#অভিশপ্ত প্রাসাদের দরজা**
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি সরেনি। শত শত বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে থাকা "নূর-ই-সুলতান প্রাসাদ" যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল নিজের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস বুকে নিয়ে। ভাঙা গম্বুজ, ফাটল ধরা দেয়াল, শ্যাওলায় ঢাকা সিঁড়ি আর লতাপাতায় জড়িয়ে থাকা বিশাল ফটক দেখে মনে হচ্ছিল, সময় এখানে অনেক আগেই থেমে গেছে। স্থানীয় লোকেরা সূর্য ডোবার পর এই প্রাসাদের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করতে ভয় পায়। তাদের বিশ্বাস, এখানে এখনও এমন কিছু বাস করে, যাদের অস্তিত্ব মানুষের চোখে ধরা পড়ার কথা নয়। কিন্তু এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করতেন না ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষক যাইনা ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা, রহস্যময় স্থাপনা আর কিংবদন্তির প্রতি তার অদম্য আকর্ষণ ছিল। বহু মাসের গবেষণার পর অবশেষে সরকারি অনুমতি নিয়ে তিনি এই প্রাসাদে গবেষণার জন্য এসেছেন। সঙ্গে রয়েছে তার গবেষক দল, ক্যামেরা, মানচিত্র, নোটবুক আর আধুনিক স্ক্যানিং যন্ত্রপাতি। প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে যাইনা মৃদু হেসে বলল, "দেখি, তোমার বুকের ভেতরে কত শত বছরের গল্প লুকিয়ে রেখেছ।" তার সহকর্মী রাশেদ কাঁপা গলায় বলল, "ম্যাম, গ্রামের সবাই কিন্তু বলেছে এখানে রাত হলে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।" যাইনা হেসে উত্তর দিল, "প্রতিটি রহস্যেরই একটা ব্যাখ্যা থাকে, আর সেই ব্যাখ্যা খুঁজে বের করাই আমাদের কাজ।" সবাই কাজ শুরু করলেও যাইনার চোখ বারবার প্রাসাদের পশ্চিম দিকের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশে গিয়ে আটকে যাচ্ছিল। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে সেদিকেই ডাকছিল। দুপুরের দিকে দেয়ালের নিচে খোদাই করা একটি অদ্ভুত প্রতীক তার চোখে পড়ল। প্রতীকটি অন্য সব নকশার থেকে আলাদা। তিনি ধুলো সরিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই বুঝলেন, এটি আসলে একটি লুকানো দরজার চিহ্ন। বহু কষ্টে পাথর সরানোর পর ধীরে ধীরে খুলে গেল একটি সরু গোপন পথ। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো শত বছরের পুরোনো ঠান্ডা বাতাস। সবাই ভয়ে পিছিয়ে গেলেও যাইনা টর্চ জ্বালিয়ে একাই ভেতরে প্রবেশ করল। দীর্ঘ অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে সে পৌঁছাল একটি বিশাল গোলাকার কক্ষে। কক্ষের মাঝখানে পাথরের বেদির ওপর রাখা ছিল একটি কালো রঙের প্রাচীন আংটি। আংটির মাঝখানে বসানো ছিল নীল রঙের অদ্ভুত এক পাথর, যা অন্ধকারের মধ্যেও হালকা আলো ছড়াচ্ছিল। যাইনা সাবধানে আংটিটি হাতে তুলতেই পুরো কক্ষ কেঁপে উঠল। দেয়ালের খোদাইগুলো একে একে জ্বলতে শুরু করল। হঠাৎ চারদিকে প্রচণ্ড ঝড়ের মতো বাতাস বইতে লাগল। নীল আলো ধীরে ধীরে এক বিশাল ঘূর্ণিতে পরিণত হলো। যাইনা ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেও চোখ সরাতে পারল না। আলো ধীরে ধীরে মানুষের অবয়ব নিল। কয়েক মুহূর্ত পর তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল লম্বা দেহের এক অপরূপ যুবক। কালো পোশাক, রূপালি নকশা করা আলখাল্লা, কাঁধ ছুঁয়ে থাকা কালো চুল আর গভীর নীল চোখে যেন শত শত বছরের ইতিহাস জমে আছে। তার চারপাশে হালকা নীল আগুনের মতো আভা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যুবকটি ধীরে ধীরে চোখ খুলে যাইনার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময়, সতর্কতা আর অদ্ভুত এক শীতলতা। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল, "মানুষ... কে সাহস করল আমাকে জাগানোর?" যাইনা কাঁপা গলায় বলল, "আপনি... কে?" যুবকটি কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল, "আমি শাফরাজ... এই ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজ্যের শেষ রক্ষক... শত শত বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা জিন রাজকুমার।" কথাটি শেষ হতেই পুরো কক্ষ আবার কেঁপে উঠল। দূরে কোথাও অন্ধকারের গভীর থেকে দুটি লাল চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি ফুটিয়ে অদৃশ্য এক নারী কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল, "অবশেষে... শাফরাজ জেগেছে। এবার শুরু হবে প্রতিশোধের খেলা..." আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যাইনা বুঝতে পারল, সে শুধু একটি প্রাচীন রহস্য নয়, এমন এক নিষিদ্ধ জগতের দরজা খুলে ফেলেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা হয়তো আর কখনো সম্ভব হবে না।
