Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

শেষ বিকেলের ভালোবাসা

কলকাতার ভোরটা সেদিন যেন একটু অন্যরকম ছিল। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘ, কিন্তু বৃষ্টি নেই। ভিজে মাটির গন্ধ বাতাসে মিশে ছিল, যেন শহরটা কোনো অদৃশ্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ধারে চায়ের দোকানগুলোতে তখন ভিড় জমে গেছে। কেউ অফিস যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে চা খাচ্ছে, কেউ খবরের কাগজে চোখ রেখে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছে, আবার কেউ মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। সেই ব্যস্ত শহরের মাঝখানেই একটা পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব সেন।

অর্ণবের পরনে ছিল সাদা ফেডেড শার্ট আর কালো জিন্স। কাঁধে ঝোলানো পুরোনো একটা ব্যাগ। বাইরে থেকে দেখলে একেবারে সাধারণ একটা ছেলে মনে হলেও তার চোখের ভিতরে ছিল অদ্ভুত এক গভীরতা। জীবনের অনেক কষ্ট খুব অল্প বয়সেই তাকে বড় করে দিয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের সব দায়িত্ব তার আর তার মায়ের উপর এসে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই টিউশন পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে সে। অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করেছে, কারণ সে জানত— তার কাছে সফলতা শুধু একটা স্বপ্ন না, প্রয়োজন। সে সফল না হলে তার মায়ের হাসিটাও একদিন হারিয়ে যাবে।

আজ তার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। কলকাতার নামী কলেজে সে ভর্তি হয়েছে। এত বড় কলেজে পড়ার কথা সে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। কিন্তু আজ সত্যিই সে সেখানে যাচ্ছে। ভেতরে ভয় ছিল, নার্ভাসনেস ছিল, আবার অদ্ভুত উত্তেজনাও ছিল।

বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অর্ণব বারবার ঘড়ি দেখছিল। বাস আসতে দেরি হচ্ছিল। তার কপালে হালকা ঘাম জমেছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা মেয়ের গলা শোনা গেল,

“একটু সাইডে দাঁড়াবেন?”

অর্ণব চমকে ঘুরে তাকাল। আর তাকিয়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সবকিছু থেমে গেল। মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে একুশ- বাইশ হবে। সাদা কুর্তি, নীল ওড়না, খোলা চুল আর চোখে একরাশ বিরক্তি। কিন্তু সেই বিরক্তির মাঝেও অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য ছিল। এমন সৌন্দর্য যা চোখ সরাতে দেয় না।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। তারপর বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তো সমস্যা হবেই।”

অর্ণব একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

“সরি… খেয়াল করিনি।”

মেয়েটা আর কিছু না বলে ফোন বের করল। ফোনে কথা বলতে বলতেই বোঝা যাচ্ছিল সে ধনী পরিবারের মেয়ে। তার গলায় বিরক্তি ছিল, কিন্তু সেই বিরক্তির আড়ালেও যেন চাপা কষ্ট লুকিয়ে ছিল।

“হ্যাঁ বাবা, আমি বেরিয়ে গেছি। না, ড্রাইভার লাগবে না। আমি নিজেই যেতে পারব।”

অর্ণব অজান্তেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কেন যেন মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছিল। বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী, একটু অহংকারী মনে হলেও কোথাও যেন একটা একাকীত্ব লুকিয়ে আছে।

ঠিক তখনই বাস এসে দাঁড়াল। মুহূর্তের মধ্যে সবাই হুড়োহুড়ি শুরু করে দিল। অর্ণবও ভিড়ের সাথে বাসে উঠল। কিন্তু বাসে ওঠার সময় হঠাৎ পিছন থেকে ধাক্কা লাগায় মেয়েটা পড়ে যেতে যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অর্ণব হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরে ফেলল।

মেয়েটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য এক হয়ে গেল। তারপর মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“থ্যাঙ্ক ইউ।”

অর্ণব শুধু হালকা মাথা নাড়ল।

বাসের ভিতর প্রচণ্ড ভিড় ছিল। মেয়েটা জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে বসে পড়ল। অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে। মাঝেমধ্যে তার চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। জানালার বাইরে শহরটা ছুটে চলছিল, কিন্তু মেয়েটার চোখে যেন অন্য কোনো চিন্তা ঘুরছিল।

অর্ণব নিজের অজান্তেই ভাবতে লাগল, “এত সুন্দর একটা মেয়ের চোখে এত দুঃখ কেন?”

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর বাস কলেজের সামনে এসে থামল। বিশাল গেটটা দেখে অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল। এত বড় কলেজ সে আগে কখনও দেখেনি। চারদিকে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, কেউ ছবি তুলছে, কেউ বন্ধুদের সাথে হাসছে, কেউ নতুন জীবনের আনন্দে মেতে আছে। অর্ণব কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ভিতরে ঢুকল। তার মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটা যেন তার জন্য না।

ঠিক তখনই পিছন থেকে সেই পরিচিত গলা ভেসে এল,

“এই শুনছেন!”

