Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

313 নম্বর রুম (ভয়ঙ্কর ভূতুড়ে গল্প)

কলকাতার মাঝামাঝি একটা পুরনো হোটেল—নাম “হোটেল অনির্বাণ”। বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, জায়গাটার বয়স অনেক। দেওয়ালের রং উঠে গেছে, করিডোরে হালকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর লিফটটা এমন শব্দ করে ওঠানামা করে যেন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে।

আমি, ঋত্বিক, একটা প্রজেক্টের কাজে দু’দিনের জন্য ওই হোটেলে উঠেছিলাম। রুম আমার আগে থেকে বুক করে রেখেছিলাম ,রুম নম্বর 313 । রিসেপশনে দাঁড়িয়ে চেক-ইন করছিলাম, তখনই খেয়াল করলাম—রিসেপশনিস্ট লোকটা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, যেন কিছু বলতে চায়।

“রুম 313 আমার বুক করা আছে”—আমি বললাম।
সে একটু থেমে বলল, “স্যার… ৩১৩ নম্বর বাদ দিন, রুমটা ভালো না, অন্ন রুমগুলো খালি আছে।”
আমি হেসে বললাম, “না না, 313 নম্বর রুম আমার বুক আছে, সেটাই দিন।”

লোকটা আবার তাকাল—এইবার তার চোখে কেমন যেন অদ্ভুত একটা ভাব। তারপর বলল, “313-ই নিন, স্যার… কিন্তু একটু সাবধানে থাকবেন ।”
আমি একটু বিরক্ত হলাম। ভাবলাম, দু’দিনের জন্যই তো—কি আর হবে! চাবিটা নিয়ে লিফটে উঠে পড়লাম।

লিফটের ভেতর একটা পুরনো আয়না ছিল। নিজের দিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে হল, আমার পিছনে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি ঘুরে তাকালাম—কেউ নেই। মনে হল, হয়তো ভুল দেখেছি।

তৃতীয় তলায় নেমে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। করিডোরটা লম্বা, দু’পাশে সারি সারি দরজা। আলো কম, আর একটা অদ্ভুত নীরবতা। আমার রুম—৩১৩—একদম শেষ মাথায়।
দরজাটা খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। যেন অনেকদিন কেউ আগে এখানে থাকেনি। ঘরটা বড়, একটা বিছানা, একটা আলমারি, আর দেয়ালে একটা পুরনো আয়না।

আমি ব্যাগ রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। সবকিছু স্বাভাবিকই লাগছিল। রাত বাড়তে লাগল। খাওয়া দাওয়া প্রায় একটা নাগাদ আমি ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু ঠিক তখনই…
টক… টক… টক…

দরজায় কেউ নক করছে। আমি উঠে দরজার কাছে গেলাম। “কে?”—কোনো উত্তর নেই। দরজা খুললাম—কেউ নেই। করিডোর পুরো ফাঁকা । আমি একটু বিরক্ত হয়ে দরজা বন্ধ করলাম।
আবার শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর আবার…
টক… টক… টক…

এইবার একটু জোরে। আমি রেগে গিয়ে দরজা খুললাম—“কে এসব করছে?” দেখলাম কেউ নেই। কিন্তু এইবার একটা জিনিস খেয়াল করলাম—
দরজার সামনে ভেজা পায়ের ছাপ। যেন কেউ ভিজে পা নিয়ে হেঁটে গেছে। পায়ের ছাপগুলো ধীরে ধীরে করিডোরের দিকে চলে গেছে… আর হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে।

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। আমি দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এইবার ঘরের ভেতরটা একটু অদ্ভুত লাগছিল। আয়নার দিকে তাকাতেই দেখি— আমি একা দাঁড়িয়ে আছি…
কিন্তু… আমার পেছনে একটা মেয়ের ছায়া।
আমি তাড়াতাড়ি ঘুরে তাকালাম— কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকালাম— ছায়াটা এখন নেই।

আমি নিজের মাথায় হাত দিলাম—“আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?” লাইট জ্বালিয়ে রাখলাম।
রাত কেটে যাচ্ছে। হঠাৎ…
বাথরুম থেকে জল পড়ার শব্দ।
টুপ… টুপ… টুপ…

