প্রথম পরিচ্ছেদ: ঘড়ির কাঁটা এবং বুকের ধুকপুকানি
সেপ্টেম্বরের শেষ কিংবা অক্টোবরের শুরু—শরতের এই সময়টা এলেই আমার মনের ভেতর কেমন যেন একটা ওলটপালট শুরু হয়ে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকানোর আমার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ভোরের দিকে গায়ে যখন একটা হালকা হিমেল চাদরের মতো ঠাণ্ডা পরশ লাগে, আর বাতাসে ছাতিম ও শিউলি ফুলের গন্ধ মিশে যায়, তখনই আমার মন জানান দেয়—দেবীপক্ষ এসে গেছে।
আজ আমি বড় হয়েছি, জীবনের তাগিদে ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে বসে মাঝরাত পার করে দিই। কিন্তু যখনই আশ্বিনের এই বিশেষ রাতটা আসে, বাইরের নিঝুম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আমার মনটা বড্ড ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আমার বারবার ফিরে চতুর্থ পরিচ্ছেদ: হারিয়ে যাওয়া মায়ার খোঁজে
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। রিমোটের বোতাম চেপে টিভিটা ধপ করে বন্ধ করে দিলাম। এক মুহূর্তের জন্য আমার ড্রয়িংরুমের দেওয়ালগুলো যেন আমাকে গ্রাস করতে এল। আমি বারান্দায় গিয়ে একা দাঁড়িয়ে রইলাম।
এখনকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভোর পাঁচটায় উঠে আবেগ নিয়ে টিভি দেখে না। তারা সকাল নয়টায় কিংবা দশটায় ঘুম থেকে উঠে ইউটিউবে 'মহালয়া হাইলাইটস' বা ছোট ছোট ক্লিপ দেখে নেয়। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে "শুভ মহালয়া" লেখা রেডিমেড স্ট্যাটাস আর রিলস আপলোড করলেই তাদের দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে যায়। সবকিছু বড্ড যান্ত্রিক, বড্ড লোকদেখানো। কিন্তু যে আনন্দের জন্য একটা বছর চাতক পাখির মতো আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম, সেই অন্তরের টানটা আজকের এই চরম অ্যাডভান্স যুগে যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই আমার স্মার্টফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। দিদির মেসেজ—"কী রে, মহালয়া দেখলি? আমাদের ছোটবেলার সেই ডিডি বাংলার মহালয়াটার কথা মনে আছে রে? এখনকার এই সিরিয়ালের নায়িকাদের দুর্গা সাজা আর এই কার্টুনের মতো গ্রাফিক্স দেখে আর ভালো লাগে না। সেই মজাটাই পুরো হারিয়ে গেছে।"
দিদির মেসেজটা পড়ে আমার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। আমি টাইপ করে উত্তর দিলাম, "হ্যাঁ রে দিদি। এখন সব কিছু বড্ড অ্যাডভান্সড, বড্ড চটকদার। কিন্তু সেই মায়াটা আর কোথাও নেই।"
আজকের মহালয়ায় চকচকে স্ক্রিন আছে, থ্রিডি অ্যানিমেশন আছে, কোটি টাকার বাজেট আছে। কিন্তু যা নেই, তা হলো সেই খড়খড়ে গলার ফিলিপস রেডিওর প্রাণবন্ত অনুভূতি, মায়ের হাতের সেই গরম সুজির হালুয়ার স্বাদ আর সাদা-কালো পর্দায় মা দুর্গাকে দেখে মনের ভেতর জেগে ওঠা সেই অকৃত্রিম ভক্তি। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শৈশবের সেই অমূল্য ভোরগুলোকে আমাদের থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: আমার ভেতরের সেই শিউলি তলা
আমি বারান্দা থেকে নেমে ঘরের কোণে রাখা পুরোনো একটা কাঠের ট্রাঙ্ক খুললাম। তার ভেতর আজও খুব যত্নে রাখা আছে বাবার সেই পুরোনো ব্যাটারি চালিত ফিলিপস ট্রানজিস্টর রেডিওটা। ধুলোবালি মেখে সেটা চুপচাপ শুয়ে আছে আমার অতীতের শেষ সাক্ষী হয়ে।
আমি পরম মমতায় রেডিওটা বের করে আনলাম। নতুন ব্যাটারি কিনে এনে লাগিয়ে যখন সেটার নবটা ঘোরালাম, তখন অনেক খোঁজাখুঁজির পর হালকা ঝিরঝিরে আওয়াজের মাঝখান থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের সেই চেনা গলাটা আবার অলৌকিকভাবে জেগে উঠল—“তিমিরবিদারী আলোক-অন্তরে...”
আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঘরের সেই আধুনিক টিভিটা অন্ধকার হয়েই রইল। কিন্তু সেই পুরোনো রেডিওর ভাঙা স্পিকার থেকে নির্গত সুরের আলোয় আমার মনের ভেতর আবার সগৌরবে জেগে উঠল বিশ বছর আগের সেই অভুল ভোর পাঁচটা। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, আমার মা রান্নাঘরে রুটি-লুচি বেলছেন, বাবা খাটে বসে চোখ বন্ধ করে চণ্ডীপাঠ শুনছেন আর ছোট আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে টিভির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি।
এখনকার এই কর্পোরেট ও গ্রাফিক্সের যুগে মহালয়ার সংজ্ঞা হয়তো বদলে গেছে। কিন্তু আমার মতো যারা সেই সোনালী দিনগুলো নিজের চোখে দেখেছে, তাদের মনের মণিকোঠায় আজও বেঁচে থাকবে সেই আসল, নিখাদ ভোরের মহালয়া। কিছু জিনিসকে যত বেশি আধুনিক করার চেষ্টা করা হয়, তার ভেতরের আত্মাটা তত বেশি মরে যায়—আজকের চটকদার মহালয়াগুলো তারই প্রমাণ।
আমি রেডিওটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ভোরের প্রথম হালকা আলোর দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম, "মা, তুমি তো অন্তর্যামী। এই প্লাস্টিকের দুনিয়ার আধুনিক সাজে নয়, তুমি আমার সেই ছোটবেলার সাধারণ মা হয়েই আমার মনে ফিরে এসো।"
[সমাপ্ত]
যেতে ইচ্ছে করে আজ থেকে বিশ বছর আগের সেই দিনগুলোয়। সেই দিনগুলো, যখন মহালয়া আমার কাছে কোনো সাধারণ ছুটির দিন ছিল না, বরং ছিল এক জাদুকরি অপেক্ষা, এক পরম উৎসব।
ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে একটা মাত্র সাধারণ রঙিন টিভি ছিল। সেই টিভির ওপর একটা প্লাস্টিকের ফুলদানী সাজানো থাকত। মহালয়ার আগের রাতে আমার আর আমার দিদির চোখে কিছুতেই ঘুম আসত না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতাম আর জানালার বাইরে তাকাতাম। মা বারবার এসে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলতেন, "কী হচ্ছে কী তোমাদের? তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করো, ভোরে উঠতে হবে তো!" কিন্তু কার সাধ্য ঘুমায়? আমার বুকের ভেতর তখন যেন ঢাকের আওয়াজ বাজত। একে তো ভোরবেলায় মা দুর্গার রূপ দেখার উত্তেজনা, তার ওপর আবার ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠার একটা রোমাঞ্চ!
ভোর চারটে বাজতে না বাজতেই বাবা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তেন। ঘর অন্ধকার থাকতেই রেডিওর নবটা ঘুরিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দের মাঝখান থেকে ঠিক খুঁজে বের করতেন সেই অলৌকিক ফ্রিকোয়েন্সি। আর তারপরেই সারা ঘরজুড়ে গমগম করে উঠত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই অমর কণ্ঠ—“আশ্বিনের শারদপ্রভাতে অনুকুশল মহিষাসুরমর্দিনী...”
