Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 29

আরশ খান মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জঙ্গলের বাতাসও যেন থেমে গেছে। শুধু শোনা যাচ্ছে ছোট্ট আযলানের কান্না—ভাঙা, আতঙ্কে কাঁপা সেই কান্না অন্ধকারের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

আরশ খানের কোম্পানি ইভান’স গ্রুপের যে কয়েকজন কর্মচারী বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, তারা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি। সামনে যা ঘটছে, তা যেন কোনো দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তারা বুঝে গেল—পরিস্থিতি খুব ভয়ংকর।
লোকগুলো যারা মাটির গর্ত খুঁড়ছিল, তারা দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের চোখে তখন আতঙ্ক আর সন্দেহ। তারা বুঝে গেছে—এই ঘটনাটা কেউ দেখে ফেলেছে।

ইভান’স গ্রুপের সেই কর্মচারীরা তাড়াতাড়ি একটা বড় গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তাদের বুক ধড়ফড় করছে। কেউই কথা বলছে না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
তাদের চোখের সামনে পড়ে আছে তাদের বস—আরশ খান। রক্তে ভেজা মাটিতে নিথর।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ছোট্ট আযলান।

কর্মচারীদের একজন ফিসফিস করে বলল—
“আমরা যদি এখন বের হই… আমাদেরও মেরে ফেলবে।”

আরেকজন দাঁত চেপে বলল—
“কিন্তু ইভান কে ওদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”
ওরা অপেক্ষা করতে লাগল।

অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময় লোকটা কয়েক মিনিট ধরে চারপাশে তাকাল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—
“সব জায়গা চেক করো। কেউ যেন পালাতে না পারে।”

তার লোকগুলো দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ জঙ্গলের ভেতর ঢুকল।
কেউ প্রাসাদের দেয়ালের দিকে গেল।
কেউ আবার মাটির গর্তটা ঢেকে ফেলতে শুরু করল।

এই সুযোগটাই অপেক্ষা করছিল ইভান’স গ্রুপের কর্মচারীরা।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক একজন ধীরে ধীরে বলল—
“এখনই সুযোগ… এখন না হলে আর পারবো না।”

তারা নিঃশব্দে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
ছোট্ট আযলান তখনও কাঁদছে। তার চোখ লাল হয়ে গেছে। সে বুঝতেই পারছে না কী হচ্ছে।
একজন কর্মচারী দ্রুত তার কাছে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে আলতো করে তাকে কোলে তুলে নিল।
“চুপ… কিছু বলবে না… আমরা আছি।”

আযলান ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আরেকজন দ্রুত চারপাশে তাকাল। দূরে টর্চের আলো দেখা যাচ্ছে—লোকগুলো এখনো খুঁজছে।
“চলো! দ্রুত!”

তারা জঙ্গলের ভেতরের অন্ধকার পথে ঢুকে পড়ল।গাছের ডাল, শুকনো পাতা আর কাঁটা তাদের পথ আটকে দিচ্ছিল। তবুও তারা থামল না।পেছন থেকে ভেসে আসছে লোকগুলোর চিৎকার—

“ওদিকে দেখো!”
“জঙ্গলের দিকে গেছে!”

কিন্তু জঙ্গলটা এত বড় আর অন্ধকার ছিল যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কর্মচারীরা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল।ছোট্ট আযলান তখন সেই কর্মচারীর বুকে মুখ গুঁজে আছে। তার চোখে এখনো আতঙ্ক।

সে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“আব্বু… কোথায়…?”

