Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 4

পর্ব ৪: আয়নার ওপাশে
মোবাইলটা মেঝেতে পড়তেই টর্চের আলো ঘুরে গিয়ে থামল ঘরের এক কোণে।
আরোহী স্থির।
তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে...
মেঘলা।
কিন্তু...
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আর বাইরে তার সঙ্গে কথা বলা মেঘলা—দুজন যেন এক নয়।
এই মেঘলার মুখ ফ্যাকাশে।
চোখের নিচে কালো দাগ।
হাতে ছোট্ট একটা কাটা দাগ থেকে ধীরে ধীরে রক্ত ঝরছে।
তবু সে হাসার চেষ্টা করল।
— "তুমি এলে কেন?"
আরোহী ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।
— "তোমাকে নিয়ে যেতে।"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "এখান থেকে কাউকে নিয়ে যাওয়া এত সহজ নয়।"
ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই লোকটার গলা ভেসে এল—
— "দেখা হয়ে গেছে? এবার চল।"
আরোহী ঘুরে দাঁড়াল।
— "আপনি আসলে কে?"
লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
— "আমার নাম অর্ণব রায়।"
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
— "ওর কোনো কথা বিশ্বাস কোরো না!"
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "প্রতিবার একই কথা বলো, মেঘলা।"
সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিটা আরোহীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
— "দেখো।"
আরোহী ছবিটা হাতে নিল।
একটি পরিবারের ছবি।
অর্ণব...
একজন মহিলা...
আর মাঝখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে—
মেঘলা।
ছবির পেছনে কালো কালিতে লেখা—
"আমাদের শেষ দুর্গাপুজো। – ২০১৯"
আরোহী বিভ্রান্ত হয়ে গেল।
— "তোমরা... একে অপরকে চিনতে?"
অর্ণব শান্ত গলায় বলল,
— "ও শুধু আমাকে চিনত না... ও আমার ছোট বোন।"
মেঘলা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
— "চুপ করো..."
— "সত্যিটা জানার অধিকার ওর আছে।"
আরোহী একবার অর্ণবের দিকে, একবার মেঘলার দিকে তাকাল।
তার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত সে ভেবেছিল অর্ণবই হয়তো ভিলেন।
কিন্তু এখন?
হঠাৎ মেঘলা আরোহীর হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— "আরোহী, আমার দিকে তাকাও।"
তার চোখে জল।
— "যদি আমাকে বিশ্বাস করো... তাহলে আজ কোনো প্রশ্ন কোরো না। শুধু আমার সঙ্গে চলো।"
অর্ণব ধীরে ধীরে বলল,
— "তুমি যদি আজ ওর সঙ্গে বেরিয়ে যাও... তাহলে কাল সূর্য ওঠার আগেই ও মারা যাবে।"
কথাটা শুনে ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল।
আরোহী স্তব্ধ।
— "আপনি কী বলছেন?"
অর্ণব উত্তর দিল না।
সে শুধু দেয়ালে ঝোলানো বড় একটা আয়নার দিকে তাকাল।
— "ওই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াও।"
— "কেন?"
— "কারণ কিছু সত্যি চোখে দেখা যায় না... দেখতে হয় প্রতিবিম্বে।"
আরোহী ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল।
তার পাশে...
মেঘলা।
আর একটু দূরে অর্ণব।
সবকিছু স্বাভাবিক।
কিন্তু ঠিক যখন সে ফিরে আসতে যাবে...
তার চোখ আবার আয়নার ওপর পড়ল।
সে জমে গেল।
কারণ...
আয়নায় অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।
আরোহীও দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু... মেঘলার কোনো প্রতিবিম্ব নেই।
ঘরের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল।
আরোহীর ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে মেঘলার দিকে তাকাল।
মেঘলা শুধু চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল—
"আমি তোমাকে সত্যিটা বলতে চেয়েছিলাম... কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নয়..."