সেই শঙ্খধ্বনি আর চণ্ডীপাঠের আওয়াজ কানে আসতেই আমি এক লাফে কম্বল ছুড়ে ফেলে বিছানা থেকে উঠে পড়তাম। চোখে তখন বিন্দুমাত্র ঘুম থাকত না, থাকত শুধু এক বুক পবিত্র আনন্দ। তখন চলত ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ভোর পাঁচটা বাজার নিখাদ অপেক্ষা। কারণ ঠিক পাঁচটা বাজলেই দূরদর্শনে শুরু হবে মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনী।
মা ততক্ষণে স্নান সেরে শুদ্ধ কাপড়ে রান্নাঘরে চলে গেছেন। সেখান থেকে ভেসে আসত ভাজা সুজির হালুয়া আর গরম গরম ফুলকো লুচির সুবাস। আমি আর দিদি একই কম্বল দুজনে ভাগাভাগি করে গায়ে জড়িয়ে টিভির ঠিক সামনে মেঝেতে চেপে বসতাম। টিভির স্ক্রিনে যখন সেই সাদা-কলো ঝিরঝিরে পর্দার পর চ্যানেলের লোগো ভেসে উঠত, তখন আমার মনে হতো যেন স্বর্গের দরজা আমার চোখের সামনে খুলে গেছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: রূপালী পর্দার সেই সাবেকি মা
আমাদের ছোটবেলার সেই মহালয়া দেখার মজাটাই ছিল একদম আলাদা। দূরদর্শনের পর্দায় যখন মা দুর্গারূপে দেবীরা ত্রিশূল হাতে পর্দায় আসতেন, তখন টিভির সামনে বসে থাকা আমার মনে হতো আমি সত্যিই সাক্ষাৎ জগতজননীকে দেখছি। কোনো চটকদার কৃত্রিম মেকআপ ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক চোখের লেন্স বা উগ্র সাজগোজ। দেবীর চোখের সেই শান্ত, করুণাময় অথচ মহিমান্বিত চাউনি দেখলেই ভক্তি আর শ্রদ্ধায় আমার মাথাটা আপনাআপনি নত হয়ে আসত।
আর মহিষাসুর? অসুর যখন বুক চিতিয়ে অট্টহাসি হাসত, তখন আমি ভয়ে দিদির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরতাম। তখন কোনো কম্পিউটার গ্রাফিক্স ছিল না, কোনো স্পেশাল এফেক্টস ছিল না। থিয়েটারের মতো সাধারণ আলো-ছায়ার খেলা আর শিল্পীদের সেই জীবন্ত ও নিখুঁত অভিনয় দিয়েই তৈরি হতো এক অদ্ভুত মায়া।
সবচেয়ে বড় কথা, সেই মহালয়া দেখার মধ্যে একটা অদ্ভুত পারিবারিক আন্তরিকতা আর সামাজিক মিলন ছিল। পাড়ার মোড়ে মোড়ে প্রতিটা বাড়ি থেকে তখন চণ্ডীপাঠের আওয়াজ আসত। পুরো পাড়াটা যেন একসাথে জেগে উঠত। চণ্ডীপাঠ শেষ হতেই আমি আর আমার বন্ধুদের দল ছুটে যেতাম শিউলি তলায়। ভেজা ঘাসের ওপর টুপটুপ করে ঝরে থাকা শিউলি ফুলগুলো কুড়িয়ে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য নিয়ে আসতাম। সেই সকালটার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল শুধু এক বুক অনাবিল আনন্দ আর এক পবিত্র অনুভূতি।
দিদি তখন আমায় বলত, "জানিস, মা দুর্গা যখন মহিষাসুরকে বধ করেন, তখন নাকি সত্যিই আকাশ থেকে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করেন।" আমিও খুব বিশ্বাস করতাম সেই কথা। আমার মনে হতো, মহালয়ার সকালটাই আসলে আসল পুজো। বাকি দিনগুলো তো শুধু উৎসবের নিয়ম পালন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আজকের এই অ্যাডভান্স মহালয়ার তিক্ততা
স্মৃতির সেই রঙিন ও আবেগঘন ক্যানভাস থেকে হুট করে কেটে গেল আমার বর্তমানের বাস্তব দিন। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আজ মহালয়া। ঘড়িতে তখন ভোর সাড়ে চারটে।
বাইরে তাকালে এখন আর সেই চেনা শরতের আবহাওয়াটা পাওয়া যায় না। কলকাতার আকাশে এখন শরতের নীল মেঘের চেয়ে ধোঁয়া আর দূষণই বেশি স্পষ্ট। আর পাড়ার সেই রেডিওর সম্মিলিত আওয়াজ? ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে রেডিও এখন জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। সবাই এখন ব্লুটুথ স্পিকারে কিংবা মোবাইলের হেডফোনে ইউটিউব চালিয়ে চণ্ডীপাঠ শোনে। কিন্তু সেই চারপাশের বাড়ি থেকে একসঙ্গে ভেসে আসা শঙ্খধ্বনির কোরাসটা আজ সম্পূর্ণ নিখোঁজ।
আমি আমার বসার ঘরের বিশাল হাই-ডেফিনিশন এলইডি টিভিটা অন করলাম। এখন আর দূরদর্শনের সেই একটা চ্যানেল নেই। এখন বাংলায় ডজনখানেক বিনোদন চ্যানেল। আর প্রতিটি চ্যানেলের মধ্যে চলছে এক অদ্ভুত ও নোংরা প্রতিযোগিতা—"কে কত বেশি অ্যাডভান্সড আর চটকদার মহালয়া বানাতে পারে!"
