নদীর উপর তখন আগুন আর ধোঁয়ার রাজত্ব।চারদিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঠ, জ্বলন্ত পাল আর মানুষের আর্তচিৎকার। নদীর কালো জলের উপর আগুনের লাল প্রতিফলন দেখে মনে হচ্ছিল—কপোতাক্ষ যেন সত্যিই রক্তে রঙিন হয়ে উঠেছে।
প্রতাপ স্থির চোখে সামনে তাকিয়ে ছিল। দূরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বিশাল সেই মগ যুদ্ধজাহাজ।
অন্য সব জাহাজের চেয়ে অনেক বড়। লোহার মোটা আবরণে ঢাকা।
সামনের অংশে বসানো বিশাল কামান। আর জাহাজের মাথায় দাঁড়িয়ে সেই ভয়ংকর সেনাপতি। তার মুখের একপাশ কাটা। ডান চোখের নিচে গভীর দাগ। হাতে বিশাল তলোয়ার।
সে আবার গর্জে উঠল—“আজ বাংলার নদীতে প্রতাপের শেষ দিন!”
মগ সৈন্যরা উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। বাংলার সৈন্যদের মুখে আবার ভয় ফিরে আসতে লাগল।
কারণ তারা বুঝতে পারছিল—এটা সাধারণ যুদ্ধজাহাজ নয়।
প্রতাপ ধীরে ধীরে নিজের তরবারি নিচে নামাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—“ওরা ভয় দেখাতে চায়।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ নৌসেনাপতি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন—“রাজপুত্র… ওই জাহাজের সামনে আমাদের রণতরী খুব ছোট।”
প্রতাপ নদীর স্রোতের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—“এই অংশে নদী কত গভীর?”
বৃদ্ধ সেনাপতি অবাক হয়ে বললেন—“মাঝখানে গভীর। কিন্তু বাঁ দিকে চর আছে।”
প্রতাপের চোখে সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ ঝিলিক দেখা দিল।
“তাহলে ওদের মাঝনদীর দিকে টেনে আনতে হবে।”
বৃদ্ধ সেনাপতি বুঝতে পেরে বিস্ময়ে তাকালেন।
“আপনি কি… ফাঁদ পাততে চাইছেন?”
প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“বড় শত্রুকে শক্তি দিয়ে হারানো যায় না। বুদ্ধি দিয়ে হারাতে হয়।”
তারপর সে গর্জে উঠল—“সব রণতরী ছড়িয়ে পড়ো! ওদের মাঝনদীর দিকে আনো!”
বাংলার ছোট ছোট জাহাজ মুহূর্তের মধ্যে কুয়াশার আড়ালে ছড়িয়ে গেল।
মগ সেনাপতি হেসে উঠল।
“পালাচ্ছে! বাংলার রাজপুত্র পালাচ্ছে!”
তার বিশাল জাহাজ সামনে এগোতে লাগল। একটার পর একটা কামান গর্জে উঠছে। নদীর জল বিস্ফোরণে আকাশে উঠে যাচ্ছে।
প্রতাপের একটি জাহাজ সরাসরি আঘাতে ভেঙে গেল।
সৈন্যদের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এক তরুণ নাবিক আতঙ্কে বলল—“রাজপুত্র! আমরা আর পারব না!”
প্রতাপ তার কাঁধে হাত রাখল।
“যে নদীতে জন্মেছ… সেই নদীকে বিশ্বাস করো।”
তার চোখে তখন অদ্ভুত শান্তি। হঠাৎ—মগদের বিশাল জাহাজ আরও দ্রুত সামনে এগিয়ে এলো। আর ঠিক তখনই—ভয়ংকর শব্দ। জাহাজটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
তারপর থেমে গেল। মগ সৈন্যদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। কারণ বিশাল জাহাজটা চরায় আটকে গেছে।
প্রতাপের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
“এবার…”
সে হাত তুলল।
“কামান!”
পরের মুহূর্তেই কুয়াশার আড়াল থেকে একসঙ্গে গর্জে উঠল বাংলার সব কামান।
ধাম!
ধাম!
ধাম!
গোলাগুলো সরাসরি গিয়ে আঘাত করল আটকে পড়া জাহাজে। আগুন ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তে। মগ সেনাপতি ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার করল—“জাহাজ ঘোরাও! ঘোরাও!”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। কারণ বিশাল জাহাজটা নড়তেই পারছে না। বাংলার ছোট রণতরীগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল তাদের।
প্রতাপ নিজের জাহাজ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
তার সৈন্যরা উন্মাদের মতো চিৎকার করছে—
“বাংলা! বাংলা!”
নদীর বাতাস কেঁপে উঠল সেই গর্জনে। মগ সেনাপতি এবার নিজেই তলোয়ার হাতে সামনে এলো। সে সরাসরি প্রতাপের জাহাজে লাফ দিল। দুই যোদ্ধা মুখোমুখি। চারদিকে আগুনের আলো। উপরে কালো আকাশ। নিচে উত্তাল নদী।
মগ সেনাপতি হিংস্র চোখে বলল—“তুই শিশু… আমার সামনে দাঁড়াবি?”
প্রতাপ শান্ত গলায় বলল—“আজ নদী ঠিক করবে… কে শিশু।”
পরের মুহূর্তেই ভয়ংকর শব্দে দুই তলোয়ার একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল চারদিকে। মগ সেনাপতির শক্তি ভয়ংকর ছিল।
প্রতিটি আঘাতে ডেক কেঁপে উঠছিল।
কিন্তু প্রতাপ দ্রুত। অস্বাভাবিক দ্রুত। সে নদীর ঢেউয়ের মতো চলছিল। এক আঘাত এড়িয়ে গিয়ে প্রতাপ সরাসরি তার কাঁধে তরবারি বসিয়ে দিল।
রক্ত ছিটকে পড়ল। মগ সেনাপতি গর্জে উঠল।
তারপর উন্মাদের মতো আবার আক্রমণ করল।
দুজনের যুদ্ধ দেখে দুই পক্ষের সৈন্যরাই থেমে গিয়েছিল। কারণ এটা শুধু দুই যোদ্ধার লড়াই ছিল না।
এটা ছিল বাংলার ভবিষ্যতের লড়াই। হঠাৎ বজ্রপাত হলো। সেই আলোয় প্রতাপ দেখল—মগ সেনাপতি কোমরের পাশ থেকে ছোট একটা ছুরি বের করছে। গোপন আক্রমণ।
প্রতাপের চোখ মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে গেল। আর ঠিক তখনই—সে বুঝতে পারল, পরের এক মুহূর্ত তার জীবন বদলে দিতে পারে।
.....................................
বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তের জন্য পুরো নদী আলোকিত করে তুলল। আর সেই আলোতেই প্রতাপ স্পষ্ট দেখতে পেল—মগ সেনাপতির বাম হাত ধীরে ধীরে কোমরের দিকে নামছে।
ছুরি। গোপন আঘাত। প্রতাপের চোখ মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই মগ সেনাপতি উন্মাদের মতো সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিশাল তলোয়ার দিয়ে উপর থেকে আঘাত করল সে।
প্রতাপ আঘাত ঠেকাল। দুই তলোয়ারের সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল চারদিকে। কিন্তু ঠিক তখনই—মগ সেনাপতি হঠাৎ নিচ থেকে ছুরিটা বের করে সরাসরি প্রতাপের পাঁজরের দিকে চালিয়ে দিল।
চারদিকে আতঙ্কের চিৎকার। কিন্তু প্রতাপ যেন আগেই প্রস্তুত ছিল। সে শরীর ঘুরিয়ে নিল শেষ মুহূর্তে। ছুরিটা তার বাহু ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল।
রক্ত ঝরে পড়ল। বাংলার সৈন্যরা চিৎকার করে উঠল—“রাজপুত্র!”
মগ সেনাপতির ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল।“রক্ত বেরোচ্ছে… এবার মরবি!”
প্রতাপ নিজের আহত বাহুর দিকে একবার তাকাল।তারপর ধীরে ধীরে আবার মাথা তুলল। তার চোখের আগুন এবার আরও ভয়ংকর।
“এই রক্ত বাংলার।”
পরের মুহূর্তেই সে এমন গতিতে আক্রমণ করল যে মগ সেনাপতি কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। প্রতাপ এবার আর থামল না। একের পর এক আঘাত। তরবারির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছিল।
মগ সেনাপতি প্রথমবার বুঝতে পারল—সে ভুল করেছে। এই ছেলেটা শুধু সাহসী নয়। সে ভয়ংকর।হঠাৎ প্রতাপ নিচু হয়ে তার আঘাত এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি হাঁটুতে লাথি মারল।
মগ সেনাপতি ভারসাম্য হারাল। আর সেই মুহূর্তেই—প্রতাপ তার গলায় তরবারি ঠেকিয়ে দিল। চারদিক নিস্তব্ধ। নদীর ঢেউয়ের শব্দও যেন থেমে গেছে। মগ সেনাপতির চোখে প্রথমবার ভয় দেখা গেল।
প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“বাংলার নদীতে যারা আগুন জ্বালায়… নদী একদিন তাদেরই গ্রাস করে।”
তারপর এক ঝলকে তরবারি নেমে এলো। চারদিকে স্তব্ধতা। পরের মুহূর্তেই বাংলার সৈন্যরা গর্জে উঠল—“জয়! জয়! জয়!”
সেই গর্জনে রাতের আকাশ কেঁপে উঠল। মগ সৈন্যদের মনোবল মুহূর্তে ভেঙে গেল। কেউ নদীতে ঝাঁপ দিল।কেউ পালানোর চেষ্টা করতে লাগল।
প্রতাপ গর্জে উঠল—“একটাকেও পালাতে দিও না!”
বাংলার রণতরীগুলো ঝড়ের মতো ছুটে গেল। নদীর উপর তখন শুধু আগুন, ধোঁয়া আর যুদ্ধের চিৎকার।
কিছুক্ষণ পর—সব শান্ত। ধীরে ধীরে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে নদীর উপর। জ্বলন্ত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ভাসছে জলে। আহত সৈন্যদের গোঙানি শোনা যাচ্ছে চারদিকে।
প্রতাপ দাঁড়িয়ে ছিল নিজের জাহাজের ধারে। তার বাহু থেকে এখনও রক্ত ঝরছে। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন—“আজ আপনি শুধু যুদ্ধ জেতেননি রাজপুত্র…”তিনি নদীর দিকে তাকালেন। “আজ বাংলাও নতুন ভয় দেখাতে শিখল।”
প্রতাপ কিছু বলল না। সে শুধু নদীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল—দূরে একটা ছোট নৌকা। নৌকাটায় একজন লোক বসে আছে।
কালো চাদরে মুখ ঢাকা। সে স্থির চোখে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে ছিল। অস্বাভাবিক শান্ত। যেন যুদ্ধের ভয়ংকর দৃশ্য তাকে একটুও স্পর্শ করেনি। প্রতাপের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ও কে?”
এক সৈন্য তাকিয়ে বলল—“জানি না রাজপুত্র… যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও লোকটাকে দেখেছিলাম।”
লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর খুব শান্তভাবে মাথা নত করল প্রতাপের দিকে। আর পরের মুহূর্তেই—কুয়াশার ভেতরে মিলিয়ে গেল। প্রতাপ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। কারণ তার মনে হচ্ছিল—লোকটা শুধু যুদ্ধ দেখতে আসেনি।
সে যেন প্রতাপকে দেখতে এসেছিল। আর সেই রাতেই—যশোরের রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেল এক গোপন সংবাদ। দিল্লি প্রতাপাদিত্যের নাম প্রথমবার শুনেছে।⚔️⚔️⚔️যশোর রাজপ্রাসাদের আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো উঠছে। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
দাসরা ছুটোছুটি করছে। প্রহরীদের মুখ গম্ভীর।সভাকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা। কারণ রাতের শেষ প্রহরে দিল্লি থেকে একটি গোপন বার্তা এসেছে।
প্রতাপ ধীরে ধীরে সভাকক্ষে ঢুকল। তার আহত বাহু কাপড়ে বাঁধা। কিন্তু মুখে কোনো ক্লান্তি নেই। বরং যুদ্ধের পর তাকে আরও কঠিন লাগছিল। সভাকক্ষে বিক্রমাদিত্য, বসন্ত রায় আর কয়েকজন প্রধান মন্ত্রী বসে ছিলেন।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা দূত। কালো পোশাক। ধুলোয় ঢাকা শরীর। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। প্রতাপ ঢুকতেই লোকটা মাথা নত করল।
বিক্রমাদিত্য নিচু গলায় বললেন—“দিল্লি তোমার কথা জেনে গেছে।”
ঘরের বাতাস মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। প্রতাপ স্থির গলায় জিজ্ঞেস করল—“সম্রাটের দরবার এত দ্রুত খবর পেল কীভাবে?”
কেউ উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বসন্ত রায় ধীরে ধীরে বললেন—“ মোঘল সাম্রাজ্যের চোখ সব জায়গায় থাকে।”
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো। তার মনে হঠাৎ নদীর সেই রহস্যময় লোকটার কথা ভেসে উঠল। কালো চাদর। অস্বাভাবিক শান্ত চোখ। সে কি গুপ্তচর ছিল?দূত এবার সামনে এগিয়ে এলো।
“দিল্লির কয়েকজন আমীর মনে করছেন… যশোরে নতুন এক শক্তি জন্ম নিচ্ছে।”
এক মন্ত্রী উদ্বিগ্ন গলায় বলল—“এটা ভালো লক্ষণ নয়।”
দূত নিচু স্বরে বলল—“সম্রাট আকবর এখনও নীরব। কিন্তু সুবেদারদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।”
প্রতাপ ধীরে ধীরে সভার মাঝখানে এসে দাঁড়াল।“তারা ভয় পেয়েছে?”
