Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

শেষে আমরা অচেনাই রইলাম_2



অধ্যায় — ২ | শেষ অধ্যায়

ছয় বছর খুব অদ্ভুত একটা সময়। এই ছয় বছরে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের জীবনের এতটা অংশ হয়ে যেতে পারে যে, তাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করাটাই অসম্ভব মনে হয়। জারিয়াবও ঠিক তেমনই ভেবেছিল। জামিল তার কাছে শুধু একজন মানুষ ছিল না, তার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল, তার অপেক্ষার কারণ ছিল, তার ভালো লাগার একটা বড় অংশ ছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়ে জামিলের মেসেজ খোঁজা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে শেষবার তার সঙ্গে কথা বলা—সবকিছু যেন অজান্তেই জীবনের নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। মানুষও বদলায়, সম্পর্কও বদলায়, আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—কখন যে সেই পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়, তা অনেক সময় বোঝাই যায় না। জারিয়াবের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। প্রথমদিকে জামিলের উত্তর দিতে একটু দেরি হলে জারিয়াব ভাবত, নিশ্চয়ই ব্যস্ত। ফোন ধরতে না পারলে ভাবত, হয়তো ক্লাসে আছে। কয়েক ঘণ্টা কথা না হলে নিজেকে বোঝাত, সবারই তো নিজের কাজ থাকে। কিন্তু একসময় সেই কয়েক ঘণ্টা থেকে দিন হয়ে গেল। আগে যে মানুষটা জারিয়াবের একটা ছোট্ট কথাও মন দিয়ে শুনত, এখন তার কথার মাঝখানেই যেন অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। জারিয়াব সেই দূরত্বটাকে দেখতে পাচ্ছিল না, কিংবা হয়তো দেখতে চেয়েও দেখতে চাইছিল না। কারণ সত্যিটা মেনে নেওয়ার চেয়ে নিজেকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়া অনেক সহজ। একদিন জারিয়াব মেসেজ করল, “আজকে সারাদিন কোথায় ছিলে?” অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না। সে ফোনটা পাশে রেখে অন্য কাজ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা হাতে নিল। কোনো মেসেজ নেই। সে আবার অপেক্ষা করল। রাত অনেকটা হয়ে যাওয়ার পর জামিলের ছোট্ট একটা উত্তর এলো, “ব্যস্ত ছিলাম।” জারিয়াব মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। আগে হলে সে হয়তো জিজ্ঞেস করত, “কী নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলে?” কিন্তু সেদিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু লিখল, “আচ্ছা।” সেই ‘আচ্ছা’ শব্দটার মধ্যে কতটা অভিমান ছিল, সেটা জামিল হয়তো বুঝতেই পারেনি। কিংবা বুঝেও গুরুত্ব দেয়নি। এভাবেই দিন চলতে লাগল। জামিল ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমিয়ে দিল। আগে যেখানে প্রতিদিন কথা হতো, সেখানে এখন দু-তিন দিন পর কথা হতো। আগে ফোন না করলে জারিয়াবকে নিজেই ফোন করত, এখন জারিয়াব ফোন করলে অনেক সময় সেটাও ধরত না। কখনো ফোন ধরলেও কথাগুলো খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল। “কেমন আছো?” “ভালো।” “খেয়েছ?” “হ্যাঁ।” “কাজ আছে?” “হুম।” তারপর নীরবতা। জারিয়াব অনেকবার চেষ্টা করত পুরোনো দিনের মতো একটা কথোপকথন শুরু করতে। কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিত, কোনো মজার ঘটনা বলত, কখনো শুধু লিখত, “তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে।” কিন্তু জামিলের উত্তর ধীরে ধীরে আরও ছোট হয়ে আসছিল। “পরে কথা বলব।” সেই ‘পরে’ আর আসত না। জারিয়াব অপেক্ষা করত। কখনো রাত জেগে। কখনো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। কখনো নিজের মনকে বোঝাত, “ও বদলায়নি। শুধু