Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মায়াডোর - পর্ব 11

“মায়াডোর”
‘রায়হানা ইয়াসমিন রায়’

মেহুলের একুশতম জন্মদিন আজ। তবে কাল রাতের সেই হাড়কাঁপানো অ্যাডভেঞ্চারের পর আজ ওর কলেজ যাওয়া শিকেয় উঠেছে। নিশিতা চৌধুরী সকাল থেকেই রান্নাঘরে এলাহি তোড়জোড় শুরু করেছেন। ঘড়িতে এখন বেলা ১১টা পার হতে চলল, অথচ মেহুলের ঘরের দরজা এখনো ভেতর থেকে খিল দেওয়া। হবেই বা না কেন? কাল রাত ৪টেয় যখন ওরা বাড়ি ফিরেছিল, তখন চারপাশ নিঝুম। আদ্রিয়ান অতি সন্তর্পণে মেহুলকে ওর ঘরে পাঠিয়ে নিজে একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে গিয়েছিল। এরপর মেহুলও ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে সেই যে এক ঘুম দিয়েছে, এখনও ওঠার নামগন্ধ নেই। দুনিয়ার কোনো আওয়াজই যেন আজ তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
সকাল থেকে আদ্রিয়ান আর আফতাব চৌধুরী মিলে বাজারের ফর্দ মেলাচ্ছেন। কখনো মেহুলের জন্য সেরা ড্রেস খুঁজতে বেরোচ্ছেন, তো কখনো কালকের অনুষ্ঠানের কেনাকাটা সারছেন। তবে আদ্রিয়ান নিজের পছন্দের কিছু ড্রেস আগেই আলাদা করে রেখেছে—মেহুলের জন্য। আদ্রিয়ান চৌধুরী পছন্দ করে দেবে আর মেহুল তা পড়বে না—এমন স্পর্ধা কি মেহুলের আছে?

এদিকে মেহুলের দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে আরাধ্যা ক্লান্ত। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে শেষমেশ গটগট করে আদ্রিয়ানের ঘরে ঢুকে পড়ল। আরাধ্যা ঘরে প্রবেশ করতেই আদ্রিয়ান বালিশের নিচে তড়িঘড়ি করে কিছু একটা লুকোচ্ছে। আরাধ্যা কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল—

"কী লুকালে ভাইয়া তুমি বালিশের নিচে?"

আদ্রিয়ান ধমকের সুরে পালটা প্রশ্ন করল—
"কারও রুমে ঢোকার আগে যে নক করতে হয়, সেটা তুই জানিস না আরাধ্যা?"

আরাধ্যার মুখটা মুহূর্তেই চুপসে গেল। ভাইয়ার ধমক খাওয়ার পর আর কথা বলার সাহস ওর নেই। আরাধ্যাকে মিইয়ে যেতে দেখে আদ্রিয়ান এবার নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল—
"কী করতে এসেছিলি, বল?"

আরাধ্যা যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। সে এক নিশ্বাসে বলে দিল—
"ইরা দিদিকে সেই কখন থেকে ডাকছি, ইরা দিদি তো দরজা খুলছেই না! তাই তোমাকে ডাকতে এলাম।"

আদ্রিয়ান গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল—
"ঘুমাচ্ছে হয়তো।"

আরাধ্যার যেন তর সইছে না—
"বারোটা বাজে ভাইয়া! আজ ইরা দিদির বার্থডে, এখনো ঘুমানোর সময়? তুমি চলো না প্লিজ, তুমি ডাকলে শিওর উঠবে।"

আদ্রিয়ান ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলল—
"আমি ডাকলেই উঠবে কেন?"

আরাধ্যা কপালে হাত চাপড়ে বলল—
"আরে বাবা তুমি এটা জানো না, ইরা দিদি তো তোমায় ভয় পায়!"

"কে বলল তোকে, মাইরা আমাকে ভয় পায়?"

"তুমি সত্যিই বোকা ভাইয়া, তুমি এটাও জানো না। আরে ইরা দিদি তোমাকে ভয় পায় বলেই তো তোমার সব কথা শোনে।"

আদ্রিয়ান এবার আরাধ্যার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু গভীর স্বরে বলে উঠল—
"ভয় কেন পাবে, ভালোও তো বাসতে পারে…!"

