Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

চুক্তির ওপারে - 1

অধ্যায় ১: দ্য পার্ক স্ট্রিট এনকাউন্টার

দক্ষিণ কলকাতার নামী মিশনারি স্কুলের বেল বাজতে তখনও মিনিট ১৫ বাকি। ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডটা ডাস্টার দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের এক চিলতে ছায়াটাকু জানালার আয়নায় দেখে নিল পারমিতা। ভবানীপুরের এক মাঝারি মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে সে। পরনে হালকা সুতির সাধারণ শাড়ি, চশমার ফাঁক দিয়ে শান্ত-সৌম্য চোখ আর মুখে সবসময় লেগে থাকা সহজ হাসি—এই নিয়ে পারমিতা সেন। স্কুলের বাচ্চারা তাকে বড্ড ভালোবাসে, আর সে ভালোবাসে তার একদম সাধারণ, মার্জিত আর হিসেবি জীবনটাকে।

ঠিক সেই মুহূর্তে পার্ক স্ট্রিকের বহুতল কর্পোরেট টাওয়ারের একদম ওপরের তলায়, কাঁচের অতিকায় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল অভীক রায়চৌধুরী।

রায়চৌধুরী গ্রুপের ইয়াং, হ্যান্ডসাম কিন্তু প্রচণ্ড অহংকারী আর মেজাজী এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। বিলাসবহুল গাড়ি, ব্র্যান্ডেড স্যুট আর হাতের লাখ টাকার ঘড়ির আড়ালে অভীক লোকটা অত্যন্ত শক্ত স্বভাবের ব্যবসায়ী। তার কাছে ব্যবসা মানে শুধুই লাভ-ক্ষতির অংক, আর মানুষ মানে শুধুই প্রয়োজনের দাবার চাল। আবেগ বা সম্পর্কের কোনো জায়গা নেই তার ডিকশনারিতে।

সেদিন দুপুরে পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট ক্রসিংয়ের কাছে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল।

রায়চৌধুরী গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এবং নামজাদা রিয়েল এস্টেট টাইকুন প্রবীর রায়চৌধুরীর এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে। অঢেল টাকা, নিউটাউনের বিশাল বাংলো, ড্রাইভার আর একঝাঁক বডিগার্ড থাকা সত্ত্বেও বছরে দু-একদিন তিনি ছদ্মবেশে শহরের রাস্তায় বেরোন। কোনো বডিগার্ড বা দামি গাড়ি ছাড়া, খুব সাধারণ একটা কুর্তা-পাজামা পরে, হাতে একটা সস্তা ছাতা আর পুরোনো ব্যাগ ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যান। আসলে প্রবীরবাবু বিশ্বাস করেন—বিলাসবহুল গাড়ির এসি কাঁচের ওপার থেকে আসল শহরকে চেনা যায় না, মানুষের খাঁটি রূপ দেখতে হলে রাজপথে নামতে হয়।

সেদিনও তিনি ভবানীপুরের এক পুরোনো বন্ধুদের ট্রাস্টে কিছু ওষুধ আর আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দিয়ে পার্ক সার্কাসের দিকে হেঁটে আসছিলেন। কিন্তু তীব্র রোদ আর বয়সের ভারে হুট করে ওনার প্রেসার নেমে যায়। পার্ক সার্কাস মোড়ের ট্রামলাইনের ধারে হঠাৎ মাথা ঘুরে ধপাস করে পড়ে যান প্রবীরবাবু। হাতে থাকা ছাতা আর কাগজের ব্যাগটা ছিটকে যায় দূরে।

রাস্তায় প্রচুর মানুষ, বাস-ট্যাক্সির বিকট হর্ন, আর ধোঁয়ায় বাতাস ভারী। অনেকেই দূর থেকে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে, কিন্তু "ঝামেলায় জড়াব না" ভেবে কেউ এগিয়ে আসছে না।

ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাচ্ছিল পারমিতা। স্কুল শেষে কাছেই একটা টিউশন সেরে বাড়ি ফিরছিল সে। প্রবীরবাবুকে ওভাবে ধুলোয় পড়ে যেতে দেখে কোনো কিছু না ভেবেই ভিড় ঠেলে দৌড়ে গেল সে।

"দাদু! দাদু, শুনছেন? চোখ খুলুন তো!"

পারমিতা হাত থেকে নিজের ভারী ব্যাগটা ফেলে দিয়ে প্রবীরবাবুকে টেনে তুলে ফুটপাতের ধারে একটা গাছের ছায়ায় বসাল। কাছেই এক চা-কাকুর দোকান থেকে তাড়াতাড়ি জল চেয়ে এনে ওনার চোখে-মুখে ছিটাল। ওনার মাথার নিচে নিজের ব্যাগটা দিয়ে, হাতের রুমালটা ভিজিয়ে কপালে আর ঘাড়ে জলপট্টি দিতে শুরু করল।

আস্তে আস্তে চোখ খুললেন প্রবীর রায়চৌধুরী। ওনার অত কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, বিশাল গাড়ি, ক্ষমতার দাপট—কিছুই আজ ওনার সঙ্গে নেই। কিন্তু এই অচেনা ভিড় শহরে, যেখানে সবাই নিজের ধান্দায় ব্যস্ত, সেখানে এই একদম সাধারণ মেয়েটা নিজের দামি শাড়ির আঁচল ধুলোয় লুটিয়ে ওনাকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করছে!

