পর্ব ২: অচেনা নম্বরের রহস্য
রাত তখন প্রায় একটা।
ঘরের সব আলো নিভে গেছে। শুধু আরোহীর টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে।
বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে।
মোবাইলের স্ক্রিনে সেই অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা এখনও জ্বলজ্বল করছে—
"মেঘলার থেকে দূরে থাকুন। ওর কাছে গেলে আপনার জীবনও বদলে যাবে।"
আরোহী অনেকক্ষণ ধরে স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেসেজটা মুছে ফেলবে?
নাকি রেখে দেবে?
শেষ পর্যন্ত সে মুছল না।
কিছু একটা তাকে বারবার বলছিল—
এই মেসেজটার সঙ্গে বড় কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট কাগজটার দিকে।
মেঘলার নম্বর।
সে ফোনটা হাতে তুলে নিল।
কল করবে?
না করবে না?
মিনিটখানেক দ্বিধার পর সে কল বাটনে চাপ দিল।
রিং হচ্ছে...
একবার...
দুবার...
তিনবার...
তারপর ওপাশ থেকে খুব আস্তে একটা গলা ভেসে এল।
— "হ্যালো..."
গলাটা শুনেই আরোহীর বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
— "আমি... আরোহী।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— "জানতাম তুমি ফোন করবে।"
আরোহী অবাক।
— "কীভাবে?"
— "যারা খুব বেশি ভাবতে ভালোবাসে, তারা শেষ পর্যন্ত ফোন করেই ফেলে।"
আরোহী হেসে ফেলল।
— "তুমি সবকিছু এত নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলো?"
— "জীবন আমাকে শিখিয়েছে।"
আবারও সেই রহস্যময় উত্তর।
আরোহী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "আজ তোমাকে খুব ভয় পেয়েছিল মনে হচ্ছিল।"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
শুধু বৃষ্টির শব্দ।
তারপর মেঘলা ধীরে বলল,
— "সব ভয়ের গল্প প্রথম দিন বলা যায় না, আরোহী।"
— "তাহলে একদিন বলবে?"
— "যদি তুমি তখনও আমার পাশে থাকতে চাও..."
কথাটা শুনে আরোহীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
ঠিক তখনই...
মেঘলার গলা বদলে গেল।
— "এক মিনিট..."
ওপাশে যেন দরজা খোলার শব্দ।
তারপর কারও পায়ের আওয়াজ।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
— "তুমি এখন ফোনটা কেটে দাও।"
— "কেন?"
— "পরে বলব।"
— "কী হয়েছে?"
হঠাৎ ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল—
— "মেঘলা... দরজা খোলো। আমি জানি তুমি ভেতরে আছো।"
মেঘলার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "আরোহী... প্লিজ... ফোন কেটে দাও।"
ঠাস!
দরজায় জোরে আঘাত পড়ল।
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
— "মেঘলা!"
আর কোনো উত্তর এল না।
শুধু একটা শব্দ...
কল ডিসকানেক্ট।
আরোহী সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন করল।
Switch Off.
সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
ঘড়িতে রাত একটা পনেরো।
তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
মেঘলার দরজার বাইরে কে ছিল?
ঠিক তখনই...
তার নিজের ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
এইবারও অচেনা নম্বর।
"বলেছিলাম না... ওর কাছে যেও না। এখন আর ফিরে আসতে পারবে না।"
আরোহীর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে রাস্তার লাইটের নিচে...
একজন কালো রেইনকোট পরা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে...
সরাসরি আরোহীর জানালার দিকে তাকাল...
আরোহীর বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে লাগল।
সে জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে আবার তাকাল।
রাস্তার লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা এখনও একইভাবে তাকিয়ে আছে।
বৃষ্টির ফোঁটা তার কালো রেইনকোট বেয়ে নিচে পড়ছে।
মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
শুধু বোঝা যাচ্ছে—লোকটা নড়ছে না।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আরোহীর হাত কাঁপতে শুরু করল।
সে দ্রুত ঘরের লাইট নিভিয়ে দিল।
পর্দার আড়াল থেকে আবার উঁকি দিল।
লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ...