কেউ উত্তর দিতে পারল না।
শুধু একজন ধীরে ধীরে বলল—
“তোমাকে বাঁচাতেই হবে… যেকোনো মূল্যে।”

তারা দৌড়াতে লাগল।
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা জঙ্গলের গভীর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

--------------------

ওদিকে প্রাসাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো অনেকক্ষণ ধরে খুঁজতে লাগল।জঙ্গলের প্রতিটা দিক তারা তল্লাশি করল।টর্চের আলো ঘুরে বেড়াল গাছের ফাঁকে ফাঁকে।
কিন্তু—
কোনো চিহ্ন নেই।কোনো শব্দ নেই।ছোট্ট আযলান যেন অন্ধকারের ভেতর হাওয়ার মতো উধাও হয়ে গেছে।
রাগে সেই রহস্যময় লোকটার চোখ লাল হয়ে উঠল।

সে দাঁত চেপে বলল—
“একটা বাচ্চা… আর কয়েকটা লোক… তোমরা খুঁজে বের করতে পারছো না?”

তার একজন লোক ভয়ে মাথা নিচু করে বলল—
“স্যার… জঙ্গলটা খুব বড়… হয়তো অনেক দূরে চলে গেছে…”

লোকটা রাগে একটা গাছের গায়ে ঘুষি মারল।
“ওরা পালাতে পারবে না। খুঁজে বের করো!”
কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজার পরও তারা কিছুই পেল না।
শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকার সবকিছু ঢেকে দিল।
আর সেই রাতের সাথে সাথে হারিয়ে গেল ছোট্ট আযলান।

----------------------

কিন্তু সেই রাতই ছিল এক নতুন গল্পের শুরু।একটা শিশুর জীবনে শুরু হলো অন্ধকার আর প্রতিশোধের পথ।
বছরের পর বছর কেটে গেল।ছোট্ট আযলান বড় হতে লাগল।
তার চোখে ধীরে ধীরে জমতে লাগল আগুন।
তার মনে গেঁথে গেল সেই রাতের স্মৃতি—রক্তে ভেজা মাটি…
তার বাবার নিথর দেহ…আর সেই মানুষের নিষ্ঠুর হাসি…

সে ভুলেনি।সে কখনো ভুলবে না।
সেই রাতের পর থেকেই শুরু হলো এক নিঃশব্দ যুদ্ধ।
একদিকে—
আযলান খান।
আর অন্যদিকে—
ইভান।
এই লড়াই শুধু ব্যবসার নয়।এটা প্রতিশোধের লড়াই।
এটা রক্তের হিসাব মেটানোর লড়াই।আর একদিন—
এই লড়াই পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেবে। 

---------------------

বর্তমান…

প্রাসাদের ভেতরের সেই বিশাল হলঘরটা এখন অন্ধকারে ডুবে আছে। দেয়ালের পুরোনো ঝাড়বাতিটা ভাঙা অবস্থায় ঝুলছে, আর জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো মেঝের ওপর পড়ে একটা অদ্ভুত, ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই প্রাসাদ এক সময় হাসি-আনন্দে ভরা ছিল। কিন্তু এখন এখানে শুধু নীরবতা… আর লুকিয়ে আছে অসংখ্য গোপন সত্য।

ঘরের মাঝখানে তিনজন মানুষ চেয়ারের সাথে শক্ত করে বাঁধা। তাদের হাত-পা মোটা দড়ি দিয়ে এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে যে নড়ারও উপায় নেই।তাদের মুখও কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল।তিনজনের চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। চোখগুলো লাল হয়ে গেছে—ভয়, ক্লান্তি আর অনিদ্রার কারণে।

কারণ আজ এক সপ্তাহ ধরে তারা এই প্রাসাদের ভেতর বন্দি।
এক সপ্তাহ ধরে তারা শুধু একটা জিনিসই দেখেছে—
আযলান খান ইভান।

হলঘরের অন্ধকারের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ছায়া নড়ল।
তারপর সেই ছায়া সামনে এগিয়ে এল।কালো পোশাক পরা একটা লম্বা মানুষ।চোখে ঠান্ডা, ভয়ংকর শান্তি।সে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।
সে—
আযলান খান ইভান।

তার ঠোঁটে খুব ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই।শুধু আছে নিষ্ঠুরতা।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্রথম লোকটার মুখের কাপড়টা খুলে দিল।লোকটা সঙ্গে সঙ্গে হাঁফ ছেড়ে শ্বাস নিল।

