দরজা খুলে গেলো। কিন্তু বাইরে কেউ নেই। শুধু করিডরের মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ।
ছোটো ছোটো পায়ের ছাপ। যেন কোনো মেয়ে পুকুর থেকে উঠে এসে সোজা এই ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
ছাপগুলো ধীরে ধীরে উত্তর দিকের করিডরের দিকে এগিয়ে গেছে। তেরো নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে।
ড.অর্ণব সেন চিৎকার করে উঠে বললো , "আমাকে ওখানে নিয়ে যাবেন না!"
ইন্সপেক্টর অনিকেত তাঁর হাত ধরে বললো , "কেউ আপনাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে না।"
কিন্তু ডাক্তার তখন আর নিজের মধ্যে নেই।
তিনি বলতে লাগলেন, "আমি কিছু করিনি! আমি কাউকে মারিনি! আমি শুধু দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম!"
কথাটা শুনে অনুব্রত স্তব্ধ হয়ে গেলো।
"কোন দরজা?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
ড. অর্ণব সেন বুঝতে পারল, তিনি কী বলে ফেলেছেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।
তারপর বলতে লাগলেন , "আমি শুধু দরজা বন্ধ করেছিলাম। সুশান্তবাবু বলেছিলেন, একটু পরে খুলে দেবেন। কিন্তু... কিন্তু তিনি আর খোলেননি।"
"কাকে বন্ধ করেছিলেন?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো।
ড . অর্ণব সেন উত্তর দিলো না।
অনুব্রত ড . অর্ণব সেনের জামার কলার চেপে ধরে রাগ মেশানো কণ্ঠে বলে উঠলো , "আমার মা-কে?"
ড. অর্ণব কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়লেন।
"তোমার মা আর কুসুম দুজনেই ওই ঘরে ছিল।"
"তারপর?"
"পরদিন সকালে দরজা খুলে দেখি, কুসুম মেঝেতে পড়ে আছে। আর তোমার মা... তোমার মা নেই। শুধু দেওয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল—"
"কী লেখা ছিল?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো।
ড.অর্ণব সেন কাঁপতে কাঁপতে বললো , "আমি ফিরব।"
তারপর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তাঁকে পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
ইন্সপেক্টর অনিকেত অনুব্রতকে বললেন, "এখনই ওই ঘর খুলতে হবে।"
অনুব্রতর বাবার চিঠির কথা মনে পড়ল। 'তেরো নম্বর ঘরের দরজা খুলিস না।'
কিন্তু এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। নিবারণকে ডেকে আনা হলো। নিবারন প্রথমে রাজি হচ্ছিল না।
তারপর সে বললো , "দরজাটা খুললে শুধু একটা ঘর খুলবে না, স্যার। চল্লিশ বছর ধরে যেটাকে আমরা আটকে রেখেছি, সেটাও বেরিয়ে আসবে।"
ইন্সপেক্টর অনিকেত বিরক্ত হয়ে বললো , "যথেষ্ট হয়েছে। চাবি আনুন।"
নিবারণ কাঁপা হাতে কোমর থেকে একটা চাবির গোছা বের করলো। সেগুলোর মধ্যে একটি চাবি ছিল কালো লোহার। চাবিটা তালায় ঢোকাতেই ভিতর থেকে তিনবার আঘাতের শব্দ এলো ।
ঠক… ।
ঠক… ।
ঠক… ।
ইন্সপেক্টর অনিকেত থমকে গেলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিবারন কে তালা খুলতে বললেন।
দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেলো। ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো পচা মাংসের গন্ধ। ঘরটা অদ্ভুতভাবে ছোটো। কোনো জানালা নেই। দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য আঁচড়। মেঝেতে শুকনো কালচে দাগ। এক কোণে কাঠের একটি চেয়ার। চেয়ারের পাশে মরচে ধরা শিকল। আর দেওয়ালে ঝুলছে একটা পুরোনো আয়না। আয়নাটার সামনে দাঁড়াতেই অনুব্রত নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। কিন্তু তার প্রতিবিম্ব হাসছিল। অনুব্রত হাসছিল না। সে পিছিয়ে এলো ।
ইন্সপেক্টর ঘরের মেঝে পরীক্ষা করতে গিয়ে একটা আলগা পাথর খুঁজে পেলেন। পাথর সরাতেই নিচে বেরিয়ে এলো একটা সরু সিঁড়ি। সিঁড়ি নেমে গেছে বাড়ির তলায়।
"গোপন পথ!" ইন্সপেক্টর বললেন।
সিঁড়ির নিচে ছিল একটা ছোট্ট ভূগর্ভস্থ ঘর। ঘরের মাঝখানে কাঠের বাক্স। বাক্সের ভিতরে পাওয়া গেলো মানুষের হাড়, কয়েকটি লাল কাঁচের চুড়ি এবং পুরোনো কাপড়ের টুকরো।
একটি হাড়ের পাশে আটকে ছিল মরচে ধরা ছোট্ট লকেট। লকেটের ভিতরে একটি মেয়ের ছবি।
ছবির পিছনে লেখা—
কুসুম, ১৯৬৮।
অনুব্রত বুঝতে পারল, এত বছর ধরে কুসুমের মৃতদেহ এই বাড়ির মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো ।
কিন্তু তার মা কোথায়?
ঠিক তখনই ভূগর্ভস্থ ঘরের অন্ধকারে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেলো।
"ছোট্ট অনুব্রত..."
মায়ের গলা।
"তুই এত বড় হয়ে গেছিস?"
অনুব্রত চোখে জল এসে গেলো।
অনুব্রত বললো , "মা! তুমি কোথায়?"
ইন্সপেক্টর চিৎকার করে বললেন, "কেউ উত্তর দেবেন না!"
কিন্তু ততক্ষণে অনুব্রত অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। তার মুখে কোমল হাসি।
"আমি তোকে খুব মিস করেছি, বাবা।"
অনুব্রত হাত বাড়ালো।
ঠিক সেই মুহূর্তে ইন্সপেক্টর অনিকেত তাকে পিছন টেনে নিলো। মহিলাটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। চোখের জায়গায় ফুটে উঠল দুটো কালো গর্ত। মুখটা লম্বা হয়ে গেলো। গলা থেকে বেরিয়ে এলো অসংখ্য মানুষের একসঙ্গে কান্নার শব্দ। তারপর এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে সে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
মেঝেতে পড়ে রইল একটি লাল কাঁচের চুড়ি।