(১)
ষাট বছর আগে
স্থান : ঝালদা, পুরুলিয়া সময়: সকাল
বাজার থেকে ব্যাগ হাতে করে ফিরছে কল্লোলিনী।
আজ তার মন ভালো আছে। সে একজন নতুন দাদুকে ফিরে পেয়েছে। মানে পাতানো দাদু।
দাদুর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাঁর চেহারা এখনও মোটামুটি ভালো।
দিদিমা আগেই চলে গেছেন। সন্তানরা কলকাতায় আছে চাকরিসূত্রে। দাদু আগে কারখানায় কাজ করতেন। এখন অখন্ড অবসর। তানপুরা তাঁর দ্বিতীয় বউ। এই দ্বিতীয় বউ এখন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী।
বাড়িতে ঢুকে কল্লোলিনী দেখল দাদু এসেছেন।
বাড়িতে একটা কুকুর, একটা বেড়াল- কল্লোলিনীর পোষ্য।
কুকুরটার নাম ' কেরি ', বেড়ালটার নাম ' চেরি '।
দাদুকে ঢুকতে দেখে কেরি চিৎকার করতে লাগল।
চেরি ম্যাও ম্যাও করতে লাগল।
কল্লোলিনী বলল," তোরা থাম। একে চিনে রাখ। ইনি আমার দাদু। "
কুকুর এবং বেড়াল দুটো বুঝলো মনিবের বক্তব্য।
তারা চুপ করে গেল।
(২)
ষাটবছর আগে
স্থান: বারুয়া, উত্তর দিনাজপুর
সময়: সন্ধ্যা
শতদল বর এখানকার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি।
প্রভূত বিষয়সম্পত্তির মালিক। তাঁর পেল্লাই বাড়ি। অনেক কাজের লোক।
তিনি আর তাঁর দাদা বিজনান্ত এই বাড়ির প্রধান।
দুজনের কেউই বিয়ে করেননি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের চরিত্রদোষ নেই। এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দা তাদের করালগ্রাস থেকে রেহাই পায়নি।
ঠিক এই কারণে বাইরের কেউ এখানে মেয়েদের বিয়ে দিতে চায় না।
এখন দুই ভাইয়ের বয়স হয়েছে কিন্তু প্রতাপ যথারীতি একই আছে।
সম্প্রতি এখানে একটি পরিবার এসেছে। সবাই বৃদ্ধ। তিন বৃদ্ধের পরিবার।
গ্রামের পুরোহিত অনুজ গোস্বামী সেই বাড়িতে পুজো করতে গিয়ে বুঝতে পারেন কিছু একটা গন্ডগোল আছে।
অনেকেই জানেনা এই পুরোহিত বর পরিবারের গুপ্তচর মাত্র।
অনুজ গোস্বামী যথারীতি সন্ধ্যায় শতদলের কাছে হাজির হলেন।
" কি খবর ? ," শতদল জিজ্ঞেস করলেন।
" আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানাতে চাই। এখানে নতুন একটি পরিবার এসেছে। তিনজনই বৃদ্ধ।
কিন্তু খুবই সন্দেহজনক। "
" এঁরা কি করেন ? "
" আগে কাজ করতেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই থাকেন। কাজ ছাড়া বাইরে বেরোন না।"
" কি সমস্যা হয়েছে সেটা তো বল। "
" এঁরা খুবই শান্তিপ্রিয়। এমনিতে লোকজনদের সঙ্গে কোনও অভদ্র আচরণ করেন না। সব ঠিক আছে। কিন্তু একটা বিষয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। "
" এত ভণিতা না করে খোলাখুলি বল। "
অনুজ গোস্বামী কিছুসময় চুপ করে থাকেন। তারপর বললেন," এই তিন বৃদ্ধকে কখনও একসঙ্গে দেখিনি। প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা ভাবে দেখেছি। জিজ্ঞেস করলে বলা হয় তাঁরা বাইরে গেছেন। "
" যেতেই পারে। "
" পরপর তিনদিন জিজ্ঞেস করেছি, একই উত্তর পেয়েছি। "
" ঠিক আছে আমি দেখব। "
(৩)
ষাটবছর আগে
স্থান: নন্দনপুর, জলপাইগুড়ি সময় : দুপুর
অমর দেবনাথ পেশায় হাতুড়ে ডাক্তার।
তাঁর কাছে পেশেন্টরা আসেন একটা পর্যন্ত। বিকেল চারটা থেকে রাত নটা।
এখন দেড়টা বাজে। অমরের বউ বারবার তাগাদা দিচ্ছেন খেতে আসার জন্য। অমর প্রতিবারই বলছেন একটু অপেক্ষা কর।
এখন পেশেন্টরা নেই। কিন্তু অমর ব্যস্ত অন্য কাজে।
তাঁর কাছে আছে একটা জাদুপাখি। হলুদ রঙের কাক!
