Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী - 1

 

 PART -1       

সময়টা উনিশশো আশির দশকের কথা। ঋষড়ার প্রান্ত ঘেঁষে ছোট্ট এক টুকরো ভাড়া ঘরে। রবি,সুরভি আর তাদের ছেলে শিবরাজকে নিয়ে ছিল এক অভাবের, কিন্তু ভালোবাসায় মোড়া সংসার।

রবি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে হিসাবরক্ষকের কাজ করত। আয় ছিল সামান্য, কিন্তু সেই সামান্য টাকাতেই সে পরিবারটাকে হাসিখুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করত। সুরভি ছিল ঘরোয়া, কিন্তু ভীষণ বুদ্ধিমতী।

সুরভির বাবা ছিলেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। তাই ওষুধ ছাড়াও ঘরোয়া উপায়ে কীভাবে রোগ সারানো যায়,কোন পাতায় জ্বর সারে আর কোন শিকোড়ে বল বাড়ে, তা সুরভি ভালো করেই জানত। তাদের ভাড়া ঘরের এক পাশে একটুখানি ফাঁকা জায়গা ছিল। সুরভি সেখানে সবজি ফলাত।যাতে তার ছেলে শিবরাজ পুষ্টিকর খাবার খেয়ে সুস্থভাবে বড় হয়।

তাদের জীবন কঠিন ছিল,কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। রাতে খাওয়ার সময় সুরভি আগেই ছেলেকে খাইয়ে দিত, তারপর স্বামীকে নিয়ে খেতে বসত।রবি মায়া জড়ানো গলায় বলত, "এসো সুরভি, আজ এক সঙ্গেই খাই"। সুরভি মিষ্টি হেসে উত্তর দিত, "না, তুমি আগে খেয়ে নাও। তুমি না খেলে আমি কি করে খাব?"।

রবি জানত, সুরভি নিজের জন্য খাবার কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। তাই সে নিজের থালা থেকে ভাত আর তরকারি ভাগ করে দিত সুরভির থালায়। সেই ভাগ করে নেওয়া সামান্য খাবারটুকুর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাদের সংসারের প্রকৃত সুখ।

পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। সুরভি মা হতে চলেছে জানালো, রবি আর সুরভির আনন্দের আর সীমা রইল না। কিন্তু আনন্দের সাথে এল দুশ্চিন্তা, —টাকার টান যে মেটে না। রবি মনে মনে ঠিক করল, তাকে অন্য কোথাও ভালো চাকরি খুঁজতেই হবে।

একদিন খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে রবি দেখল—জলপাইগুড়ি জেলার আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা গ্রামে,একটি স্কুলে ক্লার্কের চাকরির সুযোগ আছে।রবি দেরি না করে তক্ষুণি আবেদন করল। এবার ভাগ্য যেন সত্যিই তার পাশে দাঁড়াল,কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এল চাকরিটা সে পেয়ে গেছে।

 

পরের মাসেই তারা পাততাড়ি গুটিয়ে ,সেই নতুন গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। জায়গাটা সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। তবুও বুক ভরা আশা নিয়ে তারা ফালাকাটায় এসে থাকার ঘর খুঁজতে শুরু করল।

সেখানে তারা ভাগ্যক্রমে একটি বাড়ি ভাড়া পেল। সেখানে তাদের সাথে দেখা হলো হরিপদ কাকু আর চন্দনা কাকিমার সঙ্গে। কাকু-কাকিমার বয়স হয়েছে, হরিপদ কাকুর পঞ্চাশের কাছাকাছি আর চন্দনা কাকিমার চল্লিশের আশেপাশে। তাদের একমাত্র ছেলে শহরে চাকরি, আর পরিবার নিয়ে বাস করে ।মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে কলকাতায়।

বিশাল চত্বর পাকা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা দুইতলা বাড়ি। চারদিকে ফুলের বাগান আর উঠোন। তাদের তিনখানা গরু আর বাছুর ছিল, কিন্তু বয়সের কারণে কাকু-কাকিমা আর আগের মতো গরু গুলোর যত্ন নিতে পারতেন না।ওনারা গরুগুলো বিক্রি করার কথা চিন্তা করছিলেন।

