতেছেন আপনি? 

উন্নয়ন বা বিকাশ প্রত্যেক রাষ্ট্রেই সাধিত হইয়া থাকে; কিন্তু সেই বিকাশ কিরূপ—যেখানে ক্ষুদে 'মিনিকপি'-কে তাহার প্রিয়জনদিগকে হারাইতে হয়? সেই বিকাশই বা কীরূপ—যেখানে ক্ষুদে 'নিত্তিরা' তাহার আপনজন হইতে বিচ্ছিন্ন হয়? এই মহান প্রজাতি কেনো এরূপ ধ্বংসলীলায় মত্ত হইয়া রহিয়াছে? এই চিরাচরিত জগতে দুই নেত্রবিশিষ্ট এই উন্নত সম্পন্ন প্রাণিগণ কি বাস্তবিকই অন্ধ! 

    আমরা সমুদ্রকে নিঃশেষ করিলাম,পাহাড়কে ধূলিসাৎ করিলাম, বনজঙ্গল কে খাইয়া নিলাম, নদীকে শেষ করিলাম। বলছি সোজা হইয়া দাড়ান দেখি একটু বিস্তারিত বলিতেছি শুনুন—
      গত পঞ্চাশ বছরে (১৯৭০-২০২০) সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা গড়ে প্রায় ছাপ্পান্ন শতাংশ কমিয়া গিয়াছে। গত তিরিশ বছরে আমরা পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর হারাইয়া ফালাইলাম। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে "কোরাল ব্লিচিং" (প্রবালের মৃত্যু) বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে অবস্থান করিতেছে। প্রতি বছর প্রায় আট থেকে দশ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়া মিশিতেছে। সমুদ্রে প্রায় পঁচাত্তর থেকে একশো নিরানব্বই মিলিয়ন টন প্লাস্টিক জমা হইয়া রহিয়াছে বর্তমানের কথা। ইহার ফলস্বরূপ জলজ প্রাণী খাইতেছে শুধু প্লাস্টিক আর প্লাস্টিক— প্রায় ষাট শতাংশ জলজ প্রাণীর শরীরে পাওয়া যাইতেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ওহে আরো জানিয়া লও, শিল্পবিপ্লব শেষ হইতে সমুদ্রের জলের অম্লতা বা এসিডিটি তিরিশ শতাংশ বৃদ্ধি হইয়াছে। ইহার ফল স্বরূপ শামুক, ঝিনুক অন্যান্য জলজ প্রাণী শক্ত খোলস তৈরি করিতে ব্যার্থ হইতেছে তাহাদের জীবন ধারণ শেষ হইতেছে। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত তাপের নব্বই শতাংশ সমুদ্র শুষে লয়। গত কুড়ি বছরের তুলনায় বর্তমানে সমুদ্র দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হইতেছে। সমুদ্রে এমন চারশো টিরও অধিক এলাকা তৈরি হইয়াছে যেখানে অক্সিজেনের অভাবে কোনো প্রাণী বাঁচিতে পারে না।কিছু ভুলিয়া গেলাম হয়তো! ও হ্যা হিমখণ্ড গলন, চেইন রিঅ্যাকশন— সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, সবচেয়ে বড় সমস্যার সম্মুখীন হইবার জন্যে তৈরী তো আমরা ? হিমখণ্ড ও হিমবাহগুলো হইল বিশাল বিশাল জমাট বাঁধা মিষ্টি জল। এগুলো যখন গলিয়া সাগরে পড়ে, তখন সমুদ্রের জলের আয়তন বারিয়া যায় । ইহার ফলস্বরূপ সমুদ্রের তীরবর্তী নিচু এলাকা ও দ্বীপ দেশগুলি (যেমন মালদ্বীপ বা বাংলাদেশের উপকূল) ধীরে ধীরে জলের তলে তলিয়া যাইতেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই গতিতে বরফ গলিতে থাকিলে ২০৫০ সাল হইতে উপকূলীয় অনেক শহর মানচিত্র হইতে মুছিয়া যাইবে— বলার অপেক্ষা থাকিতেছে না যে ভারতের কোন কোন অংশ বিপদের দুয়ারে। সমুদ্রের জল লোনা হওয়ার কারণে এক নির্দিষ্ট গতিতে সারা পৃথিবী হইতে বেড়ায়, যাহাকে আমরা সমুদ্রের স্রোত বলিয়া থাকি। ইহার ফলস্বরূপ হিমখণ্ড হইতে  আসা প্রচুর মিষ্টি জল লোনা জলের সাথে মিলিত হইয়া স্রোতের গতিপথ উলটপালট হইয়া যায়। ইহার ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া প্রক্রিয়া ভাঙিয়া পড়ে—কোথাও ভয়াবহ বন্যা, আবার কোথাও হাড়কাঁপানো শীত বা তীব্র খরা লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মুক্তি সম্ভব হইতেছে ইহা একটু ভয়ংকর শোনালোও সত্য । বরফগুলি হাজার হাজার বছর হইতে জমাট বাঁধিয়াছে। ভেতরে বহু প্রাচীন ভাইরাস ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ঘুমন্ত অবস্থায় আটকা পড়িয়া আছে । বরফ গলিয়া যাওয়ার ফলে এই জীবাণু পরিবার  পরিবেশে ছড়িয়া পড়িতে পারে, যাহা মানুষ হইতে অন্য প্রাণীদের জন্য নতুন কোনো মহামারীর ঝুঁকি তৈরি করিতে সক্ষম। মেরু ভালুক বা পেঙ্গুইনরা হিমখণ্ডের ওপর নির্ভর করিয়া বাঁচিয়া থাকে। বরফ নাই মানে তাহাদের ঘর নাই। খাবারের  অভাবে ক্লান্ত হইয়া তাহারা সমুদ্রের জলে ডুবিয়া মরিতেছ আর বিলুপ্ত হইতেছে একে একে। 

