Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 6

রাত তখন প্রায় বারোটা। ইন্সপেক্টর অনিকেত বাড়ির সমস্ত লোককে এক জায়গায় জড়ো করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, রাতটা সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। কেউ একা ঘরে যাবে না। কেউ করিডরে বেরোবে না। কেউ নিজের নাম ধরে ডাক শুনলেও উত্তর দেবে না।

ডা. অর্ণব সেন তখনও ভীষণ অসুস্থ। তাঁকে একটি ঘরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। দরজার বাইরে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু রাত একটা তেরো মিনিটে পাহারায় থাকা কনস্টেবল হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে সবাই সেখানে গেলো। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। জানালার লোহার শিক অক্ষত। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখা গেলো, ডা. অর্ণব সেন বিছানায় শুয়ে আছেন।

তাঁর মুখের উপরে সাদা কাপড়। বুকের উপর একটা কাগজ।

কাগজে লেখা—

'যে সত্য চাপা দেয়, মৃত্যু তাকে খুঁজে নেয়।'

ডাক্তার মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণ দেখে ইন্সপেক্টর হতবাক হয়ে গেলেন। গলায় কোনো দাগ নেই। শরীরে কোনও আঘাত নেই। বিষের কোনো গন্ধ নেই।

মুখের পেশিগুলো এমনভাবে শক্ত হয়ে গেছে, যেন মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি এমন কিছু দেখেছিলেন, যা মানুষের চোখে দেখা সম্ভব নয়।

ঘরের ভিতরে একমাত্র জানালা বন্ধ। দরজার চাবি ছিল পাহারারত কনস্টেবলের কাছে।

ইন্সপেক্টর ধীরে ধীরে ঘরটা পরীক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ গেলো দেওয়ালের আয়নায়।

আয়নার উপর আঙুল দিয়ে লেখা—

'তিনজনের পাপ শেষ। এবার চতুর্থজন।'

অনুব্রত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ফিসফিস করে বললো , "চতুর্থজন কে?"

পিছন থেকে নিবারণের গলা এলো  - "যে পাপের কথা কেউ জানতো না।"

সবাই নিবারন এর দিকে তাকালো।

নিবারনের চোখে জল।

"সুশান্তবাবু, সুকান্তবাবু আর হরিপদবাবু কুসুমকে মেরেছিলেন। অর্ণববাবু দরজা বন্ধ করে তাঁকে বাঁচতে দেননি। কিন্তু মৃণালিনী দেবীকে..."

নিবারন থেমে গেলো।

ইন্সপেক্টর অনিকেত এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো , "কী হয়েছিলো  মৃণালিনী দেবীর?"

নিবারণ ঠোঁট কামড়ে বললো , "আমি জানি না, স্যার।"

ইন্সপেক্টর অনিকেত একটু ধমক দিয়ে বললো  , "মিথ্যে বলবেন না।"

"আমি শুধু জানি, সেদিন রাতে মৃণালিনী দেবী নিজের ইচ্ছায় ওই ঘরে ঢুকেছিলেন।"

অনুব্রত চমকে উঠে বললো  , "নিজের ইচ্ছায়?"

নিবারন বললো  , "হ্যাঁ, ছোটোবাবু। তিনি বলেছিলেন, কুসুমকে বাঁচাবেন। কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার পরে আমি তাঁর চিৎকার শুনেছিলাম। তারপর আর কোনো শব্দ হয়নি।"

অনুব্রত বললো  , "তুমি কাউকে বলোনি কেন?"

নিবারন মাথা নিচু করলো।

তারপর বললো  "আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম ছোটোবাবু । আমার নিজের মেয়ে ছিল। সুশান্তবাবু বলেছিলেন, মুখ খুললে আমার মেয়েকেও ওই ঘরে আটকে রাখবেন।"

অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো, "তোমার মেয়ে এখন কোথায়?"

নিবারণ উত্তর দিলো না।

অনুব্রত মনে হলো, এই বাড়িতে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু লুকিয়ে রেখেছে।

কেউ অপরাধ।

কেউ ভয়।

আর কেউ এমন একটা সত্য, যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস কারও নেই।

সেই রাতে প্রথমবারের মতো অনুব্রত বুঝতে পারল, তেরো নম্বর ঘর শুধু একটি ঘর নয়। ওটা একটা কবর। যেখানে চাপা পড়ে আছে মানুষের লোভ, নিষ্ঠুরতা আর কাপুরুষতার ইতিহাস। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।

মা কোথায়?

যদি মার মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে তার দেহ কোথায়?

আর যদি মা বেঁচে থাকেন, তবে এত বছর ধরে কোথায় আছেন ?

পরদিন সকালে বাড়ির পিছনের পুরোনো গোয়ালঘরে নিবারণকে পাওয়া গেলো। সে জীবিত ছিল, কিন্তু কথা বলতে পারছিল না। তার দুই হাতের তালুতে গভীর আঁচড়।

দেওয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা—

'মাকে খুঁজে বের করো।'

ইন্সপেক্টর অনিকেত এবার আর যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলো না। তবে তিনি হাল ছাড়ার মানুষ নন।

বাড়ির পুরোনো দলিল পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি একটি নকশা পেলেন। নকশায় দেখা গেলো, জমিদারবাড়ির নিচে বিস্তৃত একটি গোপন সুড়ঙ্গ আছে। সেটি উত্তর দিকের ঘর থেকে শুরু হয়ে পুকুরের তলা পর্যন্ত গেছে।

সুড়ঙ্গের একটি অংশ ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইন্সপেক্টর অনিকেত মনে মনে বললো  , কিন্তু কেন?