“যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়”
কিছু সিদ্ধান্ত
চিৎকার করে আসে না।
তারা আসে
চুপচাপ,
ভেতরের সবচেয়ে নরম জায়গায় আঘাত করে।
ইরা আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
নিজেকে দেখছে—
কিন্তু শুধু মুখ না।
ভয়টা দেখছে।
শক্তিটাও।
আজ আলো ডাকছে না।
আজ আলো অপেক্ষা করছে।
ইরা বুঝল—
এটাই সেই মুহূর্ত
যেখানে আর কেউ ঠেলে দেয় না।
নিজেকেই হাঁটতে হয়।
অন্যদিকে
মায়া বসে আছে মাটিতে।
ছায়া তার চারপাশে—
কিন্তু ছুঁতে পারছে না।
— “তুই একা,”
ছায়া বলল।
মায়া চোখ খুলল।
— “না।
আমি নিজের সঙ্গে আছি।”
এই কথাটায়
ছায়া প্রথমবার থমকে গেল।
কারণ
যে মানুষ নিজের সঙ্গে থাকে,
তাকে দখল করা যায় না।
হঠাৎ
ইরা আর মায়া
একই জায়গায় এসে দাঁড়াল।
কেউ ডাকেনি।
কেউ টানেনি।
নিজেদের সিদ্ধান্তে।
নীরবতা ভারী।
কিন্তু অস্বস্তিকর না।
— “আমি ভয় পেয়েছিলাম,”
ইরা বলল।
— “তোমাকে না…
নিজেকে হারানোর।”
মায়া মাথা নোয়াল।
— “আমি ভয় পেয়েছিলাম
তোর সামনে নিজেকে দেখাতে।”
একটু থেমে—
— “কারণ আমি সবসময় শক্ত ছিলাম।
একা।”
ইরা ধীরে বলল—
— “আমার শক্তি
তোমাকে বদলাতে না চাওয়া।”
এই কথাটা
মায়ার বুকের ভেতর
গভীরভাবে ঢুকে গেল।
হঠাৎ বাতাস ভারী হলো।
রিয়ার উপস্থিতি।
— “এইটাই শেষ সুযোগ,”
রিয়া বলল।
— “একসাথে থাকো,
না হলে আলাদা হও।”
ইরা রিয়ার দিকে তাকাল।
— “ভালোবাসা
আল্টিমেটাম বোঝে না।”
মায়া শান্ত গলায় যোগ করল—
— “আর আমরা
ভয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নিই না।”
রিয়ার চোখে অদ্ভুত কিছু ভাঙল।
— “তাহলে তোমরা কী চাও?”
ইরা গভীর শ্বাস নিল।
— “পাশাপাশি থাকা।
কিন্তু বাঁধা না।”
মায়া বলল—
— “যদি কখনো অন্ধকার জিতে যায়—
আমি সরে যাব।”
— “আর যদি আলো পুড়িয়ে দেয়,”
ইরা বলল,
— “আমি থামব।”
এই চুক্তিতে
কোনো রক্ত নেই।
কোনো জোর নেই।
শুধু সচেতনতা।
রিয়া ধীরে পিছিয়ে গেল।
— “তোমরা ভয়ংকর,”
সে বলল।
— “কারণ তোমরা
নিজেদের চেনো।”
তার ছায়া মিলিয়ে গেল।
ইরা আর মায়া
একসাথে দাঁড়িয়ে।
হাত ধরেনি।
তবু দূরত্ব নেই।
— “আমরা কি ঠিক করছি?”
