Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

অদৃশ্য যুদ্ধ ( সিজন 1 )


                                          (১)

আশিবছর আগে 


স্থান: পোখন্নাচাপ, বাঁকুড়া 

সময়: শেষ রাত


বারোটার পর থেকে বৃষ্টিটা শুরু হয়েছে। প্রথমে টিপ টিপ তারপর মুষলধারায়। 

ক্রমাগত হয়ে যাবার পর এই শেষ রাতে বৃষ্টিটা থেমে এসেছে। এখন পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।

বৃষ্টির অস্তিত্ব ছাপিয়ে ভেসে আসছে একটা পায়ের শব্দ।

সামনে একটা কাঠের ভাঙাচোরা বাড়ি। দরজা খোলা।

পায়ের শব্দ খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

আগন্তুক চারপাশ সাবধানে দেখে নিলেন। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

আধঘন্টা কেটে গেল। এবার দরজায় ধাক্কানোর শব্দ হচ্ছে।

আগন্তুক দরজা খুলে দেখতে পেলেন দুটো কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। দেরি না করে তিনি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন।

কিছুটা যেতেই একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিছু একটা পড়ে আছে। আগন্তুক দেখলেন ঝুড়িতে একটা সদ্যোজাত শিশু।

শিশুটাকে তিনি চিনতে পারলেন। ঝুড়িসমেত তাকে তুলে নিয়ে এলেন ঘরে।


দুদিন পর 


এখন রাত। আগন্তুকের সামনে বসে আছেন এক বয়স্কা মহিলা। মহিলাটি তাঁরই বয়সী।

বৃদ্ধা বললেন," একটা তোমার নাতনি আরেকটা আমার। আমরা দুজনে মিলে ওদের দেখব। "

আগন্তুক বৃদ্ধ বললেন," তুমি একজনকে নিয়ে অন্যত্র চলে যাও। "

" সেজন্যই তো এসেছি। "


                                    (২)

৭০ বছর আগে

স্থান: আরিশাল, মেদিনীপুর

সময়: সকাল 


হৈমবতী সকালে উঠে দেখল তার দিদিমা বেঁচে নেই। সে কান্নাকাটি করল না। বিষয়টাকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখল। তার বয়স দশ।

সংসারে আপন বলতে দিদিমাই ছিলেন। কালের নিয়মে তিনি মারা গেলেন। এখন হৈমবতীকে একাই যা করার করতে হবে।


দুদিন পর


পাড়ার মাসির বাড়িতে গিয়েছিল হৈমবতী। সেখানে গিয়ে শুনল তার সেই দাদু মারা গেছেন।

মুহূর্তে তার মনে পরল বোনের কথা যাকে সে আজ অবধি দেখেনি। আসলে দিদিমা তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মারা যাওয়ার আগে কোনওদিন বোনের মুখোমুখি হবি না। তাহলে বিপদে পড়বি।

মারা যাওয়ার আগে দিদিমা তাকে অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেন যা তার অবর্তমানে কাজে লাগবে।

হৈমবতী ভাবল এখন সেই শিক্ষা কাজে লাগাতে হবে। 


                                          (৩)


৭০ বছর আগে

স্থান: পোখন্নাচাপ, বাঁকুড়া 

সময়: সন্ধ্যা


কল্লোলিনী কান্নাকাটি করছে। দাদু মারা গেছেন। এই দাদুই ছিল তার সব।

দাদু তাকে খুবই ভালবাসতেন। এমন কিছু শিক্ষা তাকে দিয়ে গেছেন যা তার ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে। তাই একা থাকলেও কল্লোলিনীর কোনও সমস্যা হবে না।

পাড়ার লোকজন আছে। বাড়িতে আছে একটা কুকুর আর একটা বেড়াল।

কল্লোলিনীর মনে পরল তার সেই বোনের কথা যাকে আজ পর্যন্ত সে দেখেনি। মারা যাওয়ার আগে দাদু বলে গিয়েছিলেন কোনওদিন ওর মুখোমুখি হবে না তাহলে বিপদে পড়বি।

এই পৃথিবীতে  একা আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও সে ভীত নয়। এক্ষেত্রে তার পাথেয় দাদুর শিক্ষা।


                                   (৪)


