Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ছায়াপ্রাণ - Season - 1


                                      (১)


৯০ বছর আগে

স্থান: গ্রাদারা, ইতালি                    সময়: গভীর রাত 


গ্রামের মানুষজন ঘুমিয়ে আছে। সমস্ত প্রাণীরাও ঘুমের দেশে। 

জ্যোৎস্নার নরম সুন্দর আলোয় গ্রামটাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। আজকের রাতটা সত্যিই খুব সুন্দর।

একটা বিড়াল হাই তুলল। তার চোখ গেল একটা ছায়ামূর্তির দিকে। একজন অস্পষ্ট ব্যক্তি যার গায়ে জড়ানো লম্বা মোটা কাপড়। কিন্তু চাঁদের আলোয় বোঝা যাচ্ছে কাপড়টা সভ্য জগতের নয়। 

বিড়ালটা সেটা বুঝতে পেরেই ডেকে উঠল। 

ছায়ামূর্তি তার দিকে ঘুরে তাকাল। এবার তাঁর বামহাতে একটা সুন্দর কারুকাজ করা বাক্স দেখা গেল। 

ছায়ামূর্তি ডানহাতের মুঠো খুললেন। আসলে যাকে হাত বলা হচ্ছে সেটাও অস্পষ্ট।

বিড়ালটার দিকে খুব দ্রুত কিছু একটা ছুটে গেল। আর তার প্রভাবে সে ছায়ামূর্তিতে পরিণত হল।

নির্বিঘ্নে হেঁটে চলল। কিছুটা দূর যাবার পর সে পুনরায় বিড়ালে পরিণত হল।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে ছায়ামূর্তি হাসলেন। একেবারে স্পষ্ট হাসি। 

তারপর পা চালিয়ে গ্রামের আরও ভেতরে চলে গেলেন।


                                      (২)

৩০ বছর আগে

স্থান: দেলমা, হাইতি                         সময়: দুপুর


রান্তোন ফিশো পেশায় রেস্তোরাঁর শেফ। ছবছর হল কাজ করছেন একই কোম্পানিতে।

কোম্পানির নাম " মুভিঙ কিচেন "। এটি একটা রেস্তোরাঁ চেইন। সারাদেশে এর  চারটি শাখা।

মালিক অরট্রেম্প সিয়েন। মাঝবয়সী ব্যক্তি। ফিশোও মাঝবয়সী।

অরট্রেম্প পিতার মৃত্যুর পর ৬ বছর আগে এই রেস্তরাঁ কোম্পানির মালিক হয়েছেন ।

এই সময় কাস্টমার ভর্তি থাকে। আজকেও আছে ।

কর্মচারীরা কাস্টমারদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। এই সময় এক মাঝবয়সী মহিলা খেতে খেতে অবাক হলেন।

তাদের ডানপাশে আরেকটি পরিবার খেতে বসেছে। সেই পরিবারের একটি টিনএজ ছেলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চুপচাপ বসে আছে। আর বারবার মাথা নাড়ছে। 

সেই পরিবারের কর্তা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন," কিরে তোর কি হয়েছে ? "

ছেলেটা বলল," ঠিকমতো খেতে পারলাম না। "

" এইতো খেলি," ছেলেটার মা বললেন। 

" ভুল করছ। আমার একদম পেট ভরেনি। "

" সেটা বল। তাহলে আর যা যা খাবার খা," ছেলেটার বাবা বললেন।

এইবার ছেলেটা ডানহাত নাড়িয়ে সেই মাঝবয়সিনী ভদ্রমহিলার দিকে দেখিয়ে বললেন," আমার সব খাবার উনি খেয়ে নিয়েছেন। "

মাঝবয়সিনী কাস্টমার হাসলেন। তারপর বললেন," আমি এখানে বসে আছি। আর তোমার খাবার খেয়ে ফেললাম কি করে ? "

ছেলেটা এবার মৃদু প্রতিবাদ করে বলল," আমি দেখেছি আপনি খেয়েছেন। "

ছেলেটার বাবা বললেন," তুই চুপ কর। উনি তোর খাবার খেতে যাবেন কেন ? উনি তো অন্য টেবিলে বসে আছেন। "

ছেলেটা ফের বলল," আমি অবশ্যই দেখেছি। উনি আমার খাবার খেয়ে নিয়েছেন। "

ছেলেটার মা বললেন," মার খাবি ভুলভাল কথা বলছিস। "

ছেলেটা এবার গলা চড়ালো," আমি নিজের চোখে যা দেখলাম সেটাই এখন আমাকে অবিশ্বাস করতে হবে ? "

এবার রেস্তোরাঁর ম্যানেজার ছুটে এলেন এবং বিনীতভাবে বললে," কি হয়েছে ? দয়া করে আস্তে কথা বলুন। "

ছেলেটা এবার স্বাভাবিক কন্ঠে বলল," ওই ভদ্রমহিলা আমার সব খাবার কেড়ে নিয়েছে। "

