Read The Distance Between Us by Jalaluddin Faruque in Bengali Short Stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

বিচ্ছেদের শুরু

প্রথম অধ্যায়
যে সংসারে ভালোবাসা ছিল, বোঝাপড়া ছিল না
গ্রামের মেয়েদের জীবন অনেকটা নদীর মতো। শৈশবে তারা থাকে শান্ত, স্বচ্ছ, আপনজনের ভালোবাসায় ঘেরা; তারপর একদিন হঠাৎই সেই নদীর গতিপথ বদলে যায়। পরিচিত উঠোন, মায়ের আঁচল, বাবার কণ্ঠস্বর, ভাই-বোনের সঙ্গে ছোট ছোট অভিমান—সবকিছু পেছনে ফেলে তাদের পাড়ি দিতে হয় এক অচেনা ঘাটের দিকে। সেখানে নতুন মানুষ, নতুন নিয়ম, নতুন সম্পর্ক আর নতুন দায়িত্ব অপেক্ষা করে থাকে। কেউ সেই নতুন জীবনে নিজের জায়গা খুঁজে পায়, কেউবা সারাজীবন খুঁজেই যায়।

মায়ার জীবনটাও ছিল তেমনই এক নদীর গল্প।

ছোট্ট এক গ্রামের মেয়ে মায়া। ছোটবেলা থেকেই তার পৃথিবী বলতে ছিল মায়ের আঁচল, বাবার পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সংসার আর বাড়ির মানুষের ভালোবাসা। খুব বেশি চাওয়া-পাওয়া ছিল না তার। দামী পোশাক, বড় বাড়ি কিংবা শহুরে জীবনের বিলাসিতা—এসবের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না। কিন্তু অভাবের মধ্যেও তাদের বাড়িতে একটা জিনিসের অভাব ছিল না—আপনজনের মায়া।

মায়ার বাবা ছিলেন ভীষণ পরিশ্রমী মানুষ। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই তিনি ঘুম থেকে উঠতেন। মুখে পানি দিয়ে, পুরোনো একটা শার্ট গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে যেতেন নিজের ছোট দোকানটার দিকে। ছোট শহরের এক কোণে দোকানটা ছিল। দোকান বললেও আসলে খুব বড় কিছু নয়—টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটা ঘর, সামনে কয়েকটা কাঠের তাক, আর তাকজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস। সারাদিন দোকানে বসে থাকলেও খুব বেশি আয় হতো না। তবু সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় তাঁর মুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি থাকত। কারণ তিনি জানতেন, আজও তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য কিছু করতে পেরেছেন।

সংসারে টাকার টান ছিল, কিন্তু মায়ার বাবা কখনো সন্তানদের সামনে সেই অভাবকে বড় করে দেখাননি। নিজের প্রয়োজন অনেকবার বাদ দিয়েছেন, কিন্তু সন্তানদের প্রয়োজনের সময় কখনো পিছিয়ে যাননি। নতুন জামা না কিনে পুরোনো জামাতেই বছর পার করে দিয়েছেন, কিন্তু মায়ার পড়াশোনার খরচ যেন কোনোভাবে বন্ধ না হয়, সেদিকে সবসময় নজর রেখেছেন।

মায়ার মা ছিলেন সংসারের আরেক স্তম্ভ। সারাদিনের কাজের শেষে তাঁর মুখেও ক্লান্তি থাকত, কিন্তু মায়া কাছে এলেই সেই ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটে উঠত। রাতে মায়া মায়ের পাশে শুয়ে গল্প করত। কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখত, কখনো বলত, বড় হয়ে সে কী করবে। মা চুপচাপ শুনতেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।

“তুই শুধু ভালো মানুষ হবি মা,” মা বলতেন, “জীবনে টাকা-পয়সা সবসময় থাকবে না, কিন্তু ভালো মানুষ থাকলে মানুষ তোকে মনে রাখবে।”

তখন মায়া এসব কথার গভীরতা বুঝত না। মনে হতো, পৃথিবী বুঝি খুব সহজ। মানুষ যাকে ভালোবাসে, সে-ও তাকে ভালোবাসবে। যে আপন, সে কখনো পর হবে না। আর যার সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা, সে কখনো কষ্ট দেবে না।

