গাড়িটা বার তিনেক ঝাঁকুনি দিতে দিতে একটা পরিত্যক্ত শ্মশানের কাছে এসে বন্ধ হলো। অর্ণব অনেকবার গাড়িটা স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু প্রতিবার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে অর্ণবের চেষ্টা যে প্রতিবার বিফল হলো তার প্রমাণ দিলো । অর্ণব গাড়ি থেকে বেরিয়ে চারপাশটা দেখলো । রাস্তাঘাট পুরো শুনশান । আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলো না । শুধু এক জায়গায় রাস্তার এক কোনায় একটা স্ট্রিট লাইট জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল যেন সবাই এক নিমেষে কোথাও হারিয়ে গেছে ।
বিদ্যুতের ঝলকানি বুঝিয়ে দিলো যে এবার বৃষ্টি নামবে। দূরে অর্ণব একটা পুরনো জরাজীর্ণ বাড়ি দেখতে পেলো।
অর্ণব মনে মনে বলল , "এই শুনশান রাস্তায় একা একা দাঁড়িয়ে না থেকে ওই বাড়িটাতে গিয়ে কারোর থেকে সাহায্য চাওয়া এবং আজকের রাতের মতো আশ্রয় নেওয়া ঠিক হবে। তাছাড়া এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে।"
অর্ণব গাড়ি থেকে একটা টর্চ বার করে সেই শুনশান রাস্তার নিস্তব্ধতা ভেদ করে বাড়িটার দিকে এগিয়ে চললো ।
আশপাশের পরিবেশটা কেমন যেন গুমোট আর অস্বস্তিকর লাগছিলো অর্ণবের কাছে ।
দরজায় অর্ণব টক টক করে দুবার টোকা দেওয়ার শব্দ করলো কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে কোন উত্তর এলো না। সব নিশ্চুপ ।
অর্ণব দরজাটা একটু ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেলো । দরজাটা খুলতেই অর্ণবের নাকে একটা তীব্র পচা মাংসের গন্ধ যেনো সজোরে আছাড় মারলো । প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গেলও কৌতূহলের বশে বশীভূত হয়ে অর্ণব ঘরের ভেতরের দেওয়ালের চারপাশে টর্চের আলো দিয়ে দেখতে লাগলো । ঘরের ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। তখনই অর্ণবের চোখে পড়ল ঘরের প্রতিটা দেওয়ালে শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
হঠাৎ অর্ণবের মনে হলো , ওর পায়ের কাছে যেন কিছু একটা নড়াচড়া করছে। টর্চের আলো পায়ের কাছে পড়তেই অর্ণব চমকে উঠলো । পাশেই পড়ে আছে একটা আধ পচা লাশ আর সেই আধ পচা লাশটার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অসংখ্য সাদা সাদা পোকা। যেন পোকা গুলো অর্ণবের শরীরে উঠতে চায় । অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে দূরে সরে গেলো । অর্ণবের সারা শরীর যেন গুলিয়ে উঠলো । পচা মাংসের তীব্র গন্ধে অর্ণব আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সেখানে হড় হড় করে বমি করে ফেলল।
একটু নিজেকে সামলাতেই অর্ণব বুঝতে পারলো ওর কপালে ফোঁটা ফোঁটা থকথকে জেলির মত কি যেন একটা পড়ছে । অর্ণব কপালে হাত দিয়ে যখন টর্চের আলোয় দেখলো তখন ওর গা ঘিন ঘিন করে উঠলো,
ওটা আর কিছু নয় বহু দিনের জমে থাকা পুঁজ..... ।
সেই পুঁজ থেকে একটা তীব্র আঁশটে গন্ধ বের হচ্ছে । আর তাতে কি পোকা কিলবিল করছে।
টর্চের আলোয় অর্ণব ধীরে ধীরে উপরের দিকে মাথা তুলল । ছাদের সঙ্গে উল্টো হয়ে ঝুলছে একটা মেয়ে। মেয়েটার মুখের চামড়া ছিঁড়ে কান পর্যন্ত এসে ঝুলছে আর কালো লম্বা জিভ থেকে ঝরছে জমাট বাঁধা পুঁজ আর রক্ত।
