ঝরাপাতা
পর্ব - ৭৮
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
মিলি রনির ঘরে ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখটা জ্বালা করছে। এই ঘর, ঘরের কোথায় কি আছে, সব ওর দেখে রাখার কথা ছিল। অথচ জীবনে দুবার এই ঘরে এসেছে, রনির শরীর খারাপ হতে।
এমনকি এবারও কি হবে ও জানে না। কাকিমা এভাবে থাকতে বলেছে, থাকছে ও। কাকিমা বারবার বলে, "তুই আমার কাছে থাকবি, আর চলে যেতে দেব না।" কই রনি তো বলে না, "তুমি এখানে থাকবে। আমার কাছে, আমার ঘরে।"
মিলি চেয়ারের পিঠটা দুহাতে মুঠো করে ধরে রেখেছে, চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, "কই আজও তো বাড়ির কাউকে রনি বলল না আমার ব্যাপারে। আমার ভবিষ্যৎ কি? এরকম অদ্ভুত একটা সম্পর্ক কতদিন বইতে হবে?"
চোখ মুছে ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসে ও। যতবার এই ঘরে এসেছে, ব্যালকনিতে আসার মতো সময় ছিল না সেগুলো। আজ কেমন জিদ চেপে গেছে। ওকে যদি রাস্তা থেকে দেখা যায়, সবাই যদি দেখে ও এঘরে, এবাড়িতে আসে, দেখুক। ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
মিলি ব্যালকনিতে যাওয়ার আগেই রনি ফিরেছে। এমনকি ওর বাইক বাইরেই রাখা। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকা মিলি খেয়াল করেনি।
রনি ঢোকা মাত্র পিউ বলেছে, তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে আসতে, খেতে দেবে, তারপর ওর কাজ আছে। রনি বোঝেনি, পিউর কাজটা আসলে ওকেই পাহারা দেওয়া। খিদেও পেয়েছিল, দৌড়ে ঘরে এসে রনি টেবিলের উপর ব্যাগটা রেখে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে দেয়।
ব্যালকনিতে কেউ থাকতে পারে, মাথাতেই নেই দরজা খোলা দেখেও। ঘরে আওয়াজ পেয়ে মিলি সরে আসে। রনি ততক্ষণে জামাটা অর্ধেক খুলে ফেলেছে, একটা হাত থেকে বের করা বাকি। দুজনেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে।
তার পরই একগাল হেসে রনি এগিয়ে আসে ওর দিকে, "এ্যাই কখন এলে? ও বেলায় ফিরলেই না। দিব্যি বেড়াতে চলে গেলে?"
মিলির মনের অবস্থা এমনিতেই যথেষ্ট খারাপ ছিল। রনিকে দেখে চট করে সামলে নিতেও পারেনি তাই। বরং রনি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠে এক পা পিছিয়ে গেছিল মিলি।
সেটা দেখেই রনি ওর কাছে এসে জড়িয়ে ধরে, "এ্যাই মিলি, কি হয়েছে? কাঁদছ? আমি কিছু বলিনি। এ হয় নাকি, তুমি কোথাও যাবে না? বেশ করেছ, কাকুর বাড়ি গেছ। এই তো এখন চলে এসেছ। আমি বকিনি মিলি। তোমাকে মিস করছিলাম, তাই বলেছি।"
রনি আচমকা জড়িয়ে ধরে আদর করে কথা বলায় মিলি প্রথমে কেঁদে ফেলেছিল। কিন্তু রনি যা ভাবছে সেটা ভুল, একথা বলার জন্যই কান্না বন্ধ করে। রনিকে নিজেও জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে থাকে।
এদিকে বনি ফিরতেই টুকাই রোজকার মতো লাফিয়ে বাবার কোলে উঠেছে। বনি দুহাতে ছেলেকে উঁচু করে ওর পেটে নাকটা ঘষে আদর করে। সুড়সুড়ি লেগে টুকাই খিলখিল করে হাসছে। এটা ওদের দুজনের নিজস্ব সময়, নিজেদের মতো করে বানিয়ে নেওয়া মজার সব নিয়ম।
