Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ভুল পথে পেলাম তোমাকে - Part 21

“যে ভালোবাসা বিষ হয়ে ওঠে”
রাত নামল নীরবে।
কিন্তু সেই নীরবতায় শান্তি নেই—আছে চাপা আতঙ্ক।
ইরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
শহরের আলো ঝাপসা লাগছে।
রিয়ার কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরছে বারবার।
“কে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে…”
পিছন থেকে মায়া এল।
কিছু না বলেই নিজের শালটা ইরার কাঁধে জড়িয়ে দিল।
— “ঠান্ডা লাগবে।”
ইরা হালকা মাথা নাড়ল।
— “মায়া… যদি এই সবকিছু আমার জন্যই হয়?”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— “না।” একটু থেমে, — “সব যুদ্ধ নিজের নাম নিয়ে আসে না।”
ইরা ঘুরে তাকাল।
— “রিয়া আমাকে এমনভাবে দেখছিল…
যেন আমি কিছু ছিনিয়ে নিয়েছি।”
মায়ার চোখ শক্ত হয়ে গেল।
— “কারও ভালোবাসা যদি অধিকার চায়,
তাহলে সেটা আগেই ভেঙে গেছে।”
ইরা ধীরে বলল—
— “তবু ভয় লাগে।
মানুষের অন্ধকার ছায়ার থেকেও বেশি ভয়ংকর।”
মায়া তার কপালে কপাল ঠেকাল।
— “এই কারণেই আমি তোর পাশে আছি।”
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
Unknown Number
ইরার হাত কেঁপে উঠল।
— “ধরবি না,” মায়া বলল।
ইরা এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে কল ধরল।
— “হ্যালো?”
রিয়ার কণ্ঠ—শান্ত, খুব শান্ত।
— “আমি জানতাম তুমি ধরবে।”
ইরা চোখ বন্ধ করল।
— “কী চাও?”
— “সত্য,” রিয়া বলল।
— “তুমি কি ওকে জানো?”
মায়া ফোনটা নিতে গেল,
ইরা হাত তুলে থামাল।
— “আমি জানি যতটা জানার দরকার।”
রিয়া হেসে উঠল।
— “না, ইরা।
তুমি জানো না ও কী করতে পারে
যখন ভয় পায়।”
মায়ার চোখ জ্বলে উঠল।
— “বন্ধ করো।”
রিয়া শুনেও না শোনার ভান করল।
— “ও আমাকে বলেছিল—
‘ভালোবাসা মানে রক্ষা করা।’
কিন্তু জানো কী করত?”
নীরবতা।
ইরার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
— “আমাকে আটকে রাখত,”
রিয়া ধীরে বলল।
— “নিজের মতো করে।”
এই কথাটা ইরার ভেতরে কোথাও কাঁটা হয়ে ঢুকল।
মায়া ফোন কেটে দিল।
ঘরে ভারী নীরবতা।
ইরা ধীরে বলল—
— “এটা সত্যি?”
মায়া চোখ নামাল।
— “আমি ভুল করেছিলাম।”
ইরার গলা কাঁপল।
— “কী ভুল?”
— “ভেবেছিলাম,
আমি যদি শক্ত থাকি—
তাহলে কেউ ভাঙবে না।”
ইরা এক পা পিছিয়ে গেল।
— “তাহলে তুমি আমাকে—”
মায়া দ্রুত বলল—
— “না!
তোকে আমি আটকে রাখিনি।
আমি শিখছি, ইরা।”
চোখে পানি জমে উঠল তার।
— “তুই আমার মুক্তি।
আমার নিয়ন্ত্রণ না।”
ইরা চুপ করে রইল।
ভিতরে ঝড়।
অবশেষে সে বলল—
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি।
কিন্তু যদি কখনো মনে হয়
আমি নিজের মতো থাকতে পারছি না—
আমি চলে যাব।”
মায়া মাথা নোয়াল।
— “ঠিক আছে।”
এই সম্মতিটাই ইরাকে কাঁপিয়ে দিল।
— “তুমি আটকাবে না?”
— “না,” মায়া বলল।
— “ভালোবাসা ধরে রাখে না।
ভালোবাসা পাশে হাঁটে।”
ইরা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
বাইরে দূরে কোথাও
একটা গাড়ির হর্ন।
রিয়ার ছায়া শহরের ভিড়ে মিলিয়ে গেল—
কিন্তু বিষ রেখে গেল।
এই গল্প এখন আর শুধু ভালোবাসার না—
এটা বিশ্বাসের।
আর বিশ্বাস ভাঙলে
সবচেয়ে বেশি রক্তপাত হয়।

বিশ্বাসের প্রথম ফাটল”
বিশ্বাস ভাঙে শব্দে না—
ভাঙে নীরবতায়।
রাত অনেকটা এগিয়েছে।
ঘরের আলো নিভে গেছে, শুধু জানালার পাশের ল্যাম্পটা জ্বলছে।
ইরা বিছানার একপাশে বসে আছে।
মায়া অন্য পাশে।
দু’জনের মাঝখানে
খুব অল্প জায়গা—
তবু সেই অল্পটাই যেন আজ অগাধ দূরত্ব।
মায়া চুপ।
খুব বেশি চুপ।
ইরা প্রথম কথা বলল—
— “তুমি কি ভয় পাচ্ছো?”