আমি রিমোট ঘুরিয়ে একটা নামী চ্যানেলে মহালয়া চালানো শুরু করলাম। স্ক্রিনে আলো ঝলমল করে উঠল। কিন্তু এ কী? মা দুর্গার চরিত্রে যিনি অভিনয় করছেন, তিনি সিরিয়ালের এক অতি পরিচিত নায়িকা, যাকে কদিন আগেই একটা আধুনিক ড্রামায় খলনায়িকার চরিত্রে কড়া মেকআপে দেখেছি। তার সেই ভারী গয়না, আধুনিক কায়দার মেকআপ আর প্লাস্টিক হাসির আড়ালে মা দুর্গার সেই চিরন্তন 'মাতৃরূপ'টা যেন সম্পূর্ণ উধাও। কোনো ভক্তিভাব নেই, মনে হচ্ছে কোনো রাজকীয় ফ্যাশন শো চলছে!
আরও অদ্ভুত আর বিরক্তিকর হলো এখনকার ব্যাকগ্রাউন্ডের গ্রাফিক্স। অসুর আর দেবীর লড়াইটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমা বা সস্তা ভিডিও গেম চলছে। আকাশে উড়ন্ত তরোয়াল, লেজার লাইটের মতো চোখ থেকে বেরোনো আলো আর অতিরিক্ত ভিএফএক্স (VFX)-এর চোটে মূল পৌরাণিক গল্পটাই হারিয়ে গেছে। মহিষাসুরকে দেখে কোনো অসুর মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সিক্স-প্যাক বডি বিল্ডার কোনো জিম ট্রেইনার, যে চুলে জেল লাগিয়ে খ্যাপাটে কায়দায় হাসছে। এগুলো দেখে ভক্তি আসা তো দূরের কথা, চরম বিরক্তি আর রাগ তৈরি হয় মনের ভেতর। এগুলোকে কেন যে এরা মহালয়া বলে চালায়, আমার মাথায় আসে না!
