Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তোমার প্রেমে অন্ধ আমি - পর্ব 1

সকাল  9:10 , 
মমতা দেবী : " সোনাই .... ,অ্যাই সোনাই । দেখতো মেয়ের কান্ড , তখন থেকে ডাকছি এখনও বিছানা ছাড়ার নাম নেই। আরে ওঠ ওঠ । " 
মমতা দেবীর গলার শব্দে ঘরের শান্ত পরিবেশটা কেঁপে উঠল। জানালার পর্দার ফাঁক গলে রোদের নরম আলো এসে পড়েছে বিছানার ওপর, কিন্তু তাতেও ঘুমকাতুরে মেয়ের কোনো হেলদোল নেই।
তিনি আবার বললেন,
“এরপর কলেজে দেরি হলে কিন্তু আমাকেই দোষ দিবি! ওঠ বলছি!”
বিছানার ওপর গোল হয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটা বিরক্ত মুখে চোখ খুলল। এলোমেলো চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে। আধখোলা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে ঘুমঘুম গলায় বলল,
সোনাই : " ( বিরক্ত হয়ে মিটিমিটি চোখ খুলে) কি হল বলোতো ? প্রতি সকালে তোমার রেকর্ডার চালু হয়ে যায় । যাও তো আর একটুক্ষণ ঘুমাতে দাও। " 
মমতা দেবী : " হ্যাঁ হ্যাঁ , আমি তো শুধু শুধু বকবক করি । এরপর কলেজে লেট  হলে , তখন প্যান প্যান করবি না। যে তুমি একটু জোর করে তুলে দাওনি কেন আমায় । " 
সোনাই : " ( ঘুম ঘুম গলায় ) কেন , কটা বাজে ? " 
মমতা দেবী : " না না, তুমি ঘুমাও। বেশি নয় শুধু নটা দশ হয়েছে । " 
সময় শুনে সোনাই ছিটকে উঠে পড়লো । তার চোখ থেকে সব ঘুম উবে গেছে । 
সোনাই : " কি .... ? আমার তো আজ 9:45 এ কলেজ যাওয়ার কথা । রবীন্দ্রজয়ন্তী র অনুষ্ঠান আছে। তুমি একটু আগে আমায় সময়টা বলোনি কেন ? " 
মমতা দেবী : " হ্যাঁ তো এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নীচে চলে এসো । আমি তোমার খাবার বেড়ে দিচ্ছি। " 
সোনাই : " ( একটু হেসে ) হুঁম , তুমি এক মিনিট সময় দাও, আমি আধঘন্টায় আসছি । " 
এইবলে সোনাই টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে চলে যায়। 
মমতা দেবী মেয়ের কাণ্ড দেখে মাথা নেড়ে হেসে নীচে চলে গেলেন।
সোনাই—আসল নাম ঐশী মুখার্জী। তবে বাড়ির সবাই তাকে সোনাই বলেই ডাকে। সোনালি আভা মেশানো গায়ের রং আর মিষ্টি মুখের জন্য এই নামটা যেন ওর সঙ্গে একেবারে মানিয়ে গেছে।
টানা হরিণের মতো চোখ, লাল টুকটুকে ঠোঁট আর কোমর ছোঁয়া ঘন কালো চুল—সব মিলিয়ে তাকে যেন সত্যিই কোনো পুতুলের মতো লাগে। উচ্চতায় একটু ছোট হলেও সেটাই বরং তার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সে কলেজে জুলজি নিয়ে ফার্স্ট ইয়ার পড়ছে। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হলেও একটা জিনিসে সে ভীষণ দুর্বল—ঘুম।
ঘুম আর অলসতা যেন তার জন্মগত অধিকার।
তার বাবা প্রণয় মুখার্জী একজন হাইস্কুল শিক্ষক। খুব শান্ত, ভদ্র আর মেয়ে-পাগল মানুষ। আর মা মমতা মুখার্জী পুরোপুরি সংসারী, কিন্তু মেয়ের ব্যাপারে ভীষণ নরম।
সোনাই তাদের একমাত্র মেয়ে। তাই আদরও একটু বেশিই।
নীচে ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসেছিলেন মমতা দেবী। হঠাৎ ওপর থেকে চিৎকার ভেসে এলো—
সোনাই : "মাম্মাম একটু ওপরে আসো না গো । " 
ঘরে ঢুকেই থমকে গেলেন। তারপর পরের মুহূর্তেই হো হো করে হেসে ফেললেন।
সোনাই একটা বড়ো শাড়ি নিজের গায়ে জড়িয়ে মেঝেতে বসে আছে। মুখে এমন এক্সপ্রেশন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ সে করছে।
“এই কি অবস্থা তোর?”