লোকটা খুব ধীরে তার ডান হাতটা তুলল।
আরোহীর দিকে ইশারা করল।
তারপর পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে...
ট্রিং... ট্রিং...
আরোহীর ফোন বেজে উঠল।
আবারও অচেনা নম্বর।
ভয় আর কৌতূহলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে ফোনটা রিসিভ করল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।
শুধু বৃষ্টির আওয়াজ।
তারপর খুব ধীর, কর্কশ একটা কণ্ঠস্বর—
— "জানালা থেকে সরে যাও।"
আরোহীর শরীর জমে গেল।
লোকটা তাহলে তাকে দেখছে!
সে কাঁপা গলায় বলল,
— "আপনি কে?"
কোনো উত্তর নেই।
কয়েক সেকেন্ড পরে আবার সেই গলা—
— "মেঘলার জীবন থেকে দূরে থাকো।"
— "কেন?"
— "কারণ ওর সঙ্গে যে থাকে... সে শেষ পর্যন্ত সব হারায়।"
লাইনটা কেটে গেল।
আরোহী দৌড়ে জানালার কাছে এল।
রাস্তা ফাঁকা।
লোকটা নেই।
যেন কোনোদিন ছিলই না।
...
সারারাত আর ঘুম এল না।
ভোর পাঁচটার দিকে বৃষ্টি থামল।
জানালার বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু আরোহীর মাথায় শুধু একটাই নাম—
মেঘলা।
সে আবার ফোন করল।
Switched Off.
আরও একবার।
একই উত্তর।
তার বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি জমতে লাগল।
...
পরদিন সকাল।
আরোহী আবার কলেজ স্ট্রিটে এল।
একটা অদ্ভুত টান তাকে টেনে এনেছে।
হয়তো মেঘলার সঙ্গে আবার দেখা হবে।
হয়তো হবে না।
সে সেই একই বইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দোকানদার তাকে চিনতে পেরে হেসে বললেন,
— "আবার এসেছেন?"
আরোহীও হেসে বলল,
— "হ্যাঁ... ওই... কাল যে মেয়েটা ছিল..."
দোকানদারের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
— "কোন মেয়ে?"
— "ক্যামেরা ছিল... সাদা শার্ট..."
লোকটা কয়েক সেকেন্ড ভেবে মাথা নাড়লেন।
— "কাল তো আপনার সঙ্গে আর কাউকে দেখিনি।"
আরোহীর বুক কেঁপে উঠল।
— "কী বলছেন? আমরা তো এখানেই বই কিনেছিলাম।"
— "আপনি একাই এসেছিলেন দিদি।"
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা যেন থেমে গেল।
বৃষ্টির গন্ধ...
বইয়ের স্তূপ...
মানুষের ভিড়...
সবকিছু ঠিক আছে।
শুধু একটা কথা ঠিক নেই।
দোকানদার বলছেন—মেঘলা ছিলই না।
আরোহী ধীরে ধীরে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
তার মাথা ঘুরছে।
সে কি ভুল দেখেছিল?
না...
অসম্ভব।
মেঘলার হাতের স্পর্শ...
কফি...
কথা...
সবকিছু এত বাস্তব ছিল!
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।
Unknown Number
এইবার কোনো মেসেজ নয়।
একটা ছবি।
ছবিটা খুলতেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
এটা সেই ছবি...
যেটা গতকাল মেঘলা ক্যামেরায় তুলেছিল।
আরোহী বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু...
ছবিতে আরোহীর পাশে কেউ নেই।
যেখানে মেঘলার দাঁড়ানোর কথা...
সেখানে শুধু ফাঁকা রাস্তা।
ছবির নিচে মাত্র একটি লাইন লেখা—
"সবাই যাকে দেখে, সে সত্যি হয় না..."
যেখানে শুধু তুমি
আরোহীর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সে আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
একবার...
দু'বার...
তিনবার...
না।
ছবিটায় সত্যিই সে একা দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব?
সে তো স্পষ্ট মনে করতে পারছে, ঠিক ছবি তোলার সময় মেঘলা তার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
তাহলে...
ছবিতে সে নেই কেন?