      উত্তরাখণ্ডে তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত সহজ করিতে 'চারধাম অল ওয়েদার রোড' প্রকল্পের কাজ চলিতেছে । এর জন্যে শত শত পাহাড় ডিনামাইট দিয়া ফাটানো হইতেছে। ফলস্বরূপ পাহাড়ের ভিত দুর্বল হইয়া যাইতেছে। ইহার ফলে গত কয়েক বছরে কেদারনাথ বা ঋষিকেশ অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিধস বাড়িতেছে ।পাহাড়ের ভিতর হইতে বিশাল বিশাল সুড়ঙ্গ খুঁড়িয়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হইতেছে । ফলস্বরূপ জোশীমঠের মতো পাহাড়ি শহরগুলি বর্তমানে মাটির তলায় তলাইতেছে । ঘরবাড়িতে বড় বড় ফাটল দেখা যাইতেছে কারণ পাহাড়ের ভেতরের গঠন শেষ হইয়া গিয়াছে। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং ছত্তিশগড় অঞ্চলে লোহা, কয়লা এবং বক্সাইট উত্তোলনের জন্যে নির্বিচারে পাহাড় ধূলিসাৎ করা হইতেছে, লোভে গগনচুম্বী এর মত অন্যান্য পাহাড়সমূহকে কাটিয়া সমতল করিয়া দেওয়া হইতেছে। বনভূমি উজাড় করিয়া পাহাড় কাটিবার ফলে তথাকার আদিবাসী সমাজ ও বন্যপ্রাণীগণ চরম সংকটে পড়িয়াছে। শিমলা, মানালি কিংবা দার্জিলিংয়ের ন্যায় স্বাস্থ্যনিবাসসমূহে পর্যটকদের তরে বহুতল হোটেল ও বিলাস ভবন নির্মিত হইতেছে। পাহাড়ের ঢাল কাটিয়া বৃক্ষহীন করিয়া ফেলার ফলে বর্ষাকালে প্রবল ভূমিধস নামিতেছে, যাহা অগণিত প্রাণহানির কারণ হইয়া দাঁড়াইতেছে। ঘরবাড়ি ও রাস্তা তৈরির জন্যে প্রচুর পাথরের প্রয়োজন । ভারতের অনেক জায়গায় ছোট ছোট পাহাড় কাটিয়া সেই পাথর ক্রাশারে দিয়া গুঁড়ো করা হইতেছে। 
উন্নয়নের মোহে অন্ধ হইয়া ভারতবাসী আজ প্রকৃতির শিরে কুঠারাঘাত করিতেছে। শৈলমালার এই ক্রন্দন যদি অচিরেই থামানো না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র আর্যাবর্ত এক মহা বিপদের সম্মুখীন হইবে।

