Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ভেজাল জলখাবার

নতুন বউয়ের গোয়েন্দাগিরি


বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে প্রথম কয়েকটা দিন বেশ ভালোই কাটছিল মধুমিতার। শ্বশুর নিবারণবাবু খুব মজার মানুষ, শাশুড়ি মায়া দেবী একটু বকবক করলেও মনটা ভালো, আর স্বামী সুমন তো একেবারে শান্তশিষ্ট। তবে এই বাড়ির একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে—সন্ধ্যা হলেই সবাই রাস্তার পাশের হরিপদর জলখাবারের দোকানে হাজির হয়।

কখনও সিঙাড়া, কখনও চপ, কখনও আবার কচুরি আর জিলিপি। বাড়িতে যতই ভালো খাবার তৈরি হোক, হরিপদর দোকানের জলখাবার না খেলে নিবারণবাবুর নাকি রাতের খাবার হজম হয় না।

একদিন সন্ধ্যায় মধুমিতাও সবার সঙ্গে দোকানে গেল। নিবারণবাবু চারটে সিঙাড়া অর্ডার দিলেন।

মধুমিতা একটা সিঙাড়ায় কামড় দিতেই মুখ কুঁচকে ফেলল।

“বাবা, সিঙাড়ার পুরটা এমন অদ্ভুত লাগছে কেন?”

নিবারণবাবু অবাক হয়ে বললেন, “অদ্ভুত কোথায়? এটাই তো হরিপদের বিখ্যাত সিঙাড়া!”

সুমন হেসে বলল, “তুমি নতুন এসেছ, তাই বুঝতে পারছ না। এই সিঙাড়া আমাদের ছোটবেলার ভালোবাসা।”

মধুমিতা আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হলো।

পরদিন সকালে বাড়িতে সবাই পেটের সমস্যার কথা বলতে লাগল। নিবারণবাবু বললেন, “কালকের সিঙাড়াটা বোধহয় একটু বেশি মশলাদার ছিল।”

শাশুড়ি মায়া দেবী বললেন, “তোমাদের তো রোজই ওই দোকানের খাবার খাওয়া চাই। বাড়িতে জলখাবার বানালে কি তোমাদের মানসম্মান কমে যায়?”

নিবারণবাবু মুখ গম্ভীর করে বললেন, “তুমি বুঝবে না। হরিপদের হাতের স্বাদ আলাদা।”

মধুমিতা মনে মনে ভাবল, স্বাদ আলাদা না অন্য কিছু আলাদা, সেটা একদিন বের করতেই হবে!

কয়েকদিন পর আবার একই ঘটনা ঘটল। দোকানের খাবার খাওয়ার পর সুমনের পেট খারাপ হলো। এবার মধুমিতা ঠিক করল, বিষয়টা ভালোভাবে খোঁজ নিতে হবে।

সে তার ননদ পিউকে বলল, “তুই কি কখনও লক্ষ্য করেছিস, ওই দোকানের খাবার খাওয়ার পর আমাদের বাড়ির সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে?”

পিউ হেসে বলল, “বৌদি, তুমি আবার গোয়েন্দা হয়ে গেলে নাকি?”

মধুমিতা গম্ভীর মুখে বলল, “হ্যাঁ, এবার থেকে আমি গোয়েন্দা মধুমিতা। আমার প্রথম মামলা—সিঙাড়া রহস্য!”

পিউ হেসে গড়িয়ে পড়ল।

পরদিন মধুমিতা একা দোকানে গেল। হরিপদ তখন সিঙাড়া ভাজছিল। দোকানের একপাশে কয়েকটি বড় পাত্র রাখা ছিল। মধুমিতা লক্ষ্য করল, পুরোনো খাবারগুলোও নতুন খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

সে হরিপদকে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, প্রতিদিন এত খাবার বিক্রি হয়?”

হরিপদ হাসিমুখে বলল, “এই তো মা, পাড়ার সবাই আমার দোকানের ভক্ত।”

মধুমিতা আর কিছু না বলে চলে এল।

কিন্তু তার সন্দেহ আরও বাড়ল।

সেদিন বিকেলে সে পিউকে সঙ্গে নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারা দেখল, দোকানের এক কর্মচারী আগের দিনের কিছু খাবার আবার গরম করে নতুন খাবারের সঙ্গে সাজিয়ে রাখছে।

পিউ ফিসফিস করে বলল, “বৌদি, এ তো পুরোনো খাবার নতুন বলে বিক্রি করছে!”

