“দূরে থেকেও কাছে”
দূরত্ব সবসময় দেয়াল হয় না।
কখনও কখনও
দূরত্ব আয়না হয়ে দাঁড়ায়—
যেখানে মানুষ নিজের মুখটা
সবচেয়ে স্পষ্ট দেখে।
ইরা ছাদের ঘরে একা বসে ছিল।
রাত অনেক গভীর।
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে,
কিন্তু ভেজা গন্ধটা এখনো বাতাসে।
হাতের তালুতে হালকা কাঁপুনি।
আজ প্রথম দিন—
মায়া ছাড়া।
সে চোখ বন্ধ করল।
মায়ার মুখ ভেসে উঠল।
শেষবারের মতো নয়,
কিন্তু সবচেয়ে কঠিনভাবে।
— “এটা শাস্তি না… এটা বাঁচার চেষ্টা।”
নিজের কথাগুলোই
বারবার ফিরে এসে
তার বুক চেপে ধরছে।
ইরা জানে—
ভালোবাসা মানে
সবসময় পাশে থাকা না।
কখনও কখনও
নিজেকে বাঁচাতে
এক পা পিছোতে হয়।
হঠাৎ ঘরের বাতি হালকা কেঁপে উঠল।
ইরা চোখ খুলল।
আলোটা যেন
তার মুড বুঝে
ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে।
— “না… এখন না,”
সে ফিসফিস করল।
শ্বাসের সাথে তাল মিলিয়ে
আলোটা স্থির করল সে।
এই প্রথম
সে বুঝল—
আলো শুধু আশ্রয় না,
এটা নিয়ন্ত্রণও চায়।
অন্যদিকে—
মায়া দাঁড়িয়ে আছে
একটা পুরোনো আয়নার সামনে।
আয়নায়
তার মুখটা অর্ধেক মানুষের,
অর্ধেক ছায়ার।
কাঁধের কালো দাগটা
আরো গাঢ় হয়েছে।
সে দাঁত চেপে ধরে
নিজের কবজি ধরল।
— “তুই আমার না,”
সে আয়নার ভেতরের ছায়াকে বলল।
— “আমি তোকে জায়গা দেব না।”
ছায়াটা হাসল।
কিন্তু সেই হাসি
মুখে না—
মাথার ভেতর।
— “তুই আমাকে ডেকেছিস,”
ছায়ার কণ্ঠ।
— “ওর জন্য।”
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
— “হ্যাঁ,”
সে বলল।
— “কিন্তু ওকে আঘাত করার জন্য না।”
আয়নার কাঁচে
হালকা ফাটল ধরল।
ছায়া চুপ করে গেল।
এই নীরবতাই
সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ইরা রাতের দিকে হাঁটতে বেরোল।
রাস্তা ফাঁকা।
ল্যাম্পপোস্টের আলো
তার পেছনে লম্বা ছায়া ফেলছে।
সে থামল।
ছায়াটা
এক মুহূর্ত দেরিতে থামল।
ইরার শিরদাঁড়া বেয়ে
ঠান্ডা স্রোত নামল।
— “আমি ভয় পাব না,”
সে নিজের সাথেই বলল।
হাত তুলতেই
ল্যাম্পপোস্টের আলো
আরো উজ্জ্বল হলো।
ছায়াটা
পিছিয়ে গেল।
ইরা বুঝল—
ভয় মানেই দুর্বলতা না।
ভয় মানেই
নিজেকে জানা।
দূরে কোথাও
মায়া হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে।
শ্বাস ভারী।
চোখ বন্ধ।
— “ইরা…”
নামটা উচ্চারণ করতেই
ছায়াটা কেঁপে উঠল।
এই নামটাই
তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— “আমি ফিরব,”
সে বলল।
— “কিন্তু ভাঙা হয়ে না।”
রিয়া দূর থেকে সব দেখছে।
হস্তক্ষেপ করছে না।
সে জানে—
এই যুদ্ধ
কাউকে জিতিয়ে দেওয়া যায় না।
নিজেকেই জিততে হয়।
— “ভালোবাসা পরীক্ষায় পড়েছে,”
সে ফিসফিস করল।
— “আর পরীক্ষার ফল
সময়ই দেবে।”
ইরা আকাশের দিকে তাকাল।
মেঘের ফাঁক দিয়ে
চাঁদের আলো।