আরোহীর নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে গেল।
সে আবার আয়নার দিকে তাকাল।
একবার...
দু'বার...
তিনবার...
না।
ভুল দেখছে না।
আয়নায় সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে।
অর্ণবকেও দেখতে পাচ্ছে।
কিন্তু মেঘলা...
মেঘলার কোনো প্রতিবিম্ব নেই।
তার হাত থেকে ছবিটা মেঝেতে পড়ে গেল।
— "এটা... কীভাবে সম্ভব?"
মেঘলা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না, আরোহী।"
— "না... আমি উত্তর চাই!"
আরোহীর গলায় রাগের সঙ্গে মিশে ছিল ভয়।
— "তুমি আসলে কে?"
মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "আমি সেই মানুষ, যে তোমার সঙ্গে মিথ্যে বলতে চায়নি... কিন্তু সত্যিটা বলার সাহসও পায়নি।"
অর্ণব সামনে এগিয়ে এল।
— "মেঘলা, আর লুকিয়ে লাভ নেই।"
— "চুপ করো!"
মেঘলার গলায় এমন তীব্রতা ছিল যে ঘরের নীরবতাও যেন কেঁপে উঠল।
অর্ণব থেমে গেল।
আরোহী দু'জনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তোমরা দু'জন কী লুকাচ্ছ?"
অর্ণব ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে না তাকিয়েই বলল,
— "চার বছর আগে... এই বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল।"
মেঘলা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
অর্ণব বলতে লাগল,
— "সেদিনও এমনই বৃষ্টি হচ্ছিল। বাড়িতে শুধু আমি, মেঘলা আর মা ছিলাম।"
"হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তারপর..."
সে থেমে গেল।
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
— "সেই রাতের পর আমাদের জীবন আর আগের মতো থাকেনি।"
আরোহী আস্তে বলল,
— "কী হয়েছিল?"
অর্ণব উত্তর দেওয়ার আগেই মেঘলা চিৎকার করে উঠল—
— "না!"
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
— "ওকে বলো না..."
— "ওর জানা দরকার।"
— "এখন না..."
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই...
নিচতলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
ঠক... ঠক... ঠক...
মনে হলো কেউ মূল দরজায় কড়া নাড়ছে।
তিনজনই একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
আবার...
ঠক... ঠক... ঠক...
অর্ণবের মুখের রঙ বদলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "অসম্ভব..."
আরোহী অবাক।
— "কে এসেছে?"
অর্ণব ধীরে ধীরে বলল,
— "যে আসার কথা ছিল না।"
মেঘলা ভয়ে কাঁপতে শুরু করল।
— "ও এসে গেছে..."
নিচ থেকে এবার একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল—
"অর্ণব... দরজা খোলো। আমি জানি তোমরা ভেতরে আছ।"
কণ্ঠটা শান্ত।
অস্বাভাবিক শান্ত।
অর্ণবের কপালে ঘাম জমে গেল।
আরোহী জিজ্ঞেস করল,
— "উনি কে?"
অর্ণব ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
তার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট।
সে খুব আস্তে বলল—
"ওই গলাটা... আমার মায়ের।"
আরোহী অবাক হয়ে বলল,
— "তাহলে দরজা খুলছেন না কেন?"
অর্ণব ঠোঁট কামড়ে ধরে উত্তর দিল—
"কারণ... আমার মা তিন বছর আগে মারা গেছেন।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
নিচতলার প্রধান দরজাটা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ক্যাঁচ...
তারপর সারা বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ক্যাঁচ...
প্রধান দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
পুরো বাড়িটা যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।
বাইরে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
ভেতরে তিনজনের দ্রুত শ্বাসের আওয়াজ।
মেঘলা আচমকা আরোহীর হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
তার হাত ঠান্ডা।
অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
— "শোনো... যা-ই ঘটুক, আমার হাত ছাড়বে না।"
আরোহী কিছু বলতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ভেসে এল কারও ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার শব্দ।
ঠক...