#অদৃশ্য রক্ষক**
কক্ষজুড়ে অদ্ভুত নীল আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও যাইনার বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সে এখনও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে শাফরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণ যাকে গল্প বা লোককথা বলে মনে হতো, সে এখন তার সামনেই দাঁড়িয়ে। শাফরাজ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল, "এই প্রাসাদ মানুষের জন্য নয়। তুমি যে দরজাটা খুলেছ, সেটা শত শত বছর ধরে বন্ধ ছিল। এখনই চলে যাও।" যাইনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আমি একজন প্রত্নতাত্ত্বিক। সত্য খুঁজে বের করাই আমার কাজ। আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নই।" শাফরাজ ঠান্ডা হেসে বলল, "মানুষের এই এক সমস্যা। নিষেধ করলেই আরও বেশি জানতে চায়।" কথাটি শেষ হতেই সে আঙুলের হালকা ইশারা করল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষ অন্ধকারে ঢেকে গেল। দেয়ালের চারপাশে শত শত জ্বলন্ত চোখ ভেসে উঠল। কোথাও শিশুর কান্না, কোথাও ভয়ংকর হাসি, কোথাও আবার শিকল টানার শব্দ। যাইনার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে এক পা-ও পিছিয়ে গেল না। সে টর্চ শক্ত করে ধরে বলল, "এসব ভেলকি দিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন না।" শাফরাজ বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকাল। এত বছর ধরে যে কোনো মানুষ এই দৃশ্য দেখে পালিয়ে গেছে, সেখানে এই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে অবিচলভাবে। হঠাৎ যাইনার পেট থেকে অদ্ভুত এক শব্দ বের হলো। সে লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল। সকাল থেকে কাজের চাপে কিছুই খাওয়া হয়নি। শাফরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, "তুমি... ভয় পাচ্ছ না, কিন্তু ক্ষুধার কাছে হার মেনে যাচ্ছ?" যাইনা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "ওটা... আলাদা বিষয়।" শাফরাজের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। বহু শতাব্দী পর সে প্রথমবার কোনো মানুষের কথা শুনে হাসল। সে হাত নাড়তেই পাথরের টেবিলের ওপর মুহূর্তের মধ্যে নানা রকম ফল আর স্বচ্ছ পানির পাত্র দেখা দিল। যাইনা অবাক হয়ে বলল, "এগুলো... কোথা থেকে এলো?" শাফরাজ শান্তভাবে উত্তর দিল, "জিনদের জগতে ক্ষুধার্ত অতিথিকে না খাইয়ে বিদায় দেওয়া অসম্মানের।" যাইনা কিছুক্ষণ দ্বিধা করে একটি ফল তুলে খেল। অবাক হয়ে বলল, "এত মিষ্টি ফল আমি জীবনে খাইনি!" শাফরাজ গম্ভীর মুখে বলল, "কারণ এটা মানুষের দুনিয়ার ফল নয়।" যাইনা তাড়াতাড়ি ফলটি মুখ থেকে বের করতে গিয়ে কাশতে শুরু করল। শাফরাজ বিরক্ত মুখে মাথা নেড়ে বলল, "শান্ত হও। একটুখানি খেলেই তুমি জিন হয়ে যাবে না।" যাইনা কাশির মাঝেও হেসে ফেলল। দুজনের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে প্রথমবারের মতো একটুখানি স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকল না। প্রাসাদের বাইরে হঠাৎ বজ্রপাতের মতো বিকট শব্দ হলো। একই সময়ে কক্ষের দেয়ালে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ, "শাফরাজ... তুমি আবার একজন মানুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছ?" মুহূর্তের মধ্যেই ধোঁয়া থেকে তৈরি হলো এক রহস্যময় নারীর অবয়ব। রক্তলাল পোশাক, লম্বা কালো চুল আর আগুনের মতো জ্বলজ্বলে লাল চোখ। সে-ই জেসমিন। শাফরাজের মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। সে যাইনার সামনে এসে দাঁড়াল, যেন তাকে আড়াল করছে। জেসমিন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "শত বছর আগের ভুলটা আবার করতে যাচ্ছ? মনে আছে তো, একজন মানুষের কারণেই তোমার রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল?" শাফরাজ কোনো উত্তর দিল না। তার নীল চোখে এবার শুধু সতর্কতা। জেসমিন ধীরে ধীরে যাইনার দিকে তাকিয়ে বলল, "মানুষের মেয়ে... তুমি জানো না তুমি কী জাগিয়ে তুলেছ। এই প্রাসাদের ইতিহাস শুধু পাথরে লেখা নয়, রক্তে লেখা।" কথাগুলো বলেই সে অট্টহাসিতে চারদিক কাঁপিয়ে কালো ধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল। জেসমিন অদৃশ্য হতেই পুরো কক্ষ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যাইনা শাফরাজের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, "সে কে? আর সে যে শত বছর আগের ঘটনার কথা বলল... সেটা কী?" শাফরাজ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, "যদি সত্যিই সব জানতে চাও... তাহলে তোমার ফিরে যাওয়ার পথ আজ থেকেই বদলে যাবে।"