বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা। কালচে মেঘগুলো চারিপাশ ঘিরে রেখেছে। টিপটিপ বৃষ্টি নিরন্তর ঝমঝমে হয়ে মাটিতে পড়ছে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের চটক আলো এসে চারিদিকে আলোকিত করে পর মুহূর্তে গর্জন করে নিজের উপস্থিতির জানান দেয়। চারপাশে দোকানের ঝাঁপ প্রায় সব নামানো। কোথাও দূরে বাজ পড়ার শব্দ, কোথাও টিনের চালের ওপর বৃষ্টির অবিরাম টুপটাপ। রাস্তায় প্রায় লোক নেই।
কলেজ আর টিউশন শেষ করে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় তিতাসের। বৃষ্টি বাড়তে থাকায় বাধ্য হয় শর্টকাট ধরতে। গলিটা অন্ধকার। দুপাশে দেয়াল। দূরে কেবল একটা স্ট্রিট ল্যাম্পের মৃদু আলো। কোনোমতে দুজন ব্যক্তি যাবার মতন রাস্তা। তিতাস ছাতাটা এতটাই নিচু করে ধরে আছে যে সামনের পথটুকুও ঠিকমতো দেখা পারে না।
এক পা... দু'পা...করে এগিয়ে চলছে।
হঠাৎ ধপ করে শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খায়।
তিতাসের পা কাদায় পিছলে যায়। কোনোমতে ভারসাম্য ফিরিয়ে নেয় সে। এক হাত বুকে চেপে জোরে শ্বাস নেয়। অপ্রত্যাশিতভাবে কারোর সাথে ধাক্কা খাবে সে ভাবেনি।
"আরে! রাস্তা ঘাটে না দেখে চলো নাকি?"
ঠোঁটে আলতো কামড় দিয়ে তিতাস ধীরে ধীরে মুখ তোলে। সে জানে লোকটা নিশ্চই তাকে যাচ্ছেতাই বলে চলে যাবে আর সে হাদার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।
ছাতার আড়াল সরাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে ভালভাবে দেখতে পায় তিতাস। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো লোকটার পিঠে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবে লোকটার মুখ কিছুটা অন্ধকারের আড়ালে। তবে চোখেমুখে যে বিরক্তি লেগে আছে সেটা তার কথা বলার ধরণে স্পষ্ট।
"আমি... আমি সত্যিই দুঃখিত। ছাতার জন্য সামনে দেখতে পাইনি। ইচ্ছে করে হয়নি।"
লোকটা নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকায়।
"দুঃখিত বললেই সব মিটে যায়?"
তিতাস চুপ করে থাকে।
"দেখো কী অবস্থা করেছ। একেবারে কাদা মেখে দিয়েছ।"
"আমি... আমি খেয়াল করিনি..."
"ওটাই তো সমস্যা। খেয়াল করো না। তারপর একটা 'সরি' বলে ভাবো দায়িত্ব শেষ।"
তিতাস আঙুলগুলো শক্ত করে ছাতার হাতল চেপে ধরে। আসলে তিতাস ছোটবেলা থেকে এমন। কেউ একটু জোরে কথা বললে গলা শুকিয়ে আসে। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কারোর সামান্য প্রশ্নের বদলে কী উত্তর দেবে, কিছুই মাথায় আসে না তার। যেন অটোমেটিকেলি তার ব্রেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অথচ সে একজন শিক্ষিকা!
"আপানি চাইলে... পরিষ্কার করানোর টাকা.." তিতাস সাহস করে মুখ ফুটিয়ে বলতে চায়। কিন্তু কথায় আছে কপালে না থাকলে ভাত জোটে না। তিতাসের সাথেও তেমনটা ঘটলো। লোকটা তিতাসের কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মেকি হাসি হাসে। সাথে তিন কদম দূরত্ব ঘনিয়ে দেয়।
"টাকা দেবে? কোথা থেকে দেবে? বাবার কাছে হাত পাতবে?"
তিতাস মাথা নিচু করে ফেলে। তিতাসের জায়গায় অন্য কেউ হলে মুখের ওপরে বলে দিতো আপনার তাতে কী! কিন্তু সে তো তিতাস!
