ঝরাপাতা
পর্ব - ৬০
🥀🌿🥀🌿🥀🌿🥀
অক্ষম আক্রোশে রনি বিছানায় একটা ঘুষি মারে, "কত সুখী ছিলাম সেদিন আমরা। ইকো পার্কে ঘুরলাম, কত গল্প করলাম। আর সব ভুলে গেলে তুমি ! একবার মনে পড়ল না এই দিনগুলো !"
ঢকঢক করে এক বোতল জল খেয়ে নেয় রনি, "তুমি খুব ভালো করে জানো, আমি কোনো খারাপ কথা বলিনি, অযৌক্তিক কথা বলিনি। আমি যা চেয়েছিলাম, তাতে সবার ভালো হত। আর সেটাই আমার দোষ হয়ে গেল। সবাইকে ভালো রাখাই অন্যায়?"
ঘর জুড়ে পায়চারি করতে করতে রনি ভাবে, "এ জীবনে আর আমি তোমার সঙ্গে সংসার করার স্বপ্ন দেখি না। একবার আমার অন্যায় ছিল। কিন্তু এবার? এবার অন্ততঃ আমার কোনো দোষ নেই। একদিন সেটা বুঝবে তুমি। কিন্তু ততদিনে হয়ত অনেক দেরি হয়ে যাবে।"
আবার ফিরে এসে খাটে বসে রনি, "তুমি ভালো থাকো, খুব ভালো থাকো। আমি আর তোমার জীবনের পথে গিয়ে দাঁড়াব না। শুধু আমিই জানব, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছ। তবুও আমি তোমাকেই ভালোবাসি।" দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ওঠে ও।
🥀🌿🥀🌿🥀🌿🥀
ঢকঢক করে এক বোতল জল খেয়ে নেয় মণিকা। কোনো কাজ হয় না। বরং অস্বস্তিটা আরও বাড়ে। গলার কাছ পর্যন্ত কি একটা উঠে এসেছে, মাথার উপরে যেন হাতুড়ির ঘা, বুকের মাঝখানটা কেউ মুঠো করে ধরে রেখেছে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
তিনরাত হতে যাচ্ছে, আর সহ্য করতে পারছে না মণিকা। প্রত্যেক দিনে রাতে এরকমই যন্ত্রণা। আজ যেন চরম কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ছেলে দুটোকে আর দেখতে পাবে না। ভাবতেই মনে হল, রনিকে আর দেখতে চায়ও না। বরং মিলিকে যদি একবার দেখতে পেত ! ওরা কেউ মিলিকে ডাকলে আসবে না? মণিকার কি আরও একবার যাওয়া উচিত ছিল? জ্ঞান হারানোর আগে ফোনটা হাতে তুলে নেয়, স্পীড ডায়ালের প্রথম নামটা বনির। কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
🥀🌿🥀🌿🥀🌿🥀
তিনরাত তিনদিন দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি এ বাড়ির কেউ, মিলি তো নয়ই। চোখ খুলেই হোক, বুজেই হোক, ও কেবল দেখছে, বাবা চীৎকার করতে করতে কেমন করে হাঁপাচ্ছে। বাবা ! বাবাকে বাঁচাতেই ও বিয়ে পর্যন্ত করেছিল কয়েক ঘন্টার নোটিশে। সেই বিয়ের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে..........
না, এবার আর মিলি সেই বোঝার তলায় চাপা পড়ে থাকবে না। মিলি এবার জবাব দেবে। দিয়েছেও। রনিদার সব স্বেচ্ছাচারিতা মেনে নিতে ও পারবে না। রনিদার দুঃখ হয়েছে ভেবেই নিজের দিদির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিল। আজ রনিদার বিরুদ্ধে গিয়েই ও সেই সম্পর্কচ্ছেদ করবে।
পরীক্ষার দিনগুলো যে রনি ওর পাশে হলের ভিতরটুকু ছাড়া সবসময় ছিল, ওর বন্ধুরা সবাই যার জন্য জেনে গেল, ওর সব মনে পড়ে গেছে, পরীক্ষার পরই ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে রনি। কত মজা, কত প্ল্যান করেছিল বন্ধুরা সেই দিনটাকে নিয়ে, সব শেষ করে দিল রনি? করতে পারল?