ঠক...
ঠক...
প্রতিটি পায়ের শব্দ যেন পুরো বাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
অর্ণব ফিসফিস করে বলল,
— "অসম্ভব... অসম্ভব..."
আরোহী তার দিকে তাকাল।
— "আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন?"
অর্ণব কাঁপা গলায় বলল,
— "কারণ... এই শব্দটা আমি ভুলতে পারিনি।"
— "কোন শব্দ?"
— "সেই রাতেও... ঠিক এমনভাবেই কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিল।"
মেঘলা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
তার ঠোঁট কাঁপছে।
মনে হচ্ছে সে প্রার্থনা করছে।
পায়ের শব্দ আরও কাছে আসছে।
ঠক...
ঠক...
এবার করিডোরের শেষ মাথায় একটা ছায়া দেখা গেল।
ধীরে ধীরে ছায়াটা স্পষ্ট হতে লাগল।
সাদা শাড়ি।
লম্বা চুল।
মুখ নিচু।
মহিলাটি এক পা... এক পা করে এগিয়ে আসছেন।
আরোহী সাহস সঞ্চয় করে বলল,
— "আপনি... কে?"
কোনো উত্তর নেই।
মহিলা আরও কাছে এলেন।
তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
আরোহীর বুক কেঁপে উঠল।
মুখটা শান্ত।
কিন্তু চোখ দুটো লাল।
অদ্ভুত লাল।
মহিলা মেঘলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "তুই আবার কাউকে নিয়ে এসেছিস?"
মেঘলা কেঁপে উঠল।
— "মা..."
মহিলা এবার আরোহীর দিকে তাকালেন।
তার চোখে রাগ নেই।
বরং গভীর কষ্ট।
— "তোমার নাম আরোহী... তাই তো?"
আরোহী অবাক।
— "আপনি আমার নাম জানেন?"
মহিলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
— "অনেক আগেই জেনেছি।"
অর্ণব হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
— "আপনি কে?"
মহিলা মৃদু হেসে বললেন,
— "আমাকে চিনতে পারছ না, অর্ণব?"
অর্ণবের চোখ বড় হয়ে গেল।
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— "না... এটা হতে পারে না..."
মহিলা ধীরে ধীরে হাত বাড়ালেন।
— "এদিকে আয়।"
অর্ণব এক পা পিছিয়ে গেল।
— "না!"
মহিলার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
— "তাহলে সত্যিটা আজও কাউকে বলবি না?"
করিডোরে হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।
দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলো একসঙ্গে পড়ে ভেঙে গেল।
ঝনঝন!
মেঘলা চিৎকার করে উঠল।
— "আরোহী, চোখ বন্ধ করো!"
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
আরোহীর চোখ পড়েছে ভাঙা ছবির একটায়।
ছবিটা উল্টে গিয়েছিল।
সে সেটাকে তুলে নিল।
ছবিতে তিনজন মানুষ—
অর্ণব...
মেঘলা...
আর মাঝখানে সেই মহিলা।
কিন্তু ছবির নিচে লেখা তারিখ দেখে আরোহীর বুক কেঁপে উঠল।
তারিখ: ১৭ আগস্ট, ২০২৬।
সে হতবাক হয়ে গেল।
আজকের তারিখের দুই মাস পরের তারিখ!
আর ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা মাত্র একটি বাক্য—
"যে বাড়িতে একবার ভালোবাসা আটকে যায়, সে বাড়ি সময়কেও আটকে রাখতে শেখে।"
আরোহী ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
কিন্তু...
মহিলা আর সেখানে নেই।
করিডোর আবার ফাঁকা।
শুধু দূরের একটি ঘর থেকে খুব আস্তে ভেসে এল একটি পরিচিত সুর...
মেঘলা সেই গানটাই গাইছে—
"বৃষ্টি নামুক... তবু তুমি হাতটা ছেড়ো না..."
— চলবে.....