"দাদু, এখন একটু ভালো লাগছে? আপনার নাম কী? বাড়িতে কে আছেন বলবেন? আমি ফোন করে দিচ্ছি," পারমিতার গলায় উপচে পড়ছে সত্যি সত্যি আকুলতা।

প্রবীরবাবু ধীর চোখে মেয়েটার দিকে তাকালেন। মৃদু হেসে বললেন, "আমি ঠিক আছি মা... হঠাৎ একটু মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। তোমার নাম কী?"

"আমি পারমিতা। পার্ক স্ট্রিটের একটা স্কুলে পড়াই," পারমিতা নিজ হাতে ওনার কুড়িয়ে আনা ছাতা আর ব্যাগটা গুছিয়ে দিতে দিতে বলল। তারপর ঘড়ি দেখে বলল, "আপনাকে কিন্তু এই অবস্থায় একা একা যেতে দেওয়া যাবে না।"

পারমিতা সোজা রাস্তায় নেমে একটা হলুদ ট্যাক্সি ডাকল। ড্রাইভারকে বুঝিয়ে বলে প্রবীরবাবুকে খুব সাবধানে ধরে ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসাল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে মানিব্যাগ বের করে ড্রাইভারের হাতে অগ্রিম ৪০০ টাকা ভাড়া গুঁজে দিয়ে ট্যাক্সিওয়ালাকে বলল, "দাদুকে সাবধানে ওনার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে কিন্তু!"

ট্যাক্সির খোলা জানালা দিয়ে পারমিতার দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রবীরবাবু। মেয়েটা আবার জোর করে নিজের কাছে থাকা শেষ ১০০ টাকার নোটটা প্রবীরবাবুর পকেটে গুঁজে দিয়ে বলল, "বাড়িতে গিয়ে ইমিডিয়েট ডাবের জল খাবেন আর বিশ্রাম নেবেন। এই গরমে আর কখনো একা একা এইভাবে বেরোবেন না, বুঝলেন?"

ট্যাক্সিটা ছেড়ে দেওয়ার পর প্রবীরবাবু পেছনের কাঁচ দিয়ে অনেকক্ষণ পারমিতার দিকে চেয়ে রইলেন। শহরের কত নামীদামী, স্বার্থপর আর তোষামোদকারী বড়লোক দেখেছেন তিনি। কিন্তু এই অচেনা মেয়েটার চশমার পেছনের শান্ত চোখ দুটোয় যে বিরল সততা আর মায়া তিনি দেখলেন, তা কোটি টাকা দিয়েও কেনা যায় না।

ট্যাক্সিতে বসেই প্রবীরবাবু পকেট থেকে ফোন বের করে ওনার বহু বছরের পুরানো বিশ্বস্ত পারিবারিক আইনজীবী দেবাশীষবাবুকে ফোন করলেন।

"দেবাশীষ, আমার আগের উইলের খসড়াটা এখনই বাতিল করো। রায়চৌধুরী গ্রুপের নতুন উইল তৈরি হবে।"

দেবাশীষবাবু অবাক হয়ে বললেন, "নতুন উইল? কিন্তু স্যার, অভীক তো সব বিজনেস একাই সামলাচ্ছে..."

"অভীক ভালো বিজনেসম্যান হতে পারে দেবাশীষ, কিন্তু ও মানুষ হিসেবে অত্যন্ত অহংকারী আর নির্দয়। ওর ইগো ভাঙতে আর ওকে সত্যিকারের মানুষ বানাতে আমার এই উইলটা দরকার," প্রবীরবাবুর গলায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

ওদিকে একই বিকেলে, রায়চৌধুরী হাউসের বিলাসবহুল কনফারেন্স রুমে মিটিং টেবিল চাপড়ে চিল্লাচ্ছে অভীক।
"আই ডোন্ট কেয়ার! যে প্রজেক্টে আমার দু'কোটি টাকা লোকসান হতে পারে, সেটা আমি সাইন করব না! দাদু কী বলল বা না বলল তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না!"

ফোনটা বাজল অভীকের। স্ক্রিনে দেবাশীষবাবুর নাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে লয়ারের গম্ভীর গলা ভেসে এল, "অভীক, কাজ বন্ধ করে এক্ষুণি নিউটাউনের বাংলোয় এসো। তোমার দাদু একটা নতুন উইল তৈরি করেছেন। আর সেটা শোনানোর জন্য তোমার আর তোমার পুরো পরিবারের থাকাটা বাধ্যতামূলক।"

অভীক মারাত্মক বিরক্তিতে সামনে থাকা ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। সে তখনও স্বপ্নেও ভাবেনি, পার্ক স্ট্রিটের এক সাধারণ স্কুলের মাইনে পাওয়া শিক্ষিকা কীভাবে তার কোটি টাকার অহংকার আর হিসেবি জীবনটাকে তছনছ করে দিতে চলেছে!