দূত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—“ভয়… আর কৌতূহল।”
প্রতাপের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “তাহলে শুরু হয়েছে।”
বিক্রমাদিত্য এবার কড়া গলায় বললেন—“এটাকে খেলা ভেবো না প্রতাপ। দিল্লি যখন কাউকে লক্ষ্য করে… তখন শুধু মানুষ নয়, পুরো রাজ্য মুছে যায়।”
প্রতাপ শান্তভাবে বাবার দিকে তাকাল।“যে ভয় পেয়ে বাঁচে… সে এমনিতেও মরে যায়।”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো।ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ গোলমালের শব্দ শোনা গেল।
এক প্রহরী দৌড়ে ভেতরে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“মহারাজ! নদীর ঘাটে একটা অদ্ভুত জাহাজ দেখা গেছে!”
সবাই চমকে উঠল। প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলো। নদীর ধারে পৌঁছে সে দেখল—ঘন কুয়াশার মধ্যে সত্যিই একটা বড় জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেটা মগদের জাহাজ নয়। জাহাজের গায়ে অদ্ভুত চিহ্ন। উঁচু মাস্তুল। লোহার কামান।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত—জাহাজের মাথায় উড়ছে বিদেশি পতাকা। এক সৈন্য আতঙ্কে বলল—“এরা কারা?”
বৃদ্ধ নৌসেনাপতি চোখ ছোট করে তাকিয়ে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“পর্তুগিজ…”
চারদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। এই বিদেশিদের কথা সবাই শুনেছে। কেউ বলে তারা ব্যবসায়ী। কেউ বলে জলদস্যু। আবার কেউ বলে—ওরা টাকার জন্য শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলায়।
জাহাজ থেকে ধীরে ধীরে কয়েকজন লোক নেমে এলো। তাদের পোশাক অদ্ভুত। কারও মুখে দাড়ি।কারও কোমরে বন্দুক।
সবচেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বাংলায় ভাঙা গলায় বলল—“আমরা যুদ্ধের কথা শুনেছি।”
প্রতাপ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা হালকা হাসল।“আপনি নদীতে ভালো যুদ্ধ করেন, রাজপুত্র।”
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল— “তোমরা এখানে কেন এসেছ?”
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিল—“কারণ বাংলায় যুদ্ধ আসছে।”
নদীর বাতাস যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।প্রতাপ ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল—“আর তোমরা সেই যুদ্ধের কোন পাশে থাকবে?”
পর্তুগিজ লোকটা এবার রহস্যময় হাসল।“যে পাশে লাভ বেশি।”
সৈন্যদের অনেকেই রাগে হাত রাখল তরবারির উপর।কিন্তু প্রতাপ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন চিন্তার ছায়া।
কারণ সে বুঝতে পারছিল—বাংলার নদীতে এখন শুধু মগ জলদস্যু নয়…আরও ভয়ংকর খেলোয়াড় নামতে চলেছে।
...............................................
কপোতাক্ষ নদীর উপর তখন ঘন কুয়াশা ভাসছে।নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা যশোরের সৈন্যরা স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল সেই বিশাল পর্তুগিজ জাহাজটার দিকে। কাঠের কালো গায়ে লোহার মোটা আবরণ, মুখ বের করা কামান আর উঁচু মাস্তুল দেখে বোঝাই যাচ্ছিল—এরা সাধারণ ব্যবসায়ী নয়।
প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখ স্থির। পর্তুগিজদের নেতা এখনও রহস্যময় হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার দাড়িতে বৃষ্টির জল জমে আছে। কোমরে অদ্ভুত ধরনের লম্বা বন্দুক। চোখদুটো ঠান্ডা… কিন্তু হিসেবি।
সে আবার বলল—“বাংলার নদী খুব সুন্দর… কিন্তু খুব দুর্বল।”
এই কথাটা শুনে যশোরের কয়েকজন সৈন্য রাগে ফুঁসে উঠল। একজন তরবারি বের করতেই প্রতাপ হাত তুলে থামাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—“দুর্বল নদী এতক্ষণে তোমাদের জাহাজ ডুবিয়ে দিত।”
পর্তুগিজ নেতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে উঠল।
“আমি বুঝতে পারছি… তোমার কথা কেন দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছেছে।”
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো।“তুমি অনেক কিছু জানো।”
লোকটা শান্ত গলায় বলল—“আমরা সমুদ্রের মানুষ। খবর আমাদের আগে পৌঁছায়।”
বৃদ্ধ নৌসেনাপতি প্রতাপের কানে নিচু গলায় বললেন—“এদের বিশ্বাস করা বিপজ্জনক রাজপুত্র।”
প্রতাপ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু পর্তুগিজ জাহাজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ কামানগুলোর উপর স্থির হলো। ওগুলো বাংলার কামানের চেয়ে আলাদা।বড়।ভারী।আর অনেক বেশি ভয়ংকর।
পর্তুগিজ নেতা সেটা লক্ষ্য করল। সে হালকা হেসে বলল—“ওগুলো পছন্দ হয়েছে?”
প্রতাপ এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল—“কত দূর পর্যন্ত আঘাত করতে পারে?”
লোকটার চোখে মুহূর্তে কৌতূহল ফুটে উঠল। কারণ সাধারণ রাজারা বিদেশি অস্ত্র দেখে ভয় পায়। কিন্তু এই যুবক ভয় পাচ্ছে না। সে হিসেব করছে।
লোকটা ধীরে ধীরে বলল—“যত দূর পর্যন্ত মৃত্যু পৌঁছাতে পারে।”
প্রতাপের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।“তাহলে বাংলার নদীতে এগুলোর দরকার হবে।”
চারদিকে মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো। বসন্ত রায়, যিনি দূর থেকে সব দেখছিলেন, তাঁর চোখে চিন্তার ছায়া ফুটে উঠল। কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন—প্রতাপ শুধু যুদ্ধ করতে শিখছে না। সে যুদ্ধ বদলাতে চাইছে।
ঠিক তখনই নদীর ওপাশ থেকে হঠাৎ একটা ছোট নৌকা দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখা গেল। নৌকার মাঝি আতঙ্কে চিৎকার করছে।“বাঁচান! বাঁচান!”
সবাই তাকাল। নৌকাটা ঘাটে এসে ধাক্কা খেতেই একজন আহত লোক মাটিতে পড়ে গেল। তার শরীর রক্তে ভেজা।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“দক্ষিণের গ্রামগুলোতে আবার আক্রমণ হয়েছে…”
প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে সামনে ঝুঁকে পড়ল।“কারা করেছে?”
