ঝরাপাতা
পর্ব - ৭৩
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
- "সব গোলমাল হয়ে গেছে মিলি। তোমাকে আজও আমি নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারলাম না। আর একবার সুযোগ দাও। মায়ের জন্য এতকিছু করছ, আমাকে একবার......"
- "আমার সঙ্গে দিদির কথা হয়েছে। তুমি খুব অন্যায় করেছ। আমাকে বলনি কেন যুগলদার সব কথা? তাহলে সেদিন আমি তোমার হয়ে বলতাম। আমি বলতাম, দিদি আর যুগলদা কত ভালো। ওদের মেনে নিলে, তবেই আমাদের অনুষ্ঠানটা হবে।" মিলি ওর হাত ধরে পাশে বসে পড়েছে।
রনি একহাতে ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরেছে, "তোমার পরীক্ষা চলছিল। কিছুই বলা হয়নি। আর সেদিন আমার কোনো প্ল্যান ছিল না ঐসব কথার। নেমন্তন্নের লিস্ট দেখে মনে হল, বলে ফেললাম। কাকু রেগে যাচ্ছেন দেখে আমি বুঝিয়ে বলতে গেছিলাম। আরও ঝামেলা হয়ে গেল।"
- "জানি, বুঝতে পেরেছি।" মিলি ওর কাঁধে মাথা রাখে।
- "ওহ, এখন বুঝতেও পেরেছ? সেদিন কি রাগ ! আমাকে....."
- "প্লিজ প্লিজ, ওগুলো ভুলে যাও।" মিলি আকুতিভরা মুখ তুলে ওর দিকে তাকায়।
- "আচ্ছা, আমি কিছু মনে রাখব না। তুমিও আর এরকম কোরো না। আমার কথা একটু শুনো, আমাকে একটু সময় দিও। আর শোনো, এবার বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার পাশে থেকো।"
- "থাকব, আমি তো তোমার পাশেই থাকব। সেদিন সব কেমন হয়ে গেল। আমি দেখেছি, যেই সব ঠিক হয়ে আসে, একটা নতুন ঝঞ্ঝাট হয়ে যায়।"
- "তা ঠিক, কদিন পর পরই ঝঞ্ঝাট হয়। সেটা এবার আমাদের দুজনকে একসঙ্গে ঠিক করতে হবে।" রনি মিলিকে আরেকটু আদর করে কাছে টেনে আনতে গিয়ে আবার কোমরের ব্যথায় মুখ ব্যাঁকায়।
মিলি সোজা হয়ে বসে, "ব্যথা কমেনি?"
- "কমে যাবে। স্প্রে টা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য থ্যাঙ্কিউ।" রনি আদর করে ওর নাকটা নেড়ে দেয়।
- "এবার শুয়ে পড়ো। তাহলে ব্যথাও কমে যাবে। আমি আসছি।"
মিলি উঠতে চেষ্টা করতেই রনি হাত চেপে ধরে, "এখানে থাকো না আরেকটু। গল্প করি।"
- "কেউ উঠে গেলে কেলেঙ্কারি হবে। এখন ছাড়ো। কাল কথা বলব।" মিলি ছটফট করে।
রনি ভেবে দেখে, কথাটা ফেলনা নয়। বিশেষ করে বৌদির ঘরে শুয়েছিল মিলি। টুকাই রাতে ওঠে, বৌদিও জেগে যায়। ও মিলির হাত ছেড়ে দেয়, "ঠিক আছে, এসো, গুড নাইট।"
- "গুড নাইট।" বলে পা বাড়িয়েও ফিরে এসে মিলি আলতো করে ওর গালে ঠোঁট ছোঁওয়ায়। তারপর আর পিছনে না তাকিয়ে দৌড় দেয়।
রনি ভাবতেই পারেনি মিলি এই কাণ্ড করবে। মিলি পালালে নিজের গালে হাত দিয়ে বসে থাকে খানিকক্ষণ। ইস, যদি জানত, ও কি উত্তর দিত না?