আজ পিউ টুকাইকে টেনে ধরে বলে, "ওকে একটু রাখো।" বনি তাকাতে বলে, "চলো চলো, দুটোকে ঐ ঘরে পাঠিয়েছি। আমি সবে যাচ্ছিলাম। চলো গিয়ে ধরি।" পিউ ওর হাত ধরে হাঁটা দেয়।
মণিকাও হেসে ফেলে ওর উৎসাহে। টুকাইকে নামিয়ে বনি বিরক্ত হয়ে হাত ছাড়ায়, "মা, পিউ বাড়াবাড়ি করছে। আচ্ছা এখন যদি ওরা কথাবার্তা বললে আমরা গিয়ে ধরি, ঠাট্টা করি, দুজন তখন আর কিছু স্বীকার করবে? বোঝে না, এখন প্রথমে দরকার একটা অনুষ্ঠান করে লোক জানিয়ে মিলিকে বাড়িতে আনা। তারপর হাসিঠাট্টা।"
- "তুমি দিনদিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছ।" পিউ বনির হাতটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছেড়ে দেয়, "বসে থাকো তুমি, পঞ্জিকা দেখে হাসিঠাট্টা কোরো। আমি যাচ্ছি।"
পিউ হাঁটা দেওয়ার আগেই বনি খপ করে ওর হাত ধরে, "একদম না, কথাটা বোঝো, আমি বারণ করছি বলে অন্ততঃ শোনো।"
পিউ মুখ কালো করে তাকিয়ে থাকে, এত ভালো সুযোগ নষ্ট হবে? এদিকে বনির কথা ফেলে যদি যায়, রনি যা রগচটা, চীৎকার চেঁচামেচি ঝামেলা করলে কেউ ওর পাশে দাঁড়াবে না। করুণমুখে মণিকার দিকে তাকায়।
মণিকা হাসতে হাসতে শেষ, "একদম আমার দিকে তাকাবি না। তোর বর বারণ করেছে, পতি পরমেশ্বর, কথা শুনে চল।"
- "ঠিক আছে, যাচ্ছি না। সবাই মনে রেখো, এরপর তোমাদের ভাইকে পটাতে হলে, তার বউকে পটাতে হলে, তার শ্বশুর বাড়ির লোককে পটাতে হলে কেউ পিউকে ডাকবে না।"
বনি কোমরে হাত দিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়ায়, "ভয় দেখাচ্ছ? আমি তোমাকে ভয় পাই? আমি না এই এইরকম করে সবাইকে পটাতে পারি।" দু আঙ্গুলে তুড়ি বাজিয়ে দেখায় বনি।
পিউ চোখের মণিটা কোণায় ঠেলে বিশেষ এক ভঙ্গিতে কটাক্ষ করে, "ভয় পাওনা? শিওর? আমাকে পটাতে পারবে তুমি?"
বনি ওর কথার মানে বুঝে গেছে, রাতে ওকে পালিশ করবে পিউ। কিন্তু এখন হার স্বীকার করার সময়ই না। খুব কায়দায় এক হাত পেটের কাছে বেঁকিয়ে কোমর ভেঙে মাথা ঝুঁকিয়ে ম্যাজিশিয়ানের মতো বাও করে বনি, "তোমাকে কেন পটাবো? তুমি তো আমাকে পটিয়েছ, তাও কত বছর আগে।" টুকাই মজা পেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে।
- "ন্যাকা ! এখন খেয়ে নিয়ে উদ্ধার করো। রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে মোমো এনেছি। ওদের বলেছি আমি বানাচ্ছি। ভাইকে ডাকো, আমি যখন দেখতে পেলাম না, আর ঘরে থাকতে হবে না। নিচে নামতে বলো দুটোকে।''
- "গুলবাজ ! ওদের বলেছ তুমি বানাচ্ছ?" বনি আবার কোমরে হাত দেয়।
পিউ ফিক করে হাসে, "নাহলে কি বাহানায় পাঠাতাম?"
- "ওহ, এত খেটেছে আমার বউ ! ঠিক আছে চলো। টুকাই ঠাম একলা আছে, ভয় পায় কিনা পাহারা দাও। তবে তোমাকেও বলে দিচ্ছি, ওদের সাড়া দেবে না, শুধু উঁকি মেরে পালিয়ে আসবে।" পিউ বুড়ো আঙ্গুলটা উঁচু করে ওর নাকের ডগায় নেড়ে দৌড় দেয়। বনি হেসে ফেলে, এর মানে লাইক নয়, কাঁচকলা, পিউ ওর কথা মানবে না।
চলবে