Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ছায়াপ্রাণ (অন্তিম সিজন )


                                        (১)

৫০ বছর আগে 


স্থান: গ্রাদারা, ইতালি                      সময়: সন্ধ্যা 


পিওর মুন্তে ছিলেন একজন আনাজ ব্যবসায়ী।

তিনি এখানে প্রথম বাড়ি তৈরি করেছিলেন। বাড়িটা ছিল পাথরের।

সেটাও হয়ে গেল প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার কথা।

পিওরের এক সন্তান গ্লেকি। তাঁর হাতের কাজ  দুর্দান্ত। প্রকৃতি থেকে যেকোনও জিনিস আহরণ করে তিনি তাঁর মত করে সৃষ্টিকর্ম সম্পাদন করতেন। এখনও অবসর পেলে করেন।

পিওরের বউ বিয়ের পরপরই মারা গিয়েছিল।

গ্লেকির বউ প্যাট্রিকা। সন্তান কোলতেন।

প্যাট্রিকা ধনীগৃহে গৃহ সহায়িকার কাজ করেন। কোলতেন স্কুলে পড়ছে। 

গ্লেকি পেশায় মোটর মেকানিক।

ভোর থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে আসেন। তারপর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। তাঁর নিজস্ব গ্যারেজ।

সন্ধ্যায় বাড়ি এসে গ্লেকি দেখলেন প্যাট্রিকা এখনও আসেনি।

কোলতেন বলল মায়ের আসতে দেরি হবে। 

গ্লেকি মাথা নেড়ে স্নানে ঢুকলেন। 

বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি দেখলেন প্যাট্রিকা এসে গেছে।

বউকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে।

" কি হয়েছে ? ," গ্লেকি জিজ্ঞেস করলেন। 

" আমার শরীর ভালো লাগছে না," প্যাট্রিকা উত্তর দিলেন। 

" ডাক্তার দেখাতে হবে। "

হঠাৎ প্যাট্রিকা ভীষণ রেগে উঠলেন," কখনই নয়। আমি খুব ভালো আছি। "

গ্লেকি আর কোনও কথা বললেন না। 


                                      (২)

৫০ বছর আগে

স্থান: কার্প, কানাডা                          সময়: সকাল


টেনটিন হার্ডো তার বাজারের দোকান খুলে বসেছেন।

তিনি মূলত অ্যান্টিক সামগ্রী বিক্রি করেন। 

কুড়িমিনিটের মাথায় একজন টুপিধারী বয়স্ক ব্যক্তি প্রবেশ করলেন। 

টেনটিন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন," মর্নিং , আসুন স্যার। "

ভদ্রলোক পা টেনে টেনে হাঁটছেন। কাউন্টারের সামনে এসে তিনি বললেন," আমাকে এক গ্লাস জল দিন। "

" নিশ্চয়ই," টেনটিন গ্লাসভর্তি জল এগিয়ে দিলেন।

" খুব গরম লাগছে," ভদ্রলোক বললেন," আরও এক গ্লাস জল দেবেন। "

" নিশ্চয়ই। "

ভদ্রলোক এবার কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা চামড়ার থলে বের করলেন। গ্লাসভর্তি জল থলেতে ঢেলে দিয়ে ফাঁকা গ্লাস এগিয়ে দিলেন। 

" জল খেলেন না ? "

" খাব আপনি দিন আরেক গ্লাস জল। "

ভদ্রলোক অপেক্ষায় থাকলেন। এক মিনিটের মধ্যে জল এসে গেল। 

এবার ভদ্রলোক গ্লাসে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন," আমি একটু আসছি। "

চামড়ার থলেটা কাউন্টারের ওপর রেখে পা টেনে টেনে তিনি দোকানের বাইরে গেলেন। 

এবার টেনটিন চামড়ার থলেতে উকি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাথা কেউ যেন চেপে ধরল। 

তিনি স্থির থাকতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেলেন।

এবার যে ভদ্রলোক বাইরে গিয়েছিলেন তিনি  পা চালিয়ে দোকানে ঢুকলেন।

থলেটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।


                                        (৩)

৫০ বছর আগে

স্থান: লুজিনো , পোল্যান্ড                      সময়: সকাল


মার্টিন ডিউফিক্স পেশায় একজন জাদুকর। ইদানিং তাঁর বাজার পড়ে গেছে। কারণ বাজারে একজন নতুন জাদুকরের আবির্ভাব হয়েছে। 

এতদিন দেশ ঘুরে মার্টিন জাদু দেখাতেন। উপার্জন ভালোই হতো। কিন্তু এই নতুন জাদুকর আসার পর থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর সংস্থা কমে গেছে।