লোকটা এক পা এগিয়ে আসে।
"কী হলো? এবার চুপ কেন?"
বৃষ্টি আরও প্রবল বেগে ধারাতে নেমে আসে। ঝম ঝম করে টিনের চালে পড়ে কানে তালা লাগানোর জোগাড়। গলিটার ভেতর বাতাস ক্রমশঃভারী হয়ে আসছে। লোকটাকে এগিয়ে আস্তে দেখে তিতাস ভয়ে দু'কদম পিছিয়ে যায়। চারপাশে সাহায্য চাইবার মতো কাউকে দেখতে পায় না সে।
তিতাস ঠোঁট ভিজিয়ে আস্তে বলে, "আমি ঝামেলা করতে চাই না... আপনি প্লিজ এগোবেন না..."
লোকটার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে ওঠে।
"কিন্তু আমি যে আমার পাওনা না নিয়ে যাবো না।"
"কিসের পাওনা রে, বিকাশ? অন্ধকার গলিতে একটা মেয়েকে ভয় দেখিয়ে খুব বীরপুরুষ মনে হচ্ছে নিজেকে? লজ্জা-শরম সব বেচে খেয়েছিস নাকি? আয়, আজ একটু মানুষ হতে শেখাই।"
পেছন থেকে ভেসে আসা গমগমে, রাশভারী গলাটা শুনে থমকে যায় বিকাশ।
তিতাসও চমকে মাথা তোলে।
বিকাশের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক লম্বা, চওড়া কাঁধের যুবক। কালো ফুলহাতা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। ভেজা ডেনিম জিন্সের নিচে কালো বুটজোড়া কাদার ওপর নিশ্চিন্তে গেঁথে আছে। বৃষ্টির পানিতে শার্টটা খানিকটা ভিজে গায়ে লেগে থাকায় সুঠাম শরীরের গড়ন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
স্ট্রিট ল্যাম্পের ফ্যাকাশে আলো তেমন পৌঁছায় না সেখানে। তবু বিদ্যুতের ঝলকানি নামতেই মুহূর্তের জন্য লোকটার মুখ পরিষ্কার দেখা যায়।
ধারালো চোয়াল। সোজা নাক। কপালের ওপর এলোমেলো কয়েক গোছা ভেজা চুল। চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত, অথচ কঠোর।
অকারণেই তিতাসের বুকের ভেতরটা ধুপধাপ করে ওঠে।এমনটা তার আগে কখনও হয়নি। মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশের বৃষ্টির শব্দ দূরে সরে যায়। আশেপাশে সব উধাও হয়ে জ্ব। কেবল তিতাস আর আগত অচেনা ব্যক্তি। তিতাস চাইলেও চোখ সরিয়ে নিতে পারে না। পরের মুহূর্তেই নিজের ওপর বিরক্ত লাগে।
'কী হচ্ছে এসব?'
এই পরিস্থিতিতে সে একজন অচেনা মানুষকে দেখে কীসব ভাবছে ভেবে তিতাসের লজ্জায় কান দুটো গরম হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলে সে। ইচ্ছে করে ছাতার আড়ালে নিজেকে আরও একটু লুকিয়ে ফেলতে। যেন কেউ তাকে না দেখে, তার অস্বস্তিটুকু না বুঝতে পারে। নিজেকে যতটা সম্ভব ছোট করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। যে মেয়ের ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারলে সবচেয়ে স্বস্তি লাগে, তার নজরের কেন্দ্রে আসা কোনোদিন পছন্দ নয়।
এদিকে পরিচিত গলা শুনে বিকাশের গলার স্বর নিমেষে পাল্টে যায়। রীতিমতো তোতলাতে শুরু করে সে। "রু... রুদ্র দা! আপনি? না মানে, এই মেয়েটা ধাক্কা মারল তো, তাই একটু..."
রুদ্র পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে হাঁটা দেয়। চোখদুটো স্থির বিকাশের ওপর। মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অথচ বিকাশের কালঘাম ছুটছে।
"মেয়েটা তোকে দশবার 'সরি' বলল। তুই শুনতে পাসনি? নাকি আমি তোর কানের পর্দা দুটো ফাটিয়ে দেব, তারপর স্পষ্ট শুনতে পাবি?"