এবার মাঝবয়সিনী কেটে কেটে বললেন," আপনাদের রেস্তোরাঁ যে এত খারাপ আমার জানা ছিল না। আগে জানলে এখানে খেতে আসতাম না। আপনারা বুঝি কাস্টমারকে অপমান করার জন্যই লোক নিয়োগ করেন তাই তো ? "

ম্যানেজার ফের ভীষণ নম্রভাবে বললেন," কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম আপনার ধারণা ভুল। কিছু একটা ভুল হচ্ছে। "

" আমি এখানে বসে আছি, নিজের খাবার খাচ্ছি আর আমাকে বলা হচ্ছে আমি অন্যের খাবার খেয়ে নিচ্ছি। এটা কিভাবে সম্ভব ? "

ম্যানেজার কিছু বলার আগেই সেই ছেলেটা ফের বলল," আমি নিজে দেখেছি। "

এবার মাঝবয়সিনী বললেন," কোনও প্রমাণ আছে ? "

ম্যানেজার বললেন," সিসিটিভিতে দেখছি। "

মাঝবয়সিনী বললেন,"  দেখুন। "

ম্যানেজার বললেন," আপনারা আসুন। "

ছেলেটা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে উঠে পড়ল। মাঝবয়সিনী সিসিটিভির ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।


আরও কিছুক্ষণ পর 

এবার মাঝবয়সিনী বললেন," আমাকে হেনস্থা করার জন্য এবার তাহলে আমি আদালতের দারস্থ হতে পারি নিশ্চয়ই ? "

ছেলেটা বলল," কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম আপনি উঠে এসে আমার খাবার তুলে নিলেন। "

ছেলেটার মা এবার ছেলেটাকে একটা থাপ্পড় কষিয়ে বললেন," তুই থাম। "

ছেলেটার বাবা হাতজোড় করে মাঝবয়সিনীর কাছে ক্ষমা চাইলেন," মামলা মোকদ্দমায় যাবেন না। আপনার হেনস্থা দাম আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কথা দিচ্ছি ভবিষ্যতে এরকম আর হবে না। "

" আপনার ছেলে অসুস্থ। ওকে কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে দেখান," মাঝবয়সিনী বললেন।

" দেখাব দেখাব," ছেলেটার মা বললেন।


                                     (৩)

৯০ বছর আগে

 স্থান: কাদাকেস, স্পেন                সময়: রাত


চন্দ্রালোকিত রাত।। টিপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে ।

গ্রামের একদম শেষে একটা কাঠের ছোটখাটো বাড়ি। 

বাড়িটার বয়স অনেক, কাঠগুলো প্রায় খুলে এসেছে।

জোড়াতাপ্পি মারা বন্ধ দরজা। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। 

রাত ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতরর দিকে এগোচ্ছে।

একটা শব্দ হল। কেউ যেন দৌড়ে আসছে।

একটা ইঁদুর। লাফাতে লাফাতে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজার কাছে এসে সে থমকে দাঁড়াল। কিছু একটা অনুভব করছে। হতে পারে সেটা গন্ধ অথবা অন্য কিছু। 

এইসময় কাছেপিঠে একটা বাজ পড়ল।

ভয় পেয়ে ইঁদুরটা দরজার ফাঁকা অংশ দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

ঘরে ঢুকে ইঁদুরটা চোখ মেলতেই সামনে দেখতে পেল জমাট বাঁধা অন্ধকার।

ঘরে বিশেষ কিছু নেই। শুধু ভাঙাচোরা টেবিল চেয়ার আর একটা আয়না। আয়নার কাঁচ গাঢ় হলুদ।

টেবিলের ওপর অসংখ্য কাপড়ের টুকরো দিয়ে তাপ্পি মারা জামাপ্যান্ট, মাথার একটা টুপি লম্বালম্বি করে রাখা।

আছে একটা ধূমপানের পাইপ। ঘরে আর কেউ নেই।

আবার বাইরে বাজ পড়ল।

এবার ইঁদুরটা লাফ দিয়ে টেবিলের উপর উঠল। আয়নার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতেই সে একটা মানুষকে দেখতে পেল। মানুষটা যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 

টেবিলের ঠিক পাশেই আয়না। ইঁদুরটা এবার লাফ দিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আয়নাটা কেঁপে উঠল।

ইঁদুরটা দেখল আয়নায় সেই মানুষটা নেই। সে অবাক হল। পিছু ফিরতে যাবে কিন্তু একটা হাত তার লেজ ধরে ফেলেছে ততক্ষণে। ইঁদুরটা ঘুরে দেখল আয়নায় দেখা সেই মানুষটা তাপ্পি মারা জামাপ্যান্ট , টুপি পড়ে তার লেজ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড তারপরেই ইঁদুরটা নিজেকে আবিষ্কার করল মেঝেতে। ঘর ঠিক আগের মতই। 

বাইরে আবার বাজ পড়ল। ইঁদুরটা আর ঘরে থাকল না। ভাঙা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।


                                      (৪)