সে মৃদু হাসল।
— “দূরে থাকলেও,”
সে বলল,
— “আমি তোমার দিকেই আছি, মায়া।”
আর ঠিক তখনই
মায়া থেমে গেল।
বুকের ভেতর
একটা পরিচিত উষ্ণতা।
দূরে থেকেও
কাছাকাছি।
“যে ভয়টা নিজের”
সব ভয় অন্ধকার থেকে আসে না।
কিছু ভয়
আলো জ্বালালেই দেখা যায়।
ইরা আজ ভুল করল।
ভুলটা ছোট ছিল—
কিন্তু তার ফল বড়।
সে ভেবেছিল
নিজের আলোটা এখন সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ভেবেছিল
একটু বেশি ব্যবহার করলে
কিছু হবে না।
রাতের নির্জন মাঠে
সে হাত তুলেছিল।
আলো ছড়িয়ে পড়েছিল
আগুনের মতো উজ্জ্বল।
আর ঠিক তখনই—
আলো কেঁপে উঠল।
ইরার বুকের ভেতর
হঠাৎ শূন্যতা।
— “না… না না,”
সে ফিসফিস করল।
আলোটা আর তার কথা শুনছে না।
বরং
তার ভয়ের প্রতিধ্বনি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চারপাশে
অগোছালো ছায়া জমতে লাগল।
এই ছায়া
মায়ার ছায়ার মতো না।
এটা
ইরার নিজের।
— “আমি ভয় পাচ্ছি…”
এই কথাটা স্বীকার করতেই
আলো নিভে গেল।
পুরো অন্ধকার।
একই সময়ে—
মায়া হঠাৎ থেমে দাঁড়াল।
হাঁটছিল সে,
নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।
কিন্তু বুকের মাঝখানে
একটা টান।
যেন কেউ নাম ধরে ডাকছে
কিন্তু শব্দ ছাড়া।
— “ইরা…”
তার গলা কেঁপে উঠল।
ছায়াটা এবার
হাসেনি।
বরং ফিসফিস করে বলল—
— “তুই দেরি করছিস।”
মায়া দৌড়াতে শুরু করল।
ইরা মাটিতে বসে পড়েছে।
হাত-পা ঠান্ডা।
শ্বাস এলোমেলো।
অন্ধকারে
নিজের চিন্তাগুলোই
তার সবচেয়ে বড় শত্রু।
— আমি একা।
— আমি পারব না।
— আমি মায়ার মতো শক্ত না।
এই ভাবনাগুলো
ছায়া হয়ে দাঁড়াল।
ঠিক তখন—
দূরে
একটা পরিচিত কণ্ঠ।
— “চোখ বন্ধ কর।”
ইরা চমকে উঠল।
— “মায়া…?”
— “আমার দিকে না,”
কণ্ঠটা বলল।
— “নিজের ভেতরে তাকাও।”
ইরা চোখ বন্ধ করল।
অন্ধকারের ভেতর
একটা ছোট আলো।
খুব ছোট।
ভীত।
— “এইটাই তুই,”
মায়ার কণ্ঠ।
— “এটাকে ভয় দেখাস না।”
ইরার চোখ দিয়ে
নীরব জল গড়িয়ে পড়ল।
— “আমি ভয় পাচ্ছি,”
সে স্বীকার করল।
আলোটা কাঁপল।
তারপর
স্থির হলো।
ছোট আলোটা
আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল।
মায়া ছুটে এলো মাঠে।
ইরা বসে আছে।
চারপাশে আলো—
শান্ত, নরম।
মায়া থেমে গেল।
এই প্রথম
সে দেখল
ইরাকে ভেঙে পড়তে।
— “তুই একা ছিলি,”
মায়া ধীরে বলল।
— “না,”
ইরা মাথা নাড়ল।
— “আমি নিজেকে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম।”
মায়া কিছু বলল না।
শুধু পাশে বসে পড়ল।
দূরত্ব রেখে।
এই দূরত্বে
ভরসা আছে।
— “আমি ভয় পেয়েছিলাম,”
ইরা বলল।
— “কিন্তু পালাইনি।”
মায়ার চোখে
একটু আলো।
— “এইটাই সাহস,”
সে বলল।
ছায়াটা দূরে দাঁড়িয়ে।
চুপ।
অপেক্ষায়।
কারণ সে জানে—
এই যুদ্ধ
এখনো শেষ হয়নি।
চলবে ---- এভাবেই পাশে থাকবেন সকলে।