মার্টিন শুনেছেন ঐ জাদুকরের নাম গেলজিন হাফ।

তাঁর একটা জনপ্রিয় খেলা আছে --  ' মস্তিষ্ক কথা বলে। '

মূলত ঐ খেলাটা দেখতে যাবার জন্যই প্রচুর ভীড় হচ্ছে। 

মার্টিন ঠিক করেছেন ছদ্মবেশে তিনিও ঐ জাদুকরের খেলা দেখতে যাবেন।

বউ সিন্ডিলাকে একথা বলায় তিনি বললেন," খেলা দেখতে যাবে তুমি আর অনুসন্ধান করব আমি। "

মার্টিন খুশি হয়ে বললেন," ঠিক আছে। "


দুদিন পর


আজ সেই জাদুর খেলা। এখন দুপুর। লম্বা তাঁবুর ভেতরে খেলা দেখানো হবে।

একটা লম্বা টুলের উপর কাদামাটির ডেলা। দেখতে মানুষের মাথা এবং মুখের মত ।

একটু দূরে জঙ্গল।

সেখানে লুকিয়ে আছেন সিন্ডিলা।

খেলা দেখানো শুরু হয়েছে। পা টিপে টিপে তাঁবুর অন্যদিকে তিনি পৌঁছে গেলেন। 

এখানে কোনও লোকজন নেই। ভেতরে ঢুকতে যাবেন হঠাৎ একটা আওয়াজ পেলেন। কেউ যেন বলে উঠলো," তুমি এসে ভালোই করেছ। আমাকে এখান থেকে উদ্ধার কর। "

সিন্ডিলা কাউকে দেখতে পেলেন না। তিনি খুবই আশ্চর্য হলেন। 

ফের সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর একই কথা বলল। 

এইসময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। মুষলধারায়। সিন্ডিলা দেখলেন আকাশ একেবারে সন্ধ্যার মত অন্ধকার হয়ে এসেছে।

তুমুল বজ্রপাত শুরু হল। খেলা কিন্তু ভেতরে চলছে। 

সিন্ডিলা ফের অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন," এখনই সুযোগ তাড়াতাড়ি এসো ভেতরে। "

সিন্ডিলা তাঁবুর ভেতর ঢুকে দেখতে পেলেন একটা ফাঁকা চেয়ার। সেখানে একটা ইঁদুর বসে আছে।

এইসময় তাঁবুর উপরে বাজ পড়ল। সিন্ডিলা ছিটকে পড়লেন দূরে আর সবিস্ময়ে দেখলেন ইঁদুরটা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল । চেয়ারের মধ্যে পড়ে আছে একটা খুলি।

সিন্ডিলা কি মনে করে খুলিটা তুলে নিয়ে তাঁবু থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলেন।


                                          (৪)

এখন

স্থান: রিচমন্ড, ইংল্যান্ড                     সময়: দুপুর 


গৃহকর্তার নাম হিটিং জোল।  পেশায় অতিপ্রাকৃত অনুসন্ধানী । 

এই বিজ্ঞানের যুগে এইসব চিন্তাধারা বিজ্ঞান বিশ্বাসীদের কাছে অচল। কিন্তু এর বাইরেও অনেকে আছেন যাঁরা বিজ্ঞানে আস্থাশীল হলেও অতিপ্রাকৃত  বিষয়ে বিশ্বাস করেন।

এই বাড়িতে যিনি এসেছেন তাঁর নাম অ্যালেন ডাম্প।

হিটিং বললেন," কি জানতে চান বলুন। "

অ্যালেন বললেন," আমার ঠাকুর্দার একটা মহা মূল্যবান জিনিস ছিল। তিনি বহু হাত ঘুরে সেটা পেয়েছিলেন। একটা সিন্দুকে সেটা লুকানো ছিল বহুবছর। আমরা কোনওদিনই খুলিনি সিন্দুক। দুদিন আগে এক ভদ্রলোক আমার বাড়িতে আসেন। তাঁর ঠাকুর্দা নাকি আমার ঠাকুর্দার বন্ধু ছিলেন। ভদ্রলোকের নাম টিউচেন মোল। তিনি বললেন তাঁর বাড়িতেও একটা সিন্দুক আছে। সেই সিন্দুকে আছে মহামূল্যবান আরেকটি জিনিস যেটা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। ভদ্রলোকের বক্তব্য হচ্ছে সিন্দুক খুলে দুটো বস্তুকে এক জায়গায় রাখতে হবে। না হলে বিপদ হবে। এই ভদ্রলোক চলে যাবার পর একটি নীলাম সংস্থা থেকে প্রতিনিধি আমার বাড়িতে আসে। তিনি যেকোনও মূল্যে আমার ঠাকুর্দার সেই মহামূল্যবান বস্তুটি কিনে নিতে চান। অনেক টাকা অফার করেন। আমি রাজী হইনি। তিনি চলে যাবার পর রাতে আমার বাড়িতে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের দ্বারা হামলা হয়। পরদিন সেই ভদ্রলোক আবার আসেন। তিনি বলেন তাঁর বাড়িতেও হামলা হয়েছে। আমরা খুবই চিন্তিত। "