     সমগ্র বিশ্বে প্রতি মিনিটে প্রায় সাতাশটি ফুটবল মাঠের সমান বনভূমি অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। অ্যামাজন রেইনফরেস্ট, বিশ্বের ফুসফুস বলিয়া পরিচিত অ্যামাজন অরণ্য আজ অগ্নি ও কুঠারের কবলে। গবাদি পশুর চারণভূমি এবং সয়াবিন চাষের জন্যে এই আদিম অরণ্যকে পুড়াইয়া ছাই করা হইতেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া, পাম ওয়েল বা তাল জাতীয় তৈল উৎপাদনের লালসায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিরহরিৎ বনসমূহ ধ্বংস করা হইয়াছে, যাহার ফলে ওরাংওটাং-এর ন্যায় অনেক বিরল প্রাণী আজ গৃহহীন। আফ্রিকার কঙ্গো বেসিন, কাষ্ঠ আহরণ ও কয়লা খনির জন্য আফ্রিকার এই বিশাল অরণ্য আজ সংকটের সম্মুখীন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা ও দ্রুত শিল্পায়নের বলি হইতেছে এদেশের প্রাচীন বনভূমি।
হিমালয়ের বন বিনাশ, পার্বত্য অঞ্চলে পথ নির্মাণ ও পর্যটনের প্রসারে সহস্র সহস্র বৃক্ষ কর্তন করা হইতেছে। ইহার ফলে পাহাড়ের মৃত্তিকা আলগা হইয়া ভয়াবহ ভূমিধস নামিতেছে। মধ্য ভারতের খনিজ অঞ্চল, ওড়িশা, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডে কয়লা ও লৌহ আকরিক উত্তোলনের তরে মাইলের পর মাইল বনভূমি উৎসর্গ করা হইয়াছে, খনিজ পদার্থের জন্যে মাটি খুঁড়িতে খুঁড়িতে এই বোধ লেহ্ ম্যান বিযুক্তি রেখা পার করিয়া ফালাইলো। আদিবাসীগণের আদি নিবাস আজ ধূসর প্রান্তরে পরিণত হইতেছে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, ইউনেস্কো স্বীকৃত এই জীববৈচিত্র্যের আধারটি আজ কৃষি ও অবৈধ নির্মাণের চাপে পিষ্ট। তাই বন কেবল বৃক্ষের সমাহার নহে, ইহা একটি জটিল জীবনচক্র। একটি বিশাল বৃক্ষ যখন ধরাশায়ী হয়, তাহার সহিত সহস্র পতঙ্গ, পাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনদীপও নির্বাপিত হয়। ভারত সরকার বন সংরক্ষণের কথা বলিলেও শিল্পায়নের প্রয়োজনে বনভূমি হস্তান্তরের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। অরণ্য রোদন আর কেবল কথার কথা নহে; পৃথিবী আজ সত্যই অরণ্য হারাইয়া ক্রন্দন করিতেছে। বৃক্ষ রোপণ অপেক্ষা বিদ্যমান বন রক্ষা করা আজ অধিকতর জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

