আমি অতনু সেনগুপ্ত। আমার বাড়ি মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। আজ আমি যে ঘটনাটা বলতে যাচ্ছি, সেটা যদি আমার নিজের সাথে না ঘটত, তাহলে হয়তো আমিও বিশ্বাস করতাম না। কলেজ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর কলকাতার একটা আইটি কোম্পানিতে চাকরি পাই। বেতন মোটামুটি ভালোই ছিল। মাসের শেষে বাড়ি ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে যা টাকা হাতে থাকত, তার বেশিরভাগটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম। অফিসের একদম কাছেই একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম, তাই যাতায়াতের কোনো খরচও ছিল না। শুরুর কয়েক মাস সবকিছু বেশ ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো হঠাৎ করেই। একদিন অফিস থেকে জানানো হলো, এবার থেকে নাইট শিফট শুরু হবে। খবরটা শুনে বেশিরভাগ কর্মচারীই আপত্তি জানাল। কেউ বলল বাড়ি অনেক দূরে, কেউ বলল রাতে কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমার কিছু বলার ছিল না। কারণ সবাই জানত আমি অফিসের সামনেই থাকি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো— আমি আর আরও পাঁচজন মিলে এক সপ্তাহ করে নাইট শিফট করব। রাত বাড়ার সাথে সাথে অফিসটা কেমন যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে উঠত। দিনের বেলায় যেখানে মানুষের ভিড়, ফোনের আওয়াজ আর কিবোর্ডের শব্দে পুরো ফ্লোর গমগম করত, সেই জায়গাটাই রাতে যেন মৃত বাড়ির মতো লাগত। তবু প্রথম রাতে তেমন কিছু ঘটেনি শুধু রাত বাড়ার সাথে সাথে অফিসটা একটু অস্বস্তিকর লাগছিল ঠিকই, কিন্তু আমি সেসব গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু দ্বিতীয় রাত থেকেই সব বদলে যেতে শুরু করল… রাত বাড়তেই পুরো বিল্ডিং নিঃশব্দ হয়ে গেলো আমার কিছু কাজ বাকি ছিলো করতে করতে রাত ১টা বেজে ৩০মিনিট হয়ে গেলো। পুরো অফিস ফ্লোরে আমি একাই ছিলাম। দূরে শুধু AC-এর হালকা আওয়াজ আর মাঝে মাঝে CPU-এর fan ঘোরার শব্দ। আমি কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ পিছনের সারি থেকে খুব দ্রুত কিবোর্ডে টাইপ করার শব্দ ভেসে এল। টক… টকটক… টকটকটক… প্রথমে ভাবলাম হয়তো অন্য টিমের কেউ নাইট আছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই মনে পড়ল— এই সময় পুরো floor-এ আমি ছাড়া আর কারও থাকার কথা নয়। আর কথাটা মনে পড়ার সাথেসাথেই আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেলো। তাহলে কে? ধীরে ধীরে পিছনে তাকালাম। সব ডেস্ক ফাঁকা।একটাও মানুষ নেই। কিন্তু শব্দটা তখনও হচ্ছে। টক… টকটক… টকটকটক… তারপর টাইপ করার শব্দটাও হঠাৎ থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ফ্লোরটা আবার অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। আমি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো অফিসের আলো জ্বলতে-নিভতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা কেমন যেন ভৌতিক হয়ে উঠল। কখনও পুরো ফ্লোর আলোয় ভরে যাচ্ছে, আবার পরের মুহূর্তেই সব অন্ধকার। প্রথমে ভাবলাম হয়তো কেউ এসেছে। আমাকে একা দেখে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। আমি জোরে বলে উঠলাম— “কে ওখানে?” কিন্তু কোনো উত্তর পেলাম না। আলো তখনও স্থির হয়নি। আমার বুকের ভিতরটা ধকধক করছিল, তবু সাহস করে ধীরে ধীরে সুইচ বোর্ডের দিকে এগোতে লাগলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি— কেউ নেই। চারপাশ পুরো ফাঁকা। ঠিক তখনই আলোটা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কিছুই হয়নি। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর নিজেকেই বুঝালাম—“হয়তো electric-এর কোনো সমস্যা ছিল।” তারপর গিয়ে আবার নিজের ডেস্কে বসে পড়লাম। সেদিন রাতে আর তেমন কিছু ঘটেনি। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে সারাক্ষণ ওই ঘটনাগুলোই মাথার মধ্যে ঘুরছিল। কিন্তু দিনের আলোয় সবকিছু কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছিল। আমি নিজেকেই বোঝাতে লাগলাম— “এসব হয়তো মনের ভুল। মানুষ অনেক সময় একা থাকলে কত কিছুই না কল্পনা করে। সবকিছু কি আর সত্যি হয়?” এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি।সারাটা দিন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম। হায় রে কপাল! যদি তখনই বুঝতে পারতাম, পরের রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত হতে চলেছে… তাহলে হয়তো আজ এই ঘটনার সাক্ষী হতে হত না। পরের দিন যথারীতি রাত ন’টার দিকে অফিসে গেলাম। বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। অফিসের কাঁচের জানলায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল। সেদিন একটা জরুরি online meeting ছিল। আমি নিজের ডেস্কে বসে laptop-এ meeting join করলাম। কিন্তু পুরো সময়টা জুড়েই আগের রাতের ঘটনাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, যেন কেউ আমাকে লক্ষ্য করছে। মিটিং শেষ হতে প্রায় রাত বারোটা বেজে গেল। Laptop-এর camera off করে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। পুরো floor তখন প্রায় ফাঁকা আর নিস্তব্ধ। ঠিক করলাম একটা সিগারেট খেয়ে আসি। হয়তো মাথাটা একটু হালকা হবে। অফিসের balcony-টা ছিল