লোকটা কষ্টে বলল—“মগ… আর…”
সে থেমে গেল। চোখে আতঙ্ক। প্রতাপ কড়া গলায় বলল—“আর কে?”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে নদীর দিকে আঙুল তুলল।“বিদেশি বন্দুকও ছিল…”
সবাই একসঙ্গে পর্তুগিজদের দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সৈন্যদের হাত আবার তরবারির উপর চলে গেল।
পর্তুগিজ নেতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—“সমুদ্রে সবাই ব্যবসা করে রাজপুত্র। কেউ মসলার… কেউ যুদ্ধের।”
প্রতাপের চোখে তখন আগুন জ্বলছে।“তাহলে তোমরা জলদস্যুদের অস্ত্র দিচ্ছ?”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।“যে দাম দেয়… আমরা তার সঙ্গেই থাকি।”
এক মুহূর্তের জন্য চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর—প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠস্বর এবার বরফের মতো ঠান্ডা।
“ভুল জায়গায় এসেছ।”
পর্তুগিজ নেতা ভ্রু তুলল।“ওহ?”
প্রতাপ সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।“বাংলা বিক্রির জায়গা নয়।”
নদীর বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল। দুই পক্ষের সৈন্য একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। আর ঠিক তখনই—দূরে নদীর শেষ প্রান্তে হঠাৎ আরেকটা শিঙার শব্দ ভেসে এলো।একটা নয়। অনেকগুলো।
বৃদ্ধ নৌসেনাপতির মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি ফিসফিস করে বললেন—“অসম্ভব…”
প্রতাপ চোখ সরু করে কুয়াশার দিকে তাকাল। ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে উঠতে লাগল বিশাল সব ছায়া। একটার পর একটা যুদ্ধজাহাজ। আর তাদের মাথায় উড়ছে—মোগল সাম্রাজ্যের পতাকা।
.....................................
কপোতাক্ষ নদীর উপর তখন মৃত্যুর মতো নীরবতা।ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছিল বিশাল সব যুদ্ধজাহাজের ছায়া। একটার পর একটা। যেন অন্ধকারের বুক চিরে কোনো দানবের বহর এগিয়ে আসছে।
আর প্রতিটি জাহাজের মাথায় উড়ছে একই পতাকা।মোগল সাম্রাজ্যের পতাকা। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা যশোরের সৈন্যদের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
কারও হাত কাঁপছে। কারও নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।কারণ তারা জানত—মগ জলদস্যুরা ভয়ংকর। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্য?
ওটা এক দানব। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি ফিসফিস করে বললেন—“এত দ্রুত ওরা এখানে পৌঁছে গেল কিভাবে…”
প্রতাপ কোনো উত্তর দিল না। সে স্থির চোখে সামনে তাকিয়ে রইল। তার মুখে ভয় নেই। বরং তার চোখে তখন অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পর্তুগিজ নেতা ধীরে ধীরে হেসে উঠল।
“দেখছি… দিল্লি তোমাকে সত্যিই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।”
প্রতাপ এবার তার দিকে তাকাল।“তুমি কি আগে থেকেই জানতে?”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।“সমুদ্র অনেক খবর বহন করে।”
প্রতাপের চোখ আরও সরু হয়ে এলো। তার মনে হচ্ছিল—এই লোকগুলো শুধু ব্যবসায়ী নয়। এরা সবসময় হিসেব করে চলে।
কার শক্তি বাড়ছে। কার পতন আসছে। সব। ঠিক তখনই মোগল বহরের সবচেয়ে বড় জাহাজটা সামনে এগিয়ে এলো।
তার সামনের অংশ লোহার মোটা আবরণে ঢাকা।দুই পাশে বিশাল কামান। আর উপরে দাঁড়িয়ে আছে কালো বর্ম পরা সৈন্য। ধীরে ধীরে একটা লোক সামনে এসে দাঁড়াল।
উঁচু দেহ। ঘন দাড়ি। চোখে কঠিন দৃষ্টি। তার গায়ে মোগল সেনাপতির পোশাক। লোকটা নদীর ওপার থেকেই গম্ভীর গলায় বলল—“যশোরের রাজপুত্র কে?”
চারদিক নিস্তব্ধ। প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।“আমি প্রতাপ।”
মোগল সেনাপতি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—“আমি সুবেদার আব্রাহাম খাঁর দূত।”
এই নাম শুনতেই অনেকের মুখের রঙ বদলে গেল।আব্রাহাম খাঁ। বাংলায় মোগল শক্তির অন্যতম ভয়ংকর নাম। দূত আবার বলল—“দিল্লি তোমার কথা শুনেছে।”
প্রতাপ শান্ত গলায় বলল—“দিল্লির কান খুব লম্বা।”
মোগল সৈন্যদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।দূতের চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল।“সম্রাট আকবরের রাজ্যে দাঁড়িয়ে এমন ভাষা ব্যবহার বিপজ্জনক।”
প্রতাপ নদীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল— “বাংলার নদী এখনও আকবরের নয়।”
চারদিকে টানটান উত্তেজনা। পর্তুগিজরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছে। যেন তারা অপেক্ষা করছে—কখন আগুন জ্বলবে। মোগল দূত এবার গলা শক্ত করল।“সম্রাট চান যশোর দিল্লির প্রতি আনুগত্য স্বীকার করুক। কর দিলে শান্তি থাকবে।”
প্রতাপ হালকা হাসল।“আর যদি না দিই?”
দূতের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল।“তাহলে শান্তির বদলে যুদ্ধ আসবে।”
বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যশোরের সৈন্যরা প্রতাপের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ তারা জানে—এই মুহূর্তে তার একটা কথাই ইতিহাস বদলে দিতে পারে। প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার পায়ের নিচে নদীর ভেজা কাদা। মাথার উপর কালো আকাশ। আর সামনে দাঁড়িয়ে মোগল সাম্রাজ্যের দূত। প্রতাপ সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর শান্ত।
কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে আগুন ছিল।“দিল্লিকে গিয়ে বলো…”
চারদিক নিস্তব্ধ।“বাংলার মাটি মাথা নত করতে জানে না।”
মুহূর্তের মধ্যে মোগল সৈন্যদের মুখ বদলে গেল। কেউ তরবারির হাতলে হাত রাখল। কেউ ক্ষুব্ধ চোখে তাকাল প্রতাপের দিকে। দূতের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।“তুমি যুদ্ধ ডাকছ রাজপুত্র।”
প্রতাপ এবার আকাশের দিকে তাকাল। বজ্রপাত হলো।তার চোখে সেই আলো জ্বলে উঠল।“না।”
সে আবার দূতের দিকে তাকাল।“যুদ্ধ তো তোমরাই নিয়ে এসেছ।”
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর মোগল দূত ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।“খুব শীঘ্রই দেখা হবে প্রতাপাদিত্য।”
বিশাল মোগল জাহাজগুলো ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল। কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল তাদের ছায়া। কিন্তু নদীর বাতাসে যেন যুদ্ধের গন্ধ রয়ে গেল।দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্তুগিজ নেতা হালকা হেসে বলল—“এখন বুঝতে পারছ? বাংলায় বড় ঝড় আসছে।”
প্রতাপ চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ভয় ছিল না। ছিল শুধু এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কারণ সে বুঝে গিয়েছে—আজ থেকে তার লড়াই শুধু জলদস্যুদের বিরুদ্ধে নয়। আজ থেকে তার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো মোগল সাম্রাজ্য।
...........................................
