“ত্যাগ না মিল”
শেষ যুদ্ধের আগে
সবকিছু অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়।
যেন ঝড়ের আগে
পৃথিবী একবার শ্বাস নেয়।
সকাল।
আকাশ পরিষ্কার।
কিন্তু ইরা জানে —
এই শান্তি সত্যি না।
সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পিছন থেকে মায়া বলল—
— “আজই।”
ইরা ঘুরে তাকাল।
— “তুইও অনুভব করছিস?”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “পূর্ণ ছায়া শেষবারের মতো ফিরে আসবে।
আজ ও শেষ চেষ্টা করবে।”
হঠাৎ চারপাশের আলো নিভে গেল।
দিনের মাঝখানে
অন্ধকার নেমে এল।
বাতাস ভারী হয়ে গেল।
পূর্ণ ছায়ার কণ্ঠ—
— “শেষ সিদ্ধান্তের সময়।”
আকাশে কালো ঘূর্ণি তৈরি হলো।
তার মাঝখানে
অন্ধকারের কেন্দ্র।
মায়া ফিসফিস করল—
— “ওর আসল শক্তি এখন ওখানে।”
ইরা জিজ্ঞেস করল—
— “ওকে শেষ করার উপায়?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর ধীরে বলল—
— “একজনকে নিজের শক্তি পুরোটা ছেড়ে দিতে হবে।”
নীরবতা।
ইরার বুক কেঁপে উঠল।
— “মানে?”
— “যে নিজের আলো বা ছায়া পুরোটা ছেড়ে দেবে…
সে স্বাভাবিক মানুষ হয়ে যাবে।
কিন্তু তখন… অন্যজনের শক্তি একাই যথেষ্ট হবে ওকে শেষ করতে।”
ইরা তাকিয়ে রইল।
— “তুই এটা আগে বলিসনি কেন?”
মায়া চোখ নামাল।
— “কারণ আমি ঠিক করেছিলাম…
আমি করব।”
ইরা এক পা এগিয়ে এল।
— “না।”
— “ইরা—”
— “সব সময় তুই নিজেকে ত্যাগ করতে যাবি না।”
মায়া শান্ত কণ্ঠে বলল—
— “আমার ভেতরে ছায়া আছে।
আমি ছাড়া গেলে পৃথিবী নিরাপদ হবে।”
ইরার চোখে জল এসে গেল।
— “আমি তোর সঙ্গে লড়েছি এতদিন…
তোকে হারানোর জন্য না।”
ঠিক তখন
পূর্ণ ছায়ার কণ্ঠ আবার ভেসে এল—
— “সময় শেষ।”
আকাশের ঘূর্ণি নিচে নামতে লাগল।
শহরের মানুষ আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে।
চারপাশে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে।
মায়া ইরার দিকে তাকাল।
— “শোন… যদি আমি না থাকি—”
ইরা তার মুখ চেপে ধরল।
— “চুপ।”
— “আমি কোথাও যাচ্ছি না।
কেউ কোথাও যাচ্ছে না।”
হঠাৎ ইরার মাথায় কিছু এল।
সে বলল—
— “যদি একজন না…
আমরা দু’জনই করি?”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “মানে?”
— “আমরা দু’জনই অর্ধেক শক্তি ছাড়ব।
তাহলে কেউ একা হবে না।
আমরা দু’জনেই মানুষ হয়ে যাব।”
মায়া স্তব্ধ।
— “তাহলে… আর কোনো শক্তি থাকবে না।”
ইরা হাসল হালকা।
— “আমরা শুরু থেকেই মানুষ ছিলাম।
ভালোবাসাই আমাদের শক্তি।”
পূর্ণ ছায়া নেমে আসছে।
সময় নেই।
মায়া ধীরে হাত বাড়াল।
— “শেষবার জিজ্ঞেস করছি…
নিশ্চিত?”
ইরা তার হাত ধরল।
— “ভালোবাসা মানে একসাথে বাঁচা।
না হলে এর কোনো মানে নেই।”
তারা দু’জন চোখ বন্ধ করল।
হাত শক্ত করে ধরল।
ধীরে ধীরে
ইরার শরীর থেকে আলো বের হতে লাগল।
মায়ার শরীর থেকে ছায়া।
দুটো শক্তি
আকাশের দিকে উঠতে লাগল।
পূর্ণ ছায়া গর্জে উঠল—
— “তোমরা নিজেদের দুর্বল করে দিচ্ছ!”
ইরা চোখ খুলল।
— “না।
আমরা ভয় ছাড়ছি।”
হঠাৎ আলো আর ছায়া
একসাথে বিস্ফোরিত হলো।
একটা বিশাল সাদা-ধূসর তরঙ্গ
আকাশ ভরে দিল।
পূর্ণ ছায়া চিৎকার করতে লাগল।
তার শরীর ভেঙে যাচ্ছে।
কারণ এখন
সে ভয় পাচ্ছে।
প্রথমবার।
— “অসম্ভব…”
আর এক মুহূর্ত পরে
সে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেল।
আকাশ পরিষ্কার।
আলো ফিরে এল।
সব শান্ত।
ইরা ধীরে চোখ খুলল।
সে হাঁপাচ্ছে।
— “মায়া…?”
