Read Love at the Crematorium by Sohagi Baski in Bengali Short Stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

শ্মশানঘাটের প্রেম

চাঁদপুরা নামে ছোট্ট একটা গ্রাম ছিল, চারদিকে সবুজ মাঠ আর এক কোণায় পুরনো একটা শ্মশানঘাট, যেটা নিয়ে গ্রামের মানুষজনের অনেক ভয় আর কুসংস্কার ছিল। সেই গ্রামেই থাকতো নাজিরা, তার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। তার বাবার নাম রহিম উদ্দিন, একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক, আর মায়ের নাম সাবিনা খাতুন, যিনি মেয়েকে খুব আদর করে বড় করেছেন। নাজিরা তখন ক্লাস ৯-এ পড়ে, পড়াশোনায় খারাপ না হলেও তার একটা বড় সমস্যা ছিল—সে খুব জেদি। তাকে যে কাজ করতে মানা করা হতো, সে ঠিক সেটাই করতো। তার মা প্রায়ই তাকে সাবধান করে বলতেন, “শ্মশানঘাটের দিকে কখনো যাস না, ওখানে ভালো কিছু নেই।” কিন্তু এই কথাটাই নাজিরার মনে আগুন ধরিয়ে দিত, আর সে ঠিক করেই ফেলেছিল—ওখানে কি আছে, সেটা সে নিজে গিয়ে দেখবেই।

একদিন সন্ধ্যার পর, আকাশে হালকা কুয়াশা আর চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলে, নাজিরা চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে সে পৌঁছে গেল সেই ভয়ংকর শ্মশানঘাটে। চারদিকে শুকনো গাছ, ভাঙা চিতা, আর হালকা ঠান্ডা বাতাস। হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে এলো—খসসস… যেন কেউ হাঁটছে। নাজিরা থেমে চারপাশে তাকালো, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ঠিক তখনই তার পেছন দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল, আর একটা ভারী কণ্ঠ শোনা গেল—“এখানে কেন এসেছো…?” কণ্ঠটা এমন ছিল, যেন মাটির গভীর থেকে ভেসে আসছে।

নাজিরার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “তুমি কে?” হঠাৎ করে তার সামনে লালচে আলো জ্বলে উঠলো, গাছের ডালপালা জোরে কাঁপতে লাগলো, আর চারপাশে অদ্ভুত ছায়া নড়াচড়া করতে শুরু করলো। কণ্ঠটা এবার আরও ভয়ংকর হয়ে উঠলো—“ফিরে যাও… নইলে বাঁচবে না…” হঠাৎ একটা ছায়া তার দিকে এগিয়ে এলো, যেন তাকে ঘিরে ফেলতে চাইছে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, নাজিরা একটুও পিছিয়ে গেল না, বরং রাগী গলায় বলে উঠলো, “এই বেডা! ভয় না দেখিয়ে সামনে আই!”

তার এই কথায় চারপাশের সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। বাতাস শান্ত হয়ে গেল, ছায়াগুলো স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর, ধীরে ধীরে তার সামনে একটা অবয়ব তৈরি হতে লাগলো—উঁচু দেহ, গাঢ় ছায়ায় ঢাকা, চোখ দুটো হালকা জ্বলছে। সে ছিল জীন—তার নাম আশরান। আশরান কিছুক্ষণ নাজিরার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন সে বুঝতে পারছে না এই মেয়েটা আসলে কেমন। তারপর ধীরে বলে উঠলো, “তুমি ভয় পাও না?” নাজিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “ভয় দেখানোর চেষ্টা ভালো ছিল, কিন্তু আমি নাজিরা… আমাকে এভাবে ভয় দেখানো যায় না।” আশরান প্রথমবারের মতো চুপ হয়ে গেল। সে এতদিন মানুষের ভয় আর চিৎকার দেখেছে, কিন্তু এই প্রথম কেউ তাকে দেখে ভয় না পেয়ে উল্টো তাকে ধমক দিল।