আরাধ্যা এবার পুরোপুরি ধৈর্য হারিয়ে বলল—
"সে আমি জানি না, তুমি আমার সাথে এখন চলো।"

আদ্রিয়ান আর কিছুই না বলে হাঁটা ধরল মেহুলের রুমের উদ্দেশে। ওরা করিডরে এসে দেখল মেহুল নিচে খেতে বসেছে। আদ্রিয়ান যেই না আরাধ্যার দিকে ঘুরে তাকাবে, তার আগেই ও একছুটে নিচে নেমে গেল।

ডাইনিং টেবিলের রাজকীয় খাবারের আয়োজনের সামনে মেহুল তখন একপ্রকার মূর্তির মতো বসে আছে। নিশিতা চৌধুরী পরম মমতায় ওর পাতে একের পর এক পছন্দের পদ তুলে দিচ্ছেন, কিন্তু মেহুলের মন পড়ে আছে কাল রাতের সেই ধূ ধূ ফাঁকা রাস্তায়। ঠিক তখনই আরাধ্যা ঝড়ের বেগে ঘর কাঁপিয়ে ছুটে এল মেহুলের কাছে।

— "ইরা দিদি, তুমি কখন উঠলে? আমি তোমাকে সেই কখন থেকে ডাকছিলাম, তুমি সাড়া দাওনি কেন?"

আরাধ্যার এই আকস্মিক আবির্ভাবে মেহুল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কাল রাতের সেই নেশালো ঘোর যেন এখনো ওর চোখের পাতায় লেগে আছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত ধীর গলায় বলল—

"আমি তখন ওয়াশরুমে ছিলাম রে আরাধ্যা। আর তোকে তো সাড়াও দিয়েছিলাম, তুই হয়তো শুনতে পাসনি।"

মেহুল কথাগুলো বলছিল ঠিকই, কিন্তু ওর দৃষ্টি আটকে গেল সিঁড়ির দিকে। আদ্রিয়ান চৌধুরী নিচে নামছে। 
পরনে সেই মায়াবী অলিভ গ্রিন কালারের শার্ট আর ব্ল্যাক কালারের প্যান্ট। শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো। আদ্রিয়ানকে এই রূপে দেখে মেহুলের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। 
সে তড়িঘড়ি করে নিজের বাম হাতটা টেবিলের নিচে লুকিয়ে ফেলল; আঙুলের সেই হীরের আংটিটা যেন এখন আগুনের মতো তাপ ছড়াচ্ছে ওর শরীরে।আদ্রিয়ান নিচে নেমে সরাসরি নিশিতা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল—

"মা, আজ তো মাইরার বার্থডে। ওকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে গেলে হয় না?"

নিশিতা চৌধুরী কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আফতাব চৌধুরী পানির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ফোড়ন কাটলেন—
"আরে, সে তো মেহুলকে নিয়ে যেতেই হবে! তবে শোন আদি, এই তপ্ত দুপুরে বেরোনোর দরকার নেই। তোরা বরং বিকেলের দিকেই যাস, কেমন?"

ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেই আরাধ্যা খুশিতে ডগমগ হয়ে বায়না ধরল—
"আমিও যাব কিন্তু! ইরা দিদির বার্থডে বলে কি শুধু ইরা দিদিই যাবে?"

আফতাব চৌধুরী হো হো করে হেসে উঠলেন—
"যাবি যাবি, তুইও যাবি। কী বলো মেহুল মা?"

মেহুল আরাধ্যার নরম গালটা টেনে দিয়ে মুচকি হেসে বলল—
"কেন নয়? আমি কি আমার আরাধ্যা সোনাকে রেখে কোথাও যেতে পারি?"

কিন্তু এদিকে আদ্রিয়ানের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। মনে মনে সে নিজেকেই গালি দিয়ে উঠল—
"শালা! কী ভেবেছিলাম আর কী হলো! ভেবেছিলাম আমার মাইরাকে নিয়ে নির্জনে একটু সময় কাটাব, তা না… আমার বউয়ের এই শ্বশুরটা আমার সব পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দিল! ধুর, ভালো লাগে না!"

আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে ওপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নিশিতা চৌধুরী পেছন থেকে মমতা মাখানো গলায় ডাকলেন—
"এই আদ্রিয়ান, তুই খাবি না? সকাল থেকে তো কিছুই পেটে পড়েনি। বোস, খেতে দিচ্ছি।"

আদ্রিয়ান এবার চরম মহাবিপদে পড়ল। মনে মনে বলল—
"উফ শিট! এখন মাকে কী করে বলি যে তোমার বৌমার দীর্ঘায়ুর জন্য আমি আজ নফল রোজা রেখেছি!"

রিলসে দেখা সেই অদ্ভুত সুন্দর আইডিয়াটা আজ পালন করতে গিয়ে সে এখন ধরা খাওয়ার জোগাড়। আদ্রিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত উত্তর দিল—
"আমি এখন খাব না মা, খিদে নেই একদম। ডিরেক্ট লাঞ্চ করে নেবো।"

নিশিতা চৌধুরীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে গটগট করে ওপরে চলে গেল। নিশিতা চৌধুরী এক দৃষ্টিতে আদ্রিয়ানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার মনে এক অদ্ভুত ভাবনা খেলা করছিল—আদ্রিয়ানের এই হঠাৎ পাল্টে যাওয়া আচরণ কি তিনি ধরে ফেললেন?
আফতাব চৌধুরী পাশ থেকে হেসে বললেন—

"নিশি, ওর কথা ভেবো না। খিদে পেলে ও ঠিকই খেয়ে নেবে। আর ও তো বললই একদম লাঞ্চ সেরে নেবে।"

স্বামীর এই আশ্বাসে নিশিতা চৌধুরীর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। উনি মনে মনে আওড়ালেন—
"তুমি সত্যিই সেই আগের মতোই রয়ে গেলে, আফতাব! আমি মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই তুমি আমার না বলা কথাগুলো সব বুঝে যাও…!"

নিশিতা চৌধুরী যখন নিজের ভাবনার জগতে ডুবে ছিলেন, তখনই কানে এল সেই অতি পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
"কী হলো গো নিশি? আবারও অমনভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"

নিশিতা চৌধুরী চমকে বাস্তবে ফিরলেন। মেহুল খাওয়া শেষ করে আরাধ্যাকে নিয়ে ওপরে চলে গেলে ডাইনিং স্পেসটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই আফতাব চৌধুরী খুব সন্তর্পণে এগিয়ে এসে পেছন দিক থেকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার কানের কাছে মুখ নিয়ে একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করে বললেন—

"এটাই ভাবছ তো, আজও আমি কীভাবে তোমার মুখ ফুটে না বলা সব কথা ঠিকই বুঝতে পেরে যাই?"

নিশিতা চৌধুরী লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেলেন। উনি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলতে যাচ্ছিলেন—
"আরে ছাড়ো না, কেউ দেখে ফেলবে তো…"

ঠিক তখনই দেখা গেল আদ্রিয়ানকে। সে জোহরের নামাজের জন্য পাঞ্জাবি পরে একদম রেডি হয়ে নিচে নামছে। বাপের সাথে মায়ের এই অভাবনীয় রোমান্টিক দৃশ্য দেখে ফেলায় পরিস্থিতি চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
 আফতাব চৌধুরী তড়িঘড়ি করে স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ালেন। নিশিতা চৌধুরী তো আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না, লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে একরকম দৌড় দিলেন।

আদ্রিয়ান যেন কিছুই দেখেনি, এমন গাম্ভীর্য নিয়ে এগিয়ে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করল—
"নামাজে যাবে না আব্বু?"
আফতাব চৌধুরী এখন ছেলের চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছেন। উনি আমতা আমতা করে বললেন—
"হুম, যাব তো… তুই যা, আমি আসছি।"

আদ্রিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে মসজিদের দিকে রওনা দিল।

দুপুরের সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপরে। ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বাজে। খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত থাকলেও আদ্রিয়ান চৌধুরীর দেখা নেই। ছেলের দেখা না পেয়ে নিশিতা চৌধুরী নিজেই ওপরে উঠলেন। আদ্রিয়ানের ঘরের দরজা সচরাচর বন্ধ থাকে, কিন্তু আজ সেটা হাঁ করে খোলা। ঘরে ঢুকে তিনি দেখলেন, আদ্রিয়ান ফিটফাট হয়ে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