অমর এই পাখি পেয়েছিলেন তাঁর ঠাকুর্দার কাছ থেকে।
পাখিটা বলল," শীঘ্রই তোমার কাছে একদল আসবে যারা তোমাকে ভোগাবে"।
অমর চিন্তিত গলায় বললেন," তারা ভালো লোক না খারাপ লোক ? "
" তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বললেই সেটা তুমি বুঝতে পারবে। "
" তুই কিছু জানিস না ? "
" এখনও পর্যন্ত নয়। "
দুদিন পর
রাস্তা দিয়ে একটা কুকুর চলেছে লেজ নাড়তে নাড়তে।
জনশূন্য পথ।
দূর থেকে একটি নারী পুরুষ আসছে। কুকুরটা তাদের কাছে দৌড়ে গেল। তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। দম্পতি যতই এগোতে চাচ্ছে ততই সে বাধা দিচ্ছে।
পুরুষটি বললেন," মনে হয় সামনে বিপদ আছে। চলো আমরা ফিরে যাই। "
নারীটি বললেন," ওকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। "
কুকুরটা তাঁদের পেছন পেছন চলল।
বাড়ি ফিরে এসে অমর বললেন," কুকুরটা আজ এখানেই থাক। "
বউ সজলা বললেন," ঠিক আছে। "
এইসময় হলুদ কাক চিৎকার জুড়ে দিল।
অমর বললেন," কি হয়েছে ? "
কাক অনেক চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বের করতে পারল না। শুধু বোঝা গেল সে ভীষণ ভয় পেয়েছে।
সজলা বললেন," তার মানে বিপদ আছে। কিন্তু সেটা কোন দিক দিয়ে ? "
অমর বললেন," আপাতত কুকুরটাকে আমরা এখানে রাখব না। ওকে একটু দূরে রেখে আসি। "
সজলা বললেন," বেশ তাই কর। "
দেখতে দেখতে রাত চলে আসলো।
পরদিন সকালে উঠে অমর চিৎকার করে উঠলেন," একি আমার এই সর্বনাশ কে করল ? "
সজলা এসে দেখলেন হলুদ কাকটি মরে পড়ে আছে।
তাঁরা অনেক খুঁজেও কুকুরটাকে দেখতে পেলেন না।
(৪)
ষাটবছর আগে
স্থান: বারুয়া, উত্তর দিনাজপুর
সময়: সকাল
অনুজ গোস্বামী বললেন," ঐ তিন বৃদ্ধকে দেখা যাচ্ছে না। "
শতদল বললেন," ওদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। "
বিজনান্ত বললেন," আপাতত তুমি কলকাতায় গিয়ে থাক কিছুদিন। তুমি তো বলছিলে ছুটি চাও। যাও দিন পনেরোর জন্য ঘুরে এস। "
" ঠিক আছে," অনুজ বললেন।
" ম্যানেজারের থেকে যা টাকা লাগে নিয়ে যাও," শতদল বললেন।
এবার অনুজ আরও খুশি হলেন," ধন্যবাদ ধন্যবাদ। "
" বাইরের কাউকে যেন এই তিন বৃদ্ধের ব্যাপারে কিছু বলতে যেও না," বিজনান্ত বললেন।
" আমি ওদের চিনিই না কি যে বলব ?," অনুজ বললেন।
" এই কথাটা মনে থাকে যেন," শতদল বললেন।
অনুজ বেরিয়ে যেতেই শতদল বললেন," ম্যাডাম আসছেন। কুকুর বেড়াল দুটো ওনাকেই উপহার দেব।"
" কবে ? ," বিজনান্ত জিজ্ঞেস করলেন।
" আগামীকাল। "
" ম্যাডামকে পাশে পেলে আমাদের আর কেউ রুখতে পারবে না। "
" অনুজের পেট পাতলা। তাই ওকে এখান থেকে সরিয়ে দিলাম। ওকে মারব না কিন্তু আর কোনওদিন এখানে আসতেও দেব না। "
" এরপর থেকে রাজত্ব চলবে আমাদের। "
" ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে দেখি উনি আমাদের কতটা হেল্প করবেন। সেই মতো আমরাও ওনার জন্য করব। "
" রূপনাথ এখন কোথায় ? কুকুর বেড়ালটা আনার সময় ম্যাডামের বোন দেখে ফেলেনি তো ? "
" রূপনাথ তখনই বাড়িতে গিয়েছে যখন ম্যাডামের বোন ঘরে ছিলেন না। হয়তো কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন। সব কাজ প্ল্যান মাফিক করা হয়েছে। "
(৫)
ষাটবছর আগে
স্থান: ঝালদা, পুরুলিয়া সময় :দুপুর
কল্লোলিনী দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছে।