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
পরদিন সকালে হইচই, নিচে রান্নাঘর, খাওয়ার ঘরের আলো জ্বলছে। সব নিভিয়ে শোওয়া হয়েছিল। মণিকা আর মামীরা আলোচনা করছে, পিউ চুপ করে শুনছে।
তার মধ্যে বনি দোতলা থেকে ডাকে, "এ্যাই পিউ, একবার উপরে এসো। রনির খুব কোমরে ব্যথা করছে।"
মণিকা বাদে বাকিরা উপরে ওঠে। বনিই মাকে আশ্বস্ত করে, তেমন কিছু না, মা নিচে থাক। আর পিউ যাওয়ার আগে পুট করে একটা চোখ আধখানা বন্ধ করে মামনির দিকে তাকিয়ে। মণিকা বোঝে, পিউ সব জানে, ধীরে ধীরে গল্পটা ভাঙবে।
যেন কিছুই না, মিলি রোজ রনির ঘরে যায়, এমন হাবভাব করে মিলির হাত ধরে পিউ দোতলায় এসেছে। রনি কোঁ কোঁ করছে। খুব কোমরে ব্যথা। ও কাল রাতে জল নিতে নেমে টুকাইয়ের সাইকেলে ধাক্কা খেয়েছে, সিঁড়ির সামনে পড়ে গেছে। বরফ, মলম, স্প্রে, নানান রেমিডি জড়ো হয়। সবাই ওকে সাহস দেয়, তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।
মিলি দরজার কাছে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে। এখনও ব্যথা আছে দেখেও খারাপ লাগছে। রাতের কাণ্ড জানাজানি হলে ওর বোকামিতে সবাই হাসবে ভেবেও একটা কিন্তু কিন্তু ভাব। সবার সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক গড়ার সময় তো পায়নি।
রনির চোখ কোনদিকে, সেটা বনি আর পিউ খুব ভালো বুঝেছে, বাকিরাও আন্দাজ করছে। রনির একচোট সেবাযত্ন করে সবাই বুদ্ধি দেয়, বিশ্রাম নিতে।
নিচে এসে পিউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাইকে জলখাবার দিতে। আজ ছাব্বিশে জানুয়ারি, ছুটির দিন। কিন্তু মামার বাড়ির সবাই এবার বেরোবে, বাড়ি ফিরবে। মণিকাকে আরেকবার চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে জলখাবারের প্লেট দিয়ে দুই মামীর মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছে পিউ। বাকিরাও বলেছে, ব্যথা কমছে বলেছে রনি। আজ মণিকার সিঁড়ি ভাঙার দরকার নেই। ওবেলাই ছেলে নেমে আসতে পারবে।
মিলির খাবারটা দেওয়ার আগেই মিলি বলে, "টুকাই কি খাবে পিউবৌদি? দাও, আমি খাইয়ে দিই।"
- "ও দুধ খাবে একগ্লাস। সে আমি খাইয়ে দেব। আমি এখানে এখন মামনিকে ওষুধও দেব। তুই বরং ভাইকে খাবারটা দিয়ে আয়।" পিউ ওর হাতে প্লেটটা ধরানোর পর বলে।
এখন সবার সামনে না বলা মুশকিল, মিলি চুপচাপ ওপরে হাঁটা দেয়।
মণিকা সেদিকে তাকিয়ে বলে, "আজই পাঠালি কেন? তোরা একবার রনির সাথে কথা বলে ধীরে সুস্থে পাঠাতিস। যা রগচটা ছেলে !"
পিউ ফিক করে হেসে টেবিলের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ায়। ওর মুখচোখের দুষ্টু ভাবটা দেখে সব মাথাগুলো এক জায়গায় হয়।
- "আস্তে ধীরে চললে তাল রাখতে পারবে না মামনি। কাল দেখি টুকাই ঘুমের মধ্যে ছটফট করছে। আমার তো অভ্যেস, তক্ষুণি ঘুম পরিষ্কার। দেখি ওপাশ থেকে তোমার ছোটবৌমা উঠে গেছেন।" সবাই চোখ গোল করে শোনে, কাল রাতের দুই চোরের অভিযান।
সাত্যকি জোরে হেসে ফেলতেই বনি থামায়, "হাশশশ, একদম চুপ। কিচ্ছু যেন টের না পায় দুটো। আমরা কিছু জানি না। দেখি দুজন যত বড় বড় প্রতিজ্ঞা করেছে, কেউ কাউকে ডাকবে না, ডাকলেও যাবে না, সেগুলো ওনারা ভুলে গেছেন, এটা বলতে কতদিন সময় নেয়।"
- "তুই বড় দুষ্টু বনি।" ঝলমলে খুশিমুখে মণিকা বলে।
- "না না, হোক হোক।" চাপাগলায় বলে ছোটমামী, "একটু ঘোল খাওয়ানো হোক। আর মণিদি, তুমিও দেখবে, এসব মজায় তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে।"
- "মিলি এ বাড়িতে এসেছে দেখেই আমার অর্ধেক সুস্থ লাগছে। আর এখন পিউর গল্প শুনে সুস্থ হয়েই গেছি। ওষুধগুলো দে। খেয়ে নিয়ে ভাবি, কি কি করা যায়। ও হ্যাঁ, পিউ ও বাড়িতে তোর ভাইয়ের কাহিনী বলে আসিস। গোপারাও টেনশনে আছে।"
চলবে