কপোতাক্ষ নদীর উপর ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। মোগল যুদ্ধজাহাজগুলোর ছায়া ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল নদীর শেষ প্রান্তে। কিন্তু তাদের চলে যাওয়ার পরও বাতাসে এক অদ্ভুত চাপা ভার রয়ে গিয়েছিল।
যেন যুদ্ধ এখনও এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। নদীর ধারে স্থির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল প্রতাপ। তার পেছনে যশোরের সৈন্যরা। কারও চোখে উত্তেজনা। কারও চোখে ভয়।
কারণ তারা বুঝে গেছে—আজ যা হলো, সেটা শুধু কথার সংঘর্ষ ছিল না। এটা ছিল যুদ্ধের শুরু। হঠাৎ পিছন থেকে বিক্রমাদিত্যের কণ্ঠ ভেসে এলো—“তুমি আগুনে হাত দিয়েছ প্রতাপ।”
প্রতাপ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। বিক্রমাদিত্যের মুখ কঠিন। চোখে চিন্তার ছায়া। তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন—“মোগলরা অপমান ভোলে না।”
প্রতাপ শান্ত স্বরে উত্তর দিল—“আমিও দাসত্ব মেনে নিই না।”
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল।তারপর বিক্রমাদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি এখনও বুঝছ না। দিল্লির সঙ্গে যুদ্ধ মানে শুধু সৈন্যের যুদ্ধ নয়। ওরা সময় নিয়ে আঘাত করে। বন্ধুকে শত্রু বানায়। রাজ্য কিনে নেয়। মানুষ ভেঙে দেয়।”
প্রতাপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“তাহলে আমাদেরও বদলাতে হবে।”
বিক্রমাদিত্য ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।“কী বলতে চাইছ?”
প্রতাপ নদীর দিকে তাকাল।“আমাদের শুধু তরবারি দিয়ে লড়লে হবে না। নদী, মানুষ, বাণিজ্য—সবকিছুকে অস্ত্র বানাতে হবে।”
বৃদ্ধ নৌসেনাপতি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারণ প্রতাপের কথা শুনে মনে হচ্ছিল—সে যেন বহু আগেই এই যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে।
ঠিক তখনই পর্তুগিজ নেতা ধীরে ধীরে সামনে এলো।তার ঠোঁটে আগের সেই রহস্যময় হাসি।“রাজপুত্র… তুমি সাহসী।”
প্রতাপ ঠান্ডা চোখে তাকাল।“সাহস আর বোকামির মধ্যে পার্থক্য আছে।”
লোকটা হেসে উঠল।“ঠিক তাই। তাই আমি তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই।”
চারদিকে নীরবতা। প্রতাপ কিছু বলল না। পর্তুগিজ নেতা ধীরে ধীরে বলল—“দিল্লির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে তোমার কামান লাগবে। বারুদ লাগবে। বড় জাহাজ লাগবে।”
সে নিজের জাহাজের দিকে তাকাল।“আমরা সেগুলো দিতে পারি।”
এক মন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল— “বিদেশিদের বিশ্বাস করা যায় না!”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।“বিশ্বাস না করলেও ব্যবসা করা যায়।”
প্রতাপ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।“বিনিময়ে কী চাও?”
পর্তুগিজ নেতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল—“নদীপথে ব্যবসার অধিকার। আর… মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগ।”
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল—এরা শুধু লাভের জন্য আসেনি। এরা বাংলার অস্থিরতাকে ব্যবহার করতে চায়।
ঠিক তখনই হঠাৎ নদীর দিক থেকে আরেকজন সৈন্য দৌড়ে এলো। লোকটা হাঁপাচ্ছে।“রাজপুত্র! দক্ষিণ সীমান্ত থেকে খবর এসেছে!”
প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।“কি খবর?”
সৈন্যটা গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বলল—“কয়েকটা ছোট জমিদার মোগলদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।”
চারদিকে মুহূর্তে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। এক মন্ত্রী আতঙ্কে বলে উঠল—“এত তাড়াতাড়ি?”
সৈন্যটা মাথা নিচু করল।
“সবাই ভয় পাচ্ছে রাজপুত্র। তারা ভাবছে… মোগলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অসম্ভব।”
প্রতাপের মুখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল—যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই দিল্লি আঘাত করতে শুরু করেছে। মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে।
বসন্ত রায় এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন।হঠাৎ তিনি ধীরে ধীরে বললেন—“ভয় খুব শক্তিশালী অস্ত্র প্রতাপ।”
প্রতাপ তাঁর দিকে তাকাল। বসন্ত রায়ের চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি।“যে ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে… সে রাজ্যও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। প্রতাপ বুঝতে পারছিল না—এই কথার মধ্যে সতর্কতা বেশি, নাকি অন্য কিছু।
হঠাৎ দূরে মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। সন্ধ্যা নেমে আসছে। নদীর জলে লাল আভা পড়েছে। প্রতাপ ধীরে ধীরে নদীর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন অদ্ভুত দৃঢ়তা।
সে খুব নিচু গলায় বলল—“যদি যুদ্ধ আসেই…”তারপর ধীরে ধীরে মুঠি শক্ত করল।“তাহলে বাংলা এবার প্রস্তুত হবে।”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—দূরে, কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা মানুষ নিঃশব্দে সবকিছু দেখছিল। কালো পোশাক। মুখ ঢাকা। তার হাতে মোগল সাম্রাজ্যের সিলমোহর।
.............................................
সন্ধ্যা নেমেছে যশোরে। আকাশে লালচে অন্ধকার।নদীর উপর কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। দূরে মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরে শান্তি নেই।
সভাকক্ষে তখন তীব্র আলোচনা চলছে। একদিকে মোগলদের হুমকি। অন্যদিকে সীমান্তের জমিদারদের ভয়। সবাই বুঝতে পারছিল—বাংলার মাটিতে বড় কিছু ঘটতে চলেছে।
প্রতাপ সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ শান্ত, কিন্তু চোখে অদ্ভুত কঠোরতা।
এক বৃদ্ধ মন্ত্রী উদ্বিগ্ন গলায় বললেন—“রাজপুত্র, এখনও সময় আছে। দিল্লির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া ঠিক হবে না।”
আরেকজন বলল—“কয়েকটা জমিদার যদি মোগলদের দিকে চলে যায়, পুরো অঞ্চল দুর্বল হয়ে পড়বে।”
প্রতাপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“যারা ভয় পেয়ে শত্রুর কাছে মাথা নত করে… তারা কোনোদিন আমাদের ছিলই না।”
ঘর নিস্তব্ধ। বিক্রমাদিত্য গভীর চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন—প্রতাপ আর শুধু রাজপুত্র নেই। সে ধীরে ধীরে নেতা হয়ে উঠছে।
ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ গোলমালের শব্দ শোনা গেল।এক প্রহরী দ্রুত ভেতরে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“মহারাজ! ঘাটে একজন সাধু এসেছে!”