সেই রাত থেকেই তাদের অদ্ভুত সম্পর্কের শুরু হলো। পরের দিন সকাল থেকে নাজিরা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেল, কিন্তু তার মাথায় ঘুরতে লাগলো সেই রাতের ঘটনাগুলো। স্কুলে গিয়েও তার মন বসলো না, বইয়ের পাতা উল্টালেও তার চোখে ভেসে উঠছিল সেই ছায়াময় অবয়ব। রাত নামতেই সে আবার চুপিচুপি বেরিয়ে গেল। শ্মশানঘাটে পৌঁছেই বললো, “আশরান, আমি এসেছি!” কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঠান্ডা বাতাস তার পাশ দিয়ে বয়ে গেল, আর আশরানের কণ্ঠ ভেসে এলো, “তুমি আবার এসেছো… তোমাকে তো বলেছিলাম এখানে না আসতে।” নাজিরা হেসে বললো, “আমাকে যা করতে মানা করা হয়, আমি ঠিক সেটাই করি।”

ধীরে ধীরে আশরান তার সামনে আবির্ভূত হলো, এবার আর ভয় দেখালো না। সে শুধু তাকিয়ে থাকলো নাজিরার দিকে। দিন কেটে যেতে লাগলো, আর প্রতিদিন রাতেই তাদের দেখা হতে লাগলো। নাজিরা তার দিনের গল্প বলতো—স্কুল, বন্ধু, ছোট ছোট জেদ আর দুষ্টুমি… আর আশরান নীরবে শুনতো। কখনো কখনো সে নিজের জগতের কথা বলতো, যেখানে নিয়ম খুব কঠিন, আর মানুষের মতো অনুভূতির কোনো জায়গা নেই। নাজিরা এসব শুনে বলতো, “তোমাদের জগতটা খুব বোরিং!” আশরান তখন হালকা হাসতো—যেন অনেক বছর পর সে হাসতে শিখছে।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত টান তৈরি হলো, যা কেউই মুখে স্বীকার করতো না, কিন্তু দুজনেই অনুভব করতো। এক রাতে নাজিরা হঠাৎ বললো, “তুমি যদি মানুষ হতে, তাহলে কি আমার বন্ধু হতে?” আশরান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, “বন্ধু… হয়তো তার থেকেও বেশি কিছু…” কথাটা বলেই সে থেমে গেল। নাজিরার বুক কেঁপে উঠলো, কিন্তু সে জেদি গলায় বললো, “তাহলে এখন কেন পারো না?” আশরানের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল, “কারণ আমি জীন… আর তুমি মানুষ… আমাদের মাঝে যে দূরত্ব, সেটা কেউ পার হতে পারে না।” নাজিরা তখন রাগ করে বললো, “আমি এসব মানি না! আমি যা চাই, সেটা করেই ছাড়ি!”

ঠিক তখনই হঠাৎ করে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো, অস্বাভাবিক ঠান্ডা নেমে এলো। আশরানের মুখ বদলে গেল। সে তাড়াহুড়ো করে বললো, “নাজিরা, আজই শেষ—তুমি আর এখানে আসবে না!” নাজিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কেন?” আশরান ধীরে বললো, “ওরা জেনে গেছে… আমি নিয়ম ভেঙেছি… মানুষের সাথে সম্পর্ক করা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ… আমাকে চলে যেতে হবে, না হলে তারা তোমাকেও ছাড়বে না।”

নাজিরার চোখে পানি এসে গেল, কিন্তু সে জেদি গলায় বললো, “আমি কাউকে ভয় পাই না! তুমি কোথাও যাবে না!” আশরান মৃদু হেসে বললো, “সব জেদ জেতার জন্য না…” ঠিক তখনই চারপাশে কালো ছায়া ঘন হয়ে এলো, অদৃশ্য শক্তি আশরানকে টেনে নিতে লাগলো। নাজিরা দৌড়ে এগিয়ে এসে তাকে ছুঁতে চাইল, কিন্তু পারলো না—তার হাত ফাঁকা বাতাসে থেমে গেল।

শেষবারের মতো আশরানের কণ্ঠ ভেসে এলো—“নাজিরা… তুমি ভয় পেতে শিখো না… কিন্তু ভুলতেও শিখো…” তারপরই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শ্মশানঘাট আবার আগের মতো ফাঁকা হয়ে রইলো।

তারপর থেকে নাজিরা আর আগের মতো নেই। সে জানে—আশরান হয়তো আর কখনো ফিরবে না, তবুও সে মাঝে মাঝে সেই শ্মশানঘাটে যায়। কেউ জানে না কেন… কিন্তু সে জানে—কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলেও, তার অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না।