কিন্তু বড় হতে হতে মায়া বুঝেছিল—জীবন এত সহজ নয়।

সময় নিজের নিয়মে এগিয়ে গেল। ছোট্ট মেয়েটি একসময় কিশোরী হলো, তারপর তরুণী। তার চোখে তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন। ঠিক সেই সময়ই তার জীবনে এলো রাকিব।

রাকিবকে প্রথম দেখায় মায়ার মনে কোনো বিশেষ অনুভূতি জন্মায়নি। ছেলেটি ছিল খুব সাধারণ। না ছিল বড় কোনো চাকরি, না ছিল বিশাল সম্পদ, না ছিল শহুরে আভিজাত্য। কিন্তু তার কথাবার্তায় একটা সরলতা ছিল, যা মায়ার ভালো লাগত। রাকিব খুব বেশি কথা বলত না। বরং মায়া কথা বললে মন দিয়ে শুনত।

ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়ল। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্ব একসময় অজান্তেই ভালোবাসায় পরিণত হলো।

ভালোবাসা যখন জীবনে প্রথম আসে, তখন মানুষ ভবিষ্যতের হিসাব করে না। তখন মনে হয়, মানুষ দুটো যদি একসঙ্গে থাকে, তাহলে পৃথিবীর বাকি সব সমস্যাকে তারা একদিন না একদিন জয় করে নেবে।

মায়াও ঠিক সেটাই ভেবেছিল।

রাকিবও ভেবেছিল।

তাদের বিয়েটা খুব বেশি পরিকল্পনা করে হয়নি। দুই পরিবারের সম্মতি ছিল। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আনন্দ ছিল। বাড়ির উঠোনে মানুষজনের আনাগোনা, রান্নাবান্নার ব্যস্ততা, হাসি-আনন্দ—সব মিলিয়ে কয়েকদিনের জন্য যেন দুই পরিবারই নিজেদের দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়েছিল।

মায়া যখন বিয়ের সাজে বসেছিল, তখন তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্বপ্ন। মনে হচ্ছিল, আজ থেকে তার জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হচ্ছে। যে মানুষটিকে সে ভালোবাসে, সেই মানুষটিই এখন তার জীবনসঙ্গী। মায়া বিশ্বাস করেছিল, সুখী হতে খুব বেশি কিছু লাগে না। পাশে একজন ভালোবাসার মানুষ থাকলেই হয়।

রাকিবও সেদিন মায়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল—যত কষ্টই হোক, সে মায়াকে ভালো রাখবে।

কিন্তু প্রতিজ্ঞা করা সহজ। সেই প্রতিজ্ঞা ধরে রেখে সারাজীবন পথ চলা কঠিন।

বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন মায়ার কাছে সবকিছুই নতুন ছিল। নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক। কখনো সে আনন্দ পেত, কখনো অস্বস্তি হতো। শ্বশুরবাড়ির নিয়মকানুন বুঝতে তার সময় লাগছিল। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, পরিবারের সবার পছন্দ-অপছন্দ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ত।

রাকিব বুঝত মায়ার কষ্ট। কিন্তু সে নিজেও ছিল অসহায়।

তার আয় সীমিত। নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনের দায়িত্ব তার কাঁধে। আলাদা সংসার করার মতো সামর্থ্য তখনও তার তৈরি হয়নি। তাই নিজের ইচ্ছেগুলোকে অনেক সময় তাকে চেপে রাখতে হতো।

মায়া হয়তো বাইরে থেকে শুধু দেখত—রাকিব তাকে নিজের মতো করে সময় দিতে পারছে না।

কিন্তু রাকিবের ভেতরের যুদ্ধটা সে সবসময় দেখতে পেত না।

দিনের পর দিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে রাকিব অনেক সময় শুধু একটু শান্তি চাইত। কিন্তু সেই শান্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল সংসারের নানা সমস্যা।

তারপর একদিন তাদের জীবনে এলো ছোট্ট একটি প্রাণ।

একটি কন্যাসন্তান।

সেদিন রাকিব যখন প্রথমবার তার মেয়েকে কোলে নিয়েছিল, তখন অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারেনি। ছোট্ট মুখটা বুকের কাছে নিয়ে শুধু তাকিয়ে ছিল। যেন পৃথিবীর সব ক্লান্তি, সব দুঃখ, সব অপূর্ণতা সেই মুহূর্তে তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

