বৃষ্টিটা থেমে যাওয়ার পরও আকাশে ঘন মেঘের আনাগোনা ছিল। রাস্তার দু'পাশে জমে থাকা পানিতে শহরের উঁচু উঁচু ভবনগুলোর প্রতিচ্ছবি কাঁপছিল। আবির দ্রুত পায়ে অফিসের দিকে এগিয়ে গেল। আজ কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের মিটিং। এই প্রজেক্টের ওপর নির্ভর করছে বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে বহু কোটি টাকার চুক্তি। তাই তার মন এখনো পুরোপুরি কাজে ডুবে আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে অফিসে পৌঁছে লিফটে উঠে নিজের কেবিনে চলে গেল। ভেজা শার্ট বদলে নতুন শার্ট পরে ল্যাপটপ খুলতেই তার সেক্রেটারি রাফি দরজায় নক করল।
"স্যার, আজ নতুন কয়েকজন কর্মী যোগ দিচ্ছেন। এইচআর থেকে বলেছে, ওদের সঙ্গে আপনার একটা ছোট্ট ইন্ট্রোডাকশন সেশন আছে।"
আবির চোখ না তুলেই বলল, "দশ মিনিট পরে কনফারেন্স রুমে আসছি।"
ওদিকে কাভিয়া অরুর বুকের ভেতরটা উত্তেজনায় ধুকপুক করছে। বহু ইন্টারভিউ দেওয়ার পর অবশেষে সে এই চাকরিটা পেয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে চেয়েছিল নিজের যোগ্যতায় দাঁড়াতে। তাই আজকের দিনটা তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইচআর একে একে সবাইকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকতেই কাভিয়া চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। আধুনিক সাজসজ্জা, বড় কাচের জানালা, দেয়ালে কোম্পানির অর্জনের ছবি—সবকিছুই যেন নতুন জীবনের দরজা খুলে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একজন ভেতরে ঢুকল। সবাই সম্মান দেখিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেই কাভিয়াও উঠে দাঁড়াল। কিন্তু লোকটার মুখ দেখেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"এই লোকটা...!"
একই সময়ে আবিরও নতুন কর্মীদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে চিনতে তার এক সেকেন্ডও লাগল না।
সকালের সেই বৃষ্টিভেজা মেয়েটা।
যে তাকে বলেছিল, "একটু হাসতে শিখবেন।"
দুজনের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে রইল। তারপর আবির এমন ভাব করল যেন সে কাভিয়াকে চিনতেই পারেনি। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "ওয়েলকাম টু রানা টেক সলিউশনস। আমি আবির সুলতান রানা। এখানে কাজের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা আর দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই। আশা করি আপনারাও সেটাই মেনে চলবেন।"
কাভিয়া মনে মনে বলল, "ওহ! তাহলে মিস্টার রাগী সাহেব এই অফিসের বড় বস!"
তার মুখের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
আবিরের চোখ এড়াল না সেই হাসি। অকারণেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। এই মেয়েটা কি সব সময় এমনই নির্ভার?
ইন্ট্রোডাকশন শেষ হতেই সবাই বেরিয়ে গেল। কিন্তু কাভিয়া ফাইল হাতে নিয়ে বেরোতে গিয়ে অসাবধানতায় দরজার পাশে রাখা একটি ফুলদানি ধাক্কা দিয়ে ফেলল।
ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কাভিয়া দু'চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল, "হায় আল্লাহ! প্রথম দিনেই সর্বনাশ!"
আবির ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। মুখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু সেই শান্ত মুখটাই যেন আরও ভয়ংকর।
"প্রথম দিন?"
কাভিয়া মাথা নিচু করে বলল, "জি..."
"আর প্রথম দিনেই অফিসের জিনিস ভাঙা শুরু?"
কাভিয়া ঠোঁট কামড়ে বলল, "ইচ্ছা করে করিনি।"
"আমি জানি।"
আবির নিচু হয়ে ভাঙা কাঁচের দিকে তাকাল, তারপর শান্ত গলায় বলল, "পরেরবার শুধু একটু সাবধানে হাঁটবেন।"
কথাটা বলে সে চলে গেল।
কাভিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে ভেবেছিল লোকটা নিশ্চয়ই অনেক বকবে। কিন্তু তা হলো না।
হয়তো মানুষটা যতটা কঠিন দেখায়, ভেতরে ততটা নয়...