"না না রুদ্র দা! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি খেয়াল করিনি," বিকাশ ঢোক গিলে এক পা পিছিয়ে যায়।
"এখান থেকে বিদেয় হ। আর কোনোদিন যদি পাড়ার কোনো মেয়ের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে দেখি, তবে তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে নেব। যা!" রূদ্র বেশ ধমকি দিয়ে কথাটা বলে।
বিকাশ আর এক সেকেন্ড দাঁড়ায় না। কার্যত দৌড়ে পালিয়ে যায়। বিকাশ গলির মোড়ে মিলিয়ে যেতে চারপাশটা আবার ফাঁকা হয়ে আসে। শুধু টিনের চাল, রাস্তার জমা জলে বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ।
তিতাস তখনো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। হাত-পা যেন পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে তার। চোখের সামনে ঠিক কী ঘটে গেল, সেটা যেন তার মগজে এখনো প্রসেস হয়ে ওঠেনি। ছাতাটা সেই আগের মতোই বুকের কাছে নামানো। দুহাতে হাতলটা এমন শক্ত করে চেপে ধরে আছে যেন ওটাই তার শেষ ভরসা।
রুদ্র পকেটে হাত গুঁজে বিরক্তি নিয়ে তিতাসের দিকে ঘোরে। একে বিকাশ তারওপর মেয়েটার কাণ্ড দেখে তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেছে। সে অনেক্ষণ আগে থেকে দেখছে বিকাশ মেয়েটাকে জ্বালাতন করছে।
বাইক নিয়ে বেরিয়েছিল কাজে। মাঝরাস্তায় বৃষ্টির কবলে পড়ে সামনের ঝাপে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু অন্ধকারে গলিতে নড়াচড়া দেখে তার খটকা লাগে। আগে পিছে না ভেবে সেদিকে হাঁটা দেয় সে। একটু এগোতে দেখতে পায় বিকাশ মেয়েটার সাথে ইচ্ছে করে ধাক্কা খেল। তারপর যা ঘটলো, সব সে একে একে দেখেছে।
চাইলে সে আগেই আটকাতে পারতো। তবে আগে নিজে থেকে সে আগ বাড়ায়নি। অপেক্ষায় ছিল মেয়েটির প্রতিবাদের। কিন্তু কীসের প্রতিবাদ! উল্টো মেনি বিড়ালের মতন গুটিয়ে এক কোণে থর থর করে কাঁপছিলো মেয়েটা। দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিলো রূদ্রর।
এখন আবার মেয়েটাকে একি পর্যায়ে দেখে সে চুপ থাকতে পারে না। সটাসট ধমকে দিয়ে বসে।
"এই যে ম্যাডাম! এবার কি ছাতাটা সরাবেন? নাকি সারা জীবন ওই কালো কাপড়ের তলাতে মুখ গুঁজে কাটানোর ইচ্ছে আছে?"
চমকে ওঠে তিতাস। কাঁপা কাঁপা হাতে ছাতাটা সামান্য ওপরে তুলতে রুদ্রর তীক্ষ্ণ, বিরক্ত দৃষ্টির সামনে পড়ে যায় সে। রুদ্রের চোখেচোখি হতে আবার ছাতাটা নামিয়ে নেয়।
তিতাসের তানামানা দেখে রুদ্রর বিরক্তি দ্বিগুন বেড়ে যায়। খই ফোটার মতো ফেটে পড়ে সে। "ছাতাটা সরাও বলছি! এভাবে কচ্ছপের মতো খোলসের ভেতর মুখ লুকিয়ে হাঁটলে সামনে কে আসছে, রাস্তায় কী আছে, সেটা দেখবে কী করে শুনি? চোখ-কান কি বাড়িতে আলমারিতে তুলে রেখে রাস্তায় বেরিয়েছ?"