এমন সময় পাড়ার একটি মেয়ে এসে বলল," দাদু কোথায় ? "
" ঘরেই আছে। "
" খুঁজে দেখ। "
কল্লোলিনী ঘরে ঢুকে দেখল দাদু নেই।
সেকি কোথায় গেল ? অনেক খুঁজেও সে দাদুকে দেখতে পেল না।
কেরি, চেরিও নেই।
কল্লোলিনীর মাথায় আগুন চড়ে বসল।
সে দ্রুত তার ঘরে চলে গেল। এই ঘর সবসময় তালাবন্ধ থাকে।
তালা খুলে কল্লোলিনী তার গোপন ছোট বাক্সটা খুলল।
একটা ছয় ইঞ্চির লাঠি। মাথাটা একটা মানুষের মাথার মতো। তলাটা ছুঁচলো।
চোখ বন্ধ করে সে লাঠির মাথাটা মুখের সামনে এনে চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার ভেতরে তুমুল উত্তেজনা।
কিছুক্ষণ পর সে চোখ খুলল। এবার লাঠিটা তার জামার ভেতরে লম্বা পকেটে ঢুকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
(৬)
ষাট বছর আগে
স্থান: নন্দনপুর , জলপাইগুড়ি সময়: রাত
বাড়িতে অতিথি এসেছে। অমরের শালা, তাঁর বউ আর একটা শিশুকন্যা।
খাওয়া দাওয়া হয়ে যাবার পর অমর বললেন," আগামীকাল আমরা মেলা দেখতে যাব। "
শালার নাম ভবেন। তিনি বললেন," নিশ্চয়ই। "
শিশুকন্যাটি ঘুমিয়ে আছে। ভবেনের বউ রত্না বললেন," শুনেছি এখানকার মেলায় সুন্দর পুতুল বানিয়ে দেয় একেবারে মানুষের মতো। আমি মেয়ের জন্য কিনব। "
সজলা বললেন," দাদু এখন আর আসেন না তুমি যার কথা বলছ। "
অমর বললেন," কোনও সমস্যা নেই। আগামীকালই ওনাকে ডেকে পাঠাচ্ছি। "
" হ্যাঁ সেটা হতে পারে," সজলা বললেন।
দুদিন পর
মেলা বসেছে। শতদল আর বিজনান্ত ছদ্মবেশে মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
মেলায় এক বৃদ্ধ পুতুল নিয়ে বসেছেন বেচার জন্য।
এইসময় ধূলো উড়তে লাগলো। মেলায় যারা এসেছিল তারা ধূলো থেকে বাঁচতে সরে যেতে লাগলো।
ঠিক তখনই দুজনকে দেখা গেল।
কল্লোলিনী লাঠি হাতে একদিকে আর অন্যদিকে তার বোন হৈমবতী।
যে বৃদ্ধ পুতুল বেচছিলেন তিনি নেই। পুতুলগুলো সব ভেঙে গেছে। দূরে একটা ভাঙা তানপুরা।
কল্লোলিনী লাঠি ঘোরাতে লাগলো আর হৈমবতী তার পুতুল বের করে ক্রমাগত মন্ত্র বলতে লাগলো।
দুদিকেই ছিটকে ছিটকে আসতে লাগলো নুড়িপাথর যা মাটিতে পড়েছিল।
লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হল না। একসময় একটা পুতুল নড়েচড়ে উঠলো সে হাতে তুলে নিল খুদে তানপুরা। তারপর বাজাতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে দুই বোন দূরে ছিটকে পড়ল। যতই তানপুরা বাজছে ততই তারা দূরে দূরে সরে যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর পুতুল মানুষের উচ্চতায় উঠে এলো। হাতে তানপুরা নিয়ে মেলায় ঘুরতে লাগলো।
লোকজন যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে।
মেলায় এসেছিল অমর আর তার বউ, শালা এবং তার বউকে নিয়ে। শতদল ,বিজনান্ত পালাচ্ছে।
১০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। মেলাপ্রাঙ্গণ খাঁ খাঁ করতে লাগলো।
আধঘন্টা পরে
এক বৃদ্ধ হেঁটে চলেছেন। পাশে এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধ বললেন," এখন তুমি আমি দুজনেই মুক্ত। "
বৃদ্ধা বললেন," এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। "
" ওদের অনেক সাবধান করেছিলাম। শুনল না। কি করা যাবে ? ব্যবস্থা তো নিতেই হবে। "
" এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। "
" আপাতত। "
সমাপ্ত
গল্পটি এখানেই শেষ হল