Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী - 4

 রবিরা  ট্রেনে রাতে উঠেছিল, আর সকালের সাতটার মধ্যে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে গেল। 

 ফালাকাটা থেকে কলকাতা—এই দীর্ঘ পথ যেন রবির কাছে এক অন্তহীন প্রতীক্ষার মতো।

 রিপোর্টগুলোয় কী আছে? ডাক্তারবাবু কী বলবেন? 

এই সব প্রশ্ন রবির মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু মেয়ের জন্য সে যে কোনো লড়াই লড়তে প্রস্তুত।

রিপোর্টগুলো হাতে পাওয়ার পর রবির হাত সামান্য কাঁপছিল।

 সে আর সুরভি চেম্বারে ঢুকে ডাক্তারবাবুর হাতে ফাইলটা তুলে দিল।

 ডাক্তারবাবু চশমাটা নাক বরাবর নামিয়ে প্রতিটি রিপোর্ট অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন। 

রবি আর সুরভির এক অজানা আশঙ্কায় বুক ফেটে যাচ্ছিল।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ডাক্তারবাবু ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন। 

তিনি গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বললেন, “দেখুন, সব পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো করে যাচাই করে যা বোঝা যাচ্ছে,—অন্বেষার শরীরে ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম (Immunodeficiency Syndrome)-এর স্পষ্ট লক্ষণ আছে”।

ডাক্তারবাবু বুঝিয়ে বললেন, “এর সহজ মানে হলো, ওর শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না বা কাজ করছে না।

 বাইরের জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য যে 'সৈন্যদল' শরীরে থাকার কথা, ওর ক্ষেত্রে তারা খুব দুর্বল।

 তাই সামান্য ধুলোবালি বা হাওয়া থেকেই সে সহজেই বড় ধরণের সংক্রমণ, জ্বর কিংবা কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে”।

সুরভির মনে হলো পৃথিবীটা হঠাৎ তার পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে। 

দীর্ঘক্ষণ যে ভয়টা সে মনের এক কোণে চেপে রেখেছিল, আজ ডাক্তারবাবুর একটা কথায় সেটা বিশাল এক পাহাড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

 সুরভির চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

ডাক্তারবাবু রবির উদভ্রান্ত মুখ আর সুরভির চোখের জল দেখে একটু নরম হলেন।

 তিনি আশ্বাসের স্বরে আবার ধীরে ধীরে বললেন, “শুনুন, একদম ভেঙে পড়বেন না। 

ভয়ের চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা এখন সমস্যাটা ঠিক কোথায় সেটা জানি। রোগটা ধরা পড়েছে এটাই সবথেকে বড় স্বস্তি। 

আমরা এখন থেকে ওর জন্য সঠিক চিকিৎসা এবং বিশেষ যত্নের ব্যবস্থা করব। 

আধুনিক চিকিৎসায় এমন অনেক পথ আছে যাতে ওকে আমরা সুস্থ রাখতে পারি।

 শুধু আপনাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে”।

রবির মনে হলো, অন্ধকারে একটা সরু সুতোর মতো আলো দেখা গেছে। 

পথটা কঠিন, কিন্তু ডাক্তারবাবু যখন বলছেন আশা আছে, তখন সে হাল ছাড়বে না।

 সে নিজের চোখের জল মুছে ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “আপনি যা বলবেন আমরা তাই করব ডাক্তারবাবু, শুধু আমার মেয়েটাকে আগের মতো করে দিন”।

 ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশনটা একপাশে রেখে রবি আর সুরভির চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় পরবর্তী ধাপের কথা বলতে শুরু করলেন। 

ডাক্তারবাবু জানতেন, এই সত্যিটা হজম করা কোনো সাধারণ মা-বাবার পক্ষে সহজ নয়।

ডাক্তারবাবু বললেন, “অন্বেষার জন্য আমরা প্রথমে বিশেষ কিছু ওষুধ দিয়ে চেষ্টা করতে পারি।

 নিয়মিত ওষুধ আর কড়া নজরদারিতে রাখলে ও সাময়িকভাবে ভালো থাকবে। 

কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই রোগ শুধু ওষুধ দিয়ে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। 

বারবার সংক্রমণ হওয়ার ভয় থেকেই যাবে, আর এই ওষুধের খরচও কিন্তু অনেক বেশি”।

রবির বুকের ভেতরটা যেন শুকিয়ে এল। সে বুঝতে পারছিল, তারা এক অন্তহীন চোরাবালিতে পা দিয়েছে। ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন, “অন্বেষাকে পুরোপুরি সুস্থ করার একমাত্র স্থায়ী উপায় হলো বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট (BMT) বা যেটাকে আমরা এইচএসসিটি (HSCT) বলি।

ভাগ্যক্রমে ওর বড় ভাই শিবরাজ আছে। শিবরাজ ওর ডোনার হতে পারে। তবে তার আগে আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে শিবরাজের বোন ম্যারো অন্বেষার সাথে কতটা মিলছে। যদি মিলে যায়, তবে ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে মেয়েটিকে আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারব”।

রবির মনে এক চিলতে আশা জাগলেও ডাক্তারবাবুর পরের কথাগুলো তাকে পাথরের মতো নিথর করে দিল। রবি আর সুরভি নিঃশব্দে পরস্পরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করল।