Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ভুল পথে পেলাম তোমাকে - Part 22

দূরত্বের ভাষা”
দূরত্ব কখনো মাইল দিয়ে মাপা হয় না।
দূরত্ব তৈরি হয়—
যখন কেউ কথা বলতে চায়,
আর কেউ নীরব থাকতে শেখে।
ইরা অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে।
পা দুটো ব্যথা করছে, তবু থামছে না।
মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন—
“ভালোবাসলে কি ভয় পাওয়া স্বাভাবিক?”
সে বেঞ্চে বসে পড়ে।
ফোনের স্ক্রিন জ্বলে ওঠে—
মায়ার নাম।
একবার বাজে।
দু’বার।
তিনবার।
ইরা কল কাটে না।
ধরেও না।
এই প্রথম সে বুঝতে পারে—
নীরবতা কখনো কখনো
প্রতিরোধ।
অন্যদিকে,
মায়া ঘরের ভেতর পায়চারি করছে।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে,
কিন্তু সময় নয়।
— “আমি কি ভুল করছি?”
সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে।
তার মাথায় রিয়ার কণ্ঠ ফিরে আসে—
“তুমি মানুষকে ভালোবাসো না, তুমি পাহারা দাও।”
মায়া চোখ বন্ধ করে।
— “না… আমি বদলাচ্ছি,”
সে ফিসফিস করে।
— “ইরার জন্য বদলাচ্ছি।”
ঠিক তখন দরজায় নক।
মায়া চমকে উঠে দরজা খুলে।
রিয়া।
চুল খোলা, চোখে সেই পুরনো আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু আজ মুখে একটা অদ্ভুত বিজয়ের ছাপ।
— “ও বাইরে,”
রিয়া বলল।
— “একাই।”
মায়ার চোখ লাল হয়ে উঠল।
— “তুমি ওর কাছে গিয়েছ?”
— “আমি শুধু কথা বলেছি,”
রিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
— “যেমন তুমি একসময় আমার সাথে বলতে।”
মায়া দাঁত চেপে ধরল।
— “চলে যাও।”
রিয়া হেসে উঠল।
— “তুমি ভয় পাচ্ছো, মায়া।
এই ভয়টাই তোমাকে আবার
আগের মতো করে তুলবে।”
— “আমি আর আগের আমি না,”
মায়া ধীরে বলল।
— “দেখা যাবে,”
রিয়া ফিসফিস করে বলল।
— “কারণ ভালোবাসা যখন হাতছাড়া হয়—
তখন মানুষ সত্যিকারের রূপ দেখায়।”
রিয়া চলে যায়।
মায়া এক মুহূর্ত দেরি না করে
কোট তুলে নেয়,
বেরিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে,
ইরা ফোনে একটা মেসেজ দেখে—
Maya:
আমি আসছি।
পালাস না।
ইরা চোখ বন্ধ করে।
— “আমি পালাচ্ছি না,”
সে নিজেকে বলল।
— “আমি শিখছি।”
কিছুক্ষণ পর
মায়া তাকে দেখতে পায়।
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।
কেউ এগোয় না।
কেউ ডাকে না।
শেষে ইরাই বলে—
— “আমরা কি একটু আলাদা থাকতে পারি?”
এই কথাটা
মায়ার বুকে ছুরি হয়ে বসে।
— “কতদিন?”
সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করে।
ইরা কাঁধ ঝাঁকায়।
— “যতদিন না বুঝি—
আমি তোমার সাথে
নিজের মতো থাকতে পারছি কিনা।”
মায়া মাথা নোয়ায়।
— “ঠিক আছে।”
এই ‘ঠিক আছে’
আগের যেকোনো ‘আমি আছি’-র থেকে
বেশি ভারী।
ইরা উঠে দাঁড়ায়।
— “আমি যাচ্ছি।”
— “আমি থামাব না,”
মায়া বলে।
ইরা হাঁটতে শুরু করে।
প্রতিটা ধাপে
দু’জনেই ভাঙছে—
কিন্তু কেউ ফিরছে না।
আকাশে মেঘ জমে।
দূরে বজ্র।
এই দূরত্ব
ঝগড়ার না—
এটা পরীক্ষা।
আর পরীক্ষায়
ভালোবাসা টিকে গেলে
আর কখনো আগের মতো থাকে না।

“ফিরে আসা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত”
কিছু সিদ্ধান্ত
চিৎকার করে আসে না।
তারা আসে নীরবে—
ভেতরে ভেতরে সব ভেঙে দিয়ে।
ইরা আজ অন্য ঘরে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে।
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে একটা প্রশ্ন বারবার করছে—
“আমি কি এখনো আমি?”