কিন্তু আমি তো কল বন্ধ করেই রেখেছিলাম।
ধীরে ধীরে বাথরুমের দরজার কাছে গেলাম।
দরজাটা একটু খোলা। ভেতরে পুরো অন্ধকার।
আমি দরজাটা ঠেলে খুললাম। আর যা দেখলাম…

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।মেঝেতে জল জমে আছে। আর সেই জলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে— একটা মেয়ে। তার চুল ভিজে, মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো… পুরো কালো।

আমি চিৎকার করে পিছিয়ে এলাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছি। ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা গলা ভেসে এল—
“তুমি আমার রুমে কেন এসেছো…”

আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি দরজা খুলে পালাতে চাইলাম। কিন্তু দরজা খুলছে না।
যেন বাইরে থেকে কেউ লক করে দিয়েছে। হঠাৎ লাইট নিভে গেল। ঘর পুরো অন্ধকার। আমি মোবাইলের টর্চ জ্বালালাম। দেখলাম— ঘরের ভেতর জল ছড়িয়ে গেছে। বাথরুম থেকে জল বেরিয়ে এসেছে। আর সেই জলের ওপর—

পায়ের ছাপ।
সেই ছাপ ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম। হঠাৎ আমার পিঠ দেওয়ালে ঠেকল। আর তখনই…
আমার কানের কাছে একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস—

“তুমি আর বেরোতে পারবে না…”
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। পরদিন সকালে হোটেলের স্টাফরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে।
আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম। ঘরের ভেতর শুকনো—কোনো জলের ছিঁটে ফোঁটাও নেই।
সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু…
আয়নার ওপর একটা লেখা ছিল—

“313 নম্বর রুম আমার…”

আমি পরে জানতে পারলাম— এই রুমে কয়েক বছর আগে এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল।বাথরুমে ডুবে মারা যায়। তারপর থেকেই…
এই রুমে কেউ বেশিদিন থাকতে পারে না। আমি সেই হোটেল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজও…
যখনই আয়নার সামনে দাঁড়াই… মাঝে মাঝে মনে হয়— আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।চুপচাপ। ভিজে চুল নিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে …আর হাসছে।

হোটেলটা আমি সেইদিনই ছেড়ে দিয়েছিলাম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে এসেছিলাম, আর মনে মনে ঠিক করেছিলাম—এই ঘটনাটা আমি ভুলে যাব। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস চাইলেই ভোলা যায় না। বিশেষ করে, যখন সেই জিনিসটা তোমার সাথেই থেকে যায়।

প্রথম কয়েকদিন সব স্বাভাবিক ছিল। আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম—সবটাই হ্যালুসিনেশন। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো মানসিক চাপ। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম—আমি ভুল ছিলাম।

ঘটনার শুরুটা হয় একদম ছোট একটা জিনিস দিয়ে।
একদিন সকালে দাঁত ব্রাশ করতে করতে আয়নার দিকে তাকিয়েছিলাম। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ঠিক যখন মুখ ধুয়ে আবার তাকালাম— এক সেকেন্ডের জন্য…
মনে হলো আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
ভিজে চুল, মুখ নিঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ।

আমি ঘুরে তাকালাম— দেখলাম কেউ নেই।আবার আয়নার দিকে তাকালাম— আবার আমি একা। আমি নিজের মাথায় হাত দিয়ে বললাম, “না… এটা সম্ভব না…” কিন্তু এটা শুধু শুরু ছিল।
সেদিন রাতেই আবার ঘটল। আমি ঘুমোতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, ঘরের ভেতর একটু ঠান্ডা হয়ে গেছে। জানালা বন্ধ, ফ্যান অফ—তবুও এই ঠান্ডা? তারপর শুনতে পেলাম—

টুপ… টুপ… টুপ…
আবার সেই জলের শব্দ। আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে তাকালাম। দরজাটা বন্ধ। কিন্তু ভেতর থেকে স্পষ্ট শব্দ আসছে। আমি উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম।

ভেতরে ঢুকে দেখি— সব শুকনো।
কোনো জল নেই। আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর হঠাৎ— আমার পায়ের নিচে ঠান্ডা কিছু লাগল। নিচে তাকিয়ে দেখি— মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ।