তারপর ভয়ে কাঁপা গলায় বলল—
“প্লিজ… আমাদের ছেড়ে দিন… আমরা কিছু করিনি…”

দ্বিতীয় লোকটা প্রায় কেঁদে ফেলল—
“আমাদের ভুল হয়ে গেছে… আমরা শুধু আদেশ মেনে চলেছিলাম…”

তৃতীয় লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“আমরা শুধু কাজ করতাম… আমাদের মেরে ফেলবেন না…”

তাদের কথা শুনে আযলান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল।তার জুতোর শব্দ ফাঁকা হলঘরে প্রতিধ্বনি তুলছে।

সে একটা টেবিলের কাছে গিয়ে থামল।টেবিলের ওপর একটা কাঁচের বোতল রাখা।বোতলের ভেতর স্বচ্ছ কিন্তু ভয়ংকর এক তরল।আযলান বোতলটা হাতে তুলে নিল।তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এল তাদের সামনে।বোতলের লেবেলে লেখা—
Sulfuric Acid (সালফিউরিক অ্যাসিড)
একটা অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষয়কারী অ্যাসিড।

তিনজন লোক বোতলটা দেখেই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
“না! না! প্লিজ না!”

একজন কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“আমাদের মেরে ফেলবেন না… আমরা সব বলে দেবো…”

আযলান থেমে গেল।তার চোখে অদ্ভুত এক ঝলক দেখা গেল।
সে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল—
“সব?”

লোকটা দ্রুত মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ… সব বলবো… শুধু আমাদের বাঁচিয়ে দিন…”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর আযলান খুব ধীরে হাসল।
সেই হাসি দেখে তিনজনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।আযলান ধীরে ধীরে বলল—
“পনেরো বছর আগে…এই প্রাসাদের পেছনে একটা রাত ছিল…”

তার চোখ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে উঠল।
“একটা ছোট ছেলে কাঁদছিল…আর তার বাবাকে মেরে ফেলা হচ্ছিল…”

তিনজন লোক হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।তারা যেন বুঝতে শুরু করেছে—কেন তারা এখানে।

আযলান বোতলের ঢাকনা খুলল।ঘরের ভেতর একটা তীব্র রাসায়নিক গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

তিনজন একসাথে চিৎকার করে উঠল—
“না! না! প্লিজ!”

কিন্তু আযলান থামল না।সে ধীরে ধীরে বোতলটা তুলল।
তারপর প্রথম লোকটার মাথার ওপর একটু একটু করে ঢালতে লাগল।

মুহূর্তের মধ্যে লোকটা ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল।
অ্যাসিড তার চুল আর ত্বকের ওপর পড়তেই ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া শুরু হলো।

সে চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় ছটফট করতে লাগল।বাকি দুজন আতঙ্কে কাঁদতে লাগল।ঘরের ভেতর শুধু আর্তনাদ আর আতঙ্কের শব্দ।

আযলান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার চোখে কোনো দয়া নেই।সে ধীরে ধীরে দ্বিতীয় লোকটার দিকেও বোতলটা ঘুরিয়ে দিল।

লোকটা পাগলের মতো মাথা নাড়তে লাগল।
“না! না! দয়া করুন!”

কিন্তু আযলান যেন কিছুই শুনছে না।আরেক ফোঁটা তরল পড়ল।আবার ভয়ংকর চিৎকার।তাদের শরীরের কিছু অংশ ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে।

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে সেই ভয়ংকর চিৎকারে।
আর এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আযলান।

তার মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে একটা হাসি।সেই হাসিতে আনন্দ নেই।আছে প্রতিশোধের তৃপ্তি।তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে।

সে খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“এটা শুধু শুরু…”

তারপর সে আকাশের দিকে তাকাল।তার কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়—“বাবা…
তোমার জন্য…এই হিসাব এখনো শেষ হয়নি।”
প্রাসাদের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে শুরু হয়ে গেছে—আযলান খানের প্রতিশোধের যুদ্ধ।

Happy Reading☺
To Be Continue😅