Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

চুক্তির ওপারে - 2

অধ্যায় ২: উইল এবং ৬ মাসের শর্ত
নিউটাউনের রাজকীয় রায়চৌধুরী বাংলোর বিশাল লিভিং রুম। ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝে, মাথায় ঝুলছে বলিভিয়ার ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। কিন্তু ঘরের ভেতরের পরিবেশটা থমথমে, যেন এখনই কালবৈশাখী ঝড় উঠবে।

বিশাল সোফায় মুখোমুখি বসে আছে পুরো রায়চৌধুরী পরিবার। একপাশে অভীকের বাবা-মা আর পিসি, আর মাঝখানের সিটে পা ওপর পা তুলে বসে আছে অভীক নিজে। তার মুখে চরম বিরক্তি আর অবিশ্বাসের ছায়া। হাতের বিলাসবহুল ঘড়িটার দিকে বারবার তাকাচ্ছে সে—সময় নষ্ট হওয়াটা তার কাছে অপরাধের সমান।

সামনের টি-টেবিলে মোটা একটা ফাইল খুলে বসে আছেন পারিবারিক আইনজীবী দেবাশীষবাবু। আর ওনার ঠিক পাশে, একটা সিঙ্গেল সোফায় খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন রায়চৌধুরী সাম্রাজ্যের সর্বেসর্বা—প্রবীর রায়চৌধুরী।

"দেবাশীষকাকা, ড্রামা বন্ধ করে আসল কথাটা বলবে?" অভীক হাত থেকে কফির কাপটা টেবিলের ওপর একটু জোরের সাথেই রাখল। "দাদু আবার কী নতুন খেয়াল চেপে বসেছেন? আমার অফিসে চারটে ইম্পরট্যান্ট মিটিং আটকে আছে।"

প্রবীরবাবু এক নজর নাতির দিকে তাকালেন। চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, শুধুই এক অদ্ভুত হাসির ঝিলিক। তিনি দেবাশীষবাবুকে ইশারা করলেন।

দেবাশীষবাবু চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ফাইলটা হাতে নিলেন। গলাটা একটু পরিষ্কার করে বললেন, "প্রবীরবাবু ওনার সম্পত্তি এবং রায়চৌধুরী গ্রুপের ৫১% মেজোরিটি শেয়ার—যা বর্তমানে ওনার নামে আছে—সেটা নিয়ে একটা নতুন উইল সাইন করেছেন।"

ঘরের সবাই সোজা হয়ে বসল। অভীকের বাবা উৎসাহ চেপে রাখতে না পেরে বললেন, "কী আছে উইলে দেবাশীষ?"

"উইলে স্পষ্ট লেখা আছে, রায়চৌধুরী গ্রুপের পরবর্তী চেয়ারম্যান এবং এই সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র মালিক হবে অভীক রায়চৌধুরী..." দেবাশীষবাবু একটু থামলেন।

অভীকের ঠোঁটের কোণে একটা অহংকারী জয়ের হাসি ফুটে উঠল। "দ্যাটস ইট? এটার জন্য আমাকে ডাকার কী দরকার ছিল? এটা তো জানাই ছিল।"

"একটু দাঁড়াও অভীক, আসল শর্তটা এখনো বলা হয়নি," দেবাশীষবাবু গলার স্বর আরো গম্ভীর করলেন। "উইলে প্রবীরবাবু একটা বিশেষ ক্লজ যোগ করেছেন। প্রবীরবাবু পারমিতা সেন নামের একটি মেয়েকে পছন্দ করেছেন। অভীককে আগামী এক মাসের মধ্যে সেই পারমিতা সেনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেতে হবে এবং কমপক্ষে আগামী ৬ মাস ওকে প্রকাশ্যে ডেট করতে হবে অথবা বিয়ে করতে হবে। এই ৬ মাসের মধ্যে অভীক যদি পারমিতাকে মানিয়ে নিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে বা বিয়েতে রাজি করাতে পারে, তবেই এই সম্পত্তি আর কোম্পানির ৫১% শেয়ার সম্পূর্ণ অভীকের নামে ট্রান্সফার হবে।"

দেবাশীষবাবু থামতেই পুরো ঘরে যেন বাজ পড়ল।

দেবাশীষবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, "আর অভীক যদি এই ৬ মাসের ডেটিং বা বিয়ের শর্তে রাজি না হয়, তবে রায়চৌধুরী গ্রুপের ৫১% শেয়ার আর নিউটাউনের এই বাংলো সোজাসুজি চলে যাবে প্রবীরবাবুর তৈরি ট্রাস্টের নামে। অভীককে কোম্পানি থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ কর্মচারীর মতো বেরিয়ে যেতে হবে।"