শেষ পরীক্ষার দিন, একুশ তারিখ সন্ধ্যায় সবাই মিলে গল্প হচ্ছিল। যদিও আগে অনেকবার আলোচনা হয়ে গেছে, তাও কতজন লোক বলেছে কোন বাড়ি, মেনু কি, এসব নিয়েই গল্প হচ্ছিল। বনিদার সঙ্গে ঢুকল রনি। মিলির দিকেও ভালো করে তাকালো না, একটুখানি নেমন্তন্নর লিস্ট শুনেই বলে বসল, "কাকু এবার লিলিকে ডেকে নিন। ঐদিন ওদের দুজনকেও আপনারা সবাই আশীর্বাদ করুন।"
বাবা মুখটা কালো করে বলল, "আমরা ওর কোনো খবর রাখি না রনি।"
তাও থামে না, লিলি যে ওর প্রাণের বন্ধু, লিলির সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, লিলির কষ্ট দেখতে পারে নাকি ও? আবার সব মনে পড়ে গায়ে যেন জ্বালা ধরে মিলির।
ফস করে রনি বলল, "আমি জানি ও কোথায় থাকে। বাড়ির সবাইকে ও খুব মিস করে। প্লিজ কাকু, কাকিমা, ওকে নিয়ে আসুন। আমার সঙ্গে একদিনে ওকেও মেনে নিন।"
- "তুই ওর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিস? বলিস নি তো।" বনিদা স্পষ্ট অসন্তুষ্ট হয়েছিল।
- "এই তো বললাম।" রনি নির্বিকার। মিলির বুক ঢিবঢিব করছে, ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাও না বলে দেয় !
- "আমি লিলিকে চাই না রনি। ওর কথা থাক। তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে........." মিলির মনে আছে, বাবা মেজাজ ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল শেষপর্যন্ত।
- "ঐ একই দিনে ওরও বিয়ে হয়েছে। এখন আমাদের নিয়ে অনুষ্ঠান হবে, লিলিও কি সেটা পেতে পারে না? আপনিই বলুন না কাকু।"
- "লিলির বিয়ের জন্য আমরা কি করিনি বলতে পারো? কোন ত্রুটি রেখেছিলাম? আমাদের নাক কেটে দিয়ে গেল ঐ মেয়ে। আমার সেদিন থেকে এই একটাই মেয়ে। ওকে তুমিও অনেক অবহেলা করেছ রনি, কিন্তু এই মেয়ে আমাদের জন্য কি করেছে, আমরা জানি।" মা পর্যন্ত মুখ কালো করে বলেছিল।
- "কাকিমা, আমি মিলিকে যদি অবহেলা করে থাকি, তার জন্য যা বলার আমাকে বলুন। লিলির তাতে কোনো দোষ নেই। ওর দিকটা......."
- "তুমি লিলির দিকটাই দেখবে, নাকি এদিনের অনুষ্ঠানের কথাটা শুনবে?" বাবা রাগে ফেটে পড়তে চাইছিল বোধহয়।
- "রনি, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, তোর আস্পর্ধা দেখে। তুই লিলির জন্য........ তোর লজ্জা না থাকতে পারে, আমাদের আছে। দয়া করে চুপ কর।" মণিকা কাকিমাও ধমকে উঠেছিলেন।
- "লজ্জা কেন পাব মা? আমি লিলিকে....."
- "চুপ কর রনি, চুপ কর। আর কথা বলিস না বলছি।" মণিকা কাকিমা ডুকরে উঠেছিল।
মিলির মনে আছে, ও হাঁ করে রনির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সত্যিই এতটুকুও লজ্জা নেই সেখানে। কি বলতে যাচ্ছিল ও? ও দিদিকে কি?
চলবে