Read Jharapata 68 by Srabanti Ghosh in Bengali Love Stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ঝরাপাতা - 68

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৬৮

🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹

বনিরা এসেছে শুনেই মিলি উঠে দোতলায় নিজের ঘরে লুকিয়েছে। আর ওদের প্রস্তাব শুনে সমরের মুখ হাঁড়ি। বুঝতেই পারছে, আত্মীয়রা সবাই ওদিকে। 

ঠিক তাই, মনোজ ঝাঁপিয়ে পড়ে, "আপনারা একটা কথা খুলে বলুন তো, আপনাদের কি মনে হয়? রনি আমাদের মিলিকে নিজের স্ত্রী মানতে তৈরি? ওকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়? না না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এখানে ওরা কেউ নেই। আমরা আমাদের মতো করে একটু আলোচনা করে নিই।"

বনি গলা পরিষ্কার করে বলে, "আমি তাই ভাবতাম। ওকে নিজের বোকামির জন্য কষ্ট পেতে দেখেছি। মিলির পাশে পাশে থাকতে দেখেছি চিকিৎসা চলাকালীন। এমনকি পরীক্ষার ব্যাপারে যে ঝামেলা করেছিল, সেটার কারণও পরে বুঝেছি। কলেজের প্রিন্সিপাল মিলির উপর ক্ষেপে গেছিলেন, ওর পরীক্ষা বাতিল হয়ে যেত ভয়ে রনি রেগে গেছিল, ওকে বকাঝকা করেছে। এখন সত্যিই বলছি, লিলির সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ হয়েছে আর লিলির হয়ে এত কেন গলা ফাটালো, তাতে কাকু যে রেগে গেছেন, আমাদের কারও কিছু বলার মুখ নেই। মাও এটা মানতে পারছে না বলেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।"

- "দিদির দিকটা আমরা বুঝেছি। ঐজন্য‌ই মিলিকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে।" গোপা শান্তভাবে বলে। 

- "তুমি মায়ের এতদিনের বন্ধু, তাই মাকে বুঝতে পারছ। কাকিমা, মিলিকে যদি কটাদিন পাঠাতে।" পিউ বলে। 

- "চিন্তা কোরো না মা, মিলিকে আমরা পাঠাবো। শুধু মণিকাদির জন্যই না, মিলির জন্য‌ও। আমার ধারণা....." মনোজ এতক্ষণের কথাগুলো আবার খুলে বলে। 

সবাই নড়েচড়ে বসে। বনির দুই মামা রনির হাবভাব দেখে এসেছে, তাদেরও এমন‌ই মনে হচ্ছিল, রনির সম্পর্কে যা ভাবা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। সবাই কলকল করে ওঠে। সমরকে বারবার পুরনো প্রত্যেকটা কথা মনে করায়। এমনকি রনি যে জোর করে মিলির চিকিৎসার ভার নিয়েছিল আর তার পিছনে মিলির ভবিষ্যতে ভালোভাবে পড়াশোনার টাকার বন্দোবস্ত যেন থাকে, সেই যুক্তি দিয়েছিল, সেকথাও গোপা আজ সবার সামনে বলে দেয়। 

মিলি ওদিকে উপরে গিয়েও নেমে এসেছিল। কি কথা হয় জানার জন্য ছটফট করছিল, শান্তি পাচ্ছিল না। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে সবটাই শোনে। ওর এককথায়, একমুহূর্তে রনি যে সি *গা *রে *টের প্যাকেট ফেলে দিয়েছে, বনির কথায় জানল আজও হাত ছোঁয়ায়নি। রনি কখন কি করেছে, ফিরে ফিরে সবার মুখে শুনে ওর চোখ জলে ভরে যায়।

সমরের মাথা অনেকটা ঠান্ডা হয়েছে। ঠিক হয়, মিলিকে কাল আবার নার্সিং হোমে নিয়ে যাবে ওরা। মণিকাকে একেবারে সঙ্গে করেই ফিরবে ওরা সবাই। 