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: হারিয়ে যাওয়া মায়ার খোঁজে
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। রিমোটের বোতাম চেপে টিভিটা ধপ করে বন্ধ করে দিলাম। এক মুহূর্তের জন্য আমার ড্রয়িংরুমের দেওয়ালগুলো যেন আমাকে গ্রাস করতে এল। আমি বারান্দায় গিয়ে একা দাঁড়িয়ে রইলাম।
এখনকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভোর পাঁচটায় উঠে আবেগ নিয়ে টিভি দেখে না। তারা সকাল নয়টায় কিংবা দশটায় ঘুম থেকে উঠে ইউটিউবে 'মহালয়া হাইলাইটস' বা ছোট ছোট ক্লিপ দেখে নেয়। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে "শুভ মহালয়া" লেখা রেডিমেড স্ট্যাটাস আর রিলস আপলোড করলেই তাদের দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে যায়। সবকিছু বড্ড যান্ত্রিক, বড্ড লোকদেখানো। কিন্তু যে আনন্দের জন্য একটা বছর চাতক পাখির মতো আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম, সেই অন্তরের টানটা আজকের এই চরম অ্যাডভান্স যুগে যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই আমার স্মার্টফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। দিদির মেসেজ—"কী রে, মহালয়া দেখলি? আমাদের ছোটবেলার সেই ডিডি বাংলার মহালয়াটার কথা মনে আছে রে? এখনকার এই সিরিয়ালের নায়িকাদের দুর্গা সাজা আর এই কার্টুনের মতো গ্রাফিক্স দেখে আর ভালো লাগে না। সেই মজাটাই পুরো হারিয়ে গেছে।"
দিদির মেসেজটা পড়ে আমার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। আমি টাইপ করে উত্তর দিলাম, "হ্যাঁ রে দিদি। এখন সব কিছু বড্ড অ্যাডভান্সড, বড্ড চটকদার। কিন্তু সেই মায়াটা আর কোথাও নেই।"
আজকের মহালয়ায় চকচকে স্ক্রিন আছে, থ্রিডি অ্যানিমেশন আছে, কোটি টাকার বাজেট আছে। কিন্তু যা নেই, তা হলো সেই খড়খড়ে গলার ফিলিপস রেডিওর প্রাণবন্ত অনুভূতি, মায়ের হাতের সেই গরম সুজির হালুয়ার স্বাদ আর সাদা-কালো পর্দায় মা দুর্গাকে দেখে মনের ভেতর জেগে ওঠা সেই অকৃত্রিম ভক্তি। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শৈশবের সেই অমূল্য ভোরগুলোকে আমাদের থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: আমার ভেতরের সেই শিউলি তলা
আমি বারান্দা থেকে নেমে ঘরের কোণে রাখা পুরোনো একটা কাঠের ট্রাঙ্ক খুললাম। তার ভেতর আজও খুব যত্নে রাখা আছে বাবার সেই পুরোনো ব্যাটারি চালিত ফিলিপস ট্রানজিস্টর রেডিওটা। ধুলোবালি মেখে সেটা চুপচাপ শুয়ে আছে আমার অতীতের শেষ সাক্ষী হয়ে।
আমি পরম মমতায় রেডিওটা বের করে আনলাম। নতুন ব্যাটারি কিনে এনে লাগিয়ে যখন সেটার নবটা ঘোরালাম, তখন অনেক খোঁজাখুঁজির পর হালকা ঝিরঝিরে আওয়াজের মাঝখান থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের সেই চেনা গলাটা আবার অলৌকিকভাবে জেগে উঠল—“তিমিরবিদারী আলোক-অন্তরে...”
আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঘরের সেই আধুনিক টিভিটা অন্ধকার হয়েই রইল। কিন্তু সেই পুরোনো রেডিওর ভাঙা স্পিকার থেকে নির্গত সুরের আলোয় আমার মনের ভেতর আবার সগৌরবে জেগে উঠল বিশ বছর আগের সেই অভুল ভোর পাঁচটা। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, আমার মা রান্নাঘরে রুটি-লুচি বেলছেন, বাবা খাটে বসে চোখ বন্ধ করে চণ্ডীপাঠ শুনছেন আর ছোট আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে টিভির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি।
এখনকার এই কর্পোরেট ও গ্রাফিক্সের যুগে মহালয়ার সংজ্ঞা হয়তো বদলে গেছে। কিন্তু আমার মতো যারা সেই সোনালী দিনগুলো নিজের চোখে দেখেছে, তাদের মনের মণিকোঠায় আজও বেঁচে থাকবে সেই আসল, নিখাদ ভোরের মহালয়া। কিছু জিনিসকে যত বেশি আধুনিক করার চেষ্টা করা হয়, তার ভেতরের আত্মাটা তত বেশি মরে যায়—আজকের চটকদার মহালয়াগুলো তারই প্রমাণ।
আমি রেডিওটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ভোরের প্রথম হালকা আলোর দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম, "মা, তুমি তো অন্তর্যামী। এই প্লাস্টিকের দুনিয়ার আধুনিক সাজে নয়, তুমি আমার সেই ছোটবেলার সাধারণ মা হয়েই আমার মনে ফিরে এসো।"
সকলের জন্য শারদীয়ার আগাম শুভেচ্ছা
রইলো
[সমাপ্ত]