৬০ বছর আগে


স্থান: বানীনগর, মুর্শিদাবাদ 

সময়: সন্ধ্যা 


জমিদার বাড়ির ভেতর থেকে সংগীত ভেসে আসছে। 

মেহফিল বসেছে।

এই বাড়ির পূর্বপুরুষ ছিলেন আভিজাত্যেন্দ্র দাশমল্লিক।

সেই থেকে এই বাড়ির নাম দাশমল্লিক জমিদার-বাড়ি।

বর্তমানে এই বাড়িতে বসবাস করে চারটে পরিবার। আভিজাত্যর দুই নাতি অলোকেন্দ্র আর বিজয়েন্দ্র।

তাদের পরিবার এবং আভিজাত্যেন্দ্রর বৌমা নিশিবালা।

আর আছে কাজের লোক তাদের ফ্যামিলি নিয়ে।

অলোকেন্দ্র তাঁতের ব্যবসা করেন। আর বিজয়েন্দ্র পাটের।

কিন্তু এই দুই ব্যবসায়ী দেখেন এই বাড়ির ম্যানেজার হরিসাধন দে। বয়সে যুবক দেখলে মনে হয় কিন্তু এখন পঞ্চাশ চলছে।

গান-বাজনা ছাড়াও জাদু দেখানো হবে। তাই জাদুকরের বরাত দেওয়া হয়েছে। বৃদ্ধ জাদুকর।

তিনি এখনও পর্যন্ত এসে পৌঁছাননি।

ম্যানেজারবাবু তাঁর অধস্থন কর্মীকে বকাবকি করছেন," তোমাদের কোন কান্ডজ্ঞান নেই। এখনও এলো না কেন ?  "

" এসে যাবেন কোন চিন্তা করবেন না। লোক আনতে গেছে," হাতজোড়  করে বললেন সেই কর্মী।

" আর কখন আসবে  ? অনুষ্ঠান শেষ হলে ? "

" আমি দেখছি। "

" বাবুর কাছে আমি মুখ দেখাতে পারছি না। জলদি যাও কিছু একটা ব্যবস্থা কর। ওই জাদুকরকে পাওয়া না গেলে অন্য জাদুকরকে নিয়ে এস। "

কিছুসময় পর ম্যানেজারবাবু জানতে পারলেন বৃদ্ধ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই আসতে পারছেন না।

এখন কি হবে ? ম্যানেজারবাবু ভয়ে কেঁপে উঠলেন। তাঁর চাকরিটা থাকবে তো ?

এবার সেই কর্মী বললেন," একটা মেয়ে এসেছে। সে বলছে জাদু দেখাবে। "

ম্যানেজারবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন," এই বাড়ির রীতি হচ্ছে ওই বৃদ্ধ জাদুকরকে দিয়েই অনুষ্ঠান করানো। তার মধ্যে আবার মেয়ে। এখানে মহিলা জাদুকর নিষিদ্ধ। "

" ওই মেয়েটাকে যদি আমরা ছেলে সাজিয়ে নিই ? "

" কথাটা তো মন্দ বলোনি হে। কিছু একটা করতেই হবে। উপায় নেই খুব সাবধানে করবে যেন জমিদারবাবুরা বুঝতে না পারে। "

" আপনি এই দায়িত্বটা আমার উপর ছেড়ে দিন।"


আরও কিছুক্ষণ কেটে গেল। যে জাদুকর ঘরে ঢুকলেন তিনি বয়সে যুবক।

হরিসাধন দে জিজ্ঞেস করলেন," আপনার নাম কি? বাড়ি কোথায় ? আগে কখনও জাদু দেখিয়েছেন ? "

" বাড়ি আরিশাল, মেদিনীপুর। নাম হৈমবতী। না, আগে কখনও জাদু দেখাইনি। আপনাদের এখানেই প্রথম ," হৈমবতী সত্য কথাই বলল।

" ইস একেবারে নতুন। আপনি পারবেন তো ? "

" আমাকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন। না পারলে আর ডাকবেন না কোনওদিন। "

" ঠিক আছে ঠিক আছে। তবে নিজের পরিচয় জমিদারবাবুদের সামনে দেবেন না। "

" ম্যানেজারবাবু আমাকে সবই বলেছেন। আমি নিজের পরিচয় কখনোই দেব না। "

" তাহলে শুরু করে দাও এস। "

হৈমবতী ঘরে ঢুকতেই ডানদিকের টেবিলে তিনটে পুতুল দেখতে পেলেন।

তাঁর মাথা চক্কর খেতে লাগলো। চোখ বন্ধ হয়ে এলো। সেই অবস্থায় তিনি দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য -- অলোকেন্দ্র আর বিজয়েন্দ্রর সামনে যে বাঈজি নাচছে সে  এবং তার সঙ্গীসাথীরা সবাই অশরীরী অর্থাৎ ভূত।