উনি কিছু না ভেবেই রুমের ভেতর ঢুকে পড়লেন। আদ্রিয়ান তখন বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছিল। হঠাৎ মাকে এই ভরদুপুরে নিজের রুমে ঢুকতে দেখে সে কিছুটা অবাক হলো। নিশিতা চৌধুরী বেশ গম্ভীর হয়ে শাসনের সুরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন—
"এই ভরদুপুরে তুই কোথায় যাবি, আদ্রিয়ান?"
আদ্রিয়ান বিচলিত না হয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল—
"ওই একটা ফ্রেন্ডের বাড়িতে ইনভাইট আছে, ওখানেই যাচ্ছি।"
নিশিতা চৌধুরী এবার কিছুটা নরম গলায় আবারও প্রশ্ন করলেন—
"কোন ফ্রেন্ড?"
আদ্রিয়ান চৌধুরী এমনই—সব প্রশ্নের উত্তর তার আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। আদ্রিয়ান জানত, এই প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতেই হবে। তাই তো সে কোনো রকম বিচলিত না হয়েই উত্তর দিল—

"রাজ। ও অনেকদিন পর দেশে ফিরেছে না? তাই জন্য লাঞ্চে সবাইকেই ইনভাইট করেছে।"

নিশিতা চৌধুরী এক মুহূর্ত স্থির থেকে বলে উঠলেন—
"তুই মিথ্যা বলছিস আমাকে, আদ্রিয়ান!"

মায়ের জহুরীর চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। আদ্রিয়ান যেন এক অদৃশ্য খাঁচায় আটকা পড়ল। ও না পারছে সত্য বলতে, না পারছে মায়ের চোখে চোখ রেখে অনর্গল মিথ্যে বলে যেতে। আদ্রিয়ানের নীরবতা দেখে নিশিতা চৌধুরীই বোমা ফাটালেন—

"আজ তুই রোজা রেখেছিস না?"

যেই আদ্রিয়ান চৌধুরীর গর্জনে পুরো লেকচার থিয়েটার কেঁপে ওঠে, সেই আদ্রিয়ান চৌধুরী আজ মায়ের সামনে এক হাতেনাতে ধরা পড়া চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ও কী বলবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। এবার আদ্রিয়ান কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে আমতা আমতা করে বলল—
"রোজা? কিসের রোজা? এটা কি রমজান মাস চলছে
 নাকি?"

নিশিতা চৌধুরী এবার চোখ রাঙিয়ে বললেন—
"কথা ঘোরানোর চেষ্টা করবি না, আদ্রিয়ান। যেটা জিজ্ঞাসা করেছি, সেটার উত্তর দে। নয়তো খেতে চল।"

আদ্রিয়ান এবার শেষ চেষ্টা করল—

"আরে মা, আমি তো তোমাকে বললাম যে আজ রাজের বাড়ি দাওয়াত আছে। ও অনেক করে বলেছে মা, আমাকে যেতেই হবে।"

নিশিতা চৌধুরী এক রহস্যময় বাঁকা হাসি দিয়ে কিছুটা ভাব নিয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালেন। ওনার এই চাহনিতে আদ্রিয়ানের যেন কলিজার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। ওর মনে এখন একটা চিন্তাই অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছে—মায়ের কাছে আজ যেন ধরা না পড়ে যেতে হয়!

নিশিতা চৌধুরী এবার কিছুটা নরম গলায় শেষবারের মতো প্রশ্ন করলেন—
"তুই সত্যিই রোজা রাখিসনি তো?"

আদ্রিয়ান তড়িঘড়ি করে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলতে লাগল—
"না না, একদমই না!"

নিশিতা চৌধুরী এবার পাশ থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে আদ্রিয়ানের মুখের সামনে একদম উঁচিয়ে ধরলেন। তারপর কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বললেন—
"তাহলে এই পানি খেয়ে দেখা!"