মায়া তখন পাশে বসে ছিল। তার চোখেও ছিল মাতৃত্বের এক অদ্ভুত আলো।

সেদিন তারা দুজনেই ভেবেছিল—এবার হয়তো তাদের সংসার আরও সুন্দর হবে।

তাদের ছোট্ট মেয়েটা ছিল যেন দুজন মানুষের মাঝখানে রাখা এক টুকরো আলো।

রাকিব মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখত। সে চাইত, তার মেয়েটা যেন তার মতো কষ্ট না পায়। ভালো পড়াশোনা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, জীবনে মাথা উঁচু করে বাঁচবে।

মেয়ের জন্য সে আরও বেশি কাজ করতে শুরু করল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করত। কখনো শরীর খারাপ থাকলেও কাজ বাদ দিত না। নিজের জন্য নতুন জামা কেনার আগে মেয়ের প্রয়োজনের কথা ভাবত। নিজের খাওয়া কমিয়ে হলেও মেয়ের দুধের ব্যবস্থা করত।

কিন্তু সংসারের বাস্তবতা ছিল কঠিন।

টাকা কম ছিল। চাহিদা বাড়ছিল। দায়িত্ব বাড়ছিল। আর সেই দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে মায়ার ভেতরেও যেন কিছু একটা বদলে যেতে শুরু করল।

প্রথমে সেটা খুব সামান্য ছিল।

রাকিব একটু দেরি করে বাড়ি ফিরলে মায়া জিজ্ঞেস করত, “এত দেরি হলো কেন?”

রাকিব স্বাভাবিকভাবেই বলত, “কাজ ছিল।”

মায়া আর কিছু বলত না।

কিন্তু কিছুদিন পর সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি প্রশ্ন—

“কার সঙ্গে ছিলে?”

রাকিব অবাক হয়ে তাকাত।

“কাজের লোকজনের সঙ্গে।”

“মেয়ে ছিল?”

প্রশ্নটা শুনে রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত।

সে বুঝতে পারত না কীভাবে এমন সন্দেহের জন্ম হলো।

কখনো কোনো ফোন একটু বেশি সময় বাজলে মায়ার চোখে প্রশ্ন দেখা দিত। কখনো রাকিব কারও সঙ্গে কথা বললে মায়া জানতে চাইত, “কে?”

রাকিব উত্তর দিত।

কিন্তু উত্তর দেওয়ার পরও যেন প্রশ্ন শেষ হতো না।

ধীরে ধীরে তাদের সংসারে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু হলো। এমন কিছু বিষয়, যেগুলো একসময় দুজনেই হাসতে হাসতে পার করে দিতে পারত, সেগুলোই এখন দিনের পর দিন মনোমালিন্যের কারণ হয়ে দাঁড়াত।

রাকিব চুপ করে থাকত।

কারণ সে জানত, মায়াকে হারানোর ভয় তার নিজের রাগের চেয়েও বড়।

কিন্তু মানুষ যত চুপ করে থাকে, তার ভেতরে তত কথা জমে।

রাকিবের ভেতরেও জমতে লাগল।

সে মায়াকে বোঝাতে চাইত—সে প্রতিদিন এত পরিশ্রম করে অন্য কারও জন্য নয়, নিজের পরিবারের জন্য। কিন্তু কথাগুলো মুখে আনতে পারত না।

সে মায়াকে বলতে চাইত—

“আমি ক্লান্ত।”

কিন্তু বলতে পারত না।

সে বলতে চাইত—

“তোমার কথায় আমি কষ্ট পাই।”

কিন্তু বলতে পারত না।

সে বলতে চাইত—

“আমাকে সন্দেহ করো না।”

কিন্তু সেই কথাটাও যেন গলায় আটকে যেত।

এরই মধ্যে মায়া পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। রাকিব তার ইচ্ছেটাকে সম্মান করেছিল। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও তার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। বই কিনেছে, প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিয়েছে। কখনো নিজের হাতে টাকা না থাকলেও অন্যভাবে ব্যবস্থা করেছে।