সময়টা খারাপ যাচ্ছে।” কিন্তু আসলে সময় খারাপ ছিল না, বদলে যাচ্ছিল সম্পর্কটা। আর সেই পরিবর্তনটা শুধু জারিয়াবই বুঝতে পারছিল না। একদিন সে জামিলকে লিখল, “তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?” অনেকক্ষণ পর উত্তর এলো, “না।” “তাহলে এমন করছ কেন?” কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই। তারপর জামিল লিখল, “কিছু না, জারিয়াব। এত কিছু ভাবো না।” জারিয়াব ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। “এত কিছু ভাবো না”—এই কথাটাই যেন তার মাথার ভেতর আরও হাজারটা প্রশ্ন তৈরি করে দিল। সে কি সত্যিই বেশি ভাবছে? নাকি জামিল সত্যিই দূরে চলে যাচ্ছে? সে সেদিন কোনো উত্তর দিল না। শুধু ফোনটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম এলো না। ছয় বছরের কত স্মৃতি যে সেদিন তার মনে ভেসে উঠেছিল! সেই প্রথম দেখা, সেই পেন, ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়া, জামিলের কথা শুনে লজ্জায় তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসা, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, অজস্র কথোপকথন, অভিমান, মান-অভিমান, হাসি, কান্না—সবকিছু। জারিয়াব মনে মনে ভাবল, “এতকিছুর পরও কি একজন মানুষ বদলে যেতে পারে?” তার নিজের কাছেই উত্তর ছিল না। সময় আরও কেটে গেল। একদিন জারিয়াব লক্ষ্য করল, সে জামিলকে মেসেজ না করলে জামিল আর নিজে থেকে মেসেজ করে না। সে একদিন ইচ্ছে করেই মেসেজ করল না। সকাল গেল। দুপুর গেল। রাত হলো। কোনো মেসেজ এলো না। পরের দিনও না। তৃতীয় দিনেও না। জারিয়াব তখন প্রথমবার সত্যিটাকে একটু একটু করে অনুভব করল। মানুষটা হয়তো সত্যিই আর তাকে খুঁজছে না। তবুও সে নিজেকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে পারল না। কারণ তার মনে হচ্ছিল, ছয় বছরের একটা সম্পর্ক এত সহজে শেষ হতে পারে না। এক রাতে সে সাহস করে লিখল, “জামিল, তোমার সঙ্গে কি আমার কোনো কথা বলা দরকার?” অনেকক্ষণ পর উত্তর এলো, “কী কথা?” জারিয়াব লিখল, “তুমি আগের মতো নেই।” এবার উত্তর আসতে আরও বেশি সময় লাগল। অবশেষে জামিল লিখল, “সবসময় তো একইরকম থাকা যায় না।” জারিয়াবের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। সে লিখল, “মানে?” জামিল আর উত্তর দিল না। জারিয়াব বারবার অনলাইন দেখল। জামিল অনলাইনে এল, আবার চলে গেল। কিন্তু তার মেসেজের উত্তর দিল না। সেদিন জারিয়াব প্রথমবার কাঁদতে কাঁদতে বুঝেছিল, কোনো মানুষকে হারানোর আগে মানুষটা সবসময় চলে যায় না; কখনো কখনো সে সামনে থেকেই দূরে চলে যায়, আর তুমি শুধু তার ছায়াটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে থাকো। তারপর জামিলের যোগাযোগ আরও কমে গেল। ফোন করা বন্ধ। মেসেজ করা বন্ধ। জারিয়াব মেসেজ করলে কখনো উত্তর আসে, কখনো আসে না। আর যখন উত্তর আসে, তখন সেটা এমন নির্লিপ্ত যে জারিয়াব বুঝতে পারে, কথাগুলো শুধু দায়িত্ববোধ থেকে লেখা। একদিন জারিয়াব অনেকক্ষণ ধরে ফোন হাতে বসে থেকে একটা মেসেজ লিখল, “তুমি যদি আর আমার সঙ্গে কথা বলতে না চাও, তাহলে সরাসরি বলো। আমি তোমাকে জোর করব না।” মেসেজটা পাঠানোর পর তার হাত কাঁপছিল। সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। কোনো উত্তর এলো না। এক ঘণ্টা। দুই ঘণ্টা। রাত পেরিয়ে সকাল হলো। তবুও কোনো উত্তর নেই। জারিয়াব তখন বুঝে গেল, কখনো কখনো নীরবতাও একটা উত্তর। সে আর মেসেজ করল না। কয়েকদিন পর হঠাৎ জামিলের প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মানুষটার সঙ্গে তার এত বছরের সম্পর্ক এখন যেন শুধু তার নিজের স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে আছে। বাস্তবে আর কিছু