"হোয়াট দ্য এফ...!" অভীক সোফা ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।

"দাদু! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?" অভীকের গলা সপ্তমে চড়ল। "আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে তুমি ব্ল্যাকমেল করছ? আর ৬ মাসের ফেক রিলেশনশিপের নাটকের শর্ত দিচ্ছ? কে এই পারমিতা সেন? কোন বিজনেসম্যানের মেয়ে? কোন মডেলে সঙ্গে ডিল বানিয়ে এসেছ?"

প্রবীরবাবু খুব ঠান্ডা গলায় বললেন, "কোনো বিজনেসম্যানের মেয়ে নয় অভীক। মেয়েটি দক্ষিণ কলকাতার একটা সাধারণ মিশনারি স্কুলের শিক্ষিকা। আর ওর নাম ছাড়া আমি নিজেই ওর বিস্তারিত ঠিকানা জানি না।"

"তুমি ওর ঠিকানাও জানো না?!" অভীক তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে উঠল।

প্রবীরবাবু সোজাসুজি অভীকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "না, জানি না। ও আমাকে শুধু নিজের নাম 'পারমিতা' আর পার্ক স্ট্রিটের একটা স্কুলে পড়ায় এটুকুই জানিয়েছিল। আমায় ট্যাক্সি ভাড়া করে বাড়ি পাঠানোর সময় ও নিজের পরিচয় দিতে চায়নি। কিন্তু আমি আমার লয়্যারকে দিয়ে ওর পুরো খবর বের করিয়েছি। মেয়েটি ভবানীপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে। অতি সাধারণ জীবনযাপন করে। ও টাকার গরম চেনে না, মানুষ চেনে। তাই ওর মতো মেয়ে যদি ৬ মাস তোর মতো অসভ্য আর অহংকারী ছেলের পাশে থাকতে রাজি হয়, তবেই বুঝব তুই কোম্পানি চালানোর যোগ্য মানুষ হয়েছিস।"

"তুমি চাও আমি—অভীক রায়চৌধুরী—একটা অতি সাধারণ স্কুলের ছ্যাঁচড়া মাইনে পাওয়া মেয়েকে ৬ মাস ধরে ডেট করি? ইউ মাস্ট বি কিডিং মি!" অভীক রাগে ফুঁসছে।

"তুই ডেট করবি না বিয়ে করবি, সেটা তোর ব্যাপার। কিন্তু কাল সকালের মধ্যে চুক্তিতে সই না করলে এডি পদ ছেড়ে দিস," প্রবীরবাবু শান্তভাবে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।

দেবাশীষবাবু অভীকের দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, "প্রবীরবাবু প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়ে ইতিমধ্যেই পারমিতা সেনের ভবানীপুরের বাড়ির ঠিকানা, ওর স্কুলের নাম আর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড বের করে এনেছেন। এই যে ওর ডিটেইলস।"

অভীক ঝটকা মেরে ফাইলটা টেনে নিল। ফাইলে থাকা পারমিতার ছবিটার দিকে তাকিয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সাধারণ সুতির শাড়ি পরা একটা শান্ত মুখের মেয়ে তাকে আজ এই পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছে!

"পারমিতা সেন... দাদুর কাছে খুব ভালো সাজা হয়েছে না?" অভীক নিজের মনেই ফিসফিস করে উঠল, "তুমি ভেবেছ রায়চৌধুরী পরিবারের বড় বউ হবে? তোমাকে আমি এমনভাবে এই ৬ মাসের চুক্তিতে ফাঁসাব, যাতে তুমি নিজেই দৌড়ে পালাও!"

অভীক মার্সিডিজের চাবিটা তুলে নিল। কাল সকালেই সে পারমিতার মুখোমুখি হবে। তবে সোজাসুজি নয়—দেবাশীষবাবুকে দিয়ে একটা মিথ্যা আইনি নোটিশ বা সাহায্যের নাম করে পারমিতাকে ডেকে পাঠানো হবে সিটি সেন্টারের এক অভিজাত ক্যাফেতে।

সেখানে বসেই লেখা হবে ৬ মাসের সেই অদ্ভুত চুক্তিপত্র!