#অধ্যায় ৪ : নিষিদ্ধ দরজার ওপারে
"অসম্ভব... নিষিদ্ধ দরজাটা আবার খুলে গেছে!"
শাফরাজের কণ্ঠে এমন আতঙ্ক ছিল, যা যাইনা এর আগে কখনো শুনেনি। সে অবাক হয়ে বলল, "নিষিদ্ধ দরজা? ওটার ওপারে কী আছে?"
শাফরাজ কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল, "ওই দরজার ওপারে বন্দী রয়েছে 'ছায়া জগত'। সেখানে এমন সব জিন, আত্মা ও অন্ধকার শক্তিকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, যাদের অস্তিত্ব দুই দুনিয়ার জন্যই বিপজ্জনক। হাজার বছর আগে জিন রাজারা নিজেদের শক্তি দিয়ে দরজাটি সিল করে দিয়েছিলেন।"
হঠাৎ আবারও সেই বিকট শব্দ ভেসে এলো। মাটিও যেন হালকা কেঁপে উঠল।
শাফরাজ দ্রুত যাইনার হাত ধরে বলল, "চলো!"
যাইনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু'জন প্রাসাদের ভেতর দৌড়াতে শুরু করল। ভাঙা করিডোর, ধুলো জমা সিঁড়ি আর অন্ধকার পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছাল একটি বিশাল গোলাকার হলঘরে। মাঝখানে কালো পাথরের তৈরি বিশাল দরজা, যার গায়ে অজস্র অদ্ভুত প্রতীক খোদাই করা। দরজার ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।
যাইনা মুগ্ধ হয়ে ফিসফিস করল, "এটাই... নিষিদ্ধ দরজা?"
"হ্যাঁ।"
ঠিক তখনই দরজার ওপরের একটি প্রতীক হঠাৎ ভেঙে পড়ল। কালো ধোঁয়া আরও ঘন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে গেল।
"অনেক দেরি হয়ে গেছে..." শাফরাজ বিড়বিড় করল।
হঠাৎ ধোঁয়ার ভেতর থেকে একটি কালো ছায়া বেরিয়ে এলো। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।
যাইনা ভয়ে শাফরাজের পেছনে সরে গেল।
ছায়াটি কর্কশ কণ্ঠে বলল, "স্বাধীনতা... অবশেষে স্বাধীনতা..."
শাফরাজ হাত উঁচু করতেই তার চারপাশে নীল আগুনের বৃত্ত তৈরি হলো।
"ফিরে যাও!"
ছায়াটি হেসে উঠল।
"তুমি একা আমাকে থামাতে পারবে না, রাজকুমার।"
মুহূর্তের মধ্যেই দু'জনের মধ্যে ভয়ংকর জাদুর লড়াই শুরু হয়ে গেল। নীল আর কালো আলোর সংঘর্ষে পুরো হলঘর কেঁপে উঠল। যাইনা জীবনে এমন দৃশ্য কখনো কল্পনাও করেনি।
একসময় শাফরাজ শক্তিশালী এক আলোর আঘাতে ছায়াটিকে আবার দরজার ভেতরে ঠেলে দিল। কিন্তু তার নিজের শক্তিও অনেকটা ক্ষয় হয়ে গেল। সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল।
"শাফরাজ!" যাইনা দৌড়ে তার পাশে বসে পড়ল।
শাফরাজ দুর্বল কণ্ঠে বলল, "আমি ঠিক আছি..."
যাইনা বলল, "তুমি ঠিক নেই।"
প্রথমবারের মতো সে শাফরাজের হাত ধরল।
অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
দু'জনের হাত স্পর্শ করতেই নীল আলো তাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। শাফরাজের হাতের ক্ষত ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।
সে বিস্ময়ে যাইনার দিকে তাকাল।
"এটা... কীভাবে সম্ভব?"
যাইনাও অবাক।
"আমি তো কিছুই করিনি!"
শাফরাজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
"শুধু রাজপরিবারের রক্ত... অথবা..."
সে বাকিটা আর বলল না।
"অথবা কী?"
"না... এটা হতে পারে না।"
ঠিক তখনই হলঘরের অন্য প্রান্তে হাততালির শব্দ শোনা গেল।
"চমৎকার!"
জেসমিন ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখে রহস্যময় হাসি।
"অবশেষে আমি নিশ্চিত হলাম।"
শাফরাজ দাঁত চেপে বলল, "তুমি কী বলতে চাইছ?"
জেসমিন যাইনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, "মানুষের মেয়ে, তোমার জন্মের রহস্য তুমি নিজেও জানো না।"
যাইনা বিস্মিত।
"আমার জন্মের রহস্য?"
"হ্যাঁ। তুমি সাধারণ মানুষ নও। তোমার রক্তের সঙ্গে বহু শতাব্দী আগের এক গোপন ইতিহাস জড়িয়ে আছে।"
"মিথ্যে কথা!"
জেসমিন হেসে বলল, "বিশ্বাস না হলে তোমার গলায় ঝোলানো লকেটটা খুলে দেখো।"
যাইনা অবাক হয়ে নিজের গলার ছোট্ট রূপার লকেটটি খুলল। এটি তার মা ছোটবেলা থেকেই পরিয়ে দিয়েছিলেন।
লকেটটি খুলতেই ভেতরে একটি অদ্ভুত নীল প্রতীক জ্বলে উঠল।
ঠিক সেই একই প্রতীক, যা নিষিদ্ধ দরজার ওপর খোদাই করা ছিল।
শাফরাজের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"অসম্ভব... এই রাজমোহর তো শুধু..."
জেসমিন কথার মাঝেই হেসে উঠল।
"হ্যাঁ, শাফরাজ। এবার বুঝতে পারছ? যে মেয়েটিকে তুমি রক্ষা করার চেষ্টা করছ, সেই-ই তোমার ভাগ্যের সবচেয়ে বড় রহস্য।"
যাইনার মাথা ঘুরে উঠল। সে কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না, একটি সাধারণ প্রত্নতত্ত্ব গবেষকের সঙ্গে হাজার বছরের পুরোনো জিন রাজ্যের কী সম্পর্ক থাকতে পারে।
ঠিক তখনই দূরে গবেষণা ক্যাম্পের দিক থেকে রাশেদের চিৎকার ভেসে এলো—
"ম্যাম! বাঁচান! কেউ আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে!"
যাইনা আতঙ্কে শব্দের দিকে তাকাল।
শাফরাজের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
সে জানত, জেসমিন আর শুধু তাকে নয়—এবার যাইনার আপন মানুষদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে।