ঝরাপাতা
পর্ব - ৮৪
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
চারজনেরই প্রবল অস্বস্তি থাকলেও যুগল আসুন বসুন বলে ওদের আপ্যায়ন করে বসায়। গোপা ঘরে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বলে, "তোমরা নাহয় ফ্রেশ হয়ে এসো, অফিস থেকে ফিরেছ। আমরা বসছি।"
যুগল প্রথমেই ব্যাগ রেখে ওয়াশরুমে পালায়। ওর প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছে, এরা কী দাবি নিয়ে এসেছে, আর সেটাকে লিলিই বা কিভাবে নেবে !
লিলি ওদিকে শান্তভাবে বলে, "তোমরা কি কথা বলতে এসেছ, বলতে পারো।" তার মুখ শক্ত, হাবভাবে অসন্তোষ।
আবার গোপাই কথা বলে, "তোর সঙ্গে রনির যোগাযোগ আছে আমরা জানতে পেরেছি......."
- "মা," কঠিন গলায় লিলি বলে, "রনিদার সঙ্গে আমি কখনোই যোগাযোগ করিনি। আমি বাড়িতে গেছিলাম, তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে। রনিদা সেখান থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলে, আমাদের সঙ্গে এ বাড়িতে আসে। সেটা নিয়ে মিলি দু দুবার প্রচণ্ড অশান্তি করেছে। বিনা দোষে আমরা যথেষ্ট অপমানিত হয়েছি। তাও চুপচাপ সহ্য করেছি, কারণ মিলি ছোট, ওর সঙ্গে রনিদার সম্পর্ক ভালো না, ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইনসিকিউরিটিতে ভোগে। কিন্তু আর কিছু আমরা সহ্য করব না। রনিদাকে বলে দেব, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখতে। তোমরাও সেটা বলে দাও, সবাই বসে আলোচনা কর।"
- "আমরা সেসব নিয়ে কথা বলতে আসিনি।" এবার সমর মুখ খোলে, "বরং তুই ঠিক বলেছিস, মিলির অনেক ইনসিকিউরিটি আছে। আর লিলি, যতই রাগ কর, রনির সঙ্গে সম্পর্ক না রাখ, এই ইনসিকিউরিটি তৈরির পিছনে তোরও ভূমিকা আছে। তুই যদি সমস্ত কথা আমাদের জানাতি, তাহলে......."
- "তাহলে কি তোমরা সেদিন যুগলকে মেনে নিতে?" লিলি আর রাগ চাপতে পারে না।
- "এর উত্তরে হ্যাঁ বলাটা আজ অর্থহীন। আমরা ভেবেছিলাম, তোর বিয়েতে আপত্তি, রনিকে বিয়েতে আপত্তি। রনি কিছু খারাপ ছেলে নয়। তাই তোকে বোঝানো হয়েছিল। তখনই তোর স্পষ্ট কথা বলা উচিত ছিল। সবচেয়ে বড় অন্যায় করেছিস তুই, এটা মেনে নে। সত্যিকারের কারণ জানলে আমরা ভাবতাম, সেদিন তোদের দুজনকে নিয়ে বসতাম। যুগলের সম্পর্কে খোঁজখবর করতাম। পছন্দ হলে আমরাই তোদের বিয়ে দিতাম।"
- "মিথ্যে কথা ! তোমরা কখনো ওকে মানতে না।" লিলি সমরের কাছে হার মানতে চায় না।
যুগল ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ওর মনে হয়, এই মুহূর্তে চুপ থাকাই ভালো। এদের তিনজনের মধ্যে কথাগুলো পরিষ্কার হয়ে যাক।
- "এই ভুলটাই তুই সেদিনও করেছিস, আজও করছিস। তোর ভুল ধারণা নিয়ে তুই নিজের মর্জিতে চলছিস। তার ফলে শুধু মিলি নয়, পরের ছেলে হলেও আমরা অন্ততঃ স্বীকার করব, রনিরও জীবন নষ্ট হচ্ছে।" সমর কথাটা পরিষ্কার করতে চায়।
- "ঐ ঘুরেফিরে একই কথা বলতে এসেছ, আমার জন্য ওদের সংসারে অশান্তি চলছে।" লিলি চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।
- "এই ভুলটা থেকে বেরিয়ে আয় লিলি। তোর সঙ্গে আজ রনির কী সম্পর্ক, আমরা জানি। তাতে আপত্তি জানাতেও আমরা আসিনি। আমরা বলেছি, রনির সঙ্গে তোর যোগাযোগ আছে জেনেছি, ওদের কাছে তোর ঠিকানা পেয়েছি। ব্যস, এইকুকুই। তুই সেই কথার মানে না বুঝে ঐ এক লাইনকে বাড়িয়ে অকারণ অশান্তি করতে চাইছিস, আমাদের কথাটাই বলতে দিচ্ছিস না।" গোপা মেয়েকে বোঝায়।
- "আমাকে দোষারোপ করা ছাড়া আর কোনো কথা আছে তোমাদের?"
- "আছে, অন্য কথা বলতেই আমরা এসেছি। তবে তার সঙ্গে তোর দোষ, তোর অন্যায়ের কথাও উঠছে। আরও উঠছে তোর ব্যবহারের জন্য। তুই শান্তভাবে আমাদের কথা বলতে দিলে........"