🌹❤🌹❤🌹❤🌹

বাড়ি ফিরেই রনিকে নিচে ডাকা হল। নেমে এসেই রনি বলে, "আমি টুকটাক জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছি। কাল সন্ধ্যায় তন্ময় অফিস থেকে ফিরলে ওর বাড়ি চলে যাব। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা শুরু হবে, নাহলে একেবারে বাইরে কোথাও চলে যেতাম।"

বড়মামা হা হা করে হেসে বলে, "এরমধ্যে‌ই গুছিয়ে নিয়েছিস? বাঃ খুব ভালো। যা আবার সব বের করে রাখ। তোর ব‌উকে ওরা এমনিই পাঠাতে রাজি হয়েছে। তোকে পালাতে হবে না।"

অবাক রনি ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোটমামা বলে, "অত অবাক হতে হবে না। তোর ব‌উ, শ্বশুরবাড়ি, সব ভালো, খুবই ভালো। ওরা চায় দিদি সুস্থ হয়ে যাক। তাই এখন কদিন মিলি আসবে যাবে, দিদির সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। তুই এখন পালা। তোর নিজের কাজকর্ম সার। দিদিকে বাড়িতে আনি, আমরাও দুদিন থেকে যাচ্ছি। সব ঠিক থাকলে পরশু বাড়ি যাব।"

- "হ্যাঁ রনি, তুই একটু সরে সরে থাকিস। মণি তোর উপর রেগে আছে। ওর শরীরটা সারুক, মাথা ঠান্ডা হোক। কিছুদিন পর আমরা তোর সঙ্গে মণির কথা বলিয়ে দেব।"

রনি আর দাঁড়ায় না। মামীদের সামনে, ভাই বোনদের সামনে চোখে জল এসে যাচ্ছিল। দাদাবৌদিকে তো নিচু হতেই হল, মামাদের‌ও। তার উপর ও নিজে সবার কাছে খারাপ‌ই থেকে গেল। মিলির উপর সবচেয়ে রাগ হয় ওর, এখন উদারতা দেখাতে আসতে পারছে। সেদিন ওকে মুখের উপর বলে দিল, কোনোদিন আসবে না। 

মিলির উদ্দেশ্যেই বলে, "এই যে মাকে দেখতে নার্সিং হোমে গেলে, আমাদের বাড়িতে পর্যন্ত আসতে রাজি হলে, আমার কথায় মানতে? এখনও যদি আমি কথা বলতে যাই, শুনবে? আমি জানি, তুমি মুখ ঘুরিয়ে নেবে।"

ওদিকে নিচের ঘরে পিউ বলে, "ওবাড়ির সবাই যেসব কথা বলল, ওর উপর যে বিশেষ কারও রাগ নেই আর, বললে না কেন মামু?"

- "হ্যাঁ মামু। ওকে নিয়ে বসে সবাই কথা বললে হত না? বরং শুধু বাড়িতে থাকতে পারবে বলে ছেড়ে দিলে?" বনিও প্রশ্ন করে। 

- "দাঁড়া দাঁড়া, মিলি বাড়িতে আসা যাওয়া করুক, কদিন যাক। দুজন কি করে দেখি। মনোজ‌ও বলল না, আস্তে আস্তে দেখা যাক। মান অভিমান এবার কমে কিনা দেখি। নিজেরাই বুঝে যায় কিনা এই ফস ফস করে মান অভিমান কমানো দরকার। সবদিক দেখে সেই অনুযায়ী যা করার করিস তোরা। বললে আমরাও চলে আসব।"

মামীরা দুজন আর ছোটরা ও বাড়ি যায়নি। মণিকার ঘরের দরজা বন্ধ করে সবাইকে সব গল্প করা হয়। 