তার কাছে মায়ার পড়াশোনা ছিল মায়ার স্বপ্নের অংশ।

কিন্তু ভালোবাসার মানুষ যখন নিজের ত্যাগকে ভালোবাসার ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তখন সেই ত্যাগ অনেক সময় অপর পক্ষের কাছে অদৃশ্য থেকে যায়।

মায়ার কাছেও হয়তো রাকিবের সেই ত্যাগগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল।

তারপর একসময় মায়ার জীবনে অন্য একজন ছেলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ তৈরি হলো।

রাকিব বিষয়টি জানতে পেরে অস্বস্তি বোধ করেছিল। তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। সে হয়তো ঈর্ষান্বিত হয়েছিল, হয়তো ভয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই ভয়কে সুন্দরভাবে প্রকাশ করার মতো ভাষা তার ছিল না।

সে প্রশ্ন করেছিল।

মায়া বিরক্ত হয়েছিল।

রাকিব চুপ করে গিয়েছিল।

আর সেই নীরবতা মায়ার কাছে হয়তো আরও বড় সন্দেহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একদিন কথা কাটাকাটির সময় মায়া এমন একটা কথা বলে ফেলল, যা রাকিবকে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ করে রেখেছিল।

“তুমি কতই বা উপার্জন করো?”

কথাটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু রাকিবের কাছে সেটা সাধারণ ছিল না।

সে সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি।

শুধু কিছুক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল।

কারণ সে জানত, তার উপার্জন সত্যিই বেশি নয়। সে কোনো বড় চাকরি করে না। বড় বাড়ি দিতে পারে না। দামি গাড়ি কিনে দিতে পারে না। মায়ার সব ইচ্ছা পূরণ করার মতো অর্থও তার নেই।

কিন্তু সে এটুকু জানত—তার সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত সে চেষ্টা করছে।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করার পর যখন সে বাড়ি ফিরত, তখন তার শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকত। কিন্তু মেয়েটা দৌড়ে এসে “বাবা” বলে জড়িয়ে ধরলে সেই ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যেত।

রাতে মেয়েটা ঘুমিয়ে গেলে রাকিব অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।

ছোট্ট বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে।

নির্ভার ঘুম।

রাকিব কখনো মেয়ের কপালে হাত রেখে মনে মনে বলত—

“তুই শুধু ভালো থাকিস মা। তোর জন্য আমি যত কষ্টই করি, করব।”

কিন্তু সে জানত না, তার নিজের সংসারটাই তখন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।

মায়া ছিল আত্মসম্মানী। নিজের সিদ্ধান্তকে সে গুরুত্ব দিত। নিজের অনুভূতিকে সহজে কারও কাছে ছোট হতে দিত না। আর রাকিব ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। সে অনুভূতিশীল হলেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে জানত না।

এই দুই স্বভাবের সংঘর্ষই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করল।

দেয়ালটা একদিনে তৈরি হয়নি।

একটা ছোট অভিমান দিয়ে একটা ইট বসেছিল।

তারপর একটা ভুল বোঝাবুঝি।

তারপর একটা তর্ক।

তারপর একটা অপমান।

তারপর কয়েকদিনের নীরবতা।

এভাবেই ইটের পর ইট জমতে জমতে একদিন তারা আবিষ্কার করল—তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেছে এমন একটা দেয়াল, যেটার ওপাশে থাকা মানুষটাকে তারা একসময় খুব ভালোবাসত।

মায়া ভাবত, রাকিব তাকে বোঝে না।

রাকিব ভাবত, মায়া তাকে বিশ্বাস করে না।

মায়া ভাবত, সে একা।

রাকিবও ভেতরে ভেতরে নিজেকে একা মনে করত।

একই ঘরে থেকেও দুজন মানুষের পৃথিবী আলাদা হয়ে গেল।

তাদের ছোট্ট মেয়েটা তখনও কিছুই বুঝত না।

সে শুধু জানত, বাবা বাড়ি ফিরলে তার কাছে ছুটে যেতে হয়। বাবার কোলে মাথা রাখলে পৃথিবীটা নিরাপদ লাগে। মা রাগ করলে সে মায়ার কাছে গিয়ে বসে থাকে। কখনো বাবার দিকে তাকায়, কখনো মায়ের দিকে।

তার ছোট্ট চোখে তখন একটা প্রশ্ন জন্ম নিতে শুরু করেছিল।

“বাবা-মা একসঙ্গে থেকেও এত চুপচাপ কেন?”