যুগল বুঝে গেছে, অভিমান ঠেলে লিলি সহজভাবে ওদের নিতে পারছে না। অথচ ওরা যখন এভাবে বাড়িতে এসেছে, কথাগুলো সিরিয়াস হওয়াই স্বাভাবিক। আজ না শুনলে, আর কখনো সুযোগ নাও হতে পারে।
তড়বড় করে গোপার কথা কেটে বলে, "আপনারা কি বলতে চান, সেটা বলুন। আর লিলি, তুমি একটু চুপ করে শোনো। সব শোনার পর যা বলার বোলো। নাহয় তুমি যাও, ফ্রেশ হয়ে এসে ভালো করে সব শোনো।"
সমর আর গোপা দুজনেরই ভালো লাগে যুগলের বুদ্ধিমানের মতো কথা। ওরাও লিলিকে বলে, মুখ হাত ধুয়ে আসতে।
এবার গোপা যুগলকেই বলে, "দেখো বাবা, আমরা বলতে চাইছি, যা হয়েছে, সেটা ভালো হয়নি। তেমনি তাতে তোমার কতটা জানি না, আমাদের মেয়ের দোষ আছে। তোমরা একবার আমাদের কাছে আসতে পারতে, কথা বলতে পারতে।"
যুগল আর বলে না, সেটা ওর নিজেরই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু লিলি ওয়াশরুমে ঢুকতে গিয়েও ফিরে দাঁড়ায়, "আমরা তোমাদের বাড়িতে গেছিলাম, যুগল পর্যন্ত গেছিল। আমরা ক্ষমা চেয়েছিলাম। অথচ তোমরা ওকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছ, ঘরে ঢুকতে পর্যন্ত দাওনি।"
- "হ্যাঁ, সেদিন আমি তোমাদের ঢুকতে দিইনি। কিন্তু তোরা কখন গেছিলি, সেটা ভেবেছিস কখনো? তখন সব সর্বনাশ হয়ে গেছে। তোর চাকরির পাশাপাশি আরও পড়ার ইচ্ছে বলে তুই সবার মুখে চুনকালি দিয়ে বিয়েবাড়ির মধ্যে পালিয়ে এলি। আর মিলি, ঐটুকু মেয়েকে বিনা নোটিশে বিয়ে করতে হল। রনি ওকে ফেলে চলে গেল। কেন গেল রনি? বিয়েটা ঐভাবে হল বলে তো? মিলি মরতে বসেছিল। তখন তোদের মাপ করে দেব আমরা?" গোপা মেয়েকে প্রশ্ন করে।
মিলির কী হয়েছিল, রনির কাছেই অনেকবার শুনেছে দুজনেই। লিলির তো বটেই, যুগলেরও একটা অপরাধবোধ আছে সেটা নিয়ে। সেখানে ঘা লাগতেই লিলি চুপ করে যায়।
- "কী রে, বল, বিয়ের আগে তুই যা করেছিস, সেটা অন্যায় করিসনি? তোরা যদি সব জানাতি, তারপর আমরা না মানতাম, তখন আমাদের দোষ দিতে পারতি। তুই যে চলে এলি, তারপর একদিনের জন্য ভেবেছিস, আজ এতগুলো মাস আমরা কতটা লজ্জা নিয়ে নিজেদের চেনা পাড়ায় থাকি?" গোপা এবার মেয়েকে কোণঠাসা করতে চায়।
- "জানি, যুগলকে নিয়ে তোমাদের লজ্জা....." লিলি ফুঁসে উঠতে যায়।
- "ভুল জানিস।" এক ধমকে ঠান্ডা করে দেয় সমর, "আমাদের লজ্জা তোকে নিয়ে। তোকে আমরা এটুকু মানুষ করতে পারিনি, যে বাবা মায়ের সামনে তুই সত্যি কথা বলতে শিখেছিস। কেন বিয়ে করবি না, তার সব মিথ্যে কারণ বলেছিস তুই।"
যুগলের দিকে ফিরে সমর বলে, "তোমাকে লিলি কী কী মিথ্যে বলেছে জানি না। আমি তোমাকে সামনাসামনি বলে যাচ্ছি, তোমার জাতি, ধর্ম, শিক্ষা, কিছু নিয়ে আমার জামাই হিসেবে আমার কোনো লজ্জা নেই। কারণ তোমার সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। শুধু রনি আর ওর বাড়ির লোকের কাছে হালে শুনেছি, তুমি সৎ, পরিশ্রমী ছেলে। আমার মেয়ে যত গোলমাল পাকিয়েছে, তার জন্য মিলিও ভুল বুঝেছে, পরিস্থিতি ক্রমশঃ খারাপ হয়েছে কেবল। এখন তোমার সম্পর্কে যেটুকু জেনেছি, তাতে তোমার সঙ্গেই মূলতঃ আলাপ করতে এসেছিলাম আমরা। তুমি যাতে অপমানিত বোধ না করো, তাই কাউকে নিয়ে তো আসিইনি, জানিয়েও আসিনি। এই ত্যাঁদড় মেয়ের জন্য একটা কথাও বলতে পারলাম না। আমরা আসছি। যদি তোমার মনে হয়, আমাদের সঙ্গে কখনো কথা বলবে, আমাদের বাড়িতে এসো, বা বাইরে দেখা করতে বোলো। এই মেয়ে সেখানে থাকবে না।"
- "যুগল তোমাদের সঙ্গে কখনো দেখা করবে না। কেন ওকে একলা ডাকছ, আমি জানি।" লিলি আরও রেগে যায়।
- "লিলি চুপ করো। প্লিজ চুপ করো। আর আপনারা চলে যাবেন না। আমি তো কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। আমার রিকোয়েস্ট, আপনারা যখন নিজে থেকে এসেছেন, আমার রিকোয়েস্টে একটু বসুন। লিলি, তুমি ওয়াশরুমে যাও। বেরিয়ে কথা বলবে।" যুগল লাফিয়ে এসে দরজা আটকায়।
চলবে