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আবির নিজের কেবিনে ফিরে গিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে অদ্ভুত এক প্রশ্ন করল নিজেকেই—
"মেয়েটার সঙ্গে আজ দ্বিতীয়বার দেখা হলো... কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে, এটাই শেষ নয়।"
************
পরদিন সকাল থেকেই অফিসের পরিবেশ ছিল অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত। প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজে ডুবে আছে। নতুন কর্মীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাভিয়া নিজের ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে ফাইল পড়ছিল। প্রথম দিনেই সে বুঝে গিয়েছিল, এই অফিসে সামান্য ভুলেরও কোনো ক্ষমা নেই। আর তার ওপর অফিসের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার আবির সুলতান রানা—মানুষটা যেন একেবারে হাঁটতে-চলতে নিয়মের বই।
দুপুরের দিকে প্রশিক্ষণ শেষ হতেই সবাই ক্যান্টিনে চলে গেল। কাভিয়া ট্রে হাতে খাবার নিয়ে বসার জায়গা খুঁজছিল। ঠিক তখনই অসাবধানতাবশত একজন কর্মচারীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার ট্রেটা কাত হয়ে গেল। গরম কফি ছিটকে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের সাদা শার্টে।
কাভিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল।
"আজও গেল!"
ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই সে দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবির।
সাদা শার্টে কফির দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ মনে মনে ভাবছে, নতুন মেয়েটার চাকরি বুঝি আজই শেষ।
কাভিয়া দ্রুত টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল, "আমি সত্যিই দুঃখিত। বিশ্বাস করুন, ইচ্ছে করে করিনি।"
আবির কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টিস্যু নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আপনার সঙ্গে দেখা হলেই কি কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে?"
কাভিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল, "তাহলে হয়তো আপনিই আমার জন্য আনলাকি!"
চারপাশে চাপা হাসির শব্দ উঠল।
আবিরের ঠোঁটের কোণেও খুব অল্প সময়ের জন্য একটুকরো হাসি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সে দ্রুত মুখ গম্ভীর করে বলল, "কাজের সময় মজা কম করলে ভালো হয়।"
কথাটা বলেই সে চলে গেল।
সবাই অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
রাফি পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, "আজব! অন্য কেউ হলে এতক্ষণে ভালোই বকা খেত।"
আরিয়ান, যে সেদিন অফিসে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, দূর থেকে পুরো ঘটনাটা দেখে মুচকি হেসে বলল, "বিষয়টা কিন্তু ইন্টারেস্টিং। আমার বরফের পাহাড় ভাইয়া আজ দ্বিতীয়বার একই মেয়েকে ক্ষমা করল!"
অন্যদিকে আবির নিজের কেবিনে ফিরে এসে শার্টের কফির দাগ পরিষ্কার করতে করতে অকারণেই কাভিয়ার কথাগুলো মনে করতে লাগল।
"তাহলে হয়তো আপনিই আমার জন্য আনলাকি!"
মেয়েটা অদ্ভুত। ভুল করে, আবার সেই ভুল নিয়েই হাসতেও পারে। অথচ তার চোখে কোনো কৃত্রিমতা নেই।
এদিকে কাভিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল।
"উফ! মানুষটা রাগী ঠিকই, কিন্তু খারাপ না।"
সেদিন বিকেলে কাজ শেষ হওয়ার পর প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছে। কাভিয়াও ছাতা আনেনি। বাসস্ট্যান্ড অনেকটা দূরে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
ঠিক তখনই একটি কালো গাড়ি তার সামনে এসে থামল।
গাড়ির জানালার কাচ ধীরে ধীরে নিচে নামতেই ভেতর থেকে আবিরের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—
"আপনি যদি চান, পথে নামিয়ে দিতে পারি। এই বৃষ্টিতে বাসের জন্য অপেক্ষা করা নিরাপদ হবে না।"
কাভিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সকালের সেই কঠোর মানুষটাই কি এখন তাকে সাহায্য করার প্রস্তাব দিচ্ছে?
সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে গাড়ির দরজা খুলল।