নেই। তারপর একদিন জারিয়াবের খুব ইচ্ছে হলো জামিলের সঙ্গে কথা বলার। কারণ কোনো কারণ ছাড়াই সেদিন তার মনটা খুব খারাপ ছিল। সে ফোন করল। ফোন বেজে কেটে গেল। আবার করল। এবারও কেউ ধরল না। তৃতীয়বার ফোন করার সাহস হলো না। সে শুধু একটা মেসেজ লিখল, “জামিল, একবার কথা বলবে?” কোনো উত্তর এলো না। সেই রাতেই জারিয়াব সিদ্ধান্ত নিল, আর সে নিজে থেকে যোগাযোগ করবে না। কিন্তু মানুষের মন কি এত সহজে সিদ্ধান্ত মানে? পরের দিনও ফোন হাতে নিয়ে সে জামিলের নামের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কয়েকদিন। তারপর কয়েক সপ্তাহ। সময় এগিয়ে গেল। জারিয়াব নিজের পড়াশোনা, কাজ, পরিবার—সবকিছু সামলাতে চেষ্টা করল। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিকই মনে হতো। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলত, হাসত, ক্লাস করত। কিন্তু একা হলেই পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসত। সে মাঝে মাঝে নিজের মনেই বলত, “হয়তো একদিন ও আবার ফোন করবে।” কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। অনেকদিন পর এক বিকেলে জারিয়াব হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে জামিলের আম্মুকে ফোন করবে। অন্তত তিনি হয়তো জানেন জামিল কেমন আছে। অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকার পর অবশেষে নম্বরটা ডায়াল করল। ফোনের ওপাশ থেকে একজন পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। “হ্যালো?” জারিয়াব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আন্টি, আমি জারিয়াব।” ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রশ্ন এলো, “ওহ, জারিয়াব? কেমন আছো মা?” জারিয়াব কোনোভাবে বলল, “ভালো আছি। জামিল কেমন আছে?” ওপাশ থেকে উত্তর এলো, “জামিল তো ভালোই আছে মা।” জারিয়াবের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা স্বস্তি এলো। অন্তত জামিল ভালো আছে। সে একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল, “ও কি খুব ব্যস্ত? অনেকদিন কথা হয়নি।” ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর জামিলের আম্মু খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন, “তোমাকে তো জানানো হয়নি বোধহয়? জামিল তো বিয়ে করে নিয়েছে।” কথাটা শুনে জারিয়াব যেন কিছুই বুঝতে পারল না। চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেল। তার হাতে থাকা ফোনটা কাঁপতে শুরু করল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠস্বর এলো, “হ্যালো মা? শুনতে পাচ্ছ?” জারিয়াব খুব কষ্টে বলল, “জি...” তারপর আর কোনো কথা না বলে ফোনটা কেটে দিল। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর যেন তার মাথার ভেতর একসঙ্গে ছয় বছরের সব স্মৃতি ফিরে এলো। সেই প্রথম পেন চাওয়া। সেই ক্যাফে। সেই প্রথম লজ্জা। জামিলের হাসি। অসংখ্য রাতের কথা। ছোট ছোট অভিমান। “আমি আছি”—এই কথাগুলো। ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন। কতবার সে ভেবেছিল, শেষ পর্যন্ত জামিলই থাকবে। অথচ আজ জানতে হলো, সেই মানুষটা অন্য কারও হয়ে গেছে। জারিয়াবের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের মনেই বলল, “তাহলে এতদিন ধরে তুমি কেন আমাকে এভাবে রেখে দিলে?” কোনো উত্তর এল না। শুধু ঘরের নীরবতা তাকে ঘিরে রইল। সে আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। জামিলের নামটা এখনও সেখানে ছিল। কিন্তু মানুষটা আর তার জীবনে নেই। জারিয়াব বুঝতে পারল, সে হয়তো অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিল, শুধু সে নিজেই সেটা বুঝতে পারেনি। জামিল যখন ধীরে ধীরে তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করছিল, তখনই হয়তো তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর জারিয়াব তখনও পুরোনো দিনের জামিলকে ধরে বসে ছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে পুরোনো মেসেজগুলো খুলতে লাগল। কিছু মেসেজ পড়ে হাসি পেল, আবার পরের মুহূর্তেই চোখ ভিজে গেল। একটা পুরোনো ছবি দেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমরা কি সত্যিই এতটা অচেনা হয়ে গেলাম?” তার কোনো উত্তর ছিল না। বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। জানালার বাইরে আকাশের রঙ বদলে যাচ্ছে। পাখিরা নিজেদের ঘরে ফিরছে। অথচ জারিয়াবের মনে হচ্ছিল, তার নিজের ঘরটাই যেন হঠাৎ খালি হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কয়েক পা হাঁটল। কিন্তু মাথার ভেতর একসঙ্গে এত স্মৃতি ঘুরছিল যে সে নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। সে মাটিতে বসে পড়ল। চারপাশের কথাগুলো যেন দূর থেকে ভেসে আসছিল। জামিলের সঙ্গে প্রথম দেখা, পেন, ক্যাফে, ছয় বছরের ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমান, unanswered message—সবকিছু একসঙ্গে তার মনে ঘুরতে লাগল। সে নিজের মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে শরীরের ভার সামলাতে না পেরে মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তার চারপাশে মানুষ জড়ো হলো। কেউ তাকে ডাকল, কেউ পানি আনতে গেল। কিন্তু জারিয়াব তখন কিছুই শুনছিল না। তার পৃথিবীটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ পর যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন চোখ খুলতেই প্রথম যে জিনিসটা দেখল, সেটা ছিল পরিচিত ছাদ। পাশে কয়েকজন উদ্বিগ্ন মুখ। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার একই দৃশ্য ফিরে আসছিল—একজন ছেলে তার দিকে পেন বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর একজন মেয়ে হাসতে হাসতে বলছে, “আপনার পেনটা দিতে ভুলে গেছি।” জারিয়াব চোখ বন্ধ করল। অশ্রু আবার গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, কিছু গল্পের শেষটা কোনো ঝগড়ায় হয় না। কোনো বড় ভুলেও হয় না। কখনো কখনো গল্প শেষ হয় শুধু একজন মানুষের ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আর অন্যজন বুঝতে বুঝতেই অনেক দেরি হয়ে যায়। ছয় বছর আগে যে দুজন মানুষ একে অপরকে চিনত না, তারা একদিন এতটা কাছাকাছি এসেছিল যে একজনের অনুপস্থিতি অন্যজনের পুরো পৃথিবীকে ফাঁকা করে দিতে পারে। আর ছয় বছর পর তারা আবার এমন জায়গায় এসে দাঁড়াল, যেখানে একজনের জীবনে অন্যজনের কোনো জায়গা নেই। হয়তো কোনো একদিন জারিয়াব আর জামিলের আবার দেখা হবে। হয়তো কোনো রাস্তার মোড়ে, কোনো ক্যাফের সামনে, অথবা কোনো ব্যস্ত শহরের ভিড়ে। হয়তো জামিল তখন তার পাশে থাকা মানুষটির সঙ্গে কথা বলবে, আর জারিয়াব দূর থেকে শুধু একবার তাকাবে। হয়তো দুজনের চোখাচোখিও হবে। কিন্তু কেউ কাউকে ডাকবে না। কারণ কিছু সম্পর্কের শেষ হওয়ার পর ফিরে যাওয়ার রাস্তা থাকে না। তখন তারা দুজনই হয়তো অচেনা মানুষের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। আর জারিয়াব হয়তো মনে মনে শুধু একটা কথাই বলবে—“একদিন তুমি আমার পৃথিবী ছিলে। আজ তুমি আমার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি।” তারপর সে হাঁটতে থাকবে। পিছনে ফিরে তাকাবে না। কারণ কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না, কিন্তু তাদের ছাড়া বাঁচতে শিখে যেতে হয়। আর কিছু গল্পের সবচেয়ে কষ্টের শেষ লাইনটা হয়তো এটাই—“হয়তো বা কোনো একদিন আবার দেখা হবে অচেনা মানুষ হয়ে।”