এক মন্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলল—“এখন এসবের সময়?”
কিন্তু প্রহরীর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল বিষয়টা সাধারণ নয়।
“লোকটা বলছে… সে শুধু রাজপুত্র প্রতাপের সঙ্গেই কথা বলবে।”
প্রতাপের ভ্রু কুঁচকে গেল। কিছুক্ষণ পর নদীর ঘাটে পৌঁছে সে দেখল—ঘন কুয়াশার মধ্যে সত্যিই একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। লম্বা জটা। সাদা দাড়ি। গায়ে ভেজা গেরুয়া কাপড়।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তাঁর চোখ। অস্বাভাবিক শান্ত। যেন চারপাশের কোনো ভয়ই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে প্রতাপের দিকে তাকালেন।“তুমিই প্রতাপ?”
প্রতাপ মাথা নেড়ে বলল—“হ্যাঁ।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন—“নদী আজ অস্থির।”
প্রতাপ শান্ত গলায় বলল—“যুদ্ধ আসছে।”
বৃদ্ধ হালকা হাসলেন।“যুদ্ধ শুধু বাইরে আসে না রাজপুত্র… যুদ্ধ মানুষের ভেতরেও জন্ম নেয়।”
প্রতাপ এবার গভীরভাবে লোকটার দিকে তাকাল।তার মনে হচ্ছিল—এই মানুষটা সাধারণ কেউ নয়।ঠিক তখনই বৃদ্ধ নিজের কাপড়ের ভেতর থেকে একটা পুরনো তামার মুদ্রা বের করলেন। মুদ্রার উপর অদ্ভুত চিহ্ন খোদাই করা।
তিনি সেটা প্রতাপের হাতে দিয়ে বললেন—“যখন চারদিক অন্ধকার হয়ে যাবে… এটা তোমাকে পথ দেখাবে।”
প্রতাপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—“আপনি কে?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু ধীরে ধীরে বললেন—“মনে রেখো… সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সবসময় বাইরে থাকে না।”
নদীর বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে উঠল। প্রতাপের বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি জমতে লাগল। কারণ বৃদ্ধের কথাগুলো অদ্ভুতভাবে সত্যি মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই দূরে প্রাসাদের দিক থেকে হঠাৎ চিৎকার ভেসে এলো।
“আগুন! আগুন!”
সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল। রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিক থেকে কালো ধোঁয়া উঠছে। প্রতাপ মুহূর্তে দৌড়ে উঠল ঘোড়ায়। সৈন্যরা তার পেছনে ছুটতে লাগল।প্রাসাদে পৌঁছে সে দেখল—অস্ত্রাগারের একাংশ আগুনে জ্বলছে।
চারদিকে আতঙ্ক। সৈন্যরা জল ঢালছে। দাসরা চিৎকার করছে। এক আহত প্রহরী মাটিতে পড়ে কষ্টে বলল—“মুখ ঢাকা কয়েকজন লোক… হঠাৎ আক্রমণ করেছিল…”
প্রতাপের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল।“ধরা গেছে কাউকে?”
প্রহরী কষ্টে মাথা নাড়ল।“না… কিন্তু…”
সে কাঁপতে কাঁপতে বলল—“ওদের একজনের হাতে মোগলদের চিহ্ন ছিল…”
চারদিকে নিস্তব্ধতা। প্রতাপ ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকা অস্ত্রাগারের দিকে তাকাল। আগুনের লাল আলো তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছিল।
ঠিক তখনই—তার মনে পড়ল বৃদ্ধ সাধুর কথা।“সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সবসময় বাইরে থাকে না…”
প্রতাপ ধীরে ধীরে মুঠি শক্ত করল। কারণ সে বুঝতে পারছিল—মোগলরা শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে না। ওরা যশোরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।⚔️⚔️⚔️রাত তখন গভীর। যশোর রাজপ্রাসাদের পশ্চিম অংশ এখনও ধোঁয়ায় ঢাকা। পোড়া কাঠের গন্ধ বাতাসে ভাসছে। অস্ত্রাগারের ভেতরে জ্বলন্ত আগুনের শেষ শিখাগুলো মাঝে মাঝে লাল আলো ছড়িয়ে আবার নিভে যাচ্ছে।
চারদিকে টানটান উত্তেজনা। প্রহরীরা দ্বিগুণ সতর্ক।প্রাসাদের প্রতিটি ফটকে পাহারা বাড়ানো হয়েছে।কিন্তু সেই রাতের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস ছিল—নীরবতা।
প্রতাপ ধীরে ধীরে জ্বলন্ত অস্ত্রাগারের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ স্থির। মাটিতে পড়ে আছে পোড়া তীর, ভাঙা তরবারি, ছাই হয়ে যাওয়া বারুদের পিপে।
একজন বৃদ্ধ সেনাপতি নিচু গলায় বললেন—“এটা সাধারণ হামলা নয় রাজপুত্র।”
প্রতাপ হাঁটু গেড়ে মাটির দিকে তাকাল। ছাইয়ের মধ্যে একটা ছোট ধাতব বস্তু পড়ে আছে। সে সেটা তুলে নিল। মোগল চিহ্ন খোদাই করা একটা আংটি।চারদিকে মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বৃদ্ধ সেনাপতির মুখ শক্ত হয়ে উঠল।“দিল্লির গুপ্তচর…”
প্রতাপ আংটিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—“না।”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। প্রতাপ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।“এরা শুধু গুপ্তচর নয়।”
সে চারদিকে চোখ বুলাল।“এরা আমাদের ভেতরের খবর জানে।”
কথাটা শুনে সভাসদদের অনেকের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কারণ এর মানে—যশোর রাজপ্রাসাদের ভেতরেই কেউ বিশ্বাসঘাতক। ঠিক তখনই বিক্রমাদিত্য ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে ক্লান্তি।
“তুমি কি বলতে চাইছ… আমাদের মধ্যেই কেউ দিল্লির হয়ে কাজ করছে?”
প্রতাপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—“অস্ত্রাগারের পাহারা কোথায় দুর্বল, বারুদ কোথায় রাখা থাকে… এগুলো বাইরের কেউ জানার কথা নয়।”
বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এক মন্ত্রী আতঙ্কিত গলায় বলল—“তাহলে আমরা কী করব?”
