সুকান্তর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের লোকেরা জমিদারবাড়ির সামনে এসে ভিড় করতে শুরু করলো।
কেউ বললো , মৃণালিনী দেবীর আত্মা ফিরে এসেছে।
কেউ বললো , কুসুমের অভিশাপ।
আর কেউ কেউ দাবি করলো, আগের রাতেও তারা বাড়ির ছাদে একটি মহিলাকে হাঁটতে দেখেছে।
ইন্সপেক্টর অনিকেত এসব কথায় গুরুত্ব দিলো না। ইন্সপেক্টর অনিকেত সুকান্তর ঘর তল্লাশি করতে গিয়ে একটি লোহার বাক্স পেলো।
বাক্সের ভিতরে পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং, কয়েকটি ছবি এবং হাতে লেখা একটি তালিকা।
তালিকায় চারটি নাম -
১. সুশান্ত চৌধুরী।
২. সুকান্ত চৌধুরী।
৩. হরিপদ মিত্র।
৪. ড. অর্ণব সেন।
প্রথম তিনটি নামের পাশে কালো কালি দিয়ে দাগ টানা।
শেষ নামটির পাশে লেখা—
'পরবর্তী অমাবস্যার আগে।'
ডা. অর্ণব সেন তালিকাটা দেখে চেয়ারে বসে পড়লেন।
"এটা অসম্ভব।"
ইন্সপেক্টর অনিকেত জিজ্ঞেস করলো, "আপনি এই তালিকা সম্পর্কে কিছু জানেন?"
ডা. অর্ণব সেন বললো , "না।"
ইন্সপেক্টর অনিকেত জিজ্ঞেস করলো , "আপনার নাম এখানে কেন?"
ডা. অর্ণব সেন বললো , "আমি জানি না!"
অনুব্রত লক্ষ্য করলো, ডাক্তারের হাত কাঁপছে। যেনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করছে।
অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ডা. অর্ণব সেনকে , "আপনি আমার মায়ের চিকিৎসা করতেন?"
ড. অর্ণব সেন মাথা তুললেন।
"হ্যাঁ।"
"তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?"
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "তোমার মা মারা যাননি। অন্তত আমি তাঁকে মৃত অবস্থায় দেখিনি।"
অনুব্রত বুকের ভিতরে ধাক্কা লাগলো ।
"তার মানে?"
ড. অর্ণব সেন চোখ বন্ধ করলো।
"সেদিন রাতে তোমার বাবা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমার মা অসুস্থ। আমি বাড়িতে এসে দেখি, তাঁকে তেরো নম্বর ঘরের ভিতরে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি তখনও বেঁচে ছিলেন।"
"তারপর?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
"আমি তোমার মা কে বের করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সুশান্তবাবু আমাকে বাধা দেন। তিনি বলেছিলেন, যদি আমি কাউকে কিছু বলি, তবে আমার পরিবারের ক্ষতি হবে।"
"আপনি পুলিশে যাননি কেন?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
ডাক্তার কিছু বললো না , তাঁর নীরবতাই উত্তর ছিল --- না…।
ইন্সপেক্টর অনিকেত এবার কঠিন গলায় বললেন, "তারপর কী হয়েছিলো ?"
ড. অর্ণব সেন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
চল্লিশ বছর আগে, মৃণালিনী দেবী জানতে পেরেছিলেন যে সুশান্তবাবু, সুকান্ত এবং হরিপদবাবু মিলে জমির দখল নেওয়ার জন্য গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের মেয়েকে অপহরণ করেছিলো ।
মেয়েটির নাম কুসুম।
কুসুমের বাবা ছিলো এই জমিদারবাড়ির পুরোনো কর্মচারী। তাঁর কাছে এমন কিছু দলিল ছিল, যা প্রমাণ করত যে চৌধুরী রা অবৈধভাবে গ্রামের বহু মানুষের জমি দখল করেছিলেন।
দলিলগুলো উদ্ধার করার জন্য কুসুমকে অপহরন করে এই জমিদারবাড়িতে আনা হয়েছিলো । কিন্তু সে দলিলের কথা জানাতে অস্বীকার করেছিলো । তারপর তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো তেরো নম্বর ঘরে। মৃণালিনী দেবী ঘটনাটা জানতে পেরে কুসুমকে পালাতে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। সেই রাতেই তাঁকে ধরে ফেলা হয়।
"তাহলে মাকে খুন করা হয়েছিলো ?" অনুব্রত ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো।
ড. অর্ণব সেন বললো , "আমি জানি না। আমি যখন শেষবার তাঁকে দেখেছিলাম, তখন তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে সুশান্তবাবু বলেছিলেন, তোমার মা পালিয়ে গেছেন।"
"আর কুসুম?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
ডাক্তার কাঁপা গলায় বললো , "তাকে আর কখনো দেখা যায়নি।"
অনুব্রতর মনে পড়ল, ছোটোবেলায় সে একবার মায়ের ঘরে কাঁদতে থাকা একটি মেয়েকে দেখেছিলো । তার হাতে ছিল লাল কাঁচের চুড়ি।
মা তাকে বলেছিলো, মেয়েটি তাদের অতিথি। সেই মেয়েটাই কি কুসুম?
ইন্সপেক্টর অনিকেত টেবিলে হাত রাখলো তারপর বললো , "এখন একটা বিষয় পরিষ্কার। চারজন মানুষ একটি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের দুজন মারা গেছে। তৃতীয়জন সুশান্তবাবু আগেই মারা গেছেন। আর তালিকায় পরের নাম ডা. অর্ণব সেনের।"
ড. অর্ণব সেন উঠে দাঁড়ালো এবং ভয় আর আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো , "আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকব না।"
ইন্সপেক্টর অনিকেত তাঁকে থামালো এবং বললো , "আপনি কোথাও যাবেন না। যতক্ষণ না তদন্ত শেষ হচ্ছে, আপনি এই বাড়িতেই থাকবেন। আপনার সুরক্ষার দায়িত্ব আমার” ।
ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো। তারপর বাড়ির সব আলো নিভে গেলো। অন্ধকারের মধ্যে কেউ খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো।
এক পা…। দুই পা…। তিন পা…।
শব্দটা এসে থামলো সুকান্তর ঘরের দরজার ঠিক বাইরে। তারপর শোনা গেলো একটি মেয়ের গলা।
"ডাক্তারবাবু..."
ড. অর্ণব সেনের মুখ সাদা হয়ে গেলো।
আতঙ্কে আছন্ন কণ্ঠে ড. অর্ণব সেন বললো , "না... না... তুমি তো মারা গেছো !"
দরজার বাইরে থেকে একটু হাল্কা হাসি মাখা কণ্ঠে উত্তর এলো — “ডাক্তারবাবু... আপনি তো বলেছিলেন, আমাকে বাঁচাবেন।"
তারপর ঘরের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করলো।