তিতাসের গলা শুকিয়ে কাঠ। জীবনে কেউ তাকে এভাবে বকেনি। সে তো একটা ধন্যবাদ দেওয়ার কথা ভাবছিল, কিন্তু এই লোকটা তো তাকেই ধুয়ে দিচ্ছে!
"আ... আমি... আসলে বৃষ্টি..." তিতাস কোনোরকমে মিনমিন করে দুটো শব্দ উচ্চারণ করে।
"বৃষ্টি! বৃষ্টি তো কী?" তিতাসকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মাঝপথে থামিয়ে দেয় রুদ্র। "বৃষ্টি পড়লে কি অন্ধ হয়ে হাঁটতে হবে? আর কেউ দুটো চমকানি দিলে অমনি ভেজা বেড়ালের মতো সিঁটিয়ে যেতে হবে? মুখে কি রা নেই তোমার? কেউ যা নয় তাই বলে যাবে আর তুমি ঘাড় গুঁজে শুনে নেবে?"
তিতাস মাথা নিচু করে ফেলে। অপমানে, লজ্জায়, ভয়ে চোখের কোণটা চিকচিক করে। কোথায় সে একজন শিক্ষিকা, আর এখানে রাস্তার মাঝে এক অচেনা লোকের কাছে স্কুলের ক্লাসের পাঁজি ছাত্রীর মতো বকুনি খাচ্ছে!
"মাথা নিচু করবে না!" ফের ধমকে ওঠে রুদ্র।
তিতাস ধড়ফড় করে মুখ তুলে তাকায়। ছাতার বাঁটটা তার হাতের মুঠোয় রীতিমতো কাঁপছে।
"রাস্তায় একা বেরোলে মেরুদণ্ডটা সোজা করে চলতে হয়। কেউ চমকালে চোখের দিকে তাকিয়ে দু-কথা শুনিয়ে দিতে হয়। একটা অচেনা অজানা লোক এসে ভয় দেখালো, সেখানে তুমি উল্টে একটা ধমক দিলে ওর বাবার সাধ্য ছিল না এক পা এগোয়। তা নয়, ইনি কাঁপতে কাঁপতে 'ঝামেলা করতে চাই না' বলে মিনমিন করছিলেন! দুনিয়াটা তোমার ড্রয়িংরুম নয় যে সবাই এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে।"
তিতাস একদম চুপ। টুঁ শব্দ করার সাহস নেই তার। লোকটা তাকে বাঁচাল ঠিকই, কিন্তু এর বকুনির চোটে তো বিকাশের থেকেও বেশি ভয় লাগছে!
তিতাসের চোখ ছলছল করে ওঠে। ছোটো থাকতে এতটা বকুনি খেতে হয়নি যেটা এখন এই লোকটা তাকে শোনাচ্ছে।
রূদ্র মুখ দিয়ে 'চ' শব্দ করে। অন্ধকারে তিতাসের হাতটা বার বার চোখের দিকে যেতে দেখে অনুমান করতে পারে, 'নির্ঘাত কান্নাকাটি করছে! এ কী মেয়েরে! আমাকেও যে দু'চারটা কথা শোনাবে তা না, আবার কান্না করতে বসছে। হুরর!' রূদ্র মনে মনে গর্জতে থাকে।
নাক চেপে ধরে ধীরে সুস্থে দু'বার শ্বাস নেয়। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে একবার রাস্তার দু'দিকটা দেখে নেয়। আবার ফিরে তিতাসকে দেখে।
"এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্নার কোনো দরকার নেই। এটা সিরিয়ালের সেট না। বাড়ি গিয়ে কত কান্না করবে করো। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার সামনে অন্তত না।"
তিতাস নাক টানে। লোকটার কথাগুলো তীরের মতো বিঁধছে বুকে। সে এমনিতে সব কিছু নিয়ে একটু বেশি কল্পনা করে, তারওপর রূদ্র যেভাবে তাকে কড়া কথা শোনাচ্ছে তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড ঘা দেয়। চোখের জলটা কোনোমতে আটকে, নাকটা আরেকবার টেনে কাঁপা গলায় সে বলে, "আপনাকে... আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে না। আ... আমি একা চলে যাবো।"