প্রতাপের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।“শত্রুকে ভয় দেখাতে হবে।”
ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো। আকাশের আলো কয়েক মুহূর্তের জন্য সভাকক্ষ আলোকিত করে আবার মিলিয়ে গেল।
প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“আজ রাত থেকেই প্রাসাদের সব ফটক বন্ধ থাকবে। প্রত্যেক প্রহরীকে বদলানো হবে। আর—”
সে থামল। তার চোখ সভাকক্ষে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের মুখের উপর ঘুরে গেল।“কেউ কাউকে বিশ্বাস করবে না।”
কথাটা শুনে ঘরের ভেতর ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। কারণ প্রতাপের কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না।ছিল শুধু সিদ্ধান্ত। সেই রাতেই যশোর রাজপ্রাসাদ যেন দুর্গে পরিণত হলো।
প্রতিটি করিডরে মশাল জ্বলছে। প্রহরীরা হাতে বর্শা নিয়ে টহল দিচ্ছে। দূরে দূরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। প্রতাপ একা হাঁটছিল প্রাসাদের দীর্ঘ বারান্দা দিয়ে। তার হাতে এখনও সেই মোগল আংটি।
হঠাৎ—পেছনে খুব ক্ষীণ শব্দ। কারও পায়ের শব্দ।প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ। তার হাত ধীরে ধীরে তরবারির হাতলে চলে গেল।
আবার সেই শব্দ। খুব ধীরে। যেন কেউ লুকিয়ে অনুসরণ করছে। প্রতাপ আচমকা ঘুরে দাঁড়াল।“কে ওখানে?!”
মশালের আলো কাঁপতে লাগল। কিন্তু করিডর ফাঁকা।কেউ নেই। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর—দূরের অন্ধকার থেকে একটা ছায়া দ্রুত সরে গেল।
প্রতাপ বিদ্যুতের মতো ছুটে গেল তার পেছনে। দীর্ঘ করিডর। অন্ধকার সিঁড়ি। দেয়ালে কাঁপতে থাকা মশালের আলো। ছায়ামূর্তিটা অসম্ভব দ্রুত দৌড়াচ্ছে।
প্রতাপ গর্জে উঠল—“থামো!”
কিন্তু লোকটা থামল না। সে সরাসরি প্রাসাদের পেছনের পুরনো অংশের দিকে ঢুকে গেল। ওই অংশ বহু বছর ধরে বন্ধ। অন্ধকার। ভাঙা দেয়াল। ধুলো আর মাকড়সার জালে ভর্তি।
প্রতাপ সেখানে পৌঁছে চারদিকে তাকাল। নিঃশব্দ।হঠাৎ—উপরে কোথাও কাঠের শব্দ। প্রতাপ মাথা তুলতেই একটা কালো ছায়া ছাদের উপর দিয়ে লাফ দিল।
প্রতাপও পিছনে ছুটল। পরের মুহূর্তেই শুরু হলো ভয়ংকর ধাওয়া। পুরনো ছাদের উপর বৃষ্টির জল।পিচ্ছিল কাঠ। চারদিকে ঝড়ের শব্দ।
ছায়ামূর্তিটা প্রায় পালিয়েই যাচ্ছিল। ঠিক তখনই প্রতাপ কোমর থেকে ছোট ছুরি বের করে ছুড়ে মারল।ছুরিটা গিয়ে লোকটার কাঁধে গেঁথে গেল। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে নিচে পড়ে গেল।
প্রতাপ দ্রুত নিচে নেমে তার গলা চেপে ধরল।লোকটার মুখ কাপড়ে ঢাকা। প্রতাপ রাগে গর্জে উঠল—“কে পাঠিয়েছে তোকে?!”
লোকটা কষ্টে হাসল। সেই হাসি শুনে প্রতাপের বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত অস্বস্তি জন্ম নিল। কারণ লোকটা ভয় পাচ্ছে না। একটুও না। সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—“যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে প্রতাপাদিত্য…”
তারপর—লোকটা নিজের মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখা বিষ কামড়ে ফেলল। প্রতাপ তাকে থামানোর আগেই তার শরীর কাঁপতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লোকটা নিথর।
প্রতাপ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল মৃতদেহটার দিকে।বৃষ্টির জল ধীরে ধীরে রক্ত ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।আর ঠিক তখনই—লোকটার কাপড় সরে গিয়ে তার বুকের উপর খোদাই করা একটা চিহ্ন দেখা গেল। একটা কালো সূর্যচিহ্ন। যেটা প্রতাপ আগে কখনও দেখেনি।
.............................................
বৃষ্টি তখনও থামেনি। পুরনো প্রাসাদের ভাঙা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে প্রতাপ স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল মৃত গুপ্তচরটার দিকে। চারপাশে ঝড়ের শব্দ। মশালের আলো বাতাসে কাঁপছে।
আর সেই কাঁপতে থাকা আলোতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল লোকটার বুকের উপর খোদাই করা অদ্ভুত চিহ্নটা।কালো সূর্য। প্রতাপ ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। তার চোখ সংকুচিত হয়ে এলো। সে আঙুল দিয়ে চিহ্নটার উপর জমে থাকা রক্ত মুছে দিল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে বৃদ্ধ নৌসেনাপতি আর কয়েকজন সৈন্য ছুটে এলো। এক সৈন্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“রাজপুত্র! আপনি ঠিক আছেন?”
প্রতাপ উত্তর দিল না। সে শুধু মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ সেনাপতি কাছে এসে থমকে গেলেন।“এটা…”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট ভয়। প্রতাপ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।“তুমি এই চিহ্ন চেনো?”
বৃদ্ধ লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। বৃষ্টির জল তার কপাল বেয়ে পড়ছে। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—“অনেক বছর আগে… এই চিহ্নের কথা শুনেছিলাম।”
চারদিকে নিস্তব্ধতা। প্রতাপ উঠে দাঁড়াল।“সব বলো।”
বৃদ্ধ সেনাপতি গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বললেন—“এরা ভাড়াটে ঘাতক। ছায়ার মধ্যে থাকে। টাকা আর আদেশ ছাড়া এদের আর কোনো ধর্ম নেই।”
তিনি মৃতদেহটার দিকে তাকালেন।“অনেকে বলে… দিল্লির গোপন লোকেরা এদের ব্যবহার করে।”
প্রতাপের চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।“মানে মোগলরা এখন গুপ্তঘাতক পাঠাচ্ছে?”
বৃদ্ধ লোকটা মাথা নাড়লেন।
“যদি সত্যি ওরা হয়… তাহলে বিষয়টা খুব ভয়ংকর।”
বজ্রপাত। চারপাশ এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। ঠিক তখনই প্রতাপের চোখে একটা জিনিস পড়ল। মৃত লোকটার কোমরের কাছে ছোট একটা চামড়ার থলি।
সে সেটা খুলে দেখল—ভেতরে একটা ছোট মানচিত্র।যশোর রাজপ্রাসাদের। কিছু জায়গায় লাল দাগ দেওয়া। অস্ত্রাগার। দক্ষিণ ফটক। আর…
প্রতাপের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদের গোপন সুড়ঙ্গ। যেটার কথা খুব কম মানুষ জানে।বাতাস যেন মুহূর্তে আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল। প্রতাপ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—“অসম্ভব…”
বৃদ্ধ সেনাপতি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন—“কি হয়েছে?”
প্রতাপ মানচিত্রটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।“এই তথ্য বাইরের কারো জানার কথা না।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর তার চোখে হঠাৎ ভয়ংকর এক উপলব্ধি ফুটে উঠল।“আমাদের খুব কাছের কেউ ওদের সাহায্য করছে।”
নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে মশালের আগুন দুলিয়ে দিল। সৈন্যদের অনেকেই অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। কারণ এখন শত্রু শুধু বাইরে নয়—ভেতরেও আছে।
ঠিক তখনই নিচে প্রাসাদের দিক থেকে দ্রুত ঘোড়ার শব্দ ভেসে এলো। এক সৈন্য দৌড়ে ছাদে উঠে এল।তার মুখ আতঙ্কে ফ্যাকাসে।
“রাজপুত্র!”
প্রতাপ দ্রুত তার দিকে তাকাল।“কি হয়েছে?”
সৈন্যটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“উত্তরের পাহারাদার টাওয়ারে হামলা হয়েছে!”
সবাই চমকে উঠল।“কী?!”
“প্রহরীদের কয়েকজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে!”
প্রতাপের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।“আক্রমণকারী?”
সৈন্যটা কাঁপা গলায় বলল—“কেউ দেখেনি… কিন্তু দেয়ালে রক্ত দিয়ে একটা চিহ্ন আঁকা আছে…”
প্রতাপের বুকের ভেতর কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।“কালো সূর্য?”
সৈন্যটা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে শোনা যেতে লাগল।
প্রতাপ ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে এখন আর শুধু রাগ নেই। ছিল সন্দেহ। কারণ সে বুঝতে পারছিল—এটা সাধারণ হত্যা নয়। কেউ ইচ্ছে করে ভয় ছড়াচ্ছে। প্রাসাদের ভেতরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিতে চাইছে।
আর ঠিক তখনই—প্রতাপের মনে হঠাৎ একটা নাম ভেসে উঠল। বসন্ত রায়। কারণ গোপন সুড়ঙ্গের কথা প্রাসাদে খুব কম মানুষ জানত। আর তাঁদের মধ্যে একজন—বসন্ত রায়।
..........................................
রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ঝড় ধীরে ধীরে থেমে এলেও বাতাসে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। যশোর রাজপ্রাসাদের প্রতিটি করিডরে মশাল জ্বলছে। সৈন্যদের পায়ের শব্দ, অস্ত্রের ঠোকাঠুকি আর দূরের বজ্রের গর্জনে পুরো প্রাসাদটা যেন যুদ্ধের আগের এক ভয়ংকর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতাপ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল উত্তরের পাহারাদার টাওয়ারের দিকে। তার চোখ কঠিন। হাতে মুঠো করে ধরা সেই মানচিত্র।
পেছনে কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈন্য আর বৃদ্ধ নৌসেনাপতি।টাওয়ারের কাছে পৌঁছাতেই এক তীব্র রক্তের গন্ধ নাকে এলো। প্রহরীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।কারও চোখে আতঙ্ক।
প্রতাপ ভেতরে ঢুকতেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।মাটিতে পড়ে আছে তিনজন পাহারাদারের দেহ।গলা কাটা। দেয়ালে ছিটকে পড়া রক্ত। আর ঠিক মাঝখানের পাথরের দেয়ালে রক্ত দিয়ে আঁকা সেই একই চিহ্ন। কালো সূর্য।
মশালের আলোয় চিহ্নটা আরও ভয়ংকর লাগছিল।প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। তার চোখে এক অদ্ভুত ঠান্ডা আগুন। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি নিচু গলায় বললেন—“ওরা ভয় ছড়াতে চাইছে।”
প্রতাপ কোনো উত্তর দিল না।সে মৃত পাহারাদারদের দিকে তাকাল। লোকগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। একজনের হাতে এখনও ভাঙা বর্শা ধরা।প্রতাপ হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল—“এরা আমার জন্য মরেছে…”
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। হঠাৎ প্রতাপের চোখে কিছু পড়ল। মৃত এক প্রহরীর হাতের নিচে কাপড়ের ছোট্ট একটা টুকরো। সে সেটা তুলে নিল।কালো কাপড়। ঠিক সেই কাপড়ের মতো… যেটা গুপ্তঘাতকের মুখে বাঁধা ছিল।
কিন্তু এর কোণায় সোনালি সুতো দিয়ে সূক্ষ্ম নকশা করা। প্রতাপের চোখ সংকুচিত হয়ে গেল। সে যেন কোথাও এই নকশা দেখেছে।
হঠাৎ—তার মনে পড়ে গেল। বসন্ত রায়ের ব্যক্তিগত রক্ষীদের পোশাকে একই ধরনের সোনালি সেলাই থাকে।
প্রতাপের বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—“তুমি আমাকে সন্দেহ করছ?”
সবাই ঘুরে তাকাল। বসন্ত রায় দাঁড়িয়ে আছেন টাওয়ারের প্রবেশপথে। মশালের আলোয় তাঁর মুখের অর্ধেক উজ্জ্বল, অর্ধেক অন্ধকারে ঢাকা।
প্রতাপ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দুজনের চোখ একে অপরের উপর স্থির হয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। বসন্ত রায় ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তারপর প্রতাপের হাতে থাকা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন।“শুধু একটা কাপড়ের টুকরো দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলে?”
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—“গোপন সুড়ঙ্গের মানচিত্রও ওদের কাছে ছিল।”
বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বসন্ত রায়ের চোখে মুহূর্তের জন্য কিছু একটা ঝলসে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তিনি শান্ত হয়ে গেলেন।
“তুমি কি ভাবছ… আমি দিল্লির হয়ে কাজ করছি?”
প্রতাপ এবার সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকাল।“আমি ভাবছি… কেউ আমাদের ভেতর থেকে ভাঙতে চাইছে।”
বসন্ত রায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“তাহলে খুব সাবধানে চলবে প্রতাপ।”
তিনি আরও কাছে এলেন।“কারণ সন্দেহ যখন শুরু হয়… তখন পরিবারও শত্রু হয়ে যায়।”
মশালের আগুন হঠাৎ বাতাসে দুলে উঠল। প্রতাপ স্থির হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল না—বসন্ত রায় তাকে সতর্ক করছেন…নাকি হুমকি দিচ্ছেন। ঠিক তখনই নিচ থেকে এক সৈন্য চিৎকার করে উঠল—“রাজপুত্র! নদীর দিকে আগুন দেখা যাচ্ছে!”
সবাই দ্রুত টাওয়ারের কিনারায় ছুটে গেল। দূরে নদীর বুকের উপর সত্যিই আগুন জ্বলছে। একটা নয়।অনেকগুলো।
প্রতাপ চোখ সরু করে তাকাল। তারপর তার মুখ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল। কারণ আগুনগুলো স্থির নয়।ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
নদীপথ ধরে। যুদ্ধজাহাজ। আর সেই আগুনের আলোয় দূর থেকে ভেসে উঠল—মোগল যুদ্ধ ঢাকের শব্দ।
চলবে...................