- "ওয়াও ! তার মানে এখন আমাদের কাজ দুজনকে ওয়াচ করা?" পিউ লাফিয়ে ওঠে। 

- "শুধু ওয়াচ না, প্যাচ‌আপ‌ও করিয়ে দেব। কিচ্ছু ভেবো না মামু।" বনিও মজার গন্ধ পেয়ে গেছে। 

- "মণি একটু সুস্থ হোক। ওকেও তখন বোঝাতে হবে।" বড়মামী বলে। 

🌹❤🌹❤🌹❤🌹

পরদিন নার্সিং হোমে সব ফর্মালিটিও ঠিকঠাক হয়, মণিকাও অনেক সুস্থ বোধ করে। মণিকা বাড়ি ফিরেছে, সঙ্গে মিলিও এসেছে বলে সবাই বেশ হাসিখুশি হয়ে ওঠে। কেউ মুখে বলছে না, ছোট থেকে বড় প্রত্যেকটা মানুষের আশা, মিলির সঙ্গে আবার রনির ঝামেলা মিটে যাবে। 

গোপা মিলির বাড়ি ফেরার কথা তুলতেই, সেই আশাতেই বোধহয়, মণিকা একেবারে উড়িয়ে দেয়, বলে দেয়, "মিলি আমার সঙ্গেই থাকবে এখন। নাহলে বুঝব, তোমরা এখনও আমার উপর রাগ করে আছ।"

গোপা পড়েছে মহা সমস্যায়। ও নিজেও নার্সিং হোমে গেছিল, একসঙ্গে এসেছে। মণিকার খাওয়া হলে মিলিকে নিয়ে যাবে ঠিক ছিল। এখন নতুন গেরো বাঁধল। 

মিনমিন করে বলতে গেছিল, মিলির পড়াশোনা। মণিকার এক ফুঁয়ে উড়ে গেল, এই তো পরীক্ষা শেষ হল। দুবাড়ির আত্মীয়রা সবাই উপস্থিত। দীপা, তপতী, সবাই গোপাকে একপাশে টেনে আনে, থাক না একরাত। মেয়ের নিজের শ্বশুরবাড়ি, এখানে থাকলে তো কারও কিছু বলার মুখ থাকবে না। 

মিলিকে একফাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, সেও রাজি। আসলে মিলি ভয় পেয়েছিল, কাকিমার যদি শরীর খারাপ হয় ও চলে গেলে ! 

আর রনি ওর এভাবে থেকে যাওয়া দেখে আরও রাগে ফুলতে থাকে। রনির স্থির বিশ্বাস হয়, ওকে নিচু দেখাতেই মিলি অন্যদের কথা শুনছে। এতক্ষণ মায়ের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে মায়ের ব্যাপারে নজর রাখছিল, সোজা নিজের ঘরে চলে আসে। 

সারা ঘরে পায়চারি করছে, হাতের মুঠো পাকাচ্ছে, যত রাগ বেশিরভাগ মিলি আর বাকিটা সমরের উপরে। কি করবে, বা আদৌ কিছু করা সম্ভব কিনা এই অবস্থায়, কিছুই ওর মাথায় আসছে না। একেই মা ওর সঙ্গে কথাও বলছে না। তার উপর এখন থেকে মিলি এই বাড়িতে থাকবে, শুধুই যে আসা যাওয়া করবে, এমন নয়। অথচ ওর সঙ্গে কথাও বলবে না, ওর দিকে ফিরেও তাকাবে না। আজ দুদিন ধরে নার্সিং হোমে যা হল, সেটা চব্বিশ ঘন্টা বাড়িতে হবে, ভাবতেই ওর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। 

বেশিক্ষণ ভাবতে হয় না। খানিক পরেই লিলি আর যুগল ওকে ফোন করে। লিলি পাড়ার এক বান্ধবীর কাছে শুনেছে, মণিকা কাকিমা অসুস্থ। 

চলবে