মোবাইলটা বিছানায় পড়ে আছে।
মায়ার কোনো মেসেজ নেই।
এই নীরবতাটা
অভিযোগ নয়—
সম্মান।
আর সেটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
ইরা ধীরে বসে পড়ে।
রিয়ার কথা মনে পড়ে আবার—
“ভালোবাসা যখন ভয় পায়,
তখন সে আঁকড়ে ধরে।”
ইরা ফিসফিস করে বলে—
— “আমি আঁকড়ে ধরা ভালোবাসা চাই না।”
ঠিক তখনই
দরজায় হালকা নক।
ইরা চমকে ওঠে।
— “কে?”
— “আমি,”
মায়ার কণ্ঠ।
শান্ত।
কিন্তু ক্লান্ত।
ইরা দরজা খোলে না।
— “কী চাইছ?”
— “কথা,”
মায়া বলে।
— “কোনো প্রতিশ্রুতি না।
কোনো দাবি না।”
নীরবতা।
ইরা দরজা খুলে।
মায়া দাঁড়িয়ে আছে—
চুল এলোমেলো,
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
এই প্রথম সে শক্ত না।
— “তুমি কেমন আছো?”
মায়া জিজ্ঞেস করে।
এই সাধারণ প্রশ্নটাই
ইরার বুক চেপে ধরে।
— “জানি না,”
ইরা সৎভাবে বলে।
মায়া মাথা নোয়ায়।
— “ঠিক আছে।”
দু’জন বসে পড়ে
মেঝেতে।
দূরে দূরে।
— “আমি একটা কথা বলব,”
মায়া বলে।
— “তুমি চাইলে শুনবে না।”
ইরা তাকায়।
— “বলো।”
মায়া গভীর শ্বাস নেয়।
— “আমি ভয় পেলে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই।
এটা আমার দোষ।
আমার অন্ধকার।”
ইরা চুপ।
— “কিন্তু তুই আমাকে শিখিয়েছিস—
ভালোবাসা মানে পাহারা না,
ভরসা।”
মায়ার গলা কেঁপে ওঠে।
— “তাই আমি তোকে আটকাব না।
তুই থাকিস বা যাস—
দুটোই তোর সিদ্ধান্ত।”
এই কথাটা
ইরাকে কাঁপিয়ে দেয়।
— “তুমি জানো…
এটাই সবচেয়ে কঠিন কথা,”
ইরা বলে।
— “আমি জানি,”
মায়া উত্তর দেয়।
— “কিন্তু সত্যি।”
দু’জনের মাঝে
আর কোনো ছায়া নেই।
শুধু মানুষ।
ইরা উঠে দাঁড়ায়।
হেঁটে জানলার কাছে যায়।
বাইরে বৃষ্টি নামছে।
— “আমি যদি যাই?”
ইরা জিজ্ঞেস করে,
ফিরে না তাকিয়ে।
মায়া একটু থামে।
— “তাহলে আমি অপেক্ষা করব না,”
সে বলে।
— “আমি বাঁচব।
নিজের মতো।”
ইরা ঘুরে তাকায়।
— “এটাই আমি শুনতে চেয়েছিলাম।”
সে এগিয়ে আসে।
মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে।
— “আমি যাচ্ছি না,”
ইরা ধীরে বলে।
— “আমি থাকছি।
কিন্তু শর্তে।”
মায়ার চোখে আলো।
— “বলো।”
— “আমরা দু’জনেই বদলাব।
আর যদি কোনোদিন
ভালোবাসা বিষ হয়ে ওঠে—
আমরা সত্য বলব।”
মায়া মাথা নোয়ায়।
— “কথা দিচ্ছি।”
ইরা তার হাত ধরে।
এই ধরা
অধিকার না।
পছন্দ।
বৃষ্টি জোরে পড়ে।
বাইরে বজ্র।
ভিতরে দু’জন মানুষ
একটা যুদ্ধ জিতে নেয়—
একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নয়,
নিজের মতো থেকে ভালোবাসার সিদ্ধান্ত।