মেয়েটার চোখ নেই বরঞ্চ সেই দুটো চোখের কোঠরে রয়েছে লকলকে অসংখ্য দানবীয় বিছে। টর্চের আলো পড়তেই সেই বিছে গুলো যেনো অর্ণবের দিকে হিংস্রভাবে তেড়ে আসার চেষ্টা করলো ।
অর্ণব কিছু বোঝার আগেই মেয়েটা লাফিয়ে নিচে নামলো। মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে অর্ণবের কাছে এগিয়ে আসতে লাগলো । অর্ণব পালানোর চেষ্টা করল কিন্তু মেঝেতে পড়ে থাকা সেই আধ-পচা মানুষটার লাশ থেকে বেরিয়ে আসা রক্তরসে পা পিছলে সজোরে মুখ থুবড়ে মেঝেতে পরলো।
অর্ণব যেনো একটা আর্তনাদ করে উঠলো । অর্ণব বুঝতে পারলো মেয়েটা এখন ওর অনেকটা কাছে চলে এসেছে। অর্ণব কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু বলতে পারল না আর বলতে পারবেই বা কি করে মুখ থুবড়ে পড়ার সময় দাঁতের চাপ লেগে অর্ণবের জিভটা কেটে খানিকটা দূরে মেঝের উপর পড়ে রয়েছে । নিজের কাটা জিভ দেখে অর্ণব যেনো কিছুক্ষণের জন্য বোবার মতো পড়ে রইল । তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে অর্ণব মেঝে থেকে ওঠার চেষ্টা করলো । আর ঠিক তখনই অর্ণব দেখতে পেলো ঘরের মেঝে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে অসংখ্য
পচা গলা কাটা হাত। সেই কাটা হাতগুলো অর্ণবের শরীরটাকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরলো যেনো সেখান থেকে হাজার চেষ্টা করেও অর্ণব কিছুতেই বেরোতে পারল না ।
অর্ণবের দৃষ্টি শক্তি যেনো কেমন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। সেই অস্পষ্ট চোখে অর্ণব দেখলো, এখন সেই মেয়েটা একদম ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর মেয়েটার হাতে রয়েছে মরচে ধরে যাওয়া অনেক দিনের পুরানো একটা বড়ো হাতুড়ি।
অর্ণবের বুকটা যেনো এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো। অর্ণব কিছু বলতে না পারলেও ওর শরীরের অভিব্যক্তি যেনো মেয়েটার কাছে হাত জোড় করে নিজের প্রাণভিক্ষা চাইছিলো কিন্তু মেয়েটার হিমশীতল পৈশাচিক হাসি যেনো অর্ণবের প্রাণ ভিক্ষার প্রার্থনাকে এক নিমেষে অস্বীকার করলো ।
মেয়েটা আর কিছু করার সুযোগ না দিয়ে সেই মরচে ধরে যাওয়া হাতুড়ি দিয়ে অর্ণবের মাথায় সজোরে আঘাত করলো। অর্ণবের মাথা ফেটে রক্ত বেরোতে লাগলো। অর্ণবের সমস্ত শরীর যেনো যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো ।
অর্ণবের যন্ত্রণা আর চিৎকার দেখে মেয়েটার হিমশীতল আর পৈশাচিক হাসি আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। মেয়েটা আবারও একবার সজোরে হাতুড়ি দিয়ে অর্ণবের মাথায় আঘাত করলো এবং এইভাবে বারংবার হাতুড়ি দিয়ে অর্ণবের মাথায় আঘাত করতে লাগলো যতক্ষণ না পর্যন্ত অর্ণবের মাথাটা সম্পূর্ণ রূপে থেঁতলে মেঝের সাথে মিশে না গেলো ।
কয়েকক্ষণ এমন দানবীয় ঘটনা চলার পর যখন মেয়েটা বুঝতে পারলো অর্ণবের শরীরটা সম্পূর্ণরূপে নিস্তেজ হয়ে গেছে তখন নিজে থেকেই মেয়েটার হাত থেকে হাতুড়িটা পড়ে গেলো আর অনেক দিনের ক্ষুধার্ত হিংস্র জন্তুর মতো অর্ণবের থেঁতলে যাওয়া মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত চেটে চেটে খেতে লাগলো।