“শেষ নয়, শুরু”
শেষ বলে কিছু হয় না।
শুধু রূপ বদলায়।
ইরা নতুন শহরে।
নামটা গুরুত্বপূর্ণ না—
কারণ এখানে কেউ তাকে চেনে না।
এটাই শান্তি।
ছোট একটা ঘর।
একটা জানালা।
সকালের আলো সরাসরি পড়ে মেঝেতে।
ইরা মেঝেতে বসে চোখ বন্ধ করে।
হাতের তালু দুটো ওপরে তুলে রাখে।
আলো আসে।
কিন্তু এবার
আলো দখল নেয় না।
শুধু থাকে।
— “এইটাই তো চাইছিলাম,”
ইরা নিজেকে বলে।
— “নিজের মতো থাকা।”
কিন্তু বুকের ভেতর
একটা জায়গা ফাঁকা।
খালি না—
ফাঁকা।
অন্যদিকে
মায়া পুরনো শহরেই আছে।
সবকিছু আগের মতো,
কিন্তু সে আগের মতো না।
সে আর ছায়া থেকে পালায় না।
ছায়াকে ব্যবহারও করে না।
সে কথা বলে।
— “তুই যদি আমাকে গ্রাস করিস,”
মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
— “আমি তোকে ছেড়ে দেব।”
ছায়া প্রথমবার
চুপ থাকে।
কারণ
এটা হুমকি না।
এটা সত্য।
রিয়া দূরে দাঁড়িয়ে দেখে।
এইবার আর হস্তক্ষেপ করে না।
— “ভালোবাসা,”
সে নিজের মনে বলে,
— “মানুষকে ভাঙে না।
পরিণত করে।”
এই উপলব্ধিটাই
তার সবচেয়ে বড় হার।
কয়েক মাস কেটে যায়।
ইরা বদলায়।
আর মায়াও।
কিন্তু সম্পর্কটা
কেটে যায় না।
এটা আর প্রতিদিনের কথা না।
এটা জানার জায়গা।
“আমি আছি।”
একদিন
ইরা ফিরে আসে।
নাটকীয়ভাবে না।
কোনো ঝড় নেই।
শুধু ট্রেন থেকে নামা।
মায়া প্ল্যাটফর্মের একপাশে দাঁড়িয়ে।
ডাকে না।
দৌড়ায় না।
ইরা কাছে আসে।
দু’জনেই থামে।
— “কেমন আছ?”
ইরা জিজ্ঞেস করে।
— “সত্যি?”
মায়া হালকা হাসে।
— “আমি আছি।”
ইরা মাথা নাড়ায়।
— “আমিও।”
হাত ধরে না।
কিন্তু কাঁধে কাঁধ লাগে।
এই স্পর্শেই
সব বলা হয়ে যায়।
হেঁটে যেতে যেতে
ইরা বলে—
— “ভয়টা গেছে।”
মায়া বলে—
— “আমারও।”
— “আমরা কি আবার—”
মায়া থামায় না।
শেষ করতে দেয়।
ইরা নিজেই থামে।
— “না,”
সে বলে।
— “আমরা এবার নতুনভাবে।”
মায়া চোখে চোখ রাখে।
— “চুক্তি?”
— “চুক্তি না,”
ইরা হালকা হাসে।
— “পছন্দ।”
রাত নামে।
শহরের আলো জ্বলে।
এইবার
আলো আর ছায়া
একসাথে দাঁড়ায়।
কেউ কারও উপর না।
পাশাপাশি।
শেষ লাইনে—
“ভুল পথে পেয়েছিলাম তোমাকে,
কিন্তু ঠিক পথে পেয়েছিলাম
নিজেকে।”
“ফিরে আসার ভয়”
মিল হওয়া সবসময় সহজ না।
কখনও কখনও মিল হওয়ার আগে
মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।
শহরের এক কোণে ছোট একটা ক্যাফে।
জানালার পাশে বসে আছে ইরা।
তার সামনে কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সে বুঝতেই পারেনি।
দরজা খুলতেই
হালকা বাতাস ঢুকল।
মায়া ঢুকল।
দু’জনের চোখ একসাথে মিলল।
এই কয়েক মাসে
দু’জনেই বদলেছে।
মায়ার চোখে আগের আগুন আছে—
কিন্তু এখন সেটা স্থির।
ইরার চোখে আলো আছে—
কিন্তু সেটা আর অস্থির না।
মায়া ধীরে সামনে এসে বসল।
— “অপেক্ষা করছিলি?”
সে জিজ্ঞেস করল।
ইরা হালকা হাসল।
— “হ্যাঁ… কিন্তু তোর জন্য না।”
মায়া ভুরু তুলল।
— “নিজের জন্য।”
এই উত্তর শুনে
মায়ার ঠোঁটে ছোট হাসি ফুটল।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ।
এই নীরবতা অস্বস্তিকর না—
গভীর।
মায়া বলল—
— “আমি ভয় পাচ্ছি।”
ইরা তাকাল।
— “কিসের?”
— “আবার সব ভেঙে যাওয়ার।”
ইরা কফির কাপ ঘুরাতে ঘুরাতে বলল—
— “ভেঙে গেলে আবার গড়া যায়।
কিন্তু এবার আমরা জোর করে ধরব না।”
হঠাৎ বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।
মায়া জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “তুই কি আমার উপর এখনো ভরসা করিস?”
ইরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল—
— “আমি তোকে বিশ্বাস করি না পুরোপুরি।”
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
কিন্তু ইরা হাত বাড়িয়ে
তার হাত ছুঁয়ে দিল।
— “আমি বিশ্বাস করি
তুই নিজেকে বদলাতে পারিস।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
বৃষ্টি বাড়তে লাগল।
মায়া ধীরে বলল—
— “আমি তোকে এখনো ভালোবাসি।”
ইরা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
তারপর বলল—
— “আমি তোকে ভালোবাসা বন্ধ করিনি কোনোদিন।”
এই স্বীকারোক্তির পরে
কেউ আর কিছু বলল না।
কারণ
সব শব্দের পরে
এই সত্যটাই থাকে।
ক্যাফে থেকে বেরোতে বেরোতে
মায়া ছাতা খুলল।
দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে।
হাত ধরেনি কেউ।
কিন্তু দূরত্ব নেই।
হাঁটতে হাঁটতে
ইরা বলল—
— “আমরা ধীরে চলব, ঠিক?”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “এইবার
দৌড়াব না।”
দূরে বজ্রপাত হলো।
কিন্তু এইবার
কেউ ভয় পেল না।
কারণ
ঝড়ের মাঝেও
দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে।
“পুরনো ক্ষত, নতুন পরীক্ষা”
ভালোবাসা ফিরে এলে
সব সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।
বরং তখনই শুরু হয়—
সত্যিকারের পরীক্ষা।
বৃষ্টিটা থেমেছে।
রাস্তার বাতিগুলো ভেজা মাটিতে প্রতিফলন ফেলছে।
ইরা আর মায়া পাশাপাশি হাঁটছে।
কথা কম… কিন্তু নীরবতা আর ভারী না।
হঠাৎ ইরা থামল।
— “মায়া… একটা প্রশ্ন করব?”
— “কর।”
— “তুই এখনো নিজের ভিতরের ছায়াটাকে ভয় পাস?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল—
— “আগে ভয় পেতাম।
এখন ভয় পাই না…
কিন্তু ওকে হালকা ভাবে নেই না।”
ইরা মাথা নাড়ল।
— “ভালো।”
ঠিক তখনই
রাস্তার আলো হঠাৎ কেঁপে উঠল।
একটা ঠান্ডা বাতাস বইল।
মায়ার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
— “ইরা… দাঁড়া।”
ইরা বুঝে গেল।
— “ওরা?”
মায়া ধীরে বলল—
— “হ্যাঁ… কিন্তু এবার অন্যরকম।”
রাস্তার শেষ প্রান্তে
একটা ছায়া তৈরি হলো।
ধীরে ধীরে
মানুষের আকার নিল।
রিয়া।
ইরার বুক কেঁপে উঠল।
— “রিয়া…?”
রিয়া এগিয়ে এলো।
তার মুখে আগের সেই শান্ত হাসি নেই।
আজ তার চোখে ক্লান্তি।
— “আমি লড়তে আসিনি,”
সে বলল।
মায়া ঠান্ডা স্বরে বলল—
— “তাহলে কেন এসেছ?”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— “কারণ পূর্ণ ছায়া ফিরে আসছে।”
নীরবতা।
বাতাস যেন জমে গেল।
ইরা ধীরে বলল—
— “ও তো শেষ হয়ে গেছিল…”
রিয়া মাথা নাড়ল।
— “পূর্ণ ছায়া কখনো শেষ হয় না।
ও শুধু অপেক্ষা করে।”
মায়ার চোখ অন্ধকার হয়ে উঠল।
— “ও এবার কী চায়?”
রিয়া সরাসরি ইরার দিকে তাকাল।
— “তোমাদের আলাদা করতে।”
ইরার বুক ধড়ফড় করে উঠল।
— “কেন?”
রিয়া বলল—
— “কারণ আলো আর ছায়া একসাথে থাকলে
পূর্ণ ছায়া দুর্বল হয়ে যায়।”
মায়া এগিয়ে দাঁড়াল ইরার সামনে।
— “আমরা আলাদা হব না।”
রিয়া মাথা নিচু করল।
— “আমি জানি।
কিন্তু ও এবার তোমার ভিতর দিয়েই আঘাত করবে।”
মায়ার শরীর হালকা কেঁপে উঠল।
ইরা সেটা বুঝে গেল।
সে মায়ার হাত ধরল।
— “আমরা এবার পালাব না।”
রিয়া তাকিয়ে রইল ওদের দিকে।
তার চোখে অদ্ভুত একটা শান্তি ফুটল।
— “তোমরা বদলে গেছ,”
সে বলল।
মায়া শান্ত স্বরে বলল—
— “ভালোবাসা মানুষকে বদলায়।”
রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “পূর্ণ ছায়া তোমাদের শেষ পরীক্ষা নেবে।
আর সেই পরীক্ষায়
তোমাদের একজনকে নিজের ভয় হারাতে হবে…
আর একজনকে নিজের শক্তি ছাড়তে হবে।”
ইরা বলল—
— “মানে?”
রিয়া ফিসফিস করে বলল—
— “শেষ লড়াইতে
ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে হলে
তোমাদের কেউ একজন
নিজেকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।”
এই কথা শুনে
ইরার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে মায়ার হাত শক্ত করে ধরল।
মায়া ধীরে বলল—
— “আমরা কাউকে হারাব না।”
রিয়া তাকাল তার দিকে।
— “দেখা যাবে।”
তারপর ধীরে ধীরে
রিয়া অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
রাস্তা আবার নিস্তব্ধ।
ইরা ফিসফিস করে বলল—
— “তুই ভয় পাচ্ছিস?”
মায়া ইরার দিকে তাকাল।
— “হ্যাঁ।
কিন্তু এবার পালাব না।”
ইরা এগিয়ে এসে
তার কপালে কপাল ছুঁইয়ে দিল।
— “আমরাও না।”
দূরে আকাশে বজ্রপাত হলো।
এইবার শব্দটা আগের চেয়ে ভারী।
কারণ
শেষ যুদ্ধ কাছে আসছে।