অর্ণব ঘুরে তাকাতেই মেয়েটা তার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার তার মুখে আগের মতো বিরক্তি ছিল না। বরং কৌতূহল ছিল।

“আপনিও কি এই কলেজে পড়েন?”

অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ… আজ প্রথম দিন।”

মেয়েটা হালকা হেসে বলল,

“আমারও।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

“সকালের জন্য আবারও থ্যাঙ্ক ইউ।”

অর্ণব একটু হেসে বলল,

“কোনো সমস্যা নেই।”

মেয়েটা এবার নিজের চুল কানে গুঁজে ধীরে বলল,

“আমি মেঘলা।”

“অর্ণব।”

দুজন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই মুহূর্তে কেউই বুঝতে পারেনি এই ছোট্ট পরিচয় একদিন তাদের জীবন পুরো বদলে দেবে।

কলেজের প্রথম ক্লাস শুরু হলো। ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় অর্ণব আর মেঘলা একই ক্লাসে পড়ল। অর্ণব পিছনের দিকে গিয়ে বসেছিল। ঠিক তখনই তার পাশে এসে বসল রুদ্র।

রুদ্র ছিল একেবারে উল্টো স্বভাবের ছেলে। সবসময় হাসিখুশি, আড্ডাবাজ, আর কথায় কথায় মজা করা তার স্বভাব। বসেই সে ফিসফিস করে বলল,

“ভাই, প্রথম দিনেই সুন্দরী মেয়ের সাথে সেটিং?”

অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল,

“চুপ কর তো।”

রুদ্র হেসে বলল,

“আমি কিন্তু সব দেখেছি।”

এদিকে মেঘলা বসেছিল ঈশিতার পাশে। ঈশিতা মেঘলার বহুদিনের বন্ধু। সে মুচকি হেসে বলল,

“ছেলেটা কিন্তু খারাপ না।”

মেঘলা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কে?”

“যে তোকে বাসে সামলেছিল।”

মেঘলা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

“উফ! ওসব কিছু না।”

কিন্তু তার নিজেরও খেয়াল হচ্ছিল, সে বারবার অর্ণবের দিকেই তাকাচ্ছে। ছেলেটার মধ্যে একটা অন্যরকম শান্তি ছিল। এই কলেজে সবাই যেখানে নিজেকে বড় দেখানোর চেষ্টা করছে, সেখানে অর্ণব যেন একদম আলাদা।

ক্লাস শেষে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছিল। করিডোরে প্রচণ্ড ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝেই হঠাৎ মেঘলার হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল। মোবাইলটা গড়িয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল। আর একবার পড়ে গেলে নিশ্চিত ভেঙে যেত।

অর্ণব দ্রুত দৌড়ে গিয়ে সেটা ধরে ফেলল।

মেঘলা হাঁফ ছেড়ে বলল,

“উফ! এটা পড়ে গেলে বাবা আমাকে শেষ করে দিত!”

অর্ণব মুচকি হেসে ফোনটা এগিয়ে দিল। মেঘলাও এবার প্রথমবারের মতো একটু হেসে ফেলল। সেই হাসিটা দেখে অর্ণবের বুকের ভিতর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হলো। অনেকদিন পর কারও হাসি তার এত ভালো লাগল।

ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। সবাই দৌড়ে ছুটতে লাগল। মেঘলা বিরক্ত হয়ে বলল,

“ধুর! আমি ছাতা আনিনি।”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো ছাতা বের করল। ছাতাটা খুব সাধারণ ছিল, একটু ছেঁড়াও ছিল। কিন্তু সে ধীরে বলল,

“চাইলে… আমরা শেয়ার করতে পারি।”

মেঘলা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। হয়তো তার জীবনে কেউ এত সাধারণভাবে কখনও তাকে সাহায্য করতে চায়নি। সবাই তার টাকার জন্য, তার সৌন্দর্যের জন্য কাছে আসে। কিন্তু এই ছেলেটার চোখে সেসব কিছুই নেই।

মেঘলা ধীরে ধীরে ছাতার নিচে এসে দাঁড়াল। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। রাস্তার পাশে জমে থাকা জলে আলো পড়ছিল। ঠান্ডা বাতাসে মেঘলার চুল উড়ছিল। আর অর্ণব নিজের অজান্তেই সেই মুহূর্তটা মনে গেঁথে নিচ্ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে মেঘলা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এত চুপচাপ কেন?”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“সব কথা সবাইকে বলা যায় না।”

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল— এই ছেলেটার ভিতরে অনেক না বলা গল্প লুকিয়ে আছে। আর অর্ণবও বুঝতে পারল— মেয়েটা বাইরে থেকে যতটা শক্ত, ভিতরে ততটাই একা।

বৃষ্টি আরও জোরে নামতে লাগল। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টির মাঝেই অজান্তে শুরু হয়ে গেল একটা ভালোবাসার গল্প। যে গল্প একদিন তাদের হাসাবে, কাঁদাবে, ভাঙবে… আবার নতুন করে বাঁচতেও শেখাবে।