Read suddenly meet by Sohagi Baski in Bengali নাটক | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

হঠাৎ দেখা

বৃষ্টি সেদিন শহরটাকে অদ্ভুত এক নীরবতায় ঢেকে রেখেছিল। বিকেলের আলো ছিল ফ্যাকাশে, আকাশে জমে থাকা মেঘ যেন বহুদিনের জমে থাকা কথাগুলোর মতো ভারী। কলেজ স্ট্রিটের ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মারিয়া হঠাৎ অনুভব করল—কেউ যেন তাকে তাকিয়ে দেখছে।
সে ঘুরে দাঁড়াতেই সময় থমকে গেল।
রোহিত।
একসময় যার চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছিল, আজ সেই চোখেই কেবল অচেনা দূরত্ব।
পাঁচ বছর পর।
একটা শব্দও না বলে, একটা ব্যাখ্যাও না দিয়ে, যে মানুষটা হারিয়ে গিয়েছিল—সে আজ হঠাৎ সামনে।
মারিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। কারণ এই পাঁচ বছরে সে শিখেছে, ভালোবাসার চেয়ে আত্মসম্মান অনেক কঠিন পাঠ।
রোহিত এগিয়ে এল ধীরে ধীরে।
“কেমন আছো, মারিয়া?”
সাধারণ প্রশ্ন। অথচ উত্তরটা এত জটিল কেন?
মারিয়া মৃদু হেসে বলল, “ভালো। তুমি?”
রোহিত একটু থেমে বলল, “ভালো থাকার অভিনয় করছি।”
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন তাদের মাঝের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছিল।
তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। একই কলেজ, একই লাইব্রেরি, একই স্বপ্ন। রোহিত ছিল উচ্চাভিলাষী, গম্ভীর, নিজের পৃথিবী বানানোর স্বপ্নে ডুবে থাকা এক ছেলে। আর মারিয়া ছিল শান্ত, গভীর, আবেগে ভরা—যে বিশ্বাস করত, মানুষ যদি একবার সত্যি ভালোবাসে, সে আর ফিরে তাকায় না।
তাদের সম্পর্ক ছিল নিঃশব্দে গভীর। বড় বড় প্রতিশ্রুতি ছিল না, কিন্তু ছিল বিশ্বাস। আর বিশ্বাসই সবচেয়ে ভঙ্গুর।
সেই রাতে, পাঁচ বছর আগে, রোহিত হঠাৎ বলেছিল, “আমাকে শহর ছাড়তে হবে।”
“কেন?”
“কারণ কিছু জিনিস না জানাই ভালো।”
তারপর সে চলে গিয়েছিল। ফোন বন্ধ। ঠিকানা বদল। কোনো চিঠি না, কোনো ব্যাখ্যা না।
মারিয়া সেদিন বুঝেছিল—অপেক্ষা সবসময় ভালোবাসার প্রমাণ নয়, অনেক সময় সেটা নিজের প্রতি অন্যায়।
আজ এতদিন পর, সে আবার সামনে।
রোহিত বলল, “আমি তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”
একটা ছোট কফিশপে তারা বসে। জানালার ওপারে বৃষ্টি, ভেতরে জমাট নীরবতা।
রোহিত ধীরে বলল, “আমি সেদিন চলে গিয়েছিলাম কারণ… আমার বাবা বড় একটা মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। আমাদের পুরো পরিবার হুমকির মধ্যে ছিল। আমাকে বাধ্য হয়ে অন্য শহরে পাঠানো হয়। কাউকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।”
মারিয়া চুপচাপ শুনছিল।
“আমি চেয়েছিলাম তোমাকে সব বলতে,” রোহিত বলল, “কিন্তু তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি।”
মারিয়া তাকাল তার দিকে।
“তুমি কি জানো, বিপদে না ফেললেও তুমি আমাকে ভেঙে দিয়েছিলে?”
রোহিত মাথা নিচু করল।
“সবচেয়ে বেশি কষ্ট তখনই হয়, যখন যার ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা ছিল—সেই মানুষটাই হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়।”
রোহিত বলল, “আমি প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি।”
মারিয়া মৃদু হেসে বলল, “ভেবেছো, কিন্তু খুঁজোনি।”
এই কথাটা রোহিতকে নিঃশব্দে আঘাত করল।
হঠাৎ দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। এক নারী ভেতরে ঢুকল—সুশ্রী, আত্মবিশ্বাসী। সে সরাসরি রোহিতের দিকে এগিয়ে এল।
“রোহিত, ডাক্তার বলেছে রিপোর্টটা সিরিয়াস। তোমার থাকা দরকার।”
মারিয়া স্তব্ধ।
ডাক্তার? রিপোর্ট? সিরিয়াস?
রোহিত ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি বিয়েটা করেছি দুই বছর আগে। ও… নীলা। কিন্তু—”
মারিয়া বাকিটা শুনতে চাইল না।
কিছু সম্পর্কের মৃত্যু শব্দ করে হয় না, নিঃশব্দে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
সে উঠে দাঁড়াল।
“তোমার ব্যাখ্যার দরকার নেই, রোহিত। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। জীবন তোমাকে নিজের মতো টেনেছে, আমাকেও।”
রোহিত হঠাৎ বলে উঠল, “আমি এখনও তোমাকে—”
মারিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিল।
“না। এই কথাটা বলো না। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হতো, তাহলে সে পাঁচ বছর অপেক্ষা করত না অন্য কারও পাশে দাঁড়িয়ে।”
রোহিতের চোখ ভিজে উঠল।
“আমি অসুখে ভুগছি, মারিয়া। খুব বেশি সময় নেই হয়তো। তাই তোমাকে একবার দেখতে চেয়েছিলাম। ক্ষমা চাইতে।”
সময় যেন থেমে গেল আবার।
মারিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা সব রাগ, অভিমান, আফসোস একসঙ্গে কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
“ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু ফিরে যেতে পারি না।”
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
মারিয়া দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “তোমার জীবনের জন্য প্রার্থনা করব। কিন্তু আমার জীবনে তোমার অধ্যায়টা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
সে বেরিয়ে এল। রাস্তায় ভেজা বাতাস, হালকা রোদ।
তার চোখে জল ছিল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
কারণ সে বুঝেছে—
হঠাৎ দেখা মানেই আবার শুরু নয়। কখনও কখনও সেটা কেবল শেষবারের মতো বিদায়।
আর রোহিত?
সে কফিশপের ভেতর বসে রইল, জানালার বাইরে তাকিয়ে।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা সে সেদিন বুঝল—
ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে সে ভালোবাসাকেই হারিয়েছে।
শহরটা আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল।
কিন্তু দুইটা হৃদয়ের ভেতর, এক অসমাপ্ত গল্প চিরকালের মতো থেমে রইল।
— সমাপ্ত —