" নীলামের ভদ্রলোক কি আবার এসেছিলেন ? "

" না। "

" ওই বস্তুটি কি সেটা কি জানতে পেরেছেন ? "

" সিন্দুকটা খোলা হয়নি। আপনার উপস্থিতিতে খুলতে চাই। "

" ঠিক আছে, আগামীকাল যাব আপনার বাড়ি। "


পরদিন 


সিন্দুক খোলা হয়েছে। ভিতরে শুধু একটা ক্ষুদ্র বিবর্ণ পাথর পড়ে আছে। 

জোল সেটা হাতে নিয়ে বললেন," এটা এখন আমার কাছে থাক। পরে জানাব। "

ডাম্প বললেন," আমি কি পুলিশকে জানাব ? "

" জানান। তবে এই জিনিসের কথা বলবেন না। সিসিটিভি আছে । দুষ্কৃতীদের নিশ্চয়ই ধরা যাবে। "


দুদিন পর 


পুলিশ অফিসারের নাম লেকটিন হান্স। তিনি বললেন," আমরা ডাকাত দলটাকে ধরেছি। কিন্তু কেউই মুখ খোলেনি। আশ্চর্যজনকভাবে সবারই এক বক্তব্য কি জন্য আমরা ঐ বাড়িতে ঢুকেছিলাম জানিনা। শুধু আমাদের ঢুকতে বলা হয়েছিল। কি জিনিস ওরা ডাকাতি করতে এসেছিল বলে আপনার মনে হয় ? "

ডাম্প বললেন," আমার বাড়িতে কোনও সোনাদানা নেই। "

" সিন্দুকে কি আছে ? "

" আমার পূর্বপুরুষের ডায়েরি। "

" একবার খুলুন। "

" ডায়েরিটা এখন নেই। "

" কেউ কি ডাইরিটা নেবার কথা বলেছিল ? "

" না। "


সেদিন রাতে 


বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে বজ্রবিদ্যুৎ সহ।

এই ঘর অন্ধকার। একটা পুরনো চেয়ারে বসে আছেন জোল। দরজা বন্ধ। 

কিছুসময় কেটে যাবার পর একটা শব্দ হল। বজ্রপাত সরাসরি ঘরে ঢুকলো। আর সেটা সরাসরি হিট করলো চেয়ারে। জোল কোনও চিৎকার চেঁচামেচি না করে চুপচাপ বসে আছেন।

আরও কিছু সময় কেটে যাবার পর ঘরে ঢুকলো একটা ছায়ামূর্তি। তাকে একেবারে অদৃশ্য দেখাচ্ছে। 

সে চেয়ারের সামনে এসে দাঁড়ালো। জোল উঠে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলেন।

ছায়ামূর্তি এবার হাত বাড়িয়ে দিল জোলের বুকের কাছে। ঠিক তখনই আরেকটা বাজ পড়লো। চেয়ারটা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ল আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা বিরাট ইঁদুর। 

সঙ্গে সঙ্গে সেই ছায়ামূর্তি পালাতে চাইল কিন্তু ততক্ষণে জোলের দেহের সঙ্গে তার অদৃশ্য হাত মিশে গেছে। 

একসময় ইঁদুরটা ছায়ামূর্তির ভেতর মিশে গেল। অর্থাৎ জোলের দেহের সঙ্গে ছায়ামূর্তি ও ইঁদুর একসঙ্গে মিশে গেছে। 


পরদিন 


সিন্দুক খুলে ডাম্প দেখতে পেলেন কতগুলো কাঁচের টুকরো পড়ে আছে। সেগুলো একসঙ্গে জড়ো করলে একটা ছোটখাট আয়না হয়। 

আর সেই আয়নায় তিনি দেখতে পেলেন গত রাতে মিস্টার জোলের বাড়িতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা। 


এরপর আর সেই ভদ্রলোক ডাম্পের বাড়িতে আর কোনওদিন আসেননি।


                                      সমাপ্ত 


গল্পটা এখানেই শেষ