কিন্তু সে প্রশ্ন করার মতো বয়সে তখনও পৌঁছায়নি।

শুধু বুঝত, আগের মতো বাড়িতে হাসি নেই।

আগের মতো বাবা-মা পাশাপাশি বসে কথা বলে না।

আগের মতো মায়ের মুখে হাসি কমে গেছে।

আর বাবার চোখে যেন সবসময় একটা ক্লান্তি।

রাকিব কখনো মেয়ের সামনে নিজের কষ্ট প্রকাশ করত না। সে জানত, শিশুরা বড়দের কথা না বুঝলেও তাদের নীরবতা বুঝতে পারে।

তাই সে মেয়ের সামনে হাসত।

মেয়েকে নিয়ে খেলত।

তার পড়াশোনার কথা ভাবত।

কিন্তু রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে কখনো কখনো সে একা বসে থাকত।

ঘরের অন্ধকারে।

কেউ জানত না, সেই অন্ধকারে বসে একজন মানুষ কতটা ভেঙে পড়তে পারে।

রাকিবের মনে তখন একটা প্রশ্ন ঘুরত—

“আমি কি সত্যিই এতটাই খারাপ?”

সে নিজেকে বিচার করত।

তার ভুলগুলো মনে করত।

মায়ার অভিযোগগুলো মনে করত।

তারপর নিজের পরিশ্রমের কথা মনে পড়ত।

কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেত না।

অন্যদিকে মায়াও নিজের ভেতরে অশান্ত ছিল। তারও মনে হতো, সে যে জীবন চেয়েছিল, সেই জীবন কোথায় হারিয়ে গেল? সে কি ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছে? নাকি সংসারটাই এমন?

কেউ জানত না।

কারণ তারা কেউ কাউকে নিজের মনের কথাগুলো সম্পূর্ণ করে বলেনি।

ভালোবাসা ছিল।

কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাস ছিল না।

দায়িত্ব ছিল।

কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা ছিল না।

কথা ছিল।

কিন্তু মনের কথা ছিল না।

আর সবচেয়ে বড় কথা—দুজনেই নিজের কষ্টকে সত্যি মনে করত, কিন্তু অপরজনের কষ্টটা বোঝার মতো ধৈর্য তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না।

জীবন কখনো কখনো মানুষকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে সম্পর্ক ভাঙার জন্য কোনো বড় অপরাধের প্রয়োজন হয় না। কখনো শুধু জমে থাকা অভিমানই যথেষ্ট। কখনো কয়েকটি ভুল বোঝাবুঝি, কিছু না বলা কথা আর একটু একটু করে কমে যাওয়া বিশ্বাসই একটি সংসারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।

রাকিব আর মায়ার সংসারও তখন ঠিক তেমনই হয়ে উঠছিল।

বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক।

একটি বাড়ি।

একজন স্বামী।

একজন স্ত্রী।

একটি ছোট্ট মেয়ে।

কিন্তু ভেতরে?

ভেতরে যেন প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছিল একটি পরিবার।

আর কেউ তখনও জানত না—এই ছোট ছোট ফাটল একদিন এত বড় হয়ে যাবে যে, তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসাটুকুও হয়তো আর তাদের একসঙ্গে রাখতে পারবে না।

তবু সেই সময়েও রাকিব মায়াকে ভালোবাসত।

আর মায়াও হয়তো কোথাও গভীরে রাকিবকে ভালোবাসত।

শুধু তারা দুজনেই ভুলে গিয়েছিল—ভালোবাসা শুধু কাউকে নিজের করে পাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা কখনো কখনো সেই মানুষটার না-বলা কথাগুলোও শুনতে হয়।

আর তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল—তারা দুজনেই কথা বলছিল, কিন্তু কেউ কারও কথা শুনছিল না।