মায়া তাকাল না।
— “হ্যাঁ।”
এই সরল স্বীকারোক্তিটা
ইরাকে অপ্রস্তুত করে দিল।
— “কিসের ভয়?”
মায়া ধীরে শ্বাস নিল।
— “এই যে তুই এখন ভাবছিস— আমি তোকে ঠিক কতটা জানি, আর কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।”
ইরা কপাল কুঁচকাল।
— “আমি এমনটা ভাবছি না—”
— “ভাবছিস,”
মায়া থামিয়ে দিল।
— “কারণ রিয়ার কথা
একবার ঢুকে গেলে চুপ করে বসে থাকে না।”
নীরবতা।
ইরা জানালার দিকে তাকাল।
— “আমি চাই তুমি আমাকে সত্যি বলো। সব।”
মায়ার চোখে ছায়া ঘনাল।
— “সব সত্য শোনার জন্য মানুষ তৈরি থাকে না।”
— “আমি তৈরি,”
ইরা দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
মায়া হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই।
— “আমি যখন ভালোবাসি, আমি ভয় পাই। আর ভয় পেলে— আমি আঁকড়ে ধরি।”
ইরার বুক কেঁপে উঠল।
— “মানে?”
মায়া এবার তাকাল। চোখে ক্লান্তি, অপরাধ।
— “মানে, রিয়ার সাথে আমি ভুল করেছিলাম। ওকে আমি রক্ষা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আসলে ওর দুনিয়াটা ছোট করে ফেলেছিলাম।”
ইরা ধীরে বলল—
— “আর আমার সাথে?”
মায়া এক মুহূর্ত চুপ।
— “তোর সাথে আমি লড়ছি। নিজের সাথে।”
এই কথাটা
ইরাকে আশ্বস্ত করল না— বরং ভয় দেখাল।
— “যদি একদিন তুমি হেরে যাও?”
মায়া মাথা নোয়াল।
— “তাই তোকে আগেই বলেছি— চলে যাবি।”
ইরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
— “তুমি এত সহজে আমাকে যেতে দিতে পারো?”
মায়ার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো—
— “সহজ না। কিন্তু জোর করে রাখলে আমি আবার দানব হয়ে যাব।”
ইরা চোখে পানি নিয়ে হাসল।
— “আমি তো ভাবতাম ভালোবাসা মানে কারও প্রথম পছন্দ হওয়া।”
— “ভালোবাসা মানে,”
মায়া ধীরে বলল,
— “কারও স্বাধীনতার পাহারাদার হওয়া।”
ইরা কিছু বলল না।
সে শুধু নিজের ব্যাগটা তুলে নিল।
মায়ার বুকটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল।
— “কোথায় যাচ্ছিস?”
— “হাঁটতে,”
ইরা বলল।
— “একটু একা।”
মায়া কিছু বলল না। এই না বলাটাই সবচেয়ে কষ্টের।
দরজা বন্ধ হলো।
মায়া বিছানায় বসে পড়ল। হাত কাঁপছে।
— “আমি ঠিক করছি তো?”
সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল।
বাইরে,
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ইরার ফোন বেজে উঠল।
Unknown Number
সে থমকে দাঁড়াল।
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড।
তারপর কল ধরল।
— “হ্যালো?”
রিয়ার কণ্ঠ— এবার আর শান্ত না।
— “তুমি একা, তাই না?”
ইরার গা শিউরে উঠল।
— “তুমি আমাকে ফলো করছ?”
— “না,”
রিয়া হাসল।
— “আমি শুধু জানি কখন ফাটল ধরে।”
ইরা দাঁত চেপে বলল—
— “আমাদের মধ্যে ঢুকবে না।”
— “আমি ঢুকিনি,”
রিয়া ফিসফিস করল।
— “আমি শুধু দেখাচ্ছি— ও কখনো পুরোটা তোমার হবে না।”
ইরা কল কেটে দিল।
কিন্তু কথাগুলো মাথার ভেতরে থেকে গেল।
সে আকাশের দিকে তাকাল।
— “আমি কি সত্যিই ভুল পথে হাঁটছি?”
সে নিজেকে প্রশ্ন করল।
দূরে কোথাও, মায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাস্তায় তাকিয়ে আছে।
ইরা নেই।
এই প্রথম— মায়ার মনে হলো, ভালোবাসা বাঁচাতে গিয়ে সে হয়তো এক ধাপ পিছিয়ে গেছে।
আর সেই এক ধাপেই বিশ্বাসে প্রথম ফাটল পড়েছে।