৩০ বছর আগে 


স্থান: তাকুবা, এল সালভাদর 

সময়: দুপুর 


খোলা মাঠের মধ্যে একটা প্রদর্শনী চলছে। দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডেনারিও পুঞ্চি আয়োজন করেছেন এই প্রদর্শনীর। এককভাবে। 

এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে বিভিন্ন আকারের প্রাচীন মহামূল্যবান আয়না। 

পুঞ্চি পেশায় কাঁচ-ব্যবসায়ী। দেশের বাইরে তাঁর মালপত্র যায়।

বাছাই করা আয়নাগুলো নিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এখন একটা বাজে। আরেকটু পরেই লাঞ্চ টাইম।

প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী সবাই ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসায়ী। স্পষ্ট করে বললে কাঁচ ব্যবসায়ী।


একমাস আগে 


সকাল আটটা। পুঞ্চির বাড়িতে দুজন বিদেশি অতিথি এসেছেন। একজন হাইতির রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী অরট্রেম্প সিয়েন, আরেকজন তাঁর বন্ধু ফ্রান্সের বুলতোয়া ম্রাসা। এই বন্ধুর সঙ্গে পুঞ্চির ব্যবসায়িক সম্পর্ক।

ম্রাসা বললেন," সিয়েনের কাছ থেকে ঘটনাটা শুনে আমার আশ্চর্য লেগেছে। তাই ওকে তোমার কাছে এনেছি। "

পুঞ্চি অরট্রেম্পকে বললেন," যা বলার বলুন। "

সিয়েন বিস্তারিতভাবে ঘটনাটা বললেন। 

পুঞ্চি শুনে বললেন," এরকম একটা ঘটনার কথা এখানেও শুনেছি। আপনার সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে এখানকার ঘটনাটায় সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য আয়নায় দেখা গেছে। ঘটনাটা ঘটেছে আমারই এক বন্ধুর গাড়ির শোরুমে। বন্ধুর শোরুমের একপাশে যে পুরনো আয়নাটা পড়েছিল সেটা খুবই প্রাচীন। বন্ধুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই আমি একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করব। সেখানে প্রাচীন আয়না থাকবে। দেখা যাক কি হয়। "


সেইসময় আরেকটা বাড়িতে 


অন্ধকার ঘর। একটা টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা পৃথিবী ঘুরছে। মাঝেমধ্যেই আগুন ছিটকে ছিটকে পড়ছে। 

টেবিলের সামনে একটা চেয়ার। টেবিলের ওপাশে আরেকটা চেয়ার। 

টেবিলের একপাশের চেয়ারে বসে আছে একটা ছায়ামূর্তি যার মুখ অদৃশ্য শুধু হাত আর শরীরের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। 

সেই ছায়ামূর্তি বলল," সেই ভদ্রমহিলাকে খুঁজে বের কর। "

টেবিলের ওপাশে আরেকটা চেয়ার থেকে ভেসে এলো কণ্ঠস্বর," উনি অসুস্থ হয়ে আছেন। শীঘ্রই যাব। "

এই চেয়ারে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

ছায়ামূর্তি বলল," বাক্সটাকে খুঁজে বের করতে হবে। ওটাই আসল। "

অদৃশ্য কন্ঠ বলল," সেটা পরের ব্যাপার। আগে এই কেসটা সমাধান করতে হবে। "

" এরপরের অ্যাটাক ভদ্রমহিলার ওপর হবে। অতএব সাবধান," ছায়ামূর্তি বলল।

" আমি দেখছি," অদৃশ্য কন্ঠ উত্তর দিল।


একমাস পর এখন 


লাঞ্চ হয়ে গেছে। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ। এখন চলছে আয়না গোছানোর পালা।

পুঞ্চি এগিয়ে এসে একজনকে বললেন," মিস্টার হরবিক্স, আপনার আয়নাটা আমাকে একবার দেখাবেন ? "

হরবিক্স উত্তর দিলেন," এতক্ষণ ধরে তো আপনি দেখলেন। "

" চলুন আরও একবার দেখি। "

দুজনে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানে ফুটে উঠল এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। 

এক অপরিচিত ভদ্রমহিলা বিছানায় শুয়ে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে তিনি অসুস্থ। একটা ইঁদুর বিছানার কাছে এসে দাঁতমুখ বের করল সঙ্গে সঙ্গে মহিলার ওপর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এলো। ইঁদুরটা এবার মুখ বন্ধ করল। ছায়াটা যেন তার দেহের সঙ্গে মিশে গেল। 

হঠাৎ আয়নার মধ্যে একটা বিস্ফোরণ। 

পুঞ্চি চিৎকার করে উঠলেন," সাবধান পালাতে যেন না পারে। "

মিস্টার হরবিক্স ততক্ষণে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

পড়ে আছে তারই পোশাক পরা একজন। একে আমরা ভালোভাবেই চিনি- বুলতোয়া ম্রাসা !

ম্রাসা জ্ঞান হারিয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।


          _________________________________

© SHIB SANKAR MAITRA