আরোহীর মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে এল—
— "দিদি..."
আরোহী ঘুরে দাঁড়াল।
বইয়ের দোকানের ছোট্ট ছেলেটা।
বয়স হবে বারো-তেরো।
হাতে একটা বাদামি রঙের খাম।
ছেলেটা কাছে এসে বলল,
— "এটা আপনার জন্য।"
আরোহী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "আমার জন্য?"
— "হ্যাঁ। আজ সকালেই একটা আপু দিয়ে গেছে। বলেছে, আপনি এলে যেন এটা দিই।"
— "কোন আপু?"
ছেলেটা একটু ভেবে বলল,
— "লম্বা... কাঁধে ক্যামেরা ছিল।"
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
মেঘলা!
— "ও কোথায়?"
ছেলেটা চারদিকে তাকিয়ে বলল,
— "খামটা দিয়ে ভিড়ের মধ্যে চলে গেল।"
আরোহী আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে দৌড়ে রাস্তার দিকে গেল।
চারদিকে শুধু মানুষ...
বই...
রিকশা...
বৃষ্টি শেষে জমে থাকা জল...
কিন্তু মেঘলা নেই।
যেন সে কখনও ছিলই না।
ধীরে ধীরে ফিরে এসে আরোহী খামটা খুলল।
ভেতরে একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
আর একটি ভাঁজ করা চিঠি।
কাঁপা হাতে সে চিঠিটা খুলল।
"প্রিয় আরোহী,
যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।
গতকালের জন্য ধন্যবাদ। অনেকদিন পর আমি সত্যি করে হেসেছিলাম।
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো...
আমার জীবনে যত মানুষ এসেছে, সবাই শেষ পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
কেউ নিজের ইচ্ছায়...
কেউ বাধ্য হয়ে।
তুমি দয়া করে আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট কোরো না।
আমাকে ভুলে যাও।
— মেঘলা"
চিঠির শেষ লাইনটা পড়তেই আরোহীর চোখ ভিজে উঠল।
কেন জানি না...
মাত্র একদিনের পরিচয়।
তবুও মনে হচ্ছে, সে যেন বহুদিন ধরে মেঘলাকে চেনে।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
ঠিক তখনই...
তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনো নম্বর নেই।
শুধু লেখা—
Private Number
সে কলটা রিসিভ করল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে একটা মেয়ের কণ্ঠ—
— "আরোহী..."
সে চমকে উঠল।
— "মেঘলা?"
— "আমার কথা শোনো..."
হঠাৎ ওপাশে কারও চিৎকার।
তারপর জোরে কিছু ভাঙার শব্দ।
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল—
— "ওরা আমাকে খুঁজে পেয়েছে..."
লাইনটা কাঁপছে।
আরোহী প্রায় চিৎকার করে উঠল—
— "তুমি কোথায়? আমি আসছি!"
ওপাশ থেকে খুব আস্তে উত্তর এল—
— "না... এসো না..."
— "কেন?"
মেঘলার গলায় কান্না।
— "কারণ... ওদের পরের লক্ষ্য তুমি..."
ঠাস!
মনে হলো ফোনটা মাটিতে পড়ে গেল।
তারপর একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল—
— "ফোনটা কেটে দাও।"
কল ডিসকানেক্ট।
আরোহী সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন করল।
The number you are trying to call does not exist.
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই তার ব্যাগের ভেতর থেকে হালকা বিপ... বিপ... শব্দ আসতে লাগল।
সে ব্যাগ খুলে দেখল—
মেঘলার দেওয়া শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুলটার নিচে একটা ছোট্ট GPS ট্র্যাকার লুকানো।
আর তার স্ক্রিনে একটি লোকেশন জ্বলছে...
"রায় ভিলা"
লোকেশনের নিচে একটি লাল সতর্কবার্তা—
"১২ ঘণ্টা বাকি..."
আরোহী বুঝতেই পারল না—
১২ ঘণ্টা পর কী হতে চলেছে?
দূরে আবার আকাশে বজ্রপাত হলো।
তার অজান্তেই...
কেউ একজন ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
— চলবে ......