Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 2

পরদিন বিকেলে আমি সুবীরের বাড়ি গেলাম।

এখানে সুবীর সম্পর্কে একটু বলা দরকার। সুবীর দত্ত। আমার স্কুল, কলেজ এবং সম্ভবত পূর্বজন্মেরও বন্ধু। রিয়ালি, আমাদের সম্পর্কটা ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। সুবীরকে প্রথম দেখলে মনে হবে এর মতো রসকসহীন মানুষ পৃথিবীতে আর দুটো নেই। সর্বক্ষণ কপালে তিনটে ভাঁজ, নাকের ডগায় চশমা, আর মুখটা এমন গম্ভীর যেন ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ও আর হাসেনি।

আর ওর নার্ভ? বাপরে বাপ! একবার স্কুলের পেছনের জঙ্গলে আমরা সাপের তাড়া খেয়েছিলাম। আমি চিল্লিয়ে পাড়া মাথায় করছি, ভয়ে আধমরা; আর ও দিব্যি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সাপটার গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। পরে স্যারের কাছে গিয়ে অম্লানবদনে এমনভাবে রিপোর্ট দিল যেন ওটা সাপ নয়, পাশের পাড়ার হরিদাদু লাঠি নিয়ে এসছিল।

তবে... হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ আছে। সুবীর ছিল আমাদের গ্রুপের সবচেয়ে বড় ‘তারকাটা’ মাল। আমাদের গ্রুপটা এমনিতেই খাতায়-কলমে স্বাভাবিক ছিল না। যারা স্কুলের টিফিনে ‘হেডস্যার বোধহয় ভিনগ্রহের গুপ্তচর’ এই নিয়ে মার্ক্সবাদী আলোচনার মতো দীর্ঘ ‘Hence Proved’ আর ‘Therefore’ দিয়ে তর্ক জুড়ে দিত, তাদের সাধারণ বলা চলে না। 

কিন্তু সুবীর ছিল আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

একদিন ফরাসি বিপ্লব পড়ার পর ওর থিওরি ছিল—ম্যারি আঁতোয়ানেত নাকি রোবসপিয়রের ছোটবেলার প্রেমিকা ছিলেন। প্রেম প্রত্যাখ্যান হওয়াতেই নাকি রোবসপিয়র রেগে গিয়ে গিলোটিন চালু করেছিলেন! 

ওর কপাল ভালো যে আঁতোয়ানেত-এর ভূত সেদিন রাতে ওর ঘাড় মটকে দেয়নি।

যাই হোক, আগের রাতে ফোনে সুবীর জানাল ও আজকাল রাতে একদম ফ্রি। বড় কোনো ফার্মে অ্যাকাউন্টস-এর কাজ পেয়েছে, রাতের ডিউটি নেই। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কেন সাইন্স নিয়ে দাঁত তোলা শিখলাম! কমার্স পড়লে অন্তত রাতে শান্তিতে ঘুমানো যেত।

সুবীরের বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, ও তখন এক মগ কালো কফি নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। কুশল মঙ্গল বিনিময়ের পর আমরা ওর ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পুরনো দিনের কথা হলো। স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখা, সেই গোয়েন্দা গোয়েন্দা খেলা—সব।

আমি আর হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। কালকের সেই পেশেন্টের কথা তুললাম।

“জানিস সুবীর, কাল চেম্বারে এক আজব পাবলিক এসেছিল। একটা পা নেই, কিন্তু দাবি করছেন ওটা নাকি আমেরিকা বা ভিনগ্রহীরা চুরি করেছে ওনার জেনেটিক কোড হাতানোর জন্য! কী লেভেলের পাগল চিন্তা কর একবার!”

আমি অট্টহাসি হাসব বলে তৈরি হচ্ছিলাম, কিন্তু দেখলাম সুবীরের মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও নেই। ও খুব ধীরস্থিরভাবে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “হু... ডাক্তার হয়ে যেন একেবারে প্র্যাক্টিকালিটির ডিপো হয়ে গেছি মনে হচ্ছে যেন, কথাটা ভুল কি বলেছে উনি ?”

“মানে?” আমার হাসিটা মাঝপথেই আটকে গেল, প্রায় বেষম খাই আর কি। 

সুবীর সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আয় আমার সাথে।”

ও আমাকে ওর পড়ার ঘরে নিয়ে গেল। 

তবে এটাকে পড়ার ঘর বললে মা সরস্বতীর অপমান করা হবে। 

দরজা খুলতেই আমি স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এটা ঘর না কি কোনো ক্রাইম ব্রাঞ্চের সদর দপ্তর? দেয়াল জুড়ে হাজার হাজার নোট, খবরের কাগজের কাটিং, আর মানচিত্রের ওপর লাল মার্কার দিয়ে আঁকাবাঁকা সব দাগ। একটা বোর্ডে পিন দিয়ে আটকানো কয়েকটা ঝাপসা ছবি।

আমি হতভম্ব হয়ে একটা পুরনো খবরের কাগজ হাতে তুলে নিলাম। হেডলাইন বলছে— “লি মিং নামে এক ইন্দো-চিন বালক নিখোঁজ, পুলিশি তল্লাশি জারি”। কাগজের কোণায় লাল কালিতে লেখা— ‘মনে হচ্ছে বালক পি এস থ্রির লোভে গা ঢাকা দিয়েছেন।’

সুবীর আমার হাত থেকে কাগজটা সরিয়ে নিল। “ওসব পুরনো। আসল জিনিসটা দেখ।”

ও একটা ল্যাপটপ খুলে আমার সামনে ধরল। স্ক্রিনে একটা ভিডিও পজ করা। মহারাষ্ট্রের লোনার লেকের দৃশ্য। সুবীর বলল, “লোনার লেক, যেটা কয়েক হাজার বছর আগে একটা উল্কাপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল। গত তিন রাত ধরে ওখানে অদ্ভুত সব নীল আলো দেখা যাচ্ছে। সরকারের দাবি ওটা রাসায়নিক বিক্রিয়া, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে আলোর উৎস আকাশ থেকে নেমেছে।”

ভিডিওর ঝাপসা আলোয় দেখা যাচ্ছে, লেকের ওপর গোলমতো একটা চাকতি মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। সুবীরের ঘরের থমথমে ভাব আর বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক মিলেমিশে আমার পেটের মধ্যে কি রকম একটু করে উঠল। হয়তো গ্যাস।

কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, সুবীর যেই তারকাটা ছিল এখনো সেই তারকাটাই আছে! এখন মনে হয় আরও বড় আরও কয়েকটা তার কেটে গেছে।

আর সত্যি তো, ডাক্তার হলে শুনেছিলাম মানুষ রামগরুরের ছানা হয়ে যায়। আমারও কি তাই হল নাকি, এতটা সিরিয়াস কবে থেকে হয়ে গেলাম ? 

না না। 

আমি সোজা হয়ে বসলাম। ড্রয়িংরুমের একটা লাল মার্কার পেন হাতে নিয়ে ম্যাপটার দিকে তাকালাম। তারপর সুবীরের দিকে একটা একপেশে হাসি দিলাম:

“আমার হয়তো এটা নিয়ে একটা থিওরি আছে। শুনবি?”