রবি আর সুরভিকে দেখে তাঁদের খুব পছন্দ হয়ে গেল। তারা শুধু ভাড়াটে হিসেবে নয়। যেন সেই দম্পতির নিজের আপনজন হয়ে উঠল কিছু দিনের মধ্যই।

সুরভি এখন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গরুগুলোকে ঘাস-বিচালি খাওয়ায়।বাগানে জল দেয় আর টাটকা ফুল তোলে। রবিও স্কুলে যাওয়ার আগে আর ছুটির পরে গাছের যত্ন নেয়, গরুগুলোর দেখাশোনা করে। শিবরাজের জন্য আর দুধের অভাব রইল না।সে রোজ টাটকা আর খাঁটি দুধ খেতে লাগল।

সুরভির হাতের ছোঁয়ায় গরুগুলোও যেন আগের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠল, সংখ্যায় তারা আরও বাড়ল। সুরভি এখন দুটো গরুর দুধ দুহতে পারত। দুধ বেশি হলে সে যত্ন করে ঘি তৈরি করত এবং সেই ঘি বিক্রি করে নিজের জন্য কিছু আলাদা উপার্জনও শুরু করত।

একদিন চন্দনা কাকিমা মুগ্ধ হয়ে বললেন, "বৌমা, তোমাদের জন্য এই বাগানটা আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে উঠেছে।" সুরভি হেসে বলল, "আপনারা তো আমাদের মা-বাবার মতোই। এই ঘর, এই বাগান তো এখন আমাদেরও।"

সুরভি বাড়তি সবজিগুলোও বিক্রি করত। চন্দনা কাকিমা এতে কিছুই বলতেন না, কারণ এখন আর তাঁকে বাজার থেকে সবজি কিনতে হতো না, সুরভি সবার আগে সেরা সবজি গুলোই কাকিমার রান্নাঘরে পৌঁছে দিত।চন্দনা কাকিমাকে আর দুধ,ঘি বা সবজি কিনতে হতো না ।

ধীরে ধীরে বাড়িটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।বাগানে ফলল নানা রকম সবজি, উঠোনে ফুটল রজনীগন্ধা , গাঁদা। বাড়ির গরুগুলোও যেন নতুন প্রাণ পেয়ে গেল।

শিবরাজ ছোটবেলা থেকেই ছিল শান্ত কিন্তু প্রচণ্ড সাহসী। রবি তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে নদীতে সাঁতার কাটতে হয়, কীভাবে স্রোতের সাথে লড়াই করতে হয় আর মাছ ধরতে হয়। মুজনাই নদী ওদের বাড়ির কাছ দিয়ে বয়ে গেছে ।বর্ষাকালে মুজনাই নদী যখন রাক্ষুসী রূপ নিত, বানের ভয়ে সবাই যখন পিছু হঠত, শিবরাজ তখনও নির্ভয়ে নদীতে নেমে পড়ত। যদিও শুকনো মরসুমে জল বেশ কমে যেত। তাই বৃষ্টির পর বা পাহাড়ি ঢালে জল বেশি এলেও সে নির্ভয়ে সাঁতরায় ।

বানের সময় শিবরাজ স্রোতের উল্টো দিকে না গিয়ে স্রোতের সাথে কোণাকুণি ভাবে। সাঁতরে পাড়ের দিকে যাওয়ার সেই কৌশল টা সে ভালভাবেই জানে । তার বন্ধুরা সবাই অবাক হয়ে যেত ঐ কৌশল টা দেখে।তাদের মনে হত যেন নদীও শিবরাজকে চিনে নিয়েছে।

শিবরাজের এই নির্ভীকতা শুধু তার শক্তি নয়,  তার মধ্যে ভালোবাসা ও কোমল হৃদয়ের মিশ্রণও আছে। সে প্রকৃতিকে ভালোবাসে, ঘরের গরু গুলোর যত্ন নেয়, এবং দুর্বলদের সাহায্য করতে কখনো পিছপা হয় না।