ইরা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
মায়া হালকা হাসল।
— “জানি না।
কিন্তু এটা আমাদের।”
দূরে
একটা নতুন পথ খুলছে।
না পুরো আলো।
না পুরো ছায়া।
একটা জায়গা—
যেখানে মানুষ
নিজের মতো থাকতে পারে।
“শেষের আগে যে সত্য”
কিছু সত্য
শেষে আসে না।
তারা আসে
শেষ হওয়ার ঠিক আগে—
সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়ার জন্য।
রাত আজ অদ্ভুত শান্ত।
অতিরিক্ত শান্ত।
ইরা হাঁটছে একা
পুরনো লাইব্রেরির ধ্বংসস্তূপের ভেতর।
এই জায়গাটা সে আগে দেখেনি,
কিন্তু চেনে।
মনে হয়
এইখানেই
কিছু লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ
একটা পুরনো আয়না সামনে পড়ে।
ভাঙা।
কিন্তু প্রতিফলন স্পষ্ট।
ইরা নিজের মুখ দেখে না।
দেখে
আরেকটা ইরাকে।
— “অবশেষে এসেছ।”
কণ্ঠটা
তার নিজেরই।
ইরার শ্বাস আটকে যায়।
— “তুমি কে?”
আয়নাটা হালকা কেঁপে ওঠে।
— “আমি সেই আলো
যাকে তুমি চাপা দিয়েছ।
কারণ তুমি ভেবেছিলে
ভালোবাসা মানে নিজেকে ছোট করা।”
ইরার চোখ ভিজে ওঠে।
— “আমি কাউকে আঘাত করতে চাইনি।”
— “কিন্তু নিজেকে করেছ,”
প্রতিফলন বলল।
— “বারবার।”
একই সময়
মায়া দাঁড়িয়ে আছে
ছায়ার গভীরতম স্তরে।
এখানে কোনো ফিসফিস নেই।
কোনো কণ্ঠ নেই।
শুধু এক দরজা।
দরজার ওপরে লেখা—
“পূর্ণ ছায়া”
মায়া হাত তুলেও থামল।
— “আমি ভয় পাচ্ছি,”
সে ফিসফিস করল।
— “কিন্তু পালাচ্ছি না।”
দরজা খুলল।
ভেতরে
সে নিজেকে দেখল।
একটা মায়া
যে কাউকে ভালোবাসেনি—
কারণ ভালোবাসা
দুর্বলতা বানায়।
— “তুই আমাকে অস্বীকার করেছিস,”
ওই মায়া বলল।
— “তাই আমি শক্তিশালী হয়েছি।”
মায়ার গলা কাঁপল।
— “না।
তুই শক্তিশালী হইছিস
কারণ আমি একা ছিলাম।”
এই স্বীকারোক্তি
ছায়াকে কাঁপিয়ে দিল।
হঠাৎ
ইরা আর মায়া
একই জায়গায় এসে দাঁড়াল।
এটা বাস্তব না।
এটা সত্যের জায়গা।
রিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু আজ
সে শত্রু না।
সে ক্লান্ত।
— “তোমরা জানো,”
রিয়া ধীরে বলল,
— “এই সবকিছু কেন শুরু হয়েছিল?”
ইরা আর মায়া চুপ।
রিয়া চোখ নামাল।
— “কারণ
আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম।”
— “আমি একবার
আলো আর ছায়াকে
জোর করে এক করতে চেয়েছিলাম।”
— “ভালোবাসা দিয়ে না।
ভয় দিয়ে।”
তার চোখে পানি।
— “আর সেটাই
সব নষ্ট করেছিল।”
ইরা ধীরে বলল—
— “তুমি আমাদের ব্যবহার করেছ।”
রিয়া মাথা নোয়াল।
— “হ্যাঁ।
কারণ তোমরা সেই সম্ভাবনা
যেটা আমি হতে পারিনি।”
মায়া সামনে এগিয়ে এলো।
— “তাহলে শেষটা কী?”