সোনাই কাঁচুমাচু মুখে বলল,
“শাড়িটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না। আমি উঠে দাঁড়ালেই খুলে যাচ্ছে!”
মমতা দেবী হেসে বললেন,
“দিন দিন বড়ো হচ্ছিস নাকি ছোট হচ্ছিস, মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না। শাড়ি পরা তো দূরের কথা, তুই শাড়ি ধরতেও শিখলি না!”
তিনি মেয়েকে দাঁড় করিয়ে ধীরে ধীরে শাড়িটা ঠিক করে পরিয়ে দিলেন। তারপর নিজের হাতে খাবারও খাইয়ে দিলেন।
সোনাই মুখ ফুলিয়ে বলল,
“মা, তুমি না থাকলে আমি সত্যি বাঁচতাম না।”
“জানি। তাই তো এখনও তোকে ছোট্ট বাচ্চার মতো সামলাতে হয়।”
সবশেষে একটা সুন্দর নীল শাড়ি পরিয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিলেন তিনি।
নীল রঙটা সোনাইয়ের গায়ে অসম্ভব মানিয়েছে। যেন সকালবেলার নরম আকাশের একটা টুকরো এসে দাঁড়িয়ে আছে।
মমতা দেবী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বললেন,
“আমার মেয়েটাকে আজ সত্যিই পরীর মতো লাগছে।”
সোনাই হেসে মাকে জড়িয়ে ধরল।
“আচ্ছা, এবার যা। অনেকক্ষণ ধরে তোর বাবা অপেক্ষা করছে। তোকে কলেজে নামিয়ে আবার স্কুলে যাবে।”
“ঠিক আছে মা। টাটা!”
ব্যাগ আর মোবাইল নিয়ে সে নীচে নেমে গেল।
অন্যদিকে...........
অন্ধকার ঘরে একটা ছেলে মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছে। স্ক্রিনে সোনাই এর হাসিমাখা একটা ফোটো । অন্ধকারে ছেলেটাকে ঠিক দেখা যাচ্ছে না। তবে তার কথা শোনা যাচ্ছে। 
অজানা : " তুমি আর একটু অপেক্ষা করো নীল পরী। আমি খুব শীঘ্রই তোমার কাছে আসছি। আর একটু সময়। আজ কলেজেই তোমার সঙ্গে দেখা হবে আমার। কবে থেকে তুমি নিজের প্রেমে অন্ধ করে রেখেছে আমায় ।  তুমি সামনে থাকলে তোমাকে ছাড়া আর কিছুই আমার নজরে আসে না। আমি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে উঠছি । আমি ..... " 
ক্ষনিকের জন্য চুপ করে গেল সে । তারপর আবার বলল ।
অজানা : " আমি আর একাকিত্বের জ্বালা সহ্য করতে পারছি না মেঘ । তুমি কবে বৃষ্টি হয়ে আমার তৃষ্ণা মেটাবে । না , আমি আর অপেক্ষা করবো না। খুব শীঘ্রই তুমি আমার হবে নীলপরী। খুব তাড়াতাড়ি তুমি আমার বুকে থাকবে । তৈরি হয়ে নাও , আমার ভালোবাসার মিষ্টি অত্যাচার গুলো পাওয়ার জন্য। " 
এবার সে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ফেমাস A.S Industry-এর CEO।
গত চার বছর ধরে লন্ডনে থেকে ব্যবসার জগতে তার নিজের নাম অনেক বড়ো করে তুলেছে। এখন দেশের অন্যতম সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের তালিকায়।