পাশেই মায়া বসে আছে।
কিন্তু এবার তার চোখ স্বাভাবিক।
কোনো অন্ধকার নেই।
মায়া ফিসফিস করল—
— “আমি… কিছু অনুভব করছি না।”
ইরা হাত তুলল।
কোনো আলো নেই।
সে হেসে ফেলল।
— “আমিও না।”
দু’জন একে অপরের দিকে তাকাল।
নীরবতা।
তারপর একসাথে হেসে উঠল।
মায়া ধীরে বলল—
— “আমরা এখন একদম সাধারণ মানুষ।”
ইরা তার কাঁধে মাথা রাখল।
— “এটাই তো চাইছিলাম।”
মায়া ফিসফিস করল—
— “এখন যদি তুই চলে যাস?”
ইরা তার হাত শক্ত করে ধরল।
— “এবার আমি শক্তি দিয়ে না…
ইচ্ছা দিয়ে থাকব।”
আকাশে সন্ধ্যার আলো।
ঝড় শেষ।
যুদ্ধ শেষ।
কিন্তু ভালোবাসা —
এবার সত্যি শুরু।
“যুদ্ধের পরের জীবন”
যখন যুদ্ধ শেষ হয়,
সবচেয়ে কঠিন কাজটা শুরু হয়—
স্বাভাবিক হয়ে বাঁচা।
শহর ধীরে ধীরে আগের মতো হয়ে উঠছে।
মানুষ আবার কাজে যাচ্ছে।
হাসছে।
ঝগড়া করছে।
বাঁচছে।
কেউ জানে না—
কত বড় এক অন্ধকার থেকে তারা বেঁচে গেছে।
ইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কোনো আলো নেই।
কোনো অদ্ভুত ঝিলিক নেই।
শুধু সে।
সে হালকা হাসল।
— “অবশেষে… শুধু আমি।”
পেছন থেকে মায়া এসে জড়িয়ে ধরল।
— “খারাপ লাগছে?”
ইরা মাথা নাড়ল।
— “না… একটু ফাঁকা লাগছে।
কিন্তু শান্ত।”
মায়া চুপ করে তার কাঁধে মুখ রাখল।
— “আমারও।”
দিনগুলো বদলাতে শুরু করল।
আর রাতগুলোও।
কোনো ঝড় নেই।
কোনো ছায়া নেই।
কোনো হঠাৎ আলো বিস্ফোরণ নেই।
শুধু ছোট ছোট স্বাভাবিক মুহূর্ত।
একদিন বিকেলে
ওরা দু’জন পার্কে বসে ছিল।
মায়া বলল—
— “আমরা কি এখন সত্যি নিরাপদ?”
ইরা একটু ভেবে বলল—
— “আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী।
কিন্তু এবার ভয় পাই না।”
মায়া তাকাল।
— “কেন?”
ইরা হেসে বলল—
— “কারণ এবার যদি ঝড় আসে—
আমরা লুকোব না।
আমরা পাশে থাকব।”
কিছুদিন পরে
ওরা একটা ছোট বাসা নিল।
পুরনো না।
বড় না।
কিন্তু জানালা দিয়ে রোদ ঢোকে।
প্রথম দিন ঘরে ঢুকে
মায়া বলল—
— “এটা আমাদের?”
ইরা হাসল।
— “হ্যাঁ। কোনো অন্ধকার ছাড়া।”
মায়া ধীরে বলল—
— “আমরা কি সত্যি সাধারণ জীবন পারব?”
ইরা তার হাত ধরল।
— “সাধারণ হওয়াই সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ ছিল।”
রাতে ওরা ছাদে বসে আকাশ দেখছিল।
তারা জ্বলছে।
মায়া হঠাৎ বলল—
— “ইরা… একটা কথা?”
— “হুম?”
— “যদি আমরা কখনো আবার ঝগড়া করি?”
ইরা হেসে ফেলল।
— “অবশ্যই করব।”
মায়া অবাক।
— “মানে?”
— “ভালোবাসা মানে সবসময় শান্তি না।
ভালোবাসা মানে ঝগড়া করেও পাশে থাকা।”
মায়া চুপ করে গেল।
তার চোখে ভিজে আলো।
— “আমি আগে ভাবতাম তোর জন্য লড়াই মানে শক্তি ব্যবহার করা।
এখন বুঝি… তোর জন্য লড়াই মানে পাশে থাকা।”
ধীরে ধীরে
ওরা নিজেদের নতুনভাবে চিনতে শিখল।
কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই।
কোনো যুদ্ধ নেই।
শুধু
হাত ধরা।
হাসি।
ভয় পেলে জড়িয়ে ধরা।
একদিন রাতে
বিদ্যুৎ চলে গেল।
ঘর অন্ধকার।
মায়া এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
আগে হলে হয়তো সে ভয় পেত।
এবার সে হালকা হেসে বলল—
— “দেখ… অন্ধকার।”
ইরা মোম জ্বালাল।
— “হ্যাঁ। কিন্তু ভয়ংকর না।”
দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
কোনো ছায়া নেই।
শুধু স্বাভাবিক অন্ধকার।
মায়া ফিসফিস করে বলল—
— “আমরা কি সত্যি জিতেছি?”
ইরা ধীরে বলল—
— “আমরা একে অপরকে বেছে নিয়েছি।
এটাই জয়।”
রাতটা শান্ত ছিল।
দু’জন পাশাপাশি শুয়ে আছে।
মায়া বলল—
— “একটা কথা বলব?”
— “বল।”
— “আমি তোকে ভুল পথে পেয়েছিলাম।”
ইরা হেসে বলল—
— “হ্যাঁ… কিন্তু ঠিক পথে ভালোবেসেছি।”
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
শহর ঘুমাচ্ছে।
আর ওরা—
প্রথমবারের মতো
যুদ্ধ ছাড়া ঘুমোচ্ছে।