Read When the Rose Dried by Sohagi Baski in Bengali কিছু | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ

মিরা সবসময় লাল গোলাপ পছন্দ করত না।
তার কাছে গোলাপ মানে ছিল অপ্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি—যা সুন্দর, কিন্তু বেশিদিন টেকে না। তবুও একদিন সে একটা লাল গোলাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। কেউ দেয়নি, নিজেই কিনেছিল। কেন কিনেছিল, সেটাও সে ঠিক জানত না। শুধু মনে হয়েছিল, কিছু জিনিস নিজের হাতে না ধরলে বোঝা যায় না—সেগুলো কতটা নরম, আর কতটা কাঁটাযুক্ত।
গোলাপটা সে জানালার ধারে একটা কাঁচের গ্লাসে রেখে দিয়েছিল। প্রতিদিন সকালে উঠেই প্রথম তাকাত ওটার দিকে। যেন গোলাপটা নয়, নিজেরই কোনো অংশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে—নিঃশব্দ, লাল, আর একটু ক্লান্ত।
মিরার সম্পর্কগুলো বরাবরই এমন ছিল। শুরুতে খুব যত্ন, খুব মনোযোগ। তারপর ধীরে ধীরে অভ্যাস। আর অভ্যাসের পর আসে অবহেলা—যেটা কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু সবাই অনুভব করে। সে কাউকে দোষ দিত না। শুধু বুঝে যেত, মানুষ আসলে যতটা কথা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এক সময় তার জীবনে একজন ছিল—নামটা এখন আর মনে পড়ে না ঠিক করে। নাম ভুলে যাওয়া সহজ, কিন্তু তার উপস্থিতির ফাঁকা জায়গাটা ভুলে যাওয়া যায় না। সে মানুষটা মিরাকে কখনো আঘাত করেনি সরাসরি। শুধু সময় দেয়নি। আর সময় না পাওয়াটা একধরনের ধীরে ধীরে মরে যাওয়া।
মিরা তখনও গোলাপটার দিকে তাকিয়ে থাকত।
প্রথম ক’দিন গোলাপটা টাটকা ছিল। পাপড়িগুলো শক্ত, রঙ গাঢ়। তারপর একদিন বুঝল—রংটা আগের মতো নেই। ঠিক যেমন সম্পর্কেও একসময় বুঝতে হয়—ভালবাসা আছে, কিন্তু আগের মতো নেই।
সে গোলাপটা ফেলে দেয়নি। শুকোতে দিয়েছিল।
কারণ কিছু জিনিস শেষ হলেও ছুড়ে ফেলা যায় না। সেগুলো রেখে দিতে হয়—নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
মিরা ধীরে ধীরে শিখে নিয়েছিল—সব দুঃখ কান্না চায় না। কিছু দুঃখ শুধু চুপ করে বসে থাকতে চায়। সন্ধেবেলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, অকারণে বুক ভারী লাগা, কাউকে ফোন না করেও কাউকে খুব মনে পড়া—এই সবই দুঃখের ভাষা।
একদিন গোলাপটা পুরো শুকিয়ে গেল। লাল রঙটা প্রায় বাদামি। পাপড়িগুলো ভঙ্গুর। মিরা তখনও ওটা ফেলে দেয়নি। শুধু গ্লাসটা পরিষ্কার করল, জল বদলাল না। কারণ সে জানত—সব শুকনো জিনিসের জল দরকার হয় না। কিছু স্মৃতি শুধু থাকার জন্যই যথেষ্ট।
মিরা আজও কাউকে বলে না সে কী চায়।
সে শুধু জানে—ভালোবাসা যদি আসে, সেটা যেন গোলাপের মতো হয়। সুন্দর, কিন্তু নিজের কাঁটার দায় নিজেই নেবে।
আর যদি না আসে—তাহলেও সে একা থাকতে শিখে গেছে। জানালার ধারে, এক গ্লাস নীরবতায়, একটা শুকনো লাল গোলাপের পাশে।
কারণ বাস্তবতা খুব চিৎকার করে না।
বাস্তবতা ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দেয়—
সব সম্পর্ক টেকে না,
কিন্তু সব অনুভূতি সত্যি হয়।
মিরা বুঝতে পারত, কিছু শূন্যতা আর ভরাট হয় না।
সেগুলো শুধু মানুষের ভেতরে জায়গা করে নেয়—নামহীন, নিরবচ্ছিন্ন।
লাল গোলাপটা শুকিয়ে যাওয়ার পর সে আর জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকত না আগের মতো। এখন সে বসে পড়ত। বসে থাকা সহজ, দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে একটা প্রত্যাশা থাকে।
দিনগুলো চলতে থাকল।
কাজ, কথা, মানুষের মুখ—সব ঠিকই ছিল। তবু কোথাও একটা ফাঁক থেকে যেত। মিরা বুঝে গিয়েছিল, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার শব্দ খুব জোরে হয় না। আসলে ভাঙে না-ই—ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যায়, তারপর একদিন হঠাৎ আর টের পাওয়া যায় না।
সে আর কাউকে জিজ্ঞেস করত না,
“তুমি বদলে গেলে কেন?”