মধুমিতা বলল, “শুধু তাই নয়, খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এবার বিষয়টা প্রমাণসহ জানাতে হবে।”

দুজন বাড়ি ফিরে সুমনকে সব বলল। কিন্তু সুমন প্রথমে বিশ্বাস করল না।

“হরিপদ কাকু অনেক বছর ধরে দোকান চালাচ্ছেন। উনি এমন কাজ করবেন না।”

মধুমিতা বলল, “তাহলে তুমি কাল আমার সঙ্গে দোকানে চলো। নিজের চোখেই সব দেখবে।”

পরদিন সুমনও তাদের সঙ্গে গেল। এবার তারা দেখল, দোকানে খাবার তৈরির জায়গাটা খুব অপরিষ্কার। খাবার ঢেকে রাখা হচ্ছে না, আর পুরোনো খাবারও নতুন বলে বিক্রি হচ্ছে।

সুমন এবার চুপ করে গেল।

মধুমিতা বলল, “এটা শুধু আমাদের পরিবারের ব্যাপার নয়। পাড়ার আরও কত মানুষ এই খাবার খাচ্ছেন!”

সে পাড়ার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলল। তারাও জানালেন, দোকানের খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই পেটের সমস্যা হয়েছে। কয়েকজন অভিভাবকও অভিযোগ করলেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা ওই দোকানের খাবার খেয়ে অসুস্থ বোধ করেছে।

মধুমিতা ঠিক করল, এবার বিষয়টা নিয়ে চুপ করে থাকা যাবে না।

সে পাড়ার ক্লাবের সভাপতি এবং স্থানীয় খাদ্য-নিরাপত্তা দপ্তরে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করল। দপ্তরের কর্মীরা দোকানটি পরিদর্শন করলেন। খাবারের নমুনা পরীক্ষা করার জন্য সংগ্রহ করা হলো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খাবার সংরক্ষণের নানা অনিয়ম ধরা পড়ল। দোকানদারকে নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হলো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলো।

খবরটা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়তেই সবাই মধুমিতার প্রশংসা করতে লাগল।

কিন্তু সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল বাড়ি ফিরে।

নিবারণবাবু খবর শুনে বললেন, “বউমা, তুমি তো দেখি একেবারে গোয়েন্দা! আমাদের এতদিনের প্রিয় দোকানের রহস্য বের করে দিলে!”

মধুমিতা হেসে বলল, “বাবা, এবার থেকে বাড়ির জলখাবারই খাবেন।”

নিবারণবাবু মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “তোমার শাশুড়ির হাতের চপ খেতে হবে?”

মায়া দেবী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “কেন? আমার চপে কী দোষ?”

নিবারণবাবু আস্তে করে বললেন, “দোষ কিছু নেই। শুধু চপের ভিতরে আলুর চেয়ে তোমার রাগ বেশি থাকে!”

সবাই হেসে উঠল।

সেদিন সন্ধ্যায় মায়া দেবী নিজে হাতে গরম সিঙাড়া বানালেন। নিবারণবাবু প্রথমে একটু ভয় পেয়ে বললেন, “বউমা, তুমি আগে খেয়ে দেখো তো!”

মধুমিতা হেসে বলল, “বাবা, এটা বাড়ির সিঙাড়া। এখানে ভেজাল নেই।”

নিবারণবাবু একটা সিঙাড়া মুখে দিয়ে বললেন, “বাহ! এ তো হরিপদের দোকানের থেকেও ভালো!”

মায়া দেবী গর্ব করে বললেন, “তাহলে এতদিন দোকানে গিয়ে টাকা নষ্ট করছিলে কেন?”

নিবারণবাবু একটু থেমে বললেন, “আসলে তোমার রান্নার প্রশংসা করলে তুমি পরদিন থেকে আমাকে রান্নাঘরে বসিয়ে দেবে। তাই এতদিন চুপ ছিলাম!”

আবারও হাসিতে ফেটে পড়ল গোটা বাড়ি।

পিউ মধুমিতার পাশে এসে বলল, “বৌদি, তোমার পরের গোয়েন্দাগিরির বিষয় কী?”

মধুমিতা হেসে উত্তর দিল, “আগে এই বাড়ির রান্নাঘরের রহস্য সমাধান করি। তারপর দেখা যাবে!”

নিবারণবাবু তাড়াতাড়ি বললেন, “না না, রান্নাঘরে কোনো রহস্য নেই। সব দোষ আমার পেটের!”

সেদিন থেকে বাড়ির সবাই ঠিক করল, রাস্তার খাবার খাওয়ার আগে তার পরিচ্ছন্নতা ও মানের দিকে নজর রাখবে। আর মধুমিতা পেয়ে গেল নতুন নাম—গোয়েন্দা বউমা!

শেষ কথা: জলখাবার যতই মজার হোক, স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও আপস নয়।