       বিশ্বের বৃহত্তম নদীসমূহ আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগিতেছে। ইউরোপের রাইন ও দানিয়ুব, উত্তর আমেরিকার কলোরাডো এবং চীনের ইয়াংসি নদী ইতিপূর্বে এমনভাবে শুকাইয়া গিয়াছিল যে, নদীর তলদেশ দৃশ্যমান হইয়া পড়িয়াছিল।প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পতিত হইতেছে। ভিয়েতনামের মেকং এবং মিশরের নীলনদ আজ আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হইয়াছে। ভারতে নদীকে 'মা' বলিয়া পূজা করা হইলেও, বাস্তব চিত্র অত্যন্ত করুণ। গঙ্গা ও যমুনা, ভারতের পবিত্রতম নদী গঙ্গা আজ বিশ্বের অন্যতম দূষিত নদী। কানপুর ও বারাণসীর কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক ও নগরের বর্জ্য গঙ্গার জলকে পানের অযোগ্য করিয়া তুলিয়াছে, কিছু কাল হইতে প্রফেসর জি. ডি. অগরওয়াল তিনি গঙ্গার জন্যে ১১১ দিন অনশন করিয়া দেহত্যাগ করিলেন, তিনি বারবার বলিতেছিলেন যে আমরা মা গঙ্গাকে শেষ করিতেছি আর আমি জানি যে কি কি করিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। দুর্ভাগ্য যে তাঁহার কথা কোন সরকারই পাত্তা দেন নাই। দিল্লীর যমুনা নদী এখন একটি কৃষ্ণবর্ণের নর্দমায় রূপান্তরিত হইয়াছে, যাহার উপরিভাগে বিষাক্ত সাদা ফেনা ভাসিতে দেখা যায়।
নদী ভাঙন ও ভরাট, উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্র প্রতি বছর দিক পরিবর্তন করিয়া জনপদ ধ্বংস করিতেছে। আবার দক্ষিণ ভারতের কাবেরী ও কৃষ্ণা নদী জলবন্টন লইয়া বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হইয়াছে, কারণ উহাদের জলপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাইয়াছে।
নদীসমূহের গতিপথে অসংখ্য বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক পলি প্রবাহ রুদ্ধ হইয়াছে, যাহার ফলে নদীর নাব্যতা কমিয়া যাইতেছে। এই মুহূর্তেই আমরা নদী শাসনে সতর্ক না হই এবং কলকারখানার বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপ করা বন্ধ না করি বা নদীকে পরিচ্ছন্ন না রাখি, তবে ধরিত্রীর এই পবিত্র ধারাটি কেবল ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হইয়া থাকিবে।

      জনসংখ্যা আটশো কোটির উপর হইতে, পৃথিবী কি এত বোঝা বইতে পারে বলুন দেখি ? এমন বোঝা বইতে আট দশ খানা পৃথিবী চাই। আকাশ পথে যা চলিতেছে আমরা পৃথিবীর পর যে উপগ্রহ চাঁদ কেও শেষ করিতে চলিতেছি তা আর বলার অপেক্ষা থাকে কি— নিজেদের গ্রহ কে গ্রাস করিয়া এখন নজর পড়িতেছে সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহাদির উপর।  বর্তমান পরিস্থিতি উপর আলোকপাত করিতেছি আর  মনে হইতেছে, 'প্রকৃতি' নাম্নী এক নারী যেন একাকিনী এক গৃহে বসবাস করিতেছেন, আর এই সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা নামক দানব সেই গৃহে প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে পুনঃপুনঃ লাঞ্ছিত ও ধর্ষণ করিয়া চলিতেছে। কিন্তু তাঁহাকে সাহায্য করিবার মতন কেহ আছেন কি এই সম্পূর্ণ বিশ্বে ? নাকি সব ডুবে মরেছে ভোগবাদে? যাহার ফলস্বরুপ আজ "জলবায়ু পরিবর্তন" এবং "বিশ্ব উষ্ণায়ন" এর মত ভয়াবহ পরিস্থিতি। 

    এই সমস্ত ঘটনার কারণ হইল আমাদের আন্তরিক অস্থিরতা আমাদের অন্ধ জীবনধারণ পদ্ধতি। আজ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের সম্মুখে এক বড় সমস্যার ভয়ানক রূপ নিয়া জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন উপস্থিত, যাহা সবকিছু শেষ করিতে সক্ষম। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে উঠিয়া চোখে পট্টি দিয়া নাচিতেছো খুব তাঁহার পথে আসিয়া বিরক্ত করিতেছ, তাঁহাকে বিরক্ত কইরো না নইলে প্রলয় আসিতেছে তাণ্ডব শুরু হইতেছে রুদ্র রূপ রুপ সে ধারণ করিতেছে। সমস্ত প্রজাতিকে শেষ করিতে সক্ষম এবং পৃথিবীকে শেষ করিতে সক্ষম। তাই প্রকৃতি কে এরূপ বিরক্ত করিয়া ফলস্বরূপ কি পাইলাম আমরা, আরো অধিক অস্থিরতা !