কারণ সে জানত—মানুষ বদলায় না, মানুষ ক্লান্ত হয়।
এক সন্ধ্যায় মিরা শুকনো গোলাপটা হাতে নিয়ে দেখছিল। পাপড়িগুলো ছুঁতেই ঝরে পড়ছিল। সে বুঝল, যত যত্নই নাও, কিছু জিনিসের ভঙ্গুরতা বদলানো যায় না। ভালোবাসাও তার ব্যতিক্রম নয়। বেশি শক্ত করে ধরলে ভেঙে যায়, আর ছেড়ে দিলে হারিয়ে যায়।
তার জীবনে আবার মানুষ আসেনি—বা এসেছে, কিন্তু থাকেনি।
কেউ কেউ এসেছিল কথা বলতে, কেউ কেউ শোনার ভান করতে।
মিরা ধীরে ধীরে শিখে নিয়েছিল—সব সম্পর্ক গভীর হওয়ার জন্য নয়। কিছু সম্পর্ক শুধু সময় কাটানোর জন্য, কিছু শুধু একাকিত্ব ঢাকার জন্য।
একদিন সে শুকনো গোলাপটা একটা বইয়ের ভেতর রেখে দিল।
পাতার মাঝে, কোনো চিহ্ন না রেখে।
কারণ কিছু অনুভূতি প্রদর্শনের জন্য নয়—সংরক্ষণের জন্য।
মিরা এখন আগের মতো কাঁদে না।
তার চোখ শিখে গেছে স্থির থাকতে।
ব্যথা এখন আর ঢেউ হয়ে আসে না—নদীর মতো বইতে থাকে। সবসময়, নিঃশব্দে।
সে জানে, ভালোবাসা আবার আসতে পারে।
কিন্তু সে আর তাড়াহুড়ো করে না।
কারণ সে বুঝে গেছে—যে ভালোবাসা নিজেকে হারিয়ে পাওয়া হয়, সেটা টেকে না।
মিরা এখন নিজের সঙ্গে থাকে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে না,
“আমি কম ছিলাম?”
কারণ সে জানে—সব ভাঙনের কারণ ঘাটতি নয়, কখনো কখনো অসামঞ্জস্য।
লাল গোলাপের কথা সে এখনো ভুলে যায়নি।
কিন্তু সেটাকে সে আর দুঃখ বলে না।
ওটা এখন একটা প্রমাণ—
যে সে অনুভব করতে পেরেছিল,
ভালোবাসতে পেরেছিল,
এবং হারিয়েও বেঁচে থাকতে শিখেছিল।
মিরার জীবন খুব বড় কোনো গল্প নয়।
কোনো নাটকীয় শেষ নেই।
শুধু প্রতিদিনের বাস্তবতা আছে—
চুপচাপ, নিরব, কিন্তু সত্য।
কারণ কিছু মানুষ চিৎকার করে বাঁচে না।
তারা শুধু ধীরে ধীরে শক্ত হয়।
আর তাদের জীবনে লাল গোলাপ একদিন শুকিয়ে গেলেও—
তার রঙ থেকে যায় মনে,
নীরবে, গভীরে।
সময় একদিন মিরাকে আর প্রশ্ন করতে শেখায়নি।
সে বুঝে গিয়েছিল—সব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি নয়। কিছু প্রশ্ন শুধু মানুষের ভেতরে থেকে যায়, জীবনের মতোই অসম্পূর্ণ।
বইয়ের ভেতরে রাখা শুকনো লাল গোলাপটা সে অনেকদিন খুলে দেখেনি। ইচ্ছে করেই না। কারণ কিছু স্মৃতি না দেখলেই ঠিক থাকে। একদিন হঠাৎ বই খুলতে গিয়ে গোলাপটা পড়ে গেল মেঝেতে। পাপড়িগুলো আর একসাথে নেই—ছড়িয়ে গেল নিঃশব্দে। মিরা সেগুলো তুলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
সে বুঝল—এটাই শেষ রূপ।
ভালোবাসার, সম্পর্কের, আর নিজের একটা পুরোনো সংস্করণের।
মিরা আর কাউকে খুঁজছিল না।
একাকিত্ব এখন তার শত্রু নয়—সহচর।
সে জানে, মানুষ চলে যায়, অনুভূতি থেকে যায়। আর থেকে যাওয়া অনুভূতিগুলোই মানুষকে ধীরে ধীরে পরিণত করে।
এক বিকেলে সে জানালাটা খুলে দিল।
ঘরে আলো ঢুকল।
গোলাপের শুকনো পাপড়িগুলো হালকা বাতাসে একটু নড়ল, তারপর থেমে গেল। মিরা তখন বুঝল—সব থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়। কিছু থামা আসলে স্থির হওয়া।
সে নিজেকে আর দোষ দেয় না।
যা পেয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ।
যা হারিয়েছে, সেটাকে অভিজ্ঞতা বলে মেনে নিয়েছে।
মিরার জীবন কোনো উপন্যাসের মতো জমকালো নয়।
কিন্তু সত্য।
আর সত্য জীবনগুলোই সবচেয়ে নীরব হয়।
লাল গোলাপটা আর নেই—
কিন্তু তার শিক্ষা রয়ে গেছে।
ভালোবাসা মানে ধরে রাখা নয়,
ভালোবাসা মানে সাহস করে অনুভব করা—
এবং প্রয়োজন হলে, ছেড়ে দিতে পারা।
মিরা আজও হাঁটে, কাজ করে, হাসে।
কিন্তু এখন সে জানে—
ভাঙা মানুষ মানেই দুর্বল নয়।
কিছু মানুষ ভাঙার পরই নিজের আকারটা ঠিক বুঝতে পারে।



সমাপ্তি.... 🍁