মেহুলের একদমই ইচ্ছা ছিল না আজ এই অবস্থায় বাইরে যাওয়ার। তবুও পরিস্থিতির চাপে তাকে ঘুরতে যেতেই হচ্ছে। তবে আদ্রিয়ান মনে মনে মহাখুশি! খুশির কারণ দুটো—প্রথমত, সে রোজা ভাঙার হাত থেকে বেঁচে গেছে, আর দ্বিতীয়ত, ওদের সাথে আরাধ্যা যাচ্ছে না। আরাধ্যাকে অনেক সাধ্যসাধনা করেও কেউ রাজি করাতে পারেনি। তার এক কথা—সে তার আব্বুকে রেখে আজ কোথাও এক কদমও নড়বে না।

দুপুরে যখন নিশিতা চৌধুরী খাবার টেবিলে ওদের তিনজনকে খেতে দিয়ে ওপরে আদ্রিয়ানের ঘরে গিয়েছিলেন, তার কিছুক্ষণ পরেই ঘটেছিল সেই অঘটন। আদ্রিয়ান যখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পানির গ্লাসটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছিল, ঠিক তখনই আরাধ্যা ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে জানাল—

আব্বুর খেতে খেতে হঠাৎ প্রচণ্ড বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে!
খবরটা শোনা মাত্রই নিশিতা চৌধুরী হাতের গ্লাসটা ওখানেই ছেড়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এলেন। আফতাব চৌধুরী হার্টের রোগী—ওনাকে কোনো ব্যাপারেই অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বারণ। এটা নিয়েও আদ্রিয়ানের মনে গভীর এক দুশ্চিন্তা কাজ করছে—আফতাব চৌধুরী যদি কোনোদিন ওদের এই সম্পর্কের কথা মেনে না নেন, তবে কী হবে? আর নিশিতা চৌধুরী তো স্বামী-অন্তর প্রাণ।

তবে বাবার এই হঠাৎ অসুস্থতার কারণেই নিশিতা চৌধুরীর আর খেয়াল ছিল না আদ্রিয়ানের খাওয়ার কথা; ফলে চরম বিপদের হাত থেকে আদ্রিয়ান এবার বেঁচে গেল।
মেহুল আজ যে ড্রেসটা পরেছে, সেটা আদ্রিয়ানের দেওয়া। বাড়ির ভেতরে এত হুলস্থুল হওয়ার মাঝেও আদ্রিয়ান ঠিকই সুযোগ বুঝে চুপিসারে মেহুলের ঘরে গিয়ে ড্রেসটা দিয়ে এসেছে, আর সাথে উপহার হিসেবে দিয়ে এসেছে গভীর অনুরাগের এক ‘ফরহেড কিস’।

ডাক্তার এসে আফতাব চৌধুরীকে চেকআপ করে যাওয়ার পর যখন তিনি মেহুলকে ঘুরতে যেতে বললেন, মেহুল প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু আফতাব চৌধুরীর কথা সে ফেলতে পারে না। ছোটবেলা থেকে নিজের বাবার বাড়িতে না থাকা এই মেয়েটা ঠিক বাবার মতোই আদর পেয়ে বড় হয়েছে আফতাব চৌধুরীর কাছে। মেহুল যেমন ওনাকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করে, ঠিক তেমনি আফতাব চৌধুরীও মেহুলকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন।

ওনার বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার পর থেকে কেউই ওনার পাশ থেকে সরতে নারাজ। একদিকে মেহুল, অন্যদিকে নিশিতা চৌধুরী আর মেহুলের পাশেই আরাধ্যা—সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। নিশিতা চৌধুরী তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন আদরের স্বামীর এই অবস্থা দেখে। ডাক্তার এসে দেখে বললেন—ভয়ের কিছু নেই। প্রেসার আর অনিয়মের জন্য হয়েছে। তবুও ভয় কাটছে না কারও।

মেহুল আদ্রিয়ানের দেওয়া তিনটি ড্রেসের মধ্যে আজ সাদা ড্রেসটাই পরেছে—আদ্রিয়ানের কথামতো। সাদামাটা এই সাজেও ওকে যেন হুরপরীর মতোই লাগছে। মেহুল বরাবরই বেশি সাজতে পছন্দ করে না। আজও তার ব্যতিক্রম নয়—ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে কাজল… তাতেই যেন তার সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠেছে।

রেডি হয়ে আদ্রিয়ানের রুমে ঢুকতেই মেহুল থমকে গেল। রুমে আদ্রিয়ান নেই। পুরো রুম খুঁজেও তাকে না পেয়ে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল সে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—‘রাজ’।

দুই-তিনবার রিং হয়ে কেটে যাওয়ার পর আবার কল আসতেই মেহুল ভাবল, নিশ্চয়ই জরুরি কিছু। সে ফোনটা রিসিভ করল।

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে রাজের গলা—
“এই শালা! তোকে কতবার ফোন করেছি রে! ধরিস না কেন? আর কখন আসছিস তোরা? তুই কি ভুলে গেছিস আজ তুই রোজা রেখেছিস? তোরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে তো মাগরিবের আজান হয়ে যাবে! তুই কি রাতেও রোজা রাখবি নাকি?”