একটা… দুটো… তিনটে…
সেগুলো ধীরে ধীরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি পিছিয়ে গেলাম।পায়ের ছাপগুলো আমার সামনে এসে থামল।
তারপর… ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সেই রাতে ভয়ে আমি আর ঘুমোতে পারিনি। পরদিন আমি ঠিক করলাম—এই ব্যাপারটার শেষ না করে শান্তি পাব না।

আমি আবার গেলাম সেই হোটেলে—হোটেল অনির্বাণ। রিসেপশনের লোকটা আমাকে দেখে চমকে উঠল।

“আপনি আবার এসেছেন?”
আমি বললাম, “৩১৩ নম্বর রুমের ব্যাপারে সবটা জানতে চাই।” সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—

“ওই রুমে যে মেয়েটা মারা গিয়েছিল, তার নাম ছিল মেঘলা। সে এখানে থাকত তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। একদিন তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়… তারপর ছেলেটা তাকে বাথরুমে ডুবিয়ে মেরে ফেলে। পরে এটাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু… মেঘলা নাকি মারা যাওয়ার আগে বলেছিল—‘আমি ফিরব… আমি কাউকে ছাড়বো না...এই রুম ছাড়ব না…’”

আমার গা শিউরে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ছেলেটা এখন কোথায়?” লোকটা বলল, “কেউ জানে না… সে সেদিনের পর উধাও হয়ে যায়…” আমি বুঝলাম—এখানেই রহস্যটা লুকিয়ে আছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আজ রাতটা আমি আবার ৩১৩ নম্বর রুমেই কাটাব।

তখন রাত ১২টা। আমি সেই রুমে একা বসে আছি লাইট অফ করে। শুধু মোবাইলের টর্চ জ্বলছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ সেই …

টুপ… টুপ… টুপ…জলের শব্দ।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাথরুমের দরজার দিকে এগোলাম। রজাটা ধীরে ধীরে নিজে থেকেই খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার। আমি টর্চটা ভেতরে ফেললাম। আর…

সে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘলা। ভিজে চুল, কালো চোখ। সে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল। তার ঠোঁট নড়ল—
“সে ফিরে এসেছে…”

আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কে?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম। ঠিক তখনই…
আমার পেছনে একটা গলা— “আমি…”
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখি—একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ বিকৃত, চোখ লাল।
সে হাসছে।

“তুমি যাকে খুঁজছো…”
আমি বুঝলাম—এটাই সেই ছেলে। সে এখনও বেঁচে নেই। সে-ও একটা আত্মা। মেঘলা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—

“তুমি পালাতে পারবে না!”
দু’জনেই আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম। ঘরের দেওয়ালে ঠেকে গেলাম। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
ভাবলাম—সব শেষ। কিন্তু… কিছুই হল না। চোখ খুলে দেখি—

মেঘলা সেই ছেলেটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সে চিৎকার করছে। মেঘলার চোখে আগুন—

“তুই আমাকে মেরেছিলি… এবার তোর পালা…”
ঘরের ভেতর এক ভয়ংকর লড়াই শুরু হল।
আমি সুযোগ বুঝে দরজা খুলে দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। করিডোর পেরিয়ে নিচে নেমে এলাম।পেছন থেকে এখনও চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

আমি আর পিছনে তাকাইনি। পরদিন খবর এল— ৩১৩ নম্বর রুমে আগুন লেগেছিল। ঘরটা পুরো পুড়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— কোনো দেহ পাওয়া যায়নি। কেউ না। আমি ভেবেছিলাম—সব শেষ।

কিন্তু… আজও মাঝে মাঝে রাতে… আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালে… দেখি— আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ।




শেষটা একদম mind-blowing 😨🔥
৩১৩ নম্বর রুমের রহস্যটা যেভাবে reveal হল, goosebumps লেগে গেছে!
মেঘলার revenge আর endingটা সত্যিই unforgettable 👏
এমনই ভয়ংকর আর engaging গল্প আরও পড়তে চাই ❤️
ভালো লাগলে অবশ্যই comment করুন আর আমাকে follow করুন 🙏📖✨