রাগী, জেদি আর ভীষণ একরোখা স্বভাবের মানুষ। সে যা চায়, তা না পাওয়া পর্যন্ত থামে না।
আর আজ… সে এসেছে শুধু একজনের জন্য।
সোনাই।
আসলে অয়ন আর সোনাইয়ের পরিচয় আজকের নয়।
তাদের বাবারা কলেজ লাইফের বেস্টফ্রেন্ড ছিলেন। সেই সূত্রেই ছোটবেলা থেকে দুই পরিবারের আসা-যাওয়া।
সোনাই তখন খুব ছোট। মাত্র পাঁচ বছরের। একদিন বাবা মায়ের সঙ্গে অয়নের বাড়িতে আসে , তখন থেকেই পরিচয়।
সেদিনই প্রথম তাকে দেখে থমকে গিয়েছিল অয়ন।
নীল রঙের ফ্রক পরা সেই ছোট্ট মেয়েটির তার জীবনে আসা সত্যিই পরীর মতো ছিল।
সেই থেকেই সোনাই তার কাছে “নীলপরী”। এমনিতেও অয়ন সোনাই কে পরী বলে ডাকে। 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট ভালোলাগা কখন যেন গভীর অনুভূতিতে বদলে গেছে‌ । তবে অয়ন তার থেকে তেরো বছরের বড়ো ।
সোনাই কলেজ এসে দেখে গেটের সামনে তার বেষ্টি নিশা দাঁড়িয়ে। যদিও নিশা তার থেকে তিন বছরের বড়ো । অন্য বিষয় নিয়ে সে আগেই ডিগ্ৰি প্রাপ্ত । তবুও সে কোনো ব্যক্তিগত কারণে সোনাই এর ডিপার্টমেন্ট এ পড়াশোনা করছে ।
সোনাই নিজের শাড়ি সামলে নিয়ে তার কাছে এলো । 
নিশা : " এই শাকচুন্নি র দাদি , তুই এত লেট করিস কেন বলতো ? আমি কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি । টাইম মেন্টন করতে পারিস না ? " 
সোনাই কিউটি ফেস বানিয়ে বলল , - সরি জানু , তুইতো জানিস আমার ঘুম উঠতে একটু দেরি হয় । প্লিজ বাবু রাগ করিস না। " 
নিশা : " তোর এই কিউট ফেস দিয়ে না সবসময় আমাকে মানিয়ে নিস । এরপর কিন্তু মানবো না। " 
সোনাই : আচ্ছা বাবা , এটা লাষ্ট এরপর থেকে আর হবে না । এবার ভেতরে চল অনেক দেরি হয়ে গেছে। " 
“প্রতিবারই এই কথা বলিস।”
দুজনেই হেসে কলেজের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
হঠাৎ নিশা উত্তেজিত গলায় বলল,
“এই সোনাই! জানিস আজ আমাদের কলেজের চিফ গেস্ট কে?”
সোনাই কৌতূহলী চোখে তাকাল।
“কে?”
নিশা প্রায় লাফিয়ে উঠল।
“হট অ্যান্ড হ্যান্ডসাম… সবার ক্রাশ… A.S Industry-এর CEO মিস্টার অয়ন সেনগুপ্ত! সোজা লন্ডন থেকে এসেছে!”
নিশা উত্তেজনায় একনাগাড়ে বলে চলেছে।
কিন্তু অয়নের নামটা কানে যেতেই সোনাইয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
চোখে ফুটে উঠল স্পষ্ট বিরক্তি।
সে ধীরে ধীরে অন্যদিকে তাকাল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কলেজের গেটের বাইরে একটা কালো গাড়ি এসে থামল…
গাড়ির দরজা খুলে নামল একজন মানুষ।
যার চোখ খুঁজছে শুধু একজনকেই।
তার নীলপরীকে। ✨

( কি এমন হয়েছে অয়ন আর সোনাই এর মধ্যে , যে সোনাই তার নাম শুনে বিরক্ত হয়ে উঠলো ? )