কিছুদিন পর আমার মাথায় একটা আইডিয়া এল। খুব একটা ভালো আইডিয়া নয়।
এমন আইডিয়া যেটাতে কাজ করে পরে নিতান্তই হাত কামড়াতে হয়।
এবং সেটাকেই বলা যায় আমার ভবিষ্যতের দুর্দশার ‘পেশেন্ট জিরো’।
এতদিন পর্যন্ত আমি আর সুবীর যা যা থিওরি বানিয়েছি, সেগুলো প্রত্যেকটাই শুধুমাত্র আমাদের চার দেয়ালের মধ্যেই রয়ে গেছে। কোনো থিওরি ভুল হলে বাইরের কেউ হাসেনি ঠিকই, কিন্তু ঠিক হওয়াতে কেউ পিঠও চাপড়ায়নি। ব্যাপারটা আমার গায়ে ঠিক চুলকানি দিচ্ছিল। মানুষের স্বভাবই তো এটা—নিজের কৃতিত্ব জাহির না করতে পারলে পেটের ভাত হজম হয় না।
এটা আমার ঠিক হজম হচ্ছিলোনা।
কথাটা সুবীরের কানে তোলায় ও সোফার পেছনে অলসভাবে হাতটাকে ঝুলিয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজে বলল, “হুমম...”
“হুমম... মানে?”
“মানে হলো শিবু, তুই বড্ড বেশি এটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিস। হয়েছে কয়েকটা থিওরি সত্যি, তাতে কী হলো? তাই বলে এখন জ্যান্ত মানুষের দাঁত তোলা ছেড়ে দিয়ে জ্যান্ত শার্লক সাজার তো কোনো মানে হয় না।”
আমি দমবার পাত্র নই। গোঁ ধরে বললাম, “আরে তোকে শার্লক সাজতে কে বলেছে? আমরা নাম পাল্টে অনলাইনে থিওরি দেব! কোনো ঝামেলা নেই, কেউ চিনতেও পারবে না।”
সুবীর এবার আমার দিকে তাকাল। চোখে সেই চেনা অবিশ্বাস। “ঝামেলা আছে শিবু, বিস্তর ঝামেলা। ইন্টারনেট মানেই একটা মস্ত বড়ো যুদ্ধক্ষেত্র, আর তুই যাচ্ছিস শুধু হাফেপ্যান্ট পরে।”
আমার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সুবীরের গালে একটা কষিয়ে চড় মারি। লোকটা এত হিসেবি কেন? কিন্তু সেদিন আমার মাথায় কোনো এক ভূত চেপেছিল। আধ ঘণ্টা ধরে টানা তর্ক করলাম। তর্কের শেষে সুবীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হার মানল।
“আচ্ছা ঠিইইইক আছে। তবে কী নাম দিবি অ্যাকাউন্টের? ‘শার্লক বক্সী’?”
নাম ঠিক করতে করতে কাটল আরও দু-ঘণ্টা। আমি চেয়েছিলাম কোনো একটা খটমটে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে। কিন্তু সুবীরের মতে, “ছদ্মনাম ইজ সেফ শুধু তখনই যখন বাকি দুনিয়া বোকা পাঁঠা হয় আর টেকনোলজি না বোঝে। অনলাইনের অবস্থা যা, স্ক্রিনের ওপারে সবাই একেকটা হ্যাকার বসে আছে। লহমায় তোর জন্মকুণ্ডলী বের করে ফেলবে।”
কী করা যায়? বুদ্ধিটা সুবীর দিল না, দিল সুবীরের বড় দিদি সাবিত্রী।
এতদিন সুবীরের বাড়ি যাতায়াত করতে করতে ওর বাড়ির সবার সাথে আমার বেশ দহরম-মহরম হয়ে গেছে। সাবিত্রী দিদি চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘরে ঢুকল। বোঝাই যাচ্ছিল, এতক্ষণ পর্দার আড়াল থেকে আমাদের সব কথা আড়ি পেতে শুনছিল। সুবীর কে দেখেই জিভ ভ্যাঙচালো। সুবীর বিরক্ত হয়ে বলল, “দেখেছিস শিবু? এই বাড়িতে আমার প্রাইভেসি বলে কোনো জিনিস নেই।”
সাবিত্রী দিদি ঠোঁট উল্টে বলল, “এএএহ... বড় লাটসাহেব এসেছেন। অতই যদি প্রাইভেসির শখ, তবে বাথরুমে গিয়ে সভা বসা না!”
সুবীর উদাসভাবে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাবছি, তাই করব।”
“ভুলভাল বকিস না। আমি যে আইডিয়াটা এনেছি, দেখ না একটু ভেবেচিন্তে,” দিদি এবার সিরিয়াস হয়ে আমাদের মাঝখানে বসল।
আমার একটু টনক নড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, “কী আইডিয়া দিদি?”
সাবিত্রী দি কিছুক্ষন ভাবলেন এক মনে। তারপর মাথা চুলকালেন।
“ইয়ে মানে, তোরা দুজনে মিলে একটা টিম কর না? মানে ওই ক্লাব-টাব টাইপের কিছু। ওটাকে নাম হিসেবে অনলাইনে ব্যবহার কর। কোনো একজনের নাম না দিয়ে অর্গানাইজেশনের নাম দিলে লোকে সহজে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে পারবে না। আর পরে যদি আরও লোক নিতে হয়, তখন এই নামটাই কাজে লাগবে।”
আইডিয়াটা আমার মনে ধরল। একটা টিম বা সোসাইটির নাম সবসময় একক ব্যক্তির চেয়ে বেশি রহস্যময় এবং নিরাপদ। দেখলাম সুবীরও সোজা হয়ে বসেছে। দিদির বুদ্ধির জোর আছে মানতে হবে।
তবে সমস্যা কোথায় ?
এবার আসল প্রশ্নটা এসে দাঁড়াল। আমি সুবীরের দিকে তাকিয়ে বললাম:
“সবই তো ঠিক আছে সুবীর, কিন্তু ইয়ে...
...
নামটা কি দেবো ? "