রিয়া তাকাল।
— “শেষটা তোমাদের হাতে।”
সে ইরার দিকে তাকাল।
— “তুমি আলো বেছে নিতে পারো।
একাই।”
তারপর মায়ার দিকে।
— “আর তুমি ছায়া বেছে নিতে পারো।
সম্পূর্ণ।”
নীরবতা।
ইরা আর মায়া
একে অপরের দিকে তাকাল।
এই প্রথম
কোনো ভয় নেই।
ইরা বলল—
— “আমি আলো হব।
কিন্তু অন্ধ না।”
মায়া বলল—
— “আমি ছায়া হব।
কিন্তু দানব না।”
রিয়া চোখ বন্ধ করল।
— “তাহলে চক্র ভাঙবে।”
একটা আলো বিস্ফোরণ।
কিন্তু ব্যথাহীন।
সব মিলিয়ে যেতে লাগল।
শেষ দৃশ্যে
ইরা আর মায়া
দু’জন দু’দিকে দাঁড়িয়ে।
হাত ধরা না।
তবু সংযোগ অটুট।
দূরে
নতুন সূর্য উঠছে।
পুরো আলো না।
পুরো অন্ধকারও না।
একটা পৃথিবী
যা প্রথমবার
শ্বাস নিতে শিখছে।
“যা হারাতে হয়, তাই পাওয়া যায়”
কিছু বিচ্ছেদ
শেষের জন্য নয়।
কিছু বিচ্ছেদ
নতুন রূপের জন্য।
ইরা দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে।
এই নদীটা সে ছোটবেলা থেকে চেনে—
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে
এটা তার নিজের ভেতরের স্রোত।
হাতের তালু খুলে দেখে।
আলোর রেখাগুলো এখন আর অস্থির না।
নিয়ন্ত্রিত।
শান্ত।
— “একাই শিখতে হচ্ছিল,”
সে নিজেকে বলল।
— “কিন্তু একা মানে দুর্বল না।”
হঠাৎ পানিতে
একটা ছায়া নড়ে উঠল।
ইরা জানে—
এটা মায়া না।
এটা স্মৃতি।
তবু বুক কেঁপে ওঠে।
অন্যদিকে
মায়া বসে আছে ছায়ার প্রান্তে।
এই জায়গায় আগে
শুধু হিংস্রতা ছিল।
আজ
নীরবতা।
সে চোখ বন্ধ করে
নিজের শ্বাস গোনে।
এক…
দুই…
তিন…
ছায়া আর কামড়ে ধরে না।
শুধু অপেক্ষা করে।
— “আমি তোর মালিক না,”
মায়া ফিসফিস করে।
— “তুই আমার অংশ।
আর অংশকে বাঁচতে দিলে
দানব হয় না।”
ছায়া ধীরে
নিজের আকার বদলায়।
আর আগের মতো বিকৃত না।
মানুষের মতো।
রাত নামলে
দু’জনেই
একই স্বপ্ন দেখে।
একটা দরজা।
দু’দিকে লেখা—
“ফিরে আসা”
আর
“এগিয়ে যাওয়া”
ইরা দাঁড়িয়ে থাকে দরজার সামনে।
মায়াও।
কিন্তু দরজাটা
একটাই।
ইরা বলে—
— “আমরা কি ভুল করলাম?”
মায়া মাথা নাড়ায়।
— “না।
আমরা বাঁচার পথ বেছে নিয়েছি।”
— “কিন্তু একসাথে না।”
— “সব একসাথে হয় না, ইরা,”
মায়া শান্ত গলায় বলে।
— “কিছু পথ
সমান্তরাল হয়।”
ইরা চোখ ভিজে উঠলেও
হাসে।
— “তাহলে হারালাম কী?”
মায়া উত্তর দেয়—
— “নিয়ন্ত্রণ।”
দরজা খুলে যায়।
সকালে
ইরা শহর ছাড়ে।
ব্যাগ হালকা।
মন ভারী না।
ফোনে একটা মেসেজ আসে।
Maya:
“আমি আছি।
নিজের সাথে।”
ইরা টাইপ করে—
Ira:
“আমিও।”
মেসেজের পরে
আর কিছু না।
কিন্তু এই নীরবতা
শূন্য না।
শেষ দৃশ্যে
একটা পুরনো জায়গা
ভেঙে নতুন করে গড়া হচ্ছে।
আলো আর ছায়া
একই মাটিতে।
আলাদা।
কিন্তু বিরোধী না।
কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—
“যা হারাতে হয়,
সেটাই জায়গা করে দেয়
যা সত্যি পাওয়া যায়।”