Read Private Eye Society by Aro Chatterjee in Bengali Adventure Stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

প্রাইভেট আই সোসাইটি

"তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে"—অন্তত প্রবাদ তো তাই বলে।

তবে আমি বঙ্গেই আছি, বিদেশে যাইনি এখনো। কেন? একে তো যাওয়ার এখন খুব একটা ইচ্ছে নেই খবরের কাগজে যা সব শুনছি, তার উপর ওই যে বললাম—কপাল! তবে কপাল আবার আলাদা করে কোথায় যাবে? আমার কপাল এখনো আমার মাথাতেই বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু কপাল থেকে খুব একটা লাভ হচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

আপনারা হয়তো এখন ভাবছেন, "কে এই ফালতু লোকটা, যে তখন থেকে কোনো মাথামুণ্ডু ছাড়া বকবক করে যাচ্ছে?"

তা ঠিকই ভেবেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত আমাকে সামনাসামনি কেউ 'ফালতু' বলেনি। কারণ আমি পেশায় দাঁতের ডাক্তার। ডাক্তারকে চটালে ইঞ্জেকশনের সূঁচ এদিক-ওদিক হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। যদিও আপনারা আমাকে এখনো চেনেননি, আমি কিন্তু যথেষ্ট সাধারণ মানের লোক। এই হতভাগার নাম শিবনাথ ব্যানার্জি। বয়স আপাতত পঁচিশ। জীবনে প্রেম, বিয়ে—কোনোটার বালাই নেই। ৫/১০ ডি সুকান্ত মল্লিক রোডের রাস্তার ধারের একটা ফ্ল্যাটে থাকি। ফ্ল্যাটে থাকার সুবিধে হলো, একা থাকলেও মোটামুটি সবাইকে চিনতে হয়, তাতে একাকীত্বটা একটু কম মনে হয়।

তাহলে কথা হচ্ছে, এমন নিরঝঞ্জাট জীবনে কী এমন ঘটল যে আমি এখন দেবদাসের মতো মুখ করে প্রবাদ আওড়াচ্ছি?

বলছি। তবে বলার জন্য অন্তত একমাস আগে যেতে হবে। কারণ শুরু থেকে না বললে এ ঘটনার লেজ-মাথা আপনারা কিছুই বুঝবেন না।

২০শে মার্চ, ২০১০।

আমি তখন দাঁত তুলি... মানে রোগী দেখি। স্বাভাবিক, কারণ এটা কয়েক মাস আগের কথা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ এক পেশেন্ট আসলেন দাঁত তোলাতে। সেদিন আর কোনো রোগী ছিল না, তাই একটু খোশমেজাজে গল্প করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

ভদ্রলোকের একটা পা নেই। জিজ্ঞেস করাটা অভদ্রতা, কিন্তু উনি নিজেই ক্যাজুয়ালি বললেন, "আসলে জানেন ডাক্তারবাবু... আমি একসময় ছিলাম এক নম্বরের দৌড়বাজ। এই কলকাতায় যতগুলো রেস হয়েছে, প্রত্যেকটায় আমি ফার্স্ট হয়েছি। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।"

আমি তখন অ্যান্টিসেপ্টিকের কৌটোর ঢাকনা বন্ধ করছি। হেসে বললাম, "আরে না না! আপনি বলছেন যখন, বিশ্বাস করছি না এমন তো নয়।"

ভদ্রলোক আমার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে হঠাৎ গলাটা নামিয়ে বললেন, "কিন্তু পা-টা কীভাবে গেল জানেন? লোকে জানে এক্সিডেন্ট। কিন্তু আসল সত্যিটা শুনলে আপনার রাতের ঘুম উড়ে যাবে। এটা কোনো এক্সিডেন্ট নয় ডাক্তারবাবু, এটা একটা কনস্পিরেসি!"

আমি ইনস্ট্রুমেন্টগুলো ট্রে-তে রাখতে রাখতে একটু থমকালাম। "ষড়যন্ত্র? মানে?"