মুজনাই নদীর দু’পাশে যে ঘন জঙ্গল ছিল। রবি আর সুরভি মাঝেমাঝে ছেলেকে নিয়ে সেখানে যেত। জঙ্গল থেকে রবি তাদের জন্য ফল—যেমন বুনো কলা। বুনো পেয়ারা, বৈঁচি, বেত ফল, বুনো জাম ,কাঁঠাল ।বুনো খেজুর আর কত রকমের বুনো ফলপেড়ে আনত। আর শিবরাজ বাবার সঙ্গে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াত। ফল খোঁজা যেন তার নেশা হয়ে উঠেছিল।

রবি মাঝে মাঝে শিবরাজকে মুজনাই নদীতে নিয়ে মাছ ধরতে যেত। পুঁটি, দাড়কিনা, খলিশা, শোল, মাগুর, টেংরা—এই সব মাছ রবি জাল দিয়ে ধরত। আর শিবরাজও তার বাবাকে নকল করত। শিবরাজ মাছ ধরতে এতটাই পাকা হয়ে গিয়েছিল যে, গরমকালে কম জলে হাত দিয়েই মাছ ধরে নিত।

সে মাছ ধরার জন্য নানা কৌশল আর বুদ্ধি ব্যবহার করত। তাই রবিকে তেমন মাছ কিনতে হতো না।সেই মাছ, বাগানের সবজি সুরভির হাতের মায়াবী রান্না। সব মিলিয়ে তাদের অভাবের দিনগুলো এখন যেন এক রূপকথার গল্প।ওরা এখন খুব সুখে-আনন্দে দিনগুলো কাটাতে লাগল। এখানে আর কোনো অভাব রইল না।

 রবি এখন স্কুলের ক্লার্ক। স্কুলের সমস্ত হিসাব-নিকাশ সে নিখুঁতভাবে সামলায়। যদিও স্কুলের বোর্ড বলেছিল, "কাজ ভালো দেখলে তবেই স্থায়ীকরণ হবে",  তবুও রবি তার পরিশ্রমে কোনো খামতি রাখত না।

 রবি শিবরাজকে সেই স্কুলেই ভর্তি করে দিল। শিবরাজ খুব উজ্জ্বল ছাত্র না হলেও পড়াশোনাটা ঠিকঠাক চালিয়ে যেত।

কয়েক মাস পর সুরভি এক ফুটফুটে মিষ্টি কন্যাসন্তানের জন্ম দিল। তারা তার নাম রাখল—অন্বেষা। পরিবারে নতুন সদস্য আসায় রবি বুঝল তাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে।

 সে এবার এক মহাজনের গদিতে বাড়তি কাজ নিল। বিকেল ৬টা থেকে রাত ৯টা - ১০ টা পর্যন্ত সে মহাজনের সমস্ত জটিল হিসাব আর লেনদেন সামলাত।রবি এখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করছে, তার আয়ও বেড়েছে। সে একজন দক্ষ হিসাবরক্ষক, তাই মহাজনের সমস্ত হিসাব ও লেনদেনের জটিলতা সে খুব ভালোভাবে বুঝে নেয় এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করে। মহাজন রবির কাজে খুব খুশি হন। তিনি বুঝতে পারেন, রবি বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী এবং একজন দায়িত্বশীল হিসাবরক্ষক।

রবির আয় বাড়ল, জীবনযাত্রায় স্বচ্ছলতা এল। রবি এখন একটু একটু করে টাকা জমাতে শুরু করেছে—ভবিষ্যতে একখণ্ড জমি কিনে নিজের একটা ছোট্ট বাড়ি তৈরি করার স্বপ্ন নিয়ে। ফালাকাটার সেই শান্ত বিকেলে মুজনাই নদীর কলতানে রবি, সুরভি, শিবরাজ আর ছোট্ট অন্বেষার জীবন এখন পরম সুখে ভরে আছে।