corridor- এর একদম শেষ মাথায়। রাতে জায়গাটা এমনিতেই খুব নির্জন লাগত। তবু ধীরে ধীরে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিলাম। ঠিক তখনই কাঁচের দরজার ওপাশে, office floor-এর ভিতরে যেন কাউকে হেঁটে যেতে দেখলাম। একটা ছায়ামূর্তি হাঁটছিল খুব অদ্ভুতভাবে। ধীরে… টেনে টেনে… আর corridor-এর আলো জ্বললেই তাকে দেখা যাচ্ছিল, আবার আলো একটু কমলেই সে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আমি কাঁচের দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। ভিতরে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। corridor পুরো ফাঁকা কেউ নেই। তৎক্ষনাৎ সিগারেটটা ফেলে দিয়ে নিজের ডেস্কের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম আর তখনই আমি প্রথম বার তার স্বর শুনলাম। সে আমার নাম ধরে একটা আবেগ জড়ানো গলায় ডাকল। অতনু… এই অতনু….. এসো…. আমার কাছে এসো...।আমি সেখানেই জমে গেলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই। মনে হলো কেউ যেন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিচ্ছে। আওয়াজটা ফ্লোরের মাঝখান থেকে আসছিল, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার প্রতিধ্বনি যেন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরছিল আমাকে। আমি চাইলেও চোখ ফেরাতে পারছিলাম না কাঁচের দরজা থেকে। ধীরে ধীরে অফিসের ভেতরের আবছা অন্ধকারে একটা অবয়ব স্পষ্ট হতে শুরু করল। একটা মেয়ে। পরনে একটা আধপোড়া সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। চুলগুলো মুখের ওপর অগোছালোভাবে ছড়ানো, তাই মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। সে অফিসের সারি সারি ডেস্কের মাঝখানের সরু পথ দিয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকে হেঁটে আসছিল। তার হাঁটার ধরনটা বড় অদ্ভুত... মনে হচ্ছিল যেন তার পায়ের হাড়গুলো সব ভাঙা, শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে প্রতিটা পদক্ষেপে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ার্ত ছিল তার চোখদুটো। অন্ধকারের মধ্যেও সেই চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করছিল। কোনো মণি নেই, শুধু দুটো সাদা, শূন্য গর্ত। সে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল, আর তার ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল একটা অদ্ভুত, পৈশাচিক হাসি। “অতনু… এসো…” সে আবার ডাকল। এবার গলাটা আরও কাছে, যেন ঠিক আমার কানের পাশেই কেউ ফিসফিস করছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। কাঁচের দরজায় একটা ধাক্কা দিয়ে আমি ছুটতে শুরু করলাম মেইন গেটের দিকে। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি একই জায়গায় দৌড়াচ্ছি। করিডোরটা যেন শেষই হচ্ছে না। আমার পেছনে ভেসে আসছে সেই ভাঙা পায়ের হাঁটার শব্দ…আর তার সাথে সেই কর্কশ, হাসির আওয়াজ। অবশেষে আমি মেইন গেটের হ্যান্ডেলটা ধরলাম। লক করা! আমি পাগলের মতো হ্যান্ডেলটা ঘোরাতে লাগলাম, কিন্তু খুলল না। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, মেয়েটা করিডোরের মোড় ঘুরে আমার দিকে আসছে। তার মুখটা এবার পুরোপুরি স্পষ্ট। সেটা মানুষের মুখ নয়। চামড়াগুলো ঝলসে গেছে, মাংসে পচন ধরেছে। একপাশের গালে গভীর ক্ষত, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। আর তার সেই শূন্য, সাদা চোখদুটো দিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। “কোথায় যাবে অতনু? কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।” তার গলাটা এখন একটা আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছিল। “আমিও এই অফিসেই কাজ করতাম জানো? একদিন রাতে… আগুন লাগল… কেউ আসেনি বাঁচাতে। সবাই পালিয়ে গেল। আমাকে একা রেখে…”সে আমার আরও কাছে চলে এল। তার গায়ের থেকে একটা পচা, পোড়া গন্ধ আসছিল। আমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।“ এখন তুমিও আমার সাথেই থাকবে। চিরকাল।” সে তার হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। তার আঙুলগুলো ছিল দীর্ঘ, নখগুলো ধারালো, কালো। আমার মনে হলো আমার শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। আমি চাইলেও নড়তে পারছি না। সে ধীরে ধীরে তার হাতটা আমার বুকের কাছে নিয়ে এল। আমি অনুভব করতে পারলাম তার আঙুলের শীতলতা। আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই, হঠাৎ অফিসের মেইন গেটটা খুলে গেল। নাইট গার্ড দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা টর্চ। “স্যার? আপনি এখানে?” আমি ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, করিডোরটা পুরো ফাঁকা। কেউ নেই। শুধু একটা পোড়া গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পরের দিন আমি আর অফিসে যাইনি। চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু সেই রাতের ঘটনাটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। সেই মেয়েটার মুখ, তার সেই পোড়া চামড়া, তার সেই শূন্য চোখ… আজও রাতে ঘুমোতে গেলে আমার কানে ভেসে আসে তার সেই আওয়াজ: “অতনু… এসো…” আমি জানি, সে এখনও সেই অফিসে আছে। আর কোনো এক রাতে, অন্য কাউকে সে ডাকবে। অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করছে সে…