হৈমবতী এটাও শুনতে পারলো একটু দূরে তিনটে পুতুলের একটা বলে উঠলো," আজ তোমার পরীক্ষা। কেমন জাদু তুমি জান শিখেছো সেটা প্রমাণিত হবে। "

আরেকটা পুতুল বলে উঠলো," আমরা তোমার সঙ্গে আছি। কোন ভয় নেই কেউ বিপদে ফেলতে পারবে না তোমাকে। "

শেষ পুতুল বলে উঠলো," ওরা জানেনা তোমার পরিচয়। তাই তুমি কাজ শুরু করে দাও। আজ সফল হলে তোমার ভবিষ্যৎ বদলে যাবে। "

হৈমবতী জিজ্ঞেস করল," কিভাবে কাজটা করব ? "

এবার তিনটে পুতুল একসঙ্গে বলে উঠলো," চোখ। নিজের চোখ কাজে লাগাও যা তুমি শিখেছ। "

" চেষ্টা করছি। তার আগে বলো এখানে কি কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে ? "

" এইতো তুমি শুরু করে দিয়েছ। দেখছি সবই জান," একটা পুতুল বলল। 

" এবার বল সেই দুর্ঘটনাটা কি ? ", আরেকটা পুতুল জিজ্ঞেস করল। 

" দুজন জমিদারের একজন পঙ্গু হবে আরেকজন মারা যাবে," হৈমবতী বললেন। 

" তৃতীয় পুতুল বলল," একদম ঠিক বলেছ। তোমার কাজ হবে ভূতেদের এখান থেকে বের করে দেওয়া তাহলেই এইসব এড়ানো যাবে। "

" ঠিক আছে আমি তাই করব। "

হৈমবতী এবার দুচোখ বন্ধ করলেন। তারপর কিছু সময় পর খুললেন। এক চোখের ভেতর কিছুই নই শুধু অন্ধকার আরেক চোখে ক্ষুদ্র পাথর। 

হৈমবতী এবার দেখতে পেলেন গানবাজনা বন্ধ করে ভূতের দল দুই জমিদারের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। 

তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন," সাবধান। "

ভূতেদের দল পিছু ফিরে চাইলো আর হৈমবতীকে দেখতে পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ল।

তারা এবার হৈমবতীর উদ্দেশ্যে ছুটে আসলো কিন্তু তার আগেই  দুই চোখ দিয়ে পাথর এবং ধোঁয়া তাদের গ্রাস করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ভূতের দল যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। 

কিছুসময় কেটে গেল।

এবার দুই জমিদারবাবু হাততালি দিয়ে উঠলেন।

অলোকেন্দ্র বলে উঠলেন," দারুন। এমন জাদু আমরা আগে দেখিনি। আপনি দেখছি দুর্দান্ত জাদুকর। কি নাম আপনার ? "

" হৈমবতী। "

" আপনি পুরুষ নন ? ," বিজয়েন্দ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। 

" না। "

" ঠিক আছে। আজ থেকে আপনি এখানেই থাকবেন। আমাদের তো চারপাশে শত্রু। আপনি থাকলে ভরসা পাব," অলোকেন্দ্র বললেন। 

" আপনার বাড়িতে আর কে আছে ? ," বিজয়েন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন। 

" দিদিমা ছিলেন তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। আমি একা। "

" আপনি আমাদের এখানেই থাকবেন। আলাদা ব্যবস্থা করে দেব," অলোকেন্দ্র বললেন।

" ম্যানেজারবাবু, ওনার ঘর দেখিয়ে দিন," বিজয়েন্দ্র বললেন। 

হরিসাধনবাবু হৈমবতীকে ঘর দেখাতে নিয়ে গেলেন। পথে বললেন," নিজের পরিচয় দিলেন কেন ? খুব জোর বাঁচা বেঁচে গেছি। ভালো জাদু দেখিয়েছেন না হলে আমার চাকরি চলে যেত। "

হৈমবতী বললেন," আমার কিন্তু কিছু শর্ত আছে। "

" আপনার সব শর্তই মানা হবে। "


ঘর দেখে হৈমবতীর ভালো লাগলো।

ম্যানেজারবাবু চলে যাবার পর তিনি অনুভব করলেন যতটা সহজ ভেবেছিলেন জাদু দেখাতে গিয়ে ঠিক ততটা মসৃণ নয় পথ। নেপথ্যে এক প্রতিদ্বন্দী আছে। তার থেকে সাবধানে থাকতে হবে। 


                                  ______________

©SHIB SANKAR MAITRA