এপাশে কোনো সাড়া নেই দেখে রাজ একটু থেমে গেল। তারপর আবার বলল—
“হ্যালো? আদি? কথা বলছিস না কেন? এই আদি!”

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল আদ্রিয়ান।
“তুই এখানে? আমি তো তোকে তোর রুমে না পেয়ে কল করতেই যাচ্ছিলাম,” বলতে বলতে সে ফোন খুঁজতে লাগল।
“আমার ফোনটা দেখে...—”

কথাটা শেষ করার আগেই মেহুলের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল সে।

এক মুহূর্তে যেন তার চারপাশের সবকিছু থেমে গেল। চোখে-মুখে একরাশ মুগ্ধতা। খেয়ালই নেই—মেহুল এখনও কানে ফোন ধরে আছে। তার দৃষ্টি আটকে রইল মেহুলের সেই গভীর, মায়াবী চোখে।
সময় যেন ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

খুব ধীরে ধীরে মেহুলের দিকে এগিয়ে গেল আদ্রিয়ান। এদিকে কখন যে ফোন কেটে গেছে, কেউই খেয়াল করেনি।
আদ্রিয়ানকে এতটা কাছে আসতে দেখে মেহুলও আর বসে থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল।

আদ্রিয়ানের ঠোঁট হালকা কাঁপল। তারপর খুব নরম গলায় বলল—

“তোমাকে দেখলে আমার সব শব্দ যেন হারিয়ে যায়… মনে হয় ভাষা বলে কিছুই নেই, শুধু নীরবতা আছে—আর সেই নীরবতার মাঝেই তুমি সবচেয়ে সুন্দর।
তোমার চোখ দুটো… কাজলে ঘেরা এই গভীরতা যেন কোনো অজানা গল্পের দরজা, যেখানে আমি বারবার হারিয়ে যেতে চাই। মনে হয়, সেখানে লুকিয়ে আছে হাজারটা না-বলা কথা।
আর যখন তুমি একটু হাসো… ওই ছোট্ট গোজদন্তটা—সেটা যেন হঠাৎ করেই আমার সব স্থিরতা ভেঙে দেয়।
তোমার হাসিটা ভোরের প্রথম আলোর মতো—নরম, শান্ত… অথচ সবকিছু আলোকিত করে দেয়।
আমি ভেবেছিলাম অনেক কথা বলব… কিন্তু এখন বুঝছি, তুমি এমন এক অনুভূতি—যাকে শব্দে বাঁধা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।”
একটু থেমে আবার বলল—
“তবুও একটা কথা বলি… তুমি আজ এত সুন্দর যে, তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।”


আদ্রিয়ানের প্রতিটি কথা মেহুলের ভেতর ঝড় তুলে দিচ্ছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি। প্রতিটি ‘তুমি’ শব্দে যেন তার মনে হাজার প্রজাপতি উড়ছে।
আদ্রিয়ান ধীরে হাত বাড়িয়ে মেহুলের গাল ছুঁল। তারপর আরও কাছে এগিয়ে এসে মেহুলের ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়াতে যাবে…
ঠিক তখনই মেহুল বলে উঠল—

“এই, কী করছো? তুমি না আজ রোজা রেখেছো?”
কথাটা শুনে আদ্রিয়ান থমকে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে উঠল।
মনে মনে ভাবল—
ও কি আমার মনের কথাও বুঝে ফেলল? কিন্তু আমি যে রোজা রেখেছি, সেটা তো কেউ জানে না…
ভাবনা কাটিয়ে সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল—
“তুই কীভাবে জানলি? তোকে কে বলল?”
মেহুল কিছু বলতে যাবে—
“ওই রা—”
ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠল। রাজ কল করেছে।
আদ্রিয়ান ফোনটা রিসিভ করে কয়েকটা কথা বলে রেখে দিল। তারপর মেহুলের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তুই নিচে যা, আমি এক্ষুনি আসছি।”
মেহুল আর কিছু বলল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ানের বুঝতে আর বাকি রইল না—এটা রাজেরই কাজ।
মনে মনে ঠিক করল, পরে ওর সঙ্গে হিসাব মিটিয়ে নেবে।
এখন আগে তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে।

মেহুল নিচে নামার পর থেকেই সোফায় বসে আছে। ও উঠে এবার নিশিতা চৌধুরীদের রুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাবে, ঠিক সেই সময় ওর চোখ আটকে গেল সিঁড়ির দিকে। আদ্রিয়ান চৌধুরী নামছে। পরনে একটা ব্ল্যাক কালারের শার্ট আর তার সাথে ম্যাচ করেই একটা কালো রঙের প্যান্ট। হাতে ব্ল্যাক কালারের ওয়াচ। শার্টের কলারে ঝোলানো চশমা, শার্টের হাতাটা কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গোটানো। এই লুকে আদ্রিয়ানকে যতবার দেখেছে, ততবারই সে মেহুলকে ঘায়েল করেছে।
আদ্রিয়ান হাতে বাইকের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে নামছিল। মেহুলকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আদ্রিয়ান নিজেও থমকে গেল। সিঁড়ির রেলিংয়ের ওপর কিছুটা ঝুঁকে মেহুলের দিকে তাকিয়ে সিটি ছুঁড়ে চোখ টিপল। হঠাৎ করেই মেহুলের সারা শরীরে শিহরণ ছেয়ে গেল। মেহুলের কেঁপে ওঠা দেখে আদ্রিয়ান মেহুলকে উদ্দেশ্য করে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ল। মেহুলও তো আর দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, সেও সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ল।
আদ্রিয়ান মেহুলের কিস ছোড়া দেখে সিঁড়ি থেকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিল। আদ্রিয়ানের পড়ে যেতে যাওয়া দেখে মেহুল বলে উঠল—
“আরে আরে, আস্তে, আস্তে!”
এটা বলেই মেহুল খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। মেহুলকে এভাবে হাসতে দেখে আদ্রিয়ান থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আজ যেন ও মেহুলকে নতুন কোনো রূপে দেখছে। আজ ওর হাসি, কথা বলা, ভাবভঙ্গি—সবই যেন আদ্রিয়ানের কাছে নতুন। আদ্রিয়ান ভাবছে—
“এটা কি তারই সেই মাইরা, যে কি না আদ্রিয়ানের সাথে চোখ তুলে কথা পর্যন্ত বলত না?”
আদ্রিয়ানকে এভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেহুলের হাসি থেমে যায়। মেহুল লজ্জা পেয়ে ছুটে চলে যায় নিশিতা চৌধুরীর রুমের দিকে। মেহুলের এই নতুন বৌয়ের মতো লজ্জা পেয়ে চলে যাওয়ায় আদ্রিয়ান কিছুটা অবাকও হলো, আবার তার সাথে কিছুটা খুশিও হলো। সে নিজের চুলে হাত বুলিয়ে আনমনে বলল—
“আমি যখন তোকে নিজের মধ্যে মিশিয়ে নেব, তখন এই লজ্জা কোথায় লুকাবি, সুইটহার্ট…!!”
আদ্রিয়ান আর দাঁড়িয়ে না থেকে নিজেও চলে গেল বাবা-মায়ের রুমে, তাঁদের সাথে দেখা করে আসার জন্য।
আদ্রিয়ান রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে বলল—
“ভেতরে আসব?”
আফতাব চৌধুরী ছেলের এই গুণ দেখে মুচকি হেসে বললেন—
“আই আই, এতে আবার পারমিশন নেওয়ার কী আছে!”
আদ্রিয়ান রুমের ভেতর ঢুকেই আফতাব চৌধুরীকে প্রশ্ন করল—
“এখন শরীর কেমন আছে, আব্বু?”
আফতাব চৌধুরী উঠে বসতে বসতে বললেন—
“আরে বাবা, আমার শরীর একদম ঠিক আছে। তোর যদি শুধু শুধু এত চিন্তা করিস! আর ডাক্তার তো বলেই গেছেন, ভয়ের কিছুই নেই।”
আফতাব চৌধুরী কিছুটা থেমে আবার বললেন—
“তোরা এখনই যাসনি কেন? বেরিয়ে পড় এবার। আরান আর সারা চলে আসলে তোদের কিন্তু আর যাওয়া হবে না।”
“সারা” নামটা শুনতেই আদ্রিয়ানের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—
“হুম আব্বু, এই তো যাব। মাইরাকেই ডাকতে এসেছিলাম।”
আফতাব চৌধুরী মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন—
“হুম যাও, মেহুল মা, এবার তোমরা বেরিয়ে পড়ো।”
মেহুল মুচকি হেসে বলল—
“হুম আংকেল, আসছি।”
ওরা আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলল—
“জানিস মাইরা, আজ কী হয়েছে?”
মেহুল কিছুটা অবাকের সুরে বলল—
“কী হয়েছে?”
আদ্রিয়ান মিররটা মেহুলের দিকে ঘুরিয়ে বলল—
“আজ আমাকে একজন ফ্লাইং কিস ছুঁড়েছে। তাকে আমি শাস্তি দেব। তুই বল মাইরা, তার সাহস কত বড়! আমাকে, মানে আদ্রিয়ান চৌধুরীকে ফ্লাইং কিস ছোড়ে! আদ্রিয়ান চৌধুরী কি তাকে ছেড়ে দেবে? কখনই না। ছেড়ে দেওয়া কি উচিত, বল?”
মেহুল চুপ করে আছে দেখে আদ্রিয়ান হেলমেটের ভেতরে বাঁকা হেসে বলল—
“কী হলো, বল?”
মেহুলের সম্বিত ফিরতেই তড়িঘড়ি করে বলল—
“নাহ… হ্যাঁ হ্যাঁ, ছেড়ে দেওয়াই ভালো।”
আদ্রিয়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল—
“কেন?”
এইবারও মেহুল চুপ। মেহুলকে চুপ থাকতে দেখে আদ্রিয়ান বলল—
“আচ্ছা, বাদ দে।”
এতক্ষন ওরা কথা বলতে বলতে অনেকটা পথই চলে এসেছে। আদ্রিয়ান বাইকটা একটা সাইডে থামাল। বাইক থামানো দেখে মেহুল বলল—
“আমাকে কি আবারও নামিয়ে দেবে মাঝ রাস্তায়?”
আদ্রিয়ান কিছুই বলল না। সে চুপচাপ তার পরনের কালো রঙের শার্টটা খুলে ফেলে নিচে বসে থাকা ভিক্ষুককে কিছু টাকা আর সেই শার্টটা দিয়ে চলে গেল। মেহুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কি জানতে যে কোনো এক ভিক্ষুকের গায়ে কাপড় নেই? তাই জন্যই কি দুটো শার্ট পরে এসেছিলে?”
আদ্রিয়ান একটা ফুলের দোকানের সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে বলল—
“নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ।”
এটা বলেই সে চলে গেল ফুলের দোকানের দিকে। মেহুল নিজের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। সে তো এতক্ষণ খেয়ালই করেনি যে আজ সে নিজেও সাদা রঙের ড্রেস পরেছে। তাই জন্যই তো ম্যাচিং আদ্রিয়ানও ভেতরে সাদা শার্ট পরে এসেছে। 
আদ্রিয়ান একটা গাজরা আর নানান ফুল দিয়ে সাজানো একটা ক্রাউন কিনল। সেগুলো নিয়ে এসে খুব যত্ন করে মেহুলের মাথায় ও হাতে পরিয়ে দিল। পাশ থেকে এটা দেখে ফুলের দোকানের লোকটা বলল—
“ভাই, খুব মানিয়েছে ভাবীকে আপনার সাথে।”
মেহুল লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিলে আদ্রিয়ান লোকটার উদ্দেশ্যে বলল—
“থ্যাংক ইউ, ব্রো।”
বলেই সে ঝড়ের গতিতে বাইক স্টার্ট দিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরল—
“ইচ্ছে যত... উড়িয়ে দেবো, হঠাৎ... দমকা হাওয়াতে...
দস্যু হয়ে তারা, ভাঙবে যে পাহারা...
জাগাবে তোমায় রাতে...
বলো না বলো... শুনতে কি চাও...
বলো না বলো... শুনতে কি পাও...
বলো না বলো... আজকে আমায়.....!!”