ভদ্রলোক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। "শহরটা যতটা শান্ত দেখছেন, ততটা নয়। এই যে বড় বড় অ্যাথলিটরা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় কিংবা ইনজুরিতে পড়ে ক্যারিয়ার শেষ করে ফেলে—এগুলো সব একটা নির্দিষ্ট চক্রের কাজ। তারা চায় না এই দেশ থেকে বিশ্বমানের কোনো দৌড়বাজ বের হোক। আমার পা-টা ওরা কৌশলে কুরে কুরে খেয়েছে। ওইদিন ট্র্যাকে নামার আগে আমার জুতোর শুকতলায় এমন এক ধরণের তেজস্ক্রিয় পাউডার মাখিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে..."

বাকি দশ মিনিট উনি আমাকে বোঝালেন কীভাবে এক গোপন 'গ্লোবাল সিন্ডিকেট' ওনার পায়ের হাড় নরম করে দিয়েছিল। আমি মন দিয়ে শুনলাম, দাঁতটাও তুললাম। তবে মনে মনে ভাবছিলাম, লোকটার কল্পনাশক্তির তো জবাব নেই, দারুণ! চিকিৎসা শেষে উনি যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে গেলেন, আমি প্রেসক্রিপশন প্যাডটা গুছিয়ে রাখতে গিয়েও পারলাম না।

এক অদ্ভুত স্মৃতি আমাকে গ্রাস করল।

২০১০ সালে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ে গেল আজ থেকে সাত-আট বছর আগের কথা। স্কুল-কলেজের দিনগুলোতে আমি আর আমার বন্ধুদের একটা ছোট দল ছিল। আমরাও ঠিক এই ধরণের আজগুবি সব ষড়যন্ত্রের গল্প ফেঁদে বসতাম। এই শহর, এই দেশ, এমনকি আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাইও কোনো এক ভিনগ্রহের চক্রান্তের অংশ—এই ছিল আমাদের বিকেলের আড্ডার বিষয়।

আজ ওই একপায়ি দৌড়বাজের কথাগুলো কেন যেন সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চ, সেই 'সবকিছুর আড়ালে কিছু একটা আছে' মার্কা ফিলিং। এখনকার এই সাদা-কালো ডিসইনফেকট্যান্টের গন্ধওয়ালা জীবনে যা একদম নেই।

এখন আমি একা। পুরোনো সেই বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। কেউ আইটি-তে ঢুকে গেছে, কেউ বা ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে টাকা গুনছে। কিন্তু একজনের কথা মনে পড়ল। সেই ছেলেটা, যে আমাদের মধ্যে সবথেকে বেশি 'পাগল' ছিল এবং যার মাথায় এই কনস্পিরেসি থিওরিগুলো সবথেকে ভালো খেলত।

বয়স বাড়লে মানুষ নাকি বাস্তববাদী হয়। আমার ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে শুধু ইনকাম ট্যাক্স বেড়েছে, বুদ্ধি বিশেষ বাড়েনি। এখনো, অবধি তো কোন রোমাঞ্চকর ঘটনা দেখলেই, আমার মাথার মধ্যে কেন জানিনা কি একটা চিরিং বিরিং করতে থাকে। 

তবে কিনা সবাই এখন জীবন থেকে সরে গেছে...

...একজন ছাড়া। 

নম্বরটা টিপলাম। অনেকদিন পর, প্রায় এক বছর। জানি না ও এখনো একইরকম আছে কি না। তবে এই একপায়ি দৌড়বাজের রহস্যটা ওকে না বললে আমার রাতে হজম হবে না।

লাইনটা কানে লাগাতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর একটা গলা পাওয়া গেল। আমি একটু হেসে, গলাটা যতটা সম্ভব রহস্যময় করে তুললাম।

